প্রশ্নোত্তর : উত্তর দিচ্ছেন- অধ্যক্ষ মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান

0

প্রশ্নোত্তর : উত্তর দিচ্ছেন- অধ্যক্ষ মুফ্তী সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান

 মাওলানা বোরহান উদ্দীন
মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া দরসে নেজামী
কালুরঘাট, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপনে যারা বিরোধিতা করে তারা যুক্তি হিসেবে বলে ১২ রবিউল আউয়াল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে আগমন করেন এবং এ দিনেই ইনতিকাল করেন। তাই এ দিনে ঈদ বা খুশী উদযাপন করার কোন অবকাশ নেই। সুতরাং ঈদে মিলাদুন্নবী পালন না করে শোক পালনার্থে সীরাতুন্নবী বা ওফাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করাটাই যুক্তিযুক্ত। এ ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের আলোকে সঠিক ফায়সালা প্রদান করে বিভ্রান্তি নিরসনের আবেদন রইল।
 উত্তর: প্রখ্যাত ইমাম আব্দুর রহমান জোজী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, শারে সহীহ্ বুখারী ইমাম আহমদ কস্তালানী, মুহাদ্দিস আবুল খত্তাব ইবনে দাহিয়া এবং শেখে মুহাক্কিক হযরত আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হিসহ বিশ্বের অধিকাংশ বরেণ্য ইমাম, ফকিহ, মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকগণের মতে প্রসিদ্ধ অভিমত অনুযায়ী ১২ রবিউল আউয়াল শরীফে রাসূলে আকরামের শুভাগমনের তারিখ হিসেবে যুগে যুগে বিশ্বের সর্বত্র অধিকাংশ মুসলমান হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ধরাপৃষ্ঠে শুভাগমনের শুকরিয়া স্বরূপ খুশি হয়ে ‘পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করে আসছেন। পবিত্র রবিউল আউয়ালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বেছাল বা ওফাত শরীফ হওয়া সত্ত্বেও এ মাসে ওফাতুন্নবী বা ওফাত দিবস ইত্যাদি পালনার্থে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করতে ইসলামী স্কলার ও মনীষীগণ নিষেধ করেছেন। কেননা, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমার হায়াত (অর্থাৎ দুনিয়ার বাহ্যিক জীবন) যেমন তোমাদের জন্য মঙ্গলময় তেমনি আমার ওফাত ও তোমাদের জন্য কল্যাণময়। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- حياتى خيرلكم ومماتى خيرلكم (الحديث) অর্থাৎ আমার দুনিয়াবী জীবন ও ইন্তেকাল শরীফ উভয়টা তোমাদের জন্য উত্তম ও মঙ্গলময় শোক বা দুঃখের বিষয় নয়। রবিউল আউয়াল মাসে যুগযুগ ধরে চলে আসা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায়ার্থে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন না করে যারা এ পবিত্র মাসে ওফাতুন্নবী বা ‘সীরাতুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইত্যাদি অনুষ্ঠান করে তাদের আসল উদ্দেশ্য হলো এ সবের মাধ্যমে ‘মিলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর খুশী উদযাপনের দিক থেকে মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুভূতিকে অন্যদিকে ফেরানোর অপচেষ্টা করা। মূলতঃ এটা সৎ উদ্দেশ্য নয় বরং ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি বিদ্বেষমূলক ও ষড়যন্ত্রমূলক। আরো উল্লেখ্য ১২ রবিউল আউয়াল রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘ওফাত দিবস’ হওয়া/ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ আছে। তবে কোন কোন ইতিহাসবিদের মতে ঐদিন হুযূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত দিবস ‘হলেও ওফাতের শোক পালন করা ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক তিনদিন পর নিষিদ্ধ। যা হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত। তদুপরি আল্লাহর সম্মানিত নবীগণের ‘ওফাত দিবস’ ও উম্মতের জন্য শোকের কারণ নয় বরং মঙ্গলময় ও কল্যাণকর। এটাই মূলত সাধারণ মানুষ ও আল্লাহর প্রিয় নবীগণের ওফাতের মধ্যে বিরাট পার্থক্য। পবিত্র হাদীসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
اِنَّ مِنْ اَفْضَلِ اَيَّامِكُمْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فِيْهِ خُلِقَ
ادَمُ وَفِيْهِ قُبِضَ [سنن نسائى ـ صفحه ـ ১৫০] অর্থাৎ তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্ব উৎকৃষ্ট দিন হচ্ছে জুমার দিন। কারণ ওই দিনে হযরত আদম আলায়হিস্ সালামকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ওই দিনেই তাঁর ওফাত হয়েছে।
[সুনানে নাসাঈ:, পৃ. ১৫০ ও মেশকাত শরীফ] অন্য হাদীসে হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
اِنَّ هذَا يَوْمُ عِيْدٌ جَعَلَهُ اللهُ لِلْمُسْلِمِيْنَ
[سنن نسائى ـ صفحه ـ ৮৭] এ জুমার দিন হচ্ছে ঈদের দিন। এটাকে আল্লাহ্ তা‘আলা মুসলমানদের জন্য ঈদের দিন সাব্যস্ত করেছেন। (সুনানে নাসায়ী, পৃ. ৮৭, সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফে জুমার দিনের ফজিলত অধ্যায়েও একই বর্ণনা রয়েছে)
সুতরাং বুঝা গেল যে, জুমার দিনটি হচ্ছে একজন নবী তথা আদি পিতা হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর সৃষ্টির দিনও আবার ওফাতের দিনও। এতদসত্ত্বেও আল্লাহর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর ওফাতের শোককে উপেক্ষা করে বাবা আদম আলায়হিস্ সালাম-এর সৃষ্টির খুশীকেই স্থায়িত্ব দান করেছেন এবং প্রত্যেকে জুমার দিবসে নামাযে জুমা ও ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে ঈদ বা খুশী উদযাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, কোন কোন ইতিহাসবিদ ১২ রবিউল আউয়ালকে প্রিয়নবীর শুভাগমন বা মিলাদ দিবসের সাথে ‘ওফাত’ দিবস হিসেবে মেনে নিলেও উক্ত দিন বা মাসে ওফাত দিবসের শোক পালন করা যাবে না। যেহেতু ইসলামী শরীয়তে শোকের বৈধতা তিনদিন পর শেষ হয়ে যায়; কিন্তু মিলাদ বা শুভাগমন-এর খুশী কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তাই এ মোবারক মাস ও দিনে শোক পালন নয় বরং আল্লাহর দরবারে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালনই শরীয়ত সমর্থিত। সুতরাং ১২ রবিউল আউয়ালের দিনেও রবিউল আউয়াল মাসে ওফাতুন্নবী বা সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইত্যাদি পালনের মাধ্যমে হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাতের শোক দিবস যারা পালন করে তারা ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ, সাথে সাথে এটা মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি তাদের হিংসার বহি:প্রকাশ। ইন্তেকাল ও ওফাতের পর সাধারণত তিনদিন পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা শোক পালন করবে, তারপরে নয়। তবে স্বামী মারা গেলে শুধু স্ত্রী গর্ভবতী হলে গর্ভ-প্রসব করা পর্যন্ত আর গর্ভীতা না হলে স্বামীর মৃত্যু হতে চার (৪) মাস দশ দিন পর্যন্ত শোক পালন করবে।
[মাওয়াহেবে লাদুন্নিয়া, কৃত. ইমাম আহমদ কসতলনী রহমাতুল্লাহি আলায়হি,
আননেমাতুল কোবরা, কৃত. ইমাম ইবনে হাজর মক্কী রহমাতুল্লাহি আলায়হি,
মা ছাবাতা বিসসুন্নাহ্, কৃত. শেখ আব্দুল হক
মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ইত্যাদি।]

হাফেজ মিজানুর রহমান
শীতলঝর্ণা, আবাসিক, বায়েজিদ, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: মিলাদ মাহফিলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শান-মান ও সম্মানে কিয়াম করা অর্থাৎ দাঁড়িয়ে আদব সহকারে দরুদ সালাম পাঠ করা শরীয়তসম্মত কিনা? জনৈক মওলভী মিলাদ-কিয়ামকে নাজায়েয ও শরিয়ত বহির্ভূত আমল বলে বিদ্রুপ-ঠাট্টা করেছে। এ ব্যাপারে ইসলামী শরীয়তের ফয়সালা জানিয়ে ধন্য করবেন।
উত্তর: মিলাদ-মাহফিলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানার্থে কিয়াম করা অর্থাৎ দাড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা মুস্তাহাব এবং মুহাক্কিক্ব ওলামায়ে কেরামের মতে যারা এ আমল করে তারা এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক সওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে থাকে। প্রিয়নবীর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে কছিদা আকারে দরুদ-সালাম পাঠ করা তথা কিয়ামকে না-জায়েজ বলা নবী বিদ্বেষীর পরিচয় এবং মুসলিম সমাজকে ভাল কাজ থেকে বিরত রাখার অপচেষ্টা। আ’লা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত আল্লামা শাহ্ আহমদ রেযা মুহাদ্দিসে বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ‘ইকামাতুল কিয়ামাহ্ আলা তা-ইনিল ক্বিয়াম’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট ফকিহ ও মুহাদ্দিস আল্লামা ওসমান ইবনে হামামদিমতী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর লিখিত কিতাব ‘রিসালায়ে ইসবাতে কিয়াম’-এর মধ্যে বর্ণনা করেছেন-
اَلْقِياَمُ عِنْدَ ذكر وِلاَدَةُ سَيِّدِ الْمُرْسَلِيْنَ صَلَّى اَللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ امر لاَشَك فِىْ اِستَحَبَابَه وَاِسْتِحَسَانَه وَندبه يحصل لفاعله من الثواب الاوفر والخير الاكبر لانه تعظيم النبى صلى الله عليه وسلم
অর্থাৎ মিলাদ শরীফ পাঠকালে বা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বেলাদত মুবারকের (শুভাগমনের) বর্ণনাকালে হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মানার্থে ও ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদর্শনার্থে দাঁড়িয়ে কেয়াম করা মুস্তাহাব, মুস্তাহাসান এবং উত্তম যার কর্তা অনেক সওয়াব ও মহান মর্যাদার অধিকারী হয়, কেননা কেয়াম করা মানে নবীজিকে সম্মান করা।
শুধু তাই নয় দেওবন্দী, ওহাবী, তাবলীগীদের নির্ভরশীল ব্যক্তি মাওলানা রফী উদ্দীন ‘তারিখে হেরেমাইন’ কিতাবে উল্লেখ করেছেন-
قَدْ اِسْتَحْسَنَ الْقِيَامُ عِنْدَ ذِكْرِ وِلادته الشَّرِيْفَة ذوراية
ودراية فطوبى لمن كان تعظيمه غاية مرامه
অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মিলাদ বা বিলাদত শরীফের বর্ণনার মুহূর্তে কিয়াম করা ঐ সমস্ত আলেম মুস্তাহাসান বা উত্তম আমল বলেছেন, যাঁরা হলেন যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহ। অতএব, শুভ সংবাদ ও আনন্দের ব্যাপার হল ঐসব ব্যক্তির জন্য যারা কেয়াম করে তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য হল নবীজীকে সম্মান করা। ওহাবী, দেওবন্দী মৌলভীদেরও পীরও হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কী রহমাতুল্লাহি আলায়হি স্বীয় কিতাব ‘ফায়সালাহ-এ হাফত মাসআলায় উল্লেখ করেছেন-
ميں خود قيام كرتاهوں اور قيام ميں لذت پاتاهوں
অর্থাৎ মিলাদ-পাঠের সময় আমি নিজে দাঁড়িয়ে কিয়াম করি এবং কিয়ামকালে আমি তৃপ্তি পায়। আল্লামা মুহাম্মদ সালেহ রহমাতুল্লাহি আলায়হির বরাতে আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা ফাজেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন-
امة النبى صلى الله عليه وسلم من العرب
والمصر والشام والروم والاندلس وجميع بلاد
الاسلام مجتمع ومتفق على استجابه واستحسانه
অর্থাৎ আরব, মিশর, সিরিয়া, রোম, আন্দালুস ও সমস্ত মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে নবীজির সমস্ত উম্মত ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, মিলাদ শরীফ পাঠের সময় প্রিয়নবীর সম্মানার্থে কিয়াম করা মুস্তাহাব ও মুস্তাহসান। পবিত্র মক্কা শরীফের শ্রেষ্ঠতম মুহাদ্দিস ও ফকিহ্ খাতেমুল মুহাদ্দেসীন হযরত সৈয়দ আহমদ দাহলান মক্কী রহমাতুল্লাহি আলায়হি স্বীয় কিতাব ‘আদদুরারুস সানিয়্যাহ্ ফির রদ্দে আলাল ওয়াহাবিয়্যাহর মধ্যে উল্লেখ করেছেন-
من تعظيمه الفرح بليلة ولادته وقراة المولد والقيام
عند ذكر ولادته واطعام الطعام ـ
অর্থাৎ নবীজির শুভাগমন ও মিলাদ রজনীতে খুশি উদযাপন করা, মিলাদ শরীফ পাঠ করা, বেলাদত শরীফের বর্ণনার মুহূর্তে সম্মানার্থে দাঁড়ানো বা কিয়াম করা তথা দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করা এবং মিলাদ মাহফিলে উপস্থিত জনতাকে খাবার পরিবেশন করা নবীজির প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও তাজিমের অন্তর্ভুক্ত। তারপরেও মিলাদ শরীফ ও কিয়ামের মত একটি বরকতমন্ডিত নেক আমলকে নাজায়েজ ও শরিয়ত বহির্ভূত কাজ বলে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা প্রকৃত মুমিন মুসলমানের পক্ষে শোভা পায় না বরং মুনাফিকি চরিত্র এবং অজ্ঞতা।
[ইকামাতুল কিয়ামাহ্ কৃত. ইমাম আ’লা হযরত শাহ্ আহমদ রেযা রহ. ও ফয়সালায়ে হাফত মাসআলা, বাগে খলিল ১ম খন্ড, মাসিক তরজুমান]

মাওলানা রবিউল হোসাইন
নায়েবে ইমাম, আরেফীন নগর, বায়েজিদ
চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: কেউ কেউ বলতে শুনা যায় যে, ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তথা প্রিয়নবী রাসূলে আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পৃথিবীর বুকে শুভাগমন উপলক্ষে কোন বর্ণনা পবিত্র ক্বোরআন মজিদে নেই। সুতরাং মিলাদুন্নবী উদযাপন করা ভিত্তিহীন। এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের উদ্ধৃতিসহ আলোচনা করলে উপকৃত হবো।
উত্তর: উপরোক্ত বিষয়ে নি¤েœ পবিত্র কোরআনের উদ্ধৃতি পেশ করা হল।
(১) সূরা নিসা ১৭৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمْ بُرْهَانٌ مِنْ رَبِّكُمْ
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُبِينًا
অর্থাৎ হে লোক সকল! তোমাদের নিকট তোমাদের রবের পক্ষ হতে অকাট্য দলিল অর্থাৎ (হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আগমন করেছেন।
(২) সূরা তাওবা ১২৮ নম্বর আয়াত-
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِنْ أَنْفُسِكُمْ عَزِيزٌ عَلَيْهِ
مَا عَنِتُّمْ حَرِيصٌ عَلَيْكُمْ بِالْمُؤْمِنِينَ رَءُوفٌ رَحِيمٌ
অর্থাৎ নিশ্চয় তোমাদের নিকট তোমাদের বংশ হতে মহান রাসূল শুভাগমন করেছেন। তোমাদের কষ্ট তাঁর জন্য অনেক ভারী ও দুঃখ, তোমাদের মঙ্গল কামনাকারী ও বড় কান্ডারী এবং ঈমানদারগণের জন্য বড়ই দয়াবান।
(৩) সূরা আম্বিয়া ১০৭ নম্বর আয়াত-
وَمَا اَرْسَلْناكَ اِلاَّ رَحْمَةٌ لِّلْعَالَمِيْنَ
অর্থাৎ আমি (আল্লাহ্) আপনাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছি সমগ্র কায়েনাতের জন্য রহমত বানিয়ে (তথা রহমত বিতরণকারী হিসেবে)।
(৪) সূরা আহযাব’র ৪৫নম্বর আয়াত-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا
وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُنِيرًا
অর্থাৎ হে আমার প্রিয় নবী (সরকারে দু’আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) নিশ্চয় আমি আপনাকে (পৃথিবীতে) প্রেরণ করেছি সাক্ষী দাতা তথা হাজির নাজির, জান্নাতের শুভ সংবাদদাতা, জাহান্নামের ভয় প্রদর্শনকারী, আল্লাহ্ তা‘আলার দিকে তার হুকুমে (আল্লাহর বান্দাগণকে) আহ্বানকারী এবং আলোক প্রদীপ হিসেবে।
এ ধরনের অসংখ্য আয়াতে কারীমায় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন স্বীয় হাবীবে পাক, সাহেবে লাওলাক, সাইয়ারে আফলাক, রাসূলে মুয়াজ্জম, নুরে মুজাস্সাম, রাহমাতুল্লিল আলামীন, খাতামুন্ নবীয়্যীন হযরত মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামার এ ধরাধামে তাশরীফ আওয়ারী তথা শুভাগমনের বিষয়ে সুন্দরভাবে আলোচনা করে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের বিবরণ পেশ করেছেন।
(৫) সূরা আলে ইমরানের ১০৩ নম্বর আয়াতে করীমায় মহান আল্লাহ্ তা‘আলা আরো এরশাদ করেন-
وَاذْكُرُوا نِعْمَتَ اللهِ عَلَيْكُمْ إِذْ كُنْتُمْ أَعْدَاءً فَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِكُمْ فَأَصْبَحْتُمْ بِنِعْمَتِهِ إِخْوَانًا وَكُنْتُمْ عَلىٰ شَفَا حُفْرَةٍ مِنَ النَّارِ فَأَنْقَذَكُمْ مِنْهَا ۗ كَذٰلِكَ يُبَيِّنُ اللهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
অর্থাৎ হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ পাকের সে মহান অনুগ্রহ ও নিয়ামাতুল্লাহ্ (তথা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) স্মরণ কর যা তোমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা এমন এক সময়ে দান করেছেন, যখন তোমরা পরস্পর শত্রু ছিলে। তাঁর সে নিয়ামতের বদৌলতে তিনি (আল্লাহ্ তা‘আলা) তোমাদের সাথে সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করেছেন। ফলে তোমরা পরস্পর ভাই ভাই হয়েছ অথচ তোমরা জাহান্নামের গর্তের একেবারে কিনারায় পতিত হওয়ার উপক্রম হয়েছিলে। তিনি তাঁর সে নেয়ামতের বদৌলতে তোমাদেরকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দান করেছেন। এভাবেই আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের জন্য স্বীয় নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা হেদায়াত প্রাপ্ত হও।’’
আর প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শুভাগমনে ঈদ তথা খুশী-আনন্দ প্রকাশ করার জন্য মহান আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে সরাসরি নির্দেশ দিয়ে এরশাদ করেন-
(৬) قُلْ بِفَضْلِ اللهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذٰلِكَ
فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ
অর্থাৎ (হে হাবীব) আপনি আমার বান্দাদের বলুন! আল্লাহরই অনুগ্রহ ও তাঁর রহমত প্রাপ্তিতে তারা যেন অবশ্যই আনন্দ-খুশী উদযাপন করে। তা তাদের সমস্ত সঞ্চয়কৃত ইবাদত-বন্দেগী ও ধন-দৌলত হতে অধিক শ্রেয় ও উত্তম। [সূরা ইউনুস: আয়াত-৫৮] উক্ত আয়াতে করীমায় ইমাম জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলায়হিসহ অনেক তাফসীর বিশারদগণ আল্লাহর রহমত হতে রাহমাতুল্লিল আলামীন রাসূলে আনোয়ার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মুরাদ নিয়েছেন এবং হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এভাবে তাফসির করেছেন। [তাফসীরে ইবনে আব্বাস ও তাফসীরে দুররে মনসুর] সুতরাং উক্ত আয়াতে করীমায় আল্লাহ্ পাক তাঁর অনুগ্রহ ও দয়ার মূর্তিপ্রতীক প্রিয় রাসূলের শুভাগমনে খুশী তথা আনন্দ উদযাপনের নির্দেশ দিয়ে মূলত মিলাদ ও ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পালন করার নির্দেশ দান করেছেন মুমিন মুসলমানদের প্রতি। বলাবাহুল্য ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন স্বয়ং আল্লাহরই নির্দেশ এবং ক্বোরআনই এর প্রকৃত উৎস তথা ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করা ক্বোরআন-সুন্নাহ্ পরিপন্থি নয় বরং জিকির-আযকার, দরুদ-সালাম, হামদ, নাত, রাসূলে আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শান-মান আলোচনা, প্রিয় নবীর শুভাগমনের মুহূর্তে যে সব অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল যা নির্ভরযোগ্য বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত। তার আলোচনা, দোয়া-মুনাজাত, মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় ও তাবাররুকাত বিতরণের মাধ্যমে মাহে রবিউল আউয়ালে ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উদযাপন করা মূলত ক্বোরআন-সুন্নাহর অনুসরণ ও অনুশীলন।

হাফেজ মিজানুর রহমান
মসজিদে রহমানিয়া গাউসিয়া
অক্সিজেন, বায়েজিদ, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: মৃত্যুর পূর্বে কোন ব্যক্তি যদি যোগ্য হক্কানী আলেমের মাধ্যমে নামাযে জানাযা পড়ানোর অছিয়ত করেন, তা পালন করা কতটুকু শরিয়তসম্মত? আর মৃত ব্যক্তির অলি ছেলে/পিতা যদি মহল্লার মসজিদের ইমামের চেয়ে যোগ্য হয় তখন নামাযে জানাযায় ইমামতির হকদার মসজিদের ইমাম না মৃত ব্যক্তির অলি? মৃত ব্যক্তির অছিয়ত কখন ওয়াজিব। বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ হব।
উত্তর: মৃত ব্যক্তি তার পরিত্যক্ত এক তৃতীয়াংশ সম্পত্তির ব্যাপারে জীবদ্দশায় কারো জন্য অসিয়ত করলে ওয়ারিশগণ তার মৃত্যুর পর তার অসিয়ত কার্যকর করবে। এটা ওয়াজিব। যদি কাফন-দাফন ও কর্জ আদায়ের পর তার পরিত্যক্ত মাল/সম্পদ অবশিষ্ট থাকে। অন্য কোন বিষয়ে মৃত ব্যক্তির অসিয়ত পালন করা ওয়ারিশগণের জন্যে আবশ্যকীয় বা ওয়াজিব নয়। তবে সামর্থ্য ও সাধ্যানুযায়ী মৃত ব্যক্তি মাতা-পিতা ও আপনজনের অছিয়ত পালন করা অলি-ওয়ারিস তথা ছেলে-সন্তানের জন্য ভাল ও উত্তম। সুতরাং কারো মাধ্যমে জানাযার নামায পড়ানোর অসিয়ত করলে বা করে গেলে এলাকার জামে মসজিদের ইমাম উপস্থিত থাকলে তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে অসিয়তকৃত বুযুর্গ ও যোগ্য ব্যক্তির মাধ্যমে নামাযে জানাযার ইমামতি করাতে কোন অসুবিধা নেই। আর যদি মৃত ব্যক্তির স্বীয় সন্তান মহাল্লার মসজিদের ইমাম/খতিবের চেয়ে উপযুক্ত হয় তখন তিনি মৃত মা-বাবার নামাযে জানাযার ইমামতি করার জন্য অধিক হকদার ও যোগ্যতম ব্যক্তি। যেমন আদ দুররুল মোখতারে বর্ণনা করা হয়েছে- وتقديم الامام الحى مندوب فقط على شرط ان يكون افضل من الولى والا فالولى اولى كما فى المجتبى وشرح المجمع অর্থাৎ নামাজে জানাযায় মহল্লার মসজিদের ইমামকে ইমাম বানানো মুস্তাহাব যদি তিনি মৃত ব্যক্তির ওলী (ছেলে-পিতা- বা অন্যান্য ওয়ারিস হতে ইসলামী শরীয়তের জ্ঞানে উত্তম হয়। যদি ইমাম সাহেব হতে মৃত ব্যক্তির অলি/ওয়ারিস উত্তম হয় তখন মায়্যেতের অলি/ওয়ারিস নামাযে জানাযার ইমামতির হকদার বেশী। মুজতাবা ও শরহুল মাজমার মধ্যে এ রকম বর্ণিত আছে। [দুররে মুখতার কৃত. ইমাম আলাউদ্দিন খাচকপি
হানাফী রহ. খন্ড-২, পৃ. ২২০, জানাযা অধ্যায় ইত্যাদি]

মুহাম্মদ আলী আশরাফ
চরকানাই, পটিয়া, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) লেখার সময় দরুদ শরীফ এবং সাহাবায়ে কেরাম ও আউলিয়া-ই কেরামের নাম লেখার পর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি কি সম্পূর্ণ লিখতে হবে? নাকি সংক্ষেপে লিখলে চলবে। এ ব্যাপারে জানালে কৃতজ্ঞ হব।
 উত্তর: নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র ও বরকতময় নাম লিপিবদ্ধ করার পর সম্পূর্ণ দরূদ শরীফ অবশ্যই লিখতে হবে। এটাকে অর্থাৎ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পরিপূর্ণভাবে লেখা অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম ওয়াজিব বলেছেন। সংক্ষেপে যেমন صـ عـ ـ عم ـ صلعم ও স. দ. লিখে দরুদ শরীফকে খাট করা নাজায়েয ও হারাম। যা মারাত্মক অপরাধ ও আদবের পরিপন্থী। ইচ্ছাকৃতভাবে কেউ সংক্ষেপে লিখলে ঈমান হারানোর আশংকা আছে। এ ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রত্যেক ঈমানদারের ঈমানী দায়িত্ব। সর্বপ্রথম যে দরুদ শরীফকে সংক্ষেপে صلعم লিখেছিল তার হাত কর্তন করা হয়েছিল। যেমন বিশ্বখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র নামের সাথে দরূদ শরীফ সংক্ষেপ করে صلعم লিখেছে, শাস্তিস্বরূপ তার হাত কর্তন করা হয়েছে। যেমন ইসলামে চোরের হাত কর্তন করার বিধান রয়েছে যেহেতু চোর অপরের সম্পদ হানি করে, আর উক্ত ব্যক্তি নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মান ও ইজ্জত হানি করেছে। দরুদ শরীফ সংক্ষেপে লেখা দুর্ভাগা বঞ্চিত ব্যক্তিদের কাজ। হযরত ইবনে হাজর হাইতমী রহমাতুল্লাহি আলায়হি ফতোয়ায়ে হাদিছিয়াতে উল্লেখ করেছেন- كذا اسم رسوله بان يكتب عقبه صلى الله عليه وسلم فقد جرت عادة الحلف كالسلف ولا يختصر بكتابتها بنحو صلعم فانه عادة المحرومين অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র নাম মোবারকের পর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পরিপূর্ণভাবে লেখা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল ইমামদের নেক তরিকা। সংক্ষেপে যেমন صلعم যেন লেখা না হয়। কেননা এভাবে দরূদ-সালাম সংক্ষেপে লেখা আল্লাহর মেহেরবাণী থেকে বঞ্চিত লোকদের স্বভাব। মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাকারী ইমাম নবভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি কিতাবুল আযকারে উল্লেখ করেছেন-
يكره الرمز بالصلواة والترحم بالكتابة بل يكتب
بكماله ولايسأم فيه والا حرم حظًا عظيمًا
অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র নামের সাথে দরূদ ও সালাম ও আউলিয়া কেরামের নামের সাথে রহমাতুল্লাহি আলায়হি লেখার সময় সংক্ষেপে ইংগিত করা মাকরূহ বরং সম্পূর্ণ লিখতে হবে এবং পুরা লেখার ক্ষেত্রে বিরক্ত বোধ করবে না। নতুবা সওয়াবের মহান অংশ থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। সুতরাং প্রিয় নবীর নাম মোবারকের সাথে সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরামের নাম মোবারকের সাথে রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও আউলিয়ায়ে কেরামের নামের সাথে রহমাতুল্লাহি আলায়হিকে সংক্ষেপ করে ইঙ্গিত করা এক প্রকার বেয়াদবী ও কৃপনতা। যা সত্যিই দুর্ভাগ্যের ব্যাপার। তাই এগুলোকে পুরাটাই লিখবে। এটাই শরীয়তের ফয়সালা। উল্লেখ্য যে, (দ.) শব্দটি মূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সংক্ষেপ শব্দ নয় বরং এটা দরূদ শব্দের সংক্ষেপ। যেমন (স.) শব্দটি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সংক্ষেপ। এ বিষয়ে অবশ্যই আদব ও সতর্কতা অবলম্বন করা নেহায়ত জরুরী। কারণ প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম এবং আউলিয়ায়ে এজাম রাহমাতুল্লাহি আলায়হিম-এর শান-মান ও মর্যাদায় সামান্যতম বেয়াদবীর কারণেও ঈমান-আমল, ইবাদত-বন্দেগী নষ্ট হয়ে যায়। উপরোক্ত বিষয়ে তরজুমান প্রশ্নোত্তর বিভাগে একাধিকবার বিস্তারিত ও প্রামাণ্য আলোচনা করা হয়েছে।
[ফতোয়ায়ে হাদিসিয়া কৃত. ইমাম ইবনে হাজর হায়তমী মক্কী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, কিতাবুল আযকার, কৃত. ইমাম নববী আলায়হির রাহমাহ্। আমার রচিত যুগ জিজ্ঞাসা, পৃ. ১১১-১১২, প্রকাশনায় আনজুমান ট্রাস্ট, চট্টগ্রাম।]

মুহাম্মদ মোমিনুল হক
শাকপুরা, পটিয়া, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: কোন মহিলা তিন তালাক প্রাপ্ত হয়ে ইদ্দত পালন না করে ২য় স্বামী গ্রহণ করে, তার শরয়ী বিধান কি হবে?
উত্তর: ইদ্দত পালন না করে ২য় স্বামী গ্রহণ করা ইসলামী শরীয়তের বিধান মোতাবেক ছহি/শুদ্ধ হবে না। জেনে শুনে এ রকম করা হারাম ও গুনাহ। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর তারা উভয়ের মধ্যে আকদ পুনরায় আয়োজন করতে হবে। ইদ্দতকালীন উভয়ের মধ্যে যে আকদ/বিবাহ্ সংগঠিত হয়েছিল, তা ফাসেদ ও অশুদ্ধ। [রদ্দুল মোহতার, কৃত. ইমাম ইবনে আবেদীন শামী হানাফী
রহমাতুল্লাহি আলায়হি, তালাক অধ্যায়, ইত্যাদি]

মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম
ভাতুরিয়া, নবীনগর, বি-বাড়িয়া।
মুহাম্মদ মাসরুর রহমান
বৈরাগ, আনোয়ারা, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পর আর সংসার করতে পারবে কি না?
উত্তর: স্বামী স্বীয় স্ত্রীকে এক/দুই তালাক প্রদান করলে স্ত্রীর ইদ্দত তথা তিন ঋতু¯্রাব (হায়য) বা স্ত্রী গর্ভিতা হলে বাচ্চা প্রসব করা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে স্ত্রীর নিকট খাচ কামরায় رجعت তথা ফিরে আসলে বা সহবাস/মিলন করলে তিন তালাক প্রদান না করা পর্যন্ত ঘর/সংসার করতে পারবে। আর এক সাথে অথবা পৃথক পৃথক তিন মাসে হুশে জ্ঞানে এক তালাক এক তালাক করে তিন তালাক প্রদান করলে হিলা ছাড়া স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সংসার করতে পারবে না। [কিতাবুল হেদায়া, কৃত. ইমাম ফরগানী মরগিনানী হানাফী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তালাক অধ্যায় ইত্যাদি]

মুহাম্মদ নাজমুস্ সায়াদাত
শ্যামনগর, সাতক্ষীরা।
প্রশ্ন: তালাক কী? কিকি উপায়ে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে পারবে।
উত্তর: ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিবাহ্ বন্ধনকে স্বামী কর্তৃক উঠিয়ে নেয়া বা বিচ্ছেদ ঘটানোকে তালাক বলা হয়। মুবাহ্ কাজসমূহের মধ্যে তালাক বা বিবাহ্ বিচ্ছেদ ঘটানো অত্যন্ত গর্হিত ও নেহায়ত অপছন্দনীয় কাজ। ছরিহ বা স্পষ্ট, কেনায়া বা অস্পষ্ট শব্দ দ্বারা তালাক বা বিবাহ্ বিচ্ছেদ সংঘটিত হয়। স্বামী কর্তৃক স্ত্রীর প্রতি মৌখিকভাবে বা লিখিত আকারে তালাক কার্যকর করা হয়। স্বামী স্ত্রীকে সখ বা খুশি/রাজি রগবতে তালাক প্রদান করলে ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে কার্যকর হয়ে যায়। [শরহে বেকায়া, হেদায়া ও কিতাবুল আশবাহ্, তালাক অধ্যায় ইত্যাদি]

নাঈমা সুলতানা
ফটিকছড়ি,চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: সম্প্রতি কিছু আলিমের ভাষ্যমতে মহিলাদের ঈদগাহে নামায আদায় করা সুন্নাত ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত বলে মহিলাদের উৎসাহিত করছে। ইসলামী শরীয়তের ফায়সালা মোতাবিক বিস্তারিত জানানোর জন্য অনুরোধ করছি।
উত্তর: ঈদগাহে বা ঈদের ময়দানে সর্বস্তরের মানুষের সমাগম ঘটে। দ্বিতীয় হিজরী সনে ঈদের নামায পড়ার বিধান চালু হলে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য ও ইসলামের শান-শওকত প্রকাশ করার জন্য ঋতুবর্তী হয়ে যাওয়া মহিলা ও প্রাপ্ত বয়স্কা মেয়েদেরও ঈদগাহে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
عن ام عطية قالت امرنا رسول الله صلى الله عليه وسلم ان نخرجهن فى الفطر والاضحى العوائق والحيض وذوات الخدور فاما الحيض فيعتزلن الصلاة ويشهدن الخير ودعوة المسلمين قلت يارسول الله احدانا لايكون لها جلباب قال لتلبسها اختها من جلبابها
অর্থাৎ বিশিষ্ট সাহাবী মহিলা হযরত উম্মে আতিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এই মর্মে আদেশ প্রদান করলেন যে, আমরা যেন যুবতী, ঋতুবর্তী এবং পর্দানশীন মহিলাদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে ঈদগাহে নিয়ে আসি; কিন্তু হায়েজ বা ঋতু¯্রবি মহিলারা যেন নামায থেকে দূরে থাকে। তবে তারা কল্যাণের কাজেও মুসলমানদের দু’আতে শরীক হতে পারবে। আমি আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম! আমাদের কারো কারো শরীর ঢাকার মত বড় চাদর নেই। উত্তরে তিনি বললেন, তার বোন যেন তাকে চাদরের ব্যবস্থা করে দেয়। [সহীহ্ মুসলিম, খ:৩, পৃ. ২০, হাদীস নং-২০৯৩] কিন্তু পরবর্তীতে পর্দার আয়াতের কঠোরতার পাশাপাশি দিন দিন ফিতনা এবং বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পাওয়ায় হযরত ওমর ফারুকে আযম রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র শাসনামলে মহিলাদের ঈদগাহে এবং মসজিদে পঞ্জেগানা নামাযের জামায়াতে ও জুমায় আসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জাহির করা হয়।
হাদীসে এসেছে-
عن اسامة بن زيد قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ما تركت فتنة على امتى اضرّ على الرجال من النساء
হযরত উসামা ইবনে যায়দ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের পুরুষ জাতির উপরে নারীদের চেয়ে অধিকতর ক্ষতিকর আর কোন ফিতনা আমি রেখে যাইনি।
[সহিহ্ বুখারী, হাদীস নং-৪৮০, মুসনাদে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং-১৫৪] তাছাড়া হযরত উম্মে আতিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা এর হাদীসে মহিলাদের ঈদগাহে উপস্থিত হওয়ার প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। আর সেই প্রেক্ষাপটটি হলো বেঈমান ও কাফিরদের সামনে মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য প্রদর্শন। নচেৎ হায়েযওয়ালী এবং কাপড়বিহীন নারীদেরকে কাপড় দিয়ে সাহায্য করে হলেও ঈদগাহে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকিদের সাথে নির্দেশ প্রদান করতেন না। তদুপরি, প্রিয় রাসূল এবং হযরতে ছিদ্দিকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সময়ে মহিলারা মসজিদে নববীতে জুমা ও পঞ্জেগানা জমাতে শরীক হতেন তখন ঈদের জমাতেও মহিলাদের শরিক হওয়ার জন্য রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত ওমর ফারুকে আযমের শাসনামলে দিন দিন যখন ফিতনা-ফ্যাসাদ বেড়ে যাচ্ছে তখন মা-বোনদেরকে ফিতনা-ফ্যাসাদ হতে রক্ষা করার জন্য জুমা জমাতে অংশ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারী করা হয়। অতএব, হযরত উম্মে আতিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুহার বর্ণিত হাদীসের আলোকে মহিলাদের ঈদের নামাযে অংশগ্রহণ করার বিষয়টি সর্বকালের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না বরং সাময়িককালের জন্য ছিল। অপরদিকে হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তার শাসনামলে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে তৎকালীন সম্মানিত সাহাবীদের কেউ তাতে আপত্তি করেননি। বিধায় মহিলাদের ঈদগাহে এবং মসজিদে জমাতে না আসার বিষয়টি ইজমায়ে সাহাবা দ্বারা সাব্যস্ত এবং প্রমাণিত। যা হেদায়ার ব্যাখ্যাগ্রন্থ বেদায়া ওয়ান্ নেহায়ায় বর্ণনা করা হয়েছে। নি¤েœ মহিলাদের ঈদগাহে ও জুমা জমাতে অংশ গ্রহণ না করা ও না আসা যে নিরাপদ তার বর্ণনাও দলীলগুলো পেশ করা হলঃ উম্মুল মুমেনীন হযরত উম্মে সালামা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- خير مساجد النساء قعربيتهن الحديث মহিলাদের জন্য উত্তম নামাযের স্থান হলো তাদের গৃহের কোনা বা নির্জনস্থান।
[মুসনাদে আহমদ, হাদীস নং-২৬৫৮৪, সহীহ্ ইবনে খুযাইমা, হাদীস নং-১৬৮৩, দাইলামী হাদীস নং-২৯১৯] عن عبد الله عن النبى صلى الله عليه وسلم قال : صلاة المراة فى مخدعها افضل من صلاتها فى بيتها وصلاتها فى بيتها افضل من صلاتها فى حجرتها
হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, মহিলাদের জন্য বাড়ির আঙ্গিনায় নামায পড়ার চেয়ে উত্তম জায়গা হলো তাদের ঘরের শয়নকক্ষে নামায পড়া। আর তাদের জন্য ঘরের ভেতরের নির্জন কক্ষে নামায আদায় তাদের ঘরের বাইরে নামায আদায় করা থেকে উত্তম।
[এ বিষয়ে ইতিপূর্বে তরজুমান প্রশ্নোত্তর বিভাগে বিস্তারিত ও প্রমাণ্য আলোচনা করা হয়েছে। সহীহ ইবনে খুজাইমাহ্ ও আত-তারগীব ওয়াত তারহীব]

উম্মে সালমা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
প্রশ্ন: পুরুষদের ন্যায় মহিলারাও মাজার এবং মা, বাবা, আত্মীয়-স্বজনের কবরের পাশে বসে ক্বোরআন পাঠ ও কবর জিয়ারত করতে পারবে কিনা? বিস্তারিত জানানোর অনুরোধ রইল।
উত্তর: পুরুষের ন্যায় কবরস্থানে গিয়ে জিয়ারত করা মহিলাদের জন্য জায়েয নেই। মহিলারা ঘরে বসে পর্দা-পুশিদায় নামায আদায়, জিকির-আযকার ও অন্যান্য ইবাদতের ন্যায় সূরা কেরাত পড়ে দোয়া-দরুদ পাঠ করে মা-বাবা ও মুরব্বীদের কবর ও রুহে ইসালে সাওয়াব করবে। আজকাল ফেতনার এ যুগে আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারে মহিলাদের আনা-গোনা এমনভাবে বেড়ে গেছে যে, সেখানে পর্দা-পুশিদার কোন বালাই নেই। ইমামে আহলে সুন্নাত, মুজাদ্দেদে দ্বীন ও মিল্লাত, আ’লা হযরত শাহ্ আহমদ রেযা খান বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি কুরআন, হাদীস এবং ফিকহর শতাধিক দলীল দিয়ে মুসলিম উম্মাহর মেয়ে-লোকদের মাজার ও কবরস্থানে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। তিনি বিশ্ববিখ্যাত ‘গুনিয়া’ কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘এটা জিজ্ঞাসা করোনা যে, মহিলারা কবরস্থান বা মাজারে যাওয়া জায়েজ আছে কিনা? বরং এটা জিজ্ঞেস কর যে, আল্লাহর পক্ষ হতে ঐ মহিলার উপর কতটুকু লা’নত (অভিসম্পাত) করা হয়। কতটুকু লানত করা হয় কবরবাসীর পক্ষ থেকে, আর তা যখনই কবরে যাওয়ার ইচ্ছায় ঘর হতে বের হয় তখনই লানত শুরু হয়ে যায়। আর ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত ফেরেশতারা লানত করতেই থাকেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রওযায়ে আকদাসের যিয়ারত একটি বড় সুন্নাত বা ওয়াজিবের কাছাকাছি এবং জীবনের গুনাহ্ মাগফিরাতের বিরাট ওসীলা। পবিত্র কুরআনে পরম করুণাময় এরশাদ করেন-
وَلَوْ أَنَّهُمْ إِذْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ جَاءُوكَ فَاسْتَغْفَرُوا
اللهَ وَاسْتَغْفَرَ لَهُمُ الرَّسُولُ لَوَجَدُوا اللهَ تَوَّابًا رَحِيمًا
অর্থাৎ এবং যখন তারা নিজেদের আত্মার উপর জুলুম করে, আপনার সমীপে হাযির হয় অতঃপর আল্লাহর কাছে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করে আর আপনি রাসূল যদি তাদের পক্ষে সুপারিশ করেন, তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী ও দয়ালু হিসেবে পাবে। [সূরা নিসা, আয়াত-৬৪] রওজা শরীফ জিয়ারত প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে রয়েছে- مَنْ زَارَ قَبَرِىْ وَجَبَتْ لَه شَفَاعَتِىْ অর্থাৎ যে ব্যক্তি আমার পবিত্র রওজা শরীফের যিয়ারত করবে তার জন্য আমার শাফাআত ওয়াজিব হবে। বর্ণনায় ইমাম দারু কুতনী রহমাতুল্লাহি আলায়হি। মদীনায়ে পাকের তথা প্রিয়নবীর রওজা শরীফের জিয়ারত অতীব গুরুত্বপূর্ণ, ফজিলতময় একটি বিষয় যা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামার সকল উম্মতের কাছে নিতান্ত পবিত্র ও অতি কাক্সিক্ষত। কিন্তু অন্যান্যদের কবর যিয়ারত ও অলিগণের মাযারে যাওয়া মহিলাদের জন্য নিষিদ্ধ। ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে বেচে স্বীয় ইজ্জত আবরু রক্ষা করা মা-বোনদের উপর ফরয। তদুপরি আপনজনদের কবরে গিয়ে মহিলারা ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলবে আর আউলিয়ায়ে কেরামের মাযারে গিয়ে আদবের খেলাফ অনেক কাজ করে ফেলবে, অজ্ঞতার কারণে। তাই মহিলাদের জন্য কবরস্থান ও মাজার জিয়ারতে ঘর হতে বের হওয়া নিষেধ করা হয়েছে। আ’লা হযরত ইমাম শাহ্ আহমদ রেযা ফাজেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি নারীদের জন্য বর্তমান ফ্যাসাদের জমানায় মাজারে যাওয়া নিষেধ মর্মে একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর নাম হচ্ছে ‘জামালুন নুর ফী নাহয়িন নিছায়ী আন যিয়ারাতিল কুবুর’ উক্ত কিতাবে তিনি নির্ভরযোগ্য কিতাবের উদ্ধৃতিসহ বর্ণনা করেন যে, সাহাবাযে কেরামের মধ্যে অন্যতম ফকিহ্ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মহিলাদের আপাদমস্তক লজ্জার বস্তু। তথা তারা পর্দা-পুশিদায় থাকবে। তারা আপন ঘরের মধ্যেই আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জন করবে। আর যখন তারা ঘর থেকে বের হয় তখন তার উপর শয়তান কুদৃষ্টি নিক্ষেপ করে। উল্লেখ্য যে, প্রখ্যাত ফকিহ্ সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু জুমার দিনে কংকর নিক্ষেপ করে মসজিদ থেকে মহিলাদের বের করে দিতেন। ইমাম ইবরাহীম নখয়ী (তাবেয়ী) যিনি ইমামে আযম হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলায়হির উস্তাদ ছিলেন তিনি তাঁর ঘরের মেয়ে লোকদেরকে জুমা এবং জামাতে শরীক হতে যেতে দিতেন না। সেই উত্তম যুগে নারীদেরকে জুমা-জামাতের জন্য ঘর হতে বের হতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। তাহলে বর্তমান ফেতনার এই কঠিন সময়ে কবর ও মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ঘর হতে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া যেতে পারে? কখনো না। [জুমালুন নুর, কৃত. আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খাঁন রহমাতুল্লাহি আলায়হি] তবে মেশকাত শরীফ ও সিরাজুল ওহহাজ’ গ্রন্থে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ফোকাহায়ে কেরামের কেউ কেউ বলেছেন, যুগে যুগে মুসলিম মহিলাগণ পর্দা-পুশিদা সহকারে ভক্তি-আদব সহকারে দোয়া ও বরকত লাভের আশায় কবরবাসীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে আপনজনদের ও আল্লাহর ওলিদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে নেহায়ত পর্দাসহকারে স্বীয় ঘর হতে বের হওয়া জায়েজ। তবে বর্তমান সময়ে অধিকাংশ বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম ফিতনা-ফ্যাসাদ হতে রক্ষার্থে মহিলাদের জন্য জুমা-জামাত ও কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে ঘর হতে বের হওয়াকে নিষেধ করেছেন। এটাই নিরাপদ। এ বিষয়ে আউলিয়ায়ে কেরামের মাজার শরীফের দায়িত্ববান কর্তৃপক্ষ আউলাদ ও মাজার পরিচালনা কমিটির সজাগ ও সতর্ক দৃষ্টি নেহায়ত জরুরী। নতুবা কবর, হাশর, নশর, আল্লাহ-রসূলের দরবারে এবং আল্লাহর অলিদের নিকট জবাবদিহী করতে হবে। এ বিষয়ে তরজুমানে আহলে সুন্নাত প্রশ্নোত্তর বিভাগে পূর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
[জুমালুন্নূর, কৃত. আলা হযরত ইমামে আহলে সুন্নাত শাহ্ আহমদ রেযা ফাজেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি আলায়হি, মালফুজাত-ই আ’লা হযরত, কৃত. মুফতি মোস্তফা রেযা বেরলভী ও আহকামুল মাযার, কৃত. আল্লামা এম.এ. জলিল রহমাতুল্লাহি আলায়হি ইত্যাদি]

দু’টির বেশি প্রশ্ন গৃহীত হবেনা  একটি কাগজের পূর্ণপৃষ্ঠায় প্রশ্ন লিখে নিচে প্রশ্নকারীর নাম, ঠিকানা লিখতে হবে  প্রশ্নের উত্তর প্রকাশের জন্য উত্তরদাতার সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাঞ্ছনীয় নয়। প্রশ্ন পাঠানোর ঠিকানা: প্রশ্নোত্তর বিভাগ, মাসিক তরজুমান, ৩২১, দিদার মার্কেট (৩য় তলা), দেওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম-৪০০০।