দেখে এলাম- টোকিও জামি ও তুর্কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র

0

দেখে এলাম-
টোকিও জামি ও তুর্কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র –
মুহাম্মদ আবদুর রহিম >
জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত টোকিও জামে মসজিদ ও তুর্কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র টোকিও কামি বা টোকিও জামি হিসাবে পরিচিত। কামি (Camii) তুর্কি শব্দ। ইংরেজিতে জামি বা জামে মসজিদ। তুর্কি স্থাপত্য শৈলীতে নির্মিত জাপানের সবচেয়ে বড় মসজিদ এটি। এটি টোকিও ওয়েমো চো জেলায় সিবুওয়ায় অবস্থিত। ১৯৩৭ সালে রাশিয়ার কাজান প্রদেশের নিগৃহিত মুসলমানেরা ও তাতারী মুসলমানেরা বিভিন্ন দেশ ঘুরে টোকিওতে অবস্থান নেয়। তাদের নেতা আবদুর রশিদ ইব্রাহিম ও আবদুল্লাহ কোরবান আলীর তত্ত্বাবধানে তাদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার মানসে প্রথমে একটি প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পরের বছর ১৯৩৮ সালের ১২ মে আবদুর রশিদ ইব্রাহিমের নেতৃত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় জামে মসজিদটি নির্মিত হয়। আবদুর রশিদ ইব্রাহিম এর প্রথম ইমাম নিযুক্ত হন। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পর ১৯৮৬ সালে মসজিদটির পিলার ধসে পড়ে। পরবর্তীতে টোকিওর এই গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ ও তুর্কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আধুনিকায়নের জন্য তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসে। ৭৩৪ বর্গ মিটার জায়গায় জাপানের সহায়তায় তারা মসজিদ ও স্কুল কার্যক্রম শুরু করে। পুনরায় ১৯৯৭ সালে রাশিয়ায় সামাজিক বিপ্লব সাধিত হলে কাজান প্রদেশ ও তাতারী মুসলমানেরা আরো বেশি পরিমাণে নিগৃহিত হতে থাকে। জীবনের নিরাপত্তার স¦ার্থে তারা সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে ম্যানচুরিয়ায় হিজরত করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের টোকিওতে পুনর্বাসিত হতে থাকে।
টোকিও-র সিবুয়াতে পূর্বে অবস্থানরত কাজান ও তাতারী মুসলমান ও নবদীক্ষিত কিছু জাপানী মুসলমানসহ মসজিদ ও ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় মনোযোগী হয়। তুরস্কের ধর্ম বিষয়ক পরিচালকের দপ্তরের সহায়তায় টোকিও জামি (Camii) ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩০ জুন ১৯৯৮ সালে ৭৩৪ বর্গমিটার জায়গার উপর এই কমপ্লেক্স নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমান মুসলিম বিশে^র অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়েফ এরদোগান এর বিশ^স্ত স্থপতি হিলমি সেন্যাফ এই আধুনিক অটোম্যান স্টাইলের গগণচুম্বি স্থাপনার ডিজাইন প্রদান করেন। ১৯৫৭ সালে মসনবীর ¯্রষ্টা আল্লামা রুমীর শহর কোনিয়ায় জন্ম নেয়া এই মহান স্থপতিকে বিশে^র প্রভাবশালী অটোম্যান সুলতান সুলেমান এর আমলে মহান স্থপতি মিমার সিনানের মানসপুত্র বলা চলে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাঁর স্থাপত্য ডিজাইনে তুরস্ককে সেই ওসমানীয় খেলাফতের দিকে নিয়ে যেতে চান। তিনি তুর্কিমেনিস্তানের বিখ্যাত আর্তগুল গাজী মসজিদ, জার্মানীর বার্লিনের সেথিলক মসজিদ এবং ডিয়ানেট সেন্টার অব আমেরিকার স্থপতি।
জাপানের রাজধানী টোকিও-র কেন্দ্রে অবস্থিত টোকিও জামি ও তুর্কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ডিজাইন তার অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম। ১৯৯৮ সালের ৩০ জুন নির্মাণ কাজ উদ্বোধনের পর থেকে তাঁর নেতৃত্বে একশজন তুরস্কের ইঞ্জিনিয়ার সত্তরজন ক্রাফটম্যান ফিনিশিং কাজে অংশ নেন। সর্বমোট ১৪৭৭ বর্গমিটারের দুটি ফ্লোরসহ একটি বেইসম্যান্ট ফ্লোর রয়েছে। দৃষ্টিনন্দন মার্বেল পাথরসমূহ আনা হয় তুরস্ক থেকে। আধুনিক তুর্কি ডিজাইনের ৪১.৪৮ মিটার উচ্চতাসম্পন্ন একটি গগণচুম্বি মিনার রয়েছে তাতে। যার কারণে অনেক দূর থেকে এই মসজিদটি দৃষ্টিগোচর হয়। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্তে পাঁচবার এই মিনার হতে আজানের সুমধুর ধ্বণি পৃথিবীর অত্যন্ত ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ শহর টোকিওর বাতাসে ধ্বনিত হয় আর ভেসে বেড়ায়। সত্যি তখন হৃদয়ে অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে। এটি নির্মাণ করতে মোট ব্যয় হয়েছে ১.৫ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন। ৩০ জুন ২০০০ সালে এর নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়।
আমরা ছত্রিশ জন বাংলাদেশি পাঁচ অক্টোবর হতে পনের অক্টোবর দুই হাজার ঊনিশ সালে জাপানের বিশ্বখ্যাত মানব সম্পদ উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান AOTS কর্তৃক আয়োজিত Japanese Industrial Tour with cultural Observation for Bangladesh কর্মসূচির আওতায় জাপান ভ্রমণ করি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আট অক্টোবর জাপানের রাজধানী টোকিওর দর্শনীয় স্থানসমূহ পরিদর্শন করি। জাপানের সর্বোচ্চ টাওয়ার স্কাই ট্রি টাওয়ার, স¤্রাট মেইজি জিংগুর সমাধি পরিদর্শন শেষে বাদ আছর আমরা টোকিও জামি এবং তুর্কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পৌঁছাই। মসজিদের সামনে আমাদের বহনকানী তাপানুকুল বাসটি আমাদের নামিয়ে দিয়ে পার্কিং এ চলে যায়। সময় মাগরিব পর্যন্ত। আমাদের নির্ধারিত ডরমেটরি থেকে ট্রেনে চড়েও এ মসজিদে যাওয়া যায়। AOTS এর ডরমেটরিকে Tokyo Kenshu Center সংক্ষেপে TKC বলা হয়। TKC থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথ হল কিতা সেনজু রেলওেয়ে স্টেশন।
এই স্টেশন হতে যে কেউ তিনশত সত্তর জাপানি ইয়েনে টিকিট নিয়ে চিবুওয়া লেনে সিবুওয়া যেতে পারবে। কিতা সেনজু স্টেশন হতে সতেরতম স্টেশন হল চিবুওয়া স্টেশন। সময় লাগবে বরাবর পঁয়ত্রিশ মিনিট। আমি গুনেছি একটি বুলেট ট্রেনে দুই মিনিটে সিমোকিতাজাওয়া স্টেশনে যাওয়া যায়। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে অথবা টেক্সি ক্যাবে টোকিও জামে মসজিদে যাওয়া যায়। জাপানের সব স্টেশনে ভ্রমণ গাইড আছে। স্টেশনে হেল্প ডেস্ক আছে। জাপানীরা জাতি হিসেবে ভদ্র অত্যন্ত অন্তরিক এবং সহায়তাপরায়ন। অপরকে সহায়তা করতে পারলেই তারা আনন্দ বোধ করে।
আমাদের জাপানী গাইড মসজিদের সদর দরজায় নিয়ে আমাদেরকে ভেতরে প্রবেশ করতে বললেন। আহ! কি দারুণ ডিজাইনের বুলওয়ান্দ দরজা। মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতেই চমকে গেলাম। একজন তুর্কি যুবক আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। আমরা প্রথমে তাদের অভ্যর্থনার ব্যবস্থা দেখে বিমোহিত হলাম। একটি ট্রেতে আরবীয় খেজুর রাখা। ইচ্ছামত খেজুর খেলাম। সুপেয় খাবার পানির সুন্দর বন্দোবস্ত। অটোমান স্টাইলের মনোরম অজুখানা। একটি লাইব্রেরী ও সুভ্যনীর কর্ণার। সুভ্যনীর কর্ণারে নানারকম গিফট আইটেম। লাইব্রেরীতে বিক্রয়ের জন্য সাজানো আরবী, ইংরেজি, তুর্কি ও জাপানিজ ভাষায় সব মূল্যবান কিতাবাদি। আমি এই লাইব্রেরী থেকে ১৩০০ জাপানি ইয়েন দিয়ে Making sense of Islamic art & architecture নামের একটি চমৎকার বই খরিদ করি।
সেখানে আরো রয়েছে টোকিও জামে মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উপর নানা বুকলেট, লিপলেট। যা বিনামূল্য সংগ্রহ করা যায়। রয়েছে জামে মসজিদকে নিয়ে সমৃদ্ধ ওয়েবসাইট। দর্শনার্থীর জন্য এই মসজিদটি সকাল দশটা থেকে বিকেল ছয়টা পর্যন্ত উম্মুক্ত থাকে। আমরা তৃপ্তি ভরে খেজুর খেলাম, পানি পান করলাম। এরপর অজু সেরে নিলাম। মসজিদের নীচতলায় ওয়াক্তিয়া নামাজ হয় না। মসজিদের পরতে পরতে মনোমুগ্ধকর ক্যালিওগ্রাফি আমাদেরকে বিমোহিত করেছে। পরে আমাদের জাপানিজ গাইডও অনুমতি নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিলেন। যেহেতু প্রতিবছর বিশে^র বিভিন্ন দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরা এই মসজিদে আসেন। তাকে তাদের সাথে থেকে যেতে হয়।
কোরান শরীফের বিভিন্ন আয়াত করিমা, হাদিস শরীফ, আল্লাহ ও রাসুলের পবিত্র নাম সমূহের ক্যালিওগ্রাফি দিয়ে মসজিদে নববীর মত করে সাজিয়েছেন পুরো জামে মসজিদ কমপ্লেক্সকে। আমরা এরপর দ্বিতীয়তলায় ওঠলাম, সেখানেও মার্বেল পাথরের বাঁধাই করা যত সব হৃদয়কাড়া ডিজাইন। বিশেষ করে মসজিদের মিম্বারটি। হুবহু মসজিদে নববীর মত করে নির্মিত। দু’তলার কিছু অংশ চিলেকোঠার মত উম্মুক্ত রয়েছে। পৃথিবীর বহুদেশের বহু মসজিদ দেখার সুযোগ আমার হয়েছে, তবে এর মত এতটা মনোমুগ্ধকর ও সুন্দর মসজিদ আমি আর কোথাও দেখিনি।
টোকিও জামি মসজিদের কার্যক্রম
আমাদের দেশের মসজিদগুলোতে সাধারণত দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ব্যতিরেকে অন্য কোন কার্যাদি সম্পাদিত হয় না, কিন্তু টোকিও জামি এক্ষেত্রে অনেকটা ব্যতিক্রম। নামাজের পাশাপাশি এ মসজিদটিতে আরো অনেকরকমের কর্মকাণ্ড সম্পাদিত হয়। নিচে এর কিছু আলোকপাত করা হলো-
১. প্রতি শুক্রবারে জুমার নামাজে প্রায় ২ হাজারের মত মুসল্লী জমায়েত হয় এতে। খুতবা পূর্ব আলোচনাটা হয় ইংরেজিতে। এটি অনলাইনে পুরোবিশে^ প্রচার করে। জাপানের মুসলিমদের পাশাপাশি ওখানে মুসলিম বিশ্বের কূটনৈতিকগণও ওই মসজিদে জমায়েত হন। মুসলিমদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টিতে এ মসজিদের গুরুত্ব অত্যধিক। প্রতি জুমাবারে এখানে মুসলিমদের মিলনমেলা বসে।
২. টোকিও জামি আন্তঃধর্মীয় নলেজ শেয়ারিং এর জন্য একটি উল্লেখযোগ্য স্থান। নামাজের পাশাপাশি এখানে ধর্মীয় জ্ঞান ভাগাভাগি করার চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে।
৩. জাপানের বেশিরভাগ মুসলিমদের বিবাহ অনুষ্ঠানগুলো টোকিও জামিতে সম্পাদিত হয়। এর জন্য এখানে রয়েছে সুন্দর ব্যবস্থা।
৪. ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য এখানে রাখা হয়েছে চমৎকার আয়োজন।
৫. পবিত্র মাহে রমজানে ইফতার ও সেহরীর বিশেষ আয়োজন হয় এখানে।
৬. অনুষ্ঠানের জন্য রয়েছে সুপরিসর সেমিনার হল। মুসলিমরা সেখানে ধর্মীয় যেকোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারে।
৭. টোকিও জামি মসজিদের খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ পুরো কমপ্লেক্সের সাথে যুক্ত সকলের আকিদা সুন্নি হানাফী।
৮. ইসলামের অবিকৃত রুপরেখা জাপানে প্রচারের জন্য নিরন্তর কাজ করছে টোকিও জামি ও তুর্কি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
লেখক: ইসলামী চিন্তক ও প্রাবন্ধিক, ডিজিএম (বিক্রয় ও বিপণন), ডায়মন্ড সিমেন্ট লি.