ইসলামী অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইমাম আহমদ রেযা খান’র অবদান

0

ইসলামী অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইমাম আহমদ রেযা খান’র অবদান-
মুহাম্মদ আবদুর রহীম >
 আ’লা হযরত, ইমামে আহলে সুন্নাত, মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত ইমাম আহমদ রেযা খান রাহমাতুল্লাহি আলায়হি (১৮৫৬-১৯২১) সমসাময়িক যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল বাতিঘর ছিলেন। যাঁর আলো সমগ্র বিশ্ববাসীকে আলোকিত করেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় পঞ্চাশটি বিষয়ের উপর দেড় সহস্রাধিক কিতাব রচনা করেছিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায় ‘‘তোমরা জ্ঞানীদের কাছে জিজ্ঞেস কর, যদি তোমরা না জান।’’ [সূরা নাহাল] এই আয়াতের বাস্তব নমুনা। তিনি ছিলেন আহলুজ জিকির। আহলুজ জিকির তারাই যারা কুরআন মজীদের শব্দাবলীর সত্যতা, বাস্তবতা, নিগূঢ় তত্ত্ব উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত। তিনি ইসলামের পরিপূর্ণতাকে তাঁর লেখনির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাফসির, হাদীস, ফতোয়া, ফরায়েজ, সাহিত্য, বালাগাত, বিজ্ঞান বিষয়ের পাশাপাশি তিনি অর্থনৈতিক বিষয়ের উপরও পারদর্শী ছিলেন।
যখন ভারত বর্ষের মুসলমানেরা পরাধীনতার চরম গ্লানিতে ভোগছিলেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বড় বড় মুসলিম নেতা ও আলেম সমাজ সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগছিলেন। মুসলিম উম্মাহর দুঃসময়ে কি করতে হবে বুঝে উঠতে পারছিল না। কিছু ফেকি আলেম ভারতবর্ষকে দারুল হরব ঘোষণা দিয়ে মুসলিম সমাজকে দেশ ত্যাগে উৎসাহিত করছিল। তাদের উস্কানিতে হাজার হাজার মুসলমান তাদের সহায় সম্বল বিক্রয় করে আফগানিস্তানে হিজরত করছিল। তখনই ইমাম আহমদ রেযা চারটি নীতিমালা প্রণয়ন করেন। রচনা করেন, ‘‘Tadbere Falah-o-Najat Wa Islah ’’ তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ। পরবর্তীতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ হায়দ্রাবাদ অঞ্চলের কলেজসমূহের উপপরিচালক প্রফেসর মুহাম্মদ রফিউল্লাহ্ সিদ্দিকী বিস্তারিত ব্যাখ্যা লিখে ১৯১২ সালে বই আকারে ছাপিয়ে দেন। বর্তমানে ‘‘Idara-i Tahqeequat-e Imam Ahmad Raza International’’-এর  ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করে। তাঁর প্রণিত চারটি নির্দেশনা বর্তমানে ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তাধারা উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। হানাফি মাযহাবের ইমাম, ইমাম আযমের সুযোগ্য ছাত্র ইমাম আবু ইউসুফের কিতাব আল খারাজের পর এটি ইসলামে অর্থনৈতিক চিন্তাধারার ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত। আল্লামা ওয়াজাহাত রাসূল কাদেরী, আল্লামা মুহাম্মদ আবদুল হাকিম শরফ কাদেরী ও প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাসুদ আহমদ কাদেরী এ নির্দেশনাগুলোর উপর গবেষণা করে বুঝিয়ে দিয়েছেন এর বর্তমান বাস্তবতা।
আ’লা হযরত রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ভারতবর্ষের মুসলমানদের আহ্বান করেছিলেন বৃটিশদের আদালত বর্জন করে নিজেদের বিবাদগুলো পারস্পরিক বুঝা পড়ার মাধ্যমে নিজেরাই সমাধান করতে, তাতেই সঞ্চয় হবে কোটি কোটি টাকা।
বম্বে, কলকাতা, রেঙ্গুন, হায়দ্রাবাদ, মাদ্রাজের ধনী মুসলমানদের তিনি আহ্বান করেছিলেন গরীব মুসলমান ভাইদের কল্যাণে সুদ মুক্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে। মুসলমানেরা যেন অমুসলিম থেকে কোন কিছু ক্রয় না করে, তারা শুধু যেন মুসলমানদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করে। ইলমে দ্বীন হাসিলে বড় বড় দ্বীনই শিক্ষা কেন্দ্র, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্যও আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
যখন অর্থনীতি কোন মৌলিক বিষয় হিসেবে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতো না, তখন থেকেই অর্থনীতির মৌলিক বিষয়ের উপর ধারণা দিয়েছেন। মূলত অর্থনীতি বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৩০ সালের মহামন্দার পর। বিশেষ করে বৃটিশ অর্থনীতিবিদ জে. এম. কেইনস (১৮৪৩-১৯৪৬) The Theory of Employment, Interest and Mony রচনার পর। কেইনস এর চব্বিশ বছর আগে ইমাম আহমদ রেযা খান রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এই সঞ্চয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। আমাদের প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মিতব্যয়ী হতে বলেছেন। বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলেই উৎপাদন বাড়বে, কর্মসংস্থান হবে, জাতীয় আয় বৃদ্ধি পাবে। এবং এ প্রক্রিয়ায় দারিদ্র বিমোচন হবে। হাদীস শরীফে এসেছে, ‘‘দারিদ্রতা মানুষকে কুফরীর দিকে নিয়ে যায়।’’
পরাধীন ভারতের মুসলমানদের ঈমান-আমল ঠিক রাখার জন্য এ প্রস্তাবটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯১২ সালে তিনি যখন ভারতের মুসলমানদের ব্যাংক প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন তখন ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা তো দূরের কথা প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। ব্যাংক একটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে রক্ত সঞ্চালনকারী, মানুষের সুদ মুক্ত সঞ্চয়গুলো সংগ্রহ করে বৃহৎ বিনিয়োগ গঠন করে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে।
তৃতীয় প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানরা যদি মুসলমানদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য করত তবে দৃশ্যপট পাল্টে যেত। অমুসলিমরা ব্যবসা সংগঠনগুলো তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য গঠন করেছে। যেমন- European Common Market- ECM, NAFTA, LAFTA, WTO সহ বহু সংগঠন।
‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা’ নাম দিয়ে সাতান্নটি রাষ্ট্র নিয়ে এখন একটি সংস্থা গঠন করা হয়েছে। ইসলামী সম্মেলন সংস্থা, তাদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য হয় মাত্র শতকরা নয় ভাগ। বর্তমানে ইসলামী কমন মার্কেট (ICM) গঠন করার জন্য মালয়েশিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, ইসলামী স্কলার দার্শনিক ও মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক পথ প্রদর্শক ইমাম আহমদ রেযা খান রাহমাতুল্লাহি আলায়হি কতটুকু এ জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য অবদান রেখেছেন। এই পথকে যদি আমরা ধরে রাখতে সক্ষম হতাম তাহলে মুসলিম জাতি ইসলামী অর্থনৈতিক চিন্তাধারার পথকে সারা বিশ্বে মডেল হিসেবে উদাহরণ হতাম। আমরা পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের ন্যায় যদি ব্যবসা-বাণিজ্যতে মুসলমান মুসলমানে মেলবন্ধনে আবদ্ধ হত, তাহলে আহমদ রেযা খান রাহমাতুল্লাহি আলায়হি’র এই চেতনা বাস্তবায়ন হত। আসুন আমরা সবাই ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর নির্দেশিত অর্থনৈতিক প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে মুসলিম জাতিকে অর্থনৈতিক দাসত্ব থেকে মুক্ত করি।