ভ্রান্ত শিয়া সম্প্রদায় ও ইমাম আহমদ রেযা

0

ভ্রান্ত শিয়া সম্প্রদায় ও ইমাম আহমদ রেযা-

আল্লামা কাজী মুহাম্মদ মুঈন উদ্দীন আশরাফী >

ইসলামের স্বচ্ছ ভূমিতে আগাছাস্বরূপ যেসব ভ্রান্ত দলের আবির্ভাবের কথা হাদিস শরীফে বিবৃত হয়েছে তন্মধ্যে শিয়া সম্প্রদায় অন্যতম। এ দলটির জন্ম রাজনৈতিক কারণে হয়ে থাকলেও পরবর্তীতে এটা পৃথক ধর্মীয় দলে রূপ পরিবর্তন করে। অতঃপর তাদের অভ্যন্তরীন পরস্পরের মতবিরোধের কারণে এটা বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। [মিন আকাঈদী শীয়া, পৃ. ১০, কৃত: আবদুল্লাহ্ বিন মুহাম্মদ আচ্ছালাফী] আসলে যে উদ্দেশ্যে এ দলের জন্ম হয়েছিল তা বাস্তবেও পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ মুসলমানদেরকে বিভক্ত করা।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান যুন্নুরাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর খেলাফতকালে পুরো জযীরাতুল আরব ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে পড়েছিল। বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও সর্বস্তরের মানুষ ইসলামের সভ্যতা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতঃ এটা উভয় জগতের গন্তব্য ও মুক্তির চাবিকাঠি জেনে পূর্বপুরুষদের ধর্ম ছেড়ে ইসলামের স্বর্গীয় পরিবেশে নিজ স্থান করে নিচ্ছিল। ইসলামের চিরশত্রুগণ ইসলামের এ অগ্রযাত্রাকে মেনে নিতে পারল না। তারা ইসলাম ও মুসলমানদের সমূলে ধ্বংস করার ষড়ন্ত্রে লিপ্ত হলো। তারা দেখলো ইসলামের বাইরে থেকে এ কাজ ততোটা সহজসাধ্য নয়, যতটা সহজ ইসলামের ভিতরে ঢুকে করা যাবে। অতঃপর ইয়েমেন অধিবাসী প্রখ্যাত আলেম আবদুল্লাহ্ ইবনে সাবা হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র খেলাফতকালে ইসলাম গ্রহণ করতঃ ইসলামের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। সে এমন সব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলো যদ্দরুন শেষ পর্যন্ত মুসলমানগণ সত্যিই নানা দলে বিভক্ত হয়ে পড়ল। যেমনিভাবে পুলোম নামক ইয়াহুদী হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম প্রবর্তিত খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ পূর্বক এ ধর্মের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করেছিলো।
[সীরাতে আয়েশা রাদ্বি., কৃত: সুলাইমান নদভী, ইমাম আহমদ রেযা আউর রদ্দে শিয়া কৃত: আল্লামা আবদুল  হাকিম শরফ কাদেরী] পুলোম যেমন ঈসায়ী ধর্মে ঢুকে নানা ধরণের কুফরী মতবাদের প্রবর্তন করে এটাকে চবরমভাবে বিকৃত করে তুলেছিল। ইবনে সাবাও একই পথ অবলম্বন করে ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে দ্বীন বিকৃতির বীজ বপন করে। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর সাথে হুযূর করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র বংশীয় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তিতে সে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু সম্পর্কে এমন উদ্ভট, বানোয়াট ও মনগড়া ধ্যান-ধারণা প্রচার করতে শুরু করল যা থেকে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত।
ইবনে সাবা প্রবর্তিত ভ্রান্ত কুফরী আক্বীদা সমূহের কয়েকটি
১. হুযূর করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পর খেলাফতের একমাত্র হকদার হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু।
২. প্রথম তিনজন খলিফা অর্থাথ  হযরত আবু বকর, হযরত ওমর ফারুক ও হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম এদের কেউ খেলাফতের যোগ্য ছিল না।
৩. সে বলতে শুরু করল যে, তাওরাত কিতাবে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে হুযূর করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অছি (খলিফা) বলা হয়েছে। সুতরাং তিনিই একমাত্র খেলাফতের হকদার। তাঁকে হুযূর করিম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিনিধি তথা খলিফা না করে তাঁর প্রতি জুলুম করা হয়েছে।
৪. হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু আল্লাহর একটি রূপ। শিয়া ধর্মের নির্ভরযোগ্য কিতাবে রেজালকশী পৃ. ৭০ মুম্বাই মুদ্রিত গ্রন্থে বর্ণিত আছে যে, ইবনে সাবা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে ইলাহ্ বা মাবুদ বলে বিশ্বাস করতো।
৫. ইবনে সাবা কোন কোন ক্ষেত্রে এ অপপ্রচারও চালিয়েছিল যে, আল্লাহ্ তা’আলা নবুওয়াত-রিসালতের জন্য হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম ভুলবশতঃ অহী নিয়ে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) ইবনে আবদিল্লাহ্র নিকট চলে গেছেন।
৬. শিয়াদের মতে, বিদ্যমান কোরআন বিকৃত। আসল কোরআন তাদের ইমামে গায়েবের নিকট রক্ষিত।
৭. হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা ও হযরত হাফসা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা উভয় ও উভয়ের পিতা যথাক্রমে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু ও হযরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু মোনাফিক। হযরত আয়েশা ও হযরত হাফসা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমা হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে  বিষ পান করিয়ে শহীদ করে দিয়েছে। এ কথা প্রখ্যাত শিয়া আলেম মোল্লা বাকের মজলিসী হায়াতুল কুলুব-এর ২য় খন্ডে লিখেছে।
৮. শিয়া ইমামদের সুমহান মর্যাদায় কোন মুরসাল নবী ও কোন নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না।
[শিয়া-সুন্নী ইখতেলাফ কৃত: মাওলানা ওবাইদুল হক জালালাবাদী, সাবেক খতীব, বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদ, ঢাকা।] শিয়া সম্প্রদায়ের এ ধরণের আরো অনেক কুফরী আক্বীদা রয়েছে। যার বিরুদ্ধে যুগে যুগে বিশ্ববরেণ্য সুন্নী আলিমগণ তাঁদের লিখনীর মাধ্যমে এসব কুফরি বক্তব্যের খণ্ডন করে আসছেন তাঁদের মধ্যে হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ইমাম আহমদ রেযা খাঁন রাহমাতুল্লাহি আলায়হি অন্যতম। তিনি শিয়াদের খন্ডনে কলম যুদ্ধের পাশাপাশি তর্কযুদ্ধেও অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
শিয়াদের তাফযীলিয়া দলের সাথে মোনাযারা
১৩০০ হিজরীতে বেরেলী, বাদাইয়ুন, সাম্বুল এবং রামপুরের তাফযীলিয়াগণ একমত হয়ে আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর সাথে মোনাযারার ঘোষণা দেয়। তখন আ’লা হযরত রাহমাতুল্লাহি আলায়হি অসুস্থ ছিলেন। এতদসত্ত্বেও মোনাযারার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। এবং ত্রিশটি প্রশ্ন লিখে পাঠিয়ে দেন। তাফযীলিয়ারা এর কোন উত্তর দিতে সক্ষম হয়নি।
ইমাম আহমদ রেযা খাঁন (রাহ.)’র লিখিত কিতাবসমূহ সন সহকারে নিম্নে প্রদত্ত হলো-
১. রদ্দুররাফযা, হিজরী- ১৩২০।
২.আল আদিল্লাতুত্তায়েনা ফী আযানিল মোলায়েনা, হিজরী-১৩০৬।
৩. আয়ালীল ইফাদা ফী তাযীয়াতিল হিন্দ ওয়া বয়ানিশ্শাহাদা, হিজরী ১৩২১।
৪. জাযাউল্লাহে আদুওয়্যাহ্ বে-আবাই খাতমিন নবুওয়াহ্ (এটা কাদিয়ানি ও রাফেযী উভয়ের খণ্ডনে লিখিত), হিজরী- ১৩১৭।
৫. গায়াতুত্ তাহকীক ফী ইমামাতিল আলী ওয়া সিদ্দিক।
৬. আল কালামুল বাহী ফী তাশবিহীসিদ্দিক বিন্নবী, হিজরী- ১২৯৭।
৭. আযযালালুল আনকা মিন নাহার ছাবাকাতিল আত্কা, হিজরী- ১৩০০।
৮. মাতলাউল কামারাইন ফী এবানাতে ছাবাকাতিল ওমরাইন, হিজরী- ১২৯৭।
৯. ওয়াজহুল মাশুক বে-জালওয়াতে আছমায়িসিদ্দিক ওয়াল ফারুক, হিজরী- ১২৯৭।
১০. জামউল কোরআন ওয়াবিমা আযাউহু লিওসমান, হিজরী- ১৩২২।
১১. আল বুশরাল আজেলা মিন তুফায়ে আজেলা, হিজরী- ১৩০০।
১২. আরশুল এযায ওয়াল একরাম লেআউয়্যালে মুলুকিল ইসলাম, হিজরী- ১৩২২।
১৩. যাব্বুল আহওয়াইল ওয়াহিয়া ফী বাবে আমীর মুয়াবিয়া, হিজরী- ১৩১২।
১৪. আ’লামু’ছাহাবাতিল মুয়াফেকীন লীল আমীর মুয়াবিয়া ওয়া উম্মিল মোমেনীন, হিজরী- ১৩১২।
১৫. আল আহাদিসুররাবীয়া লেমাদহিল আমীরে মুয়াবিয়া, হিজরী- ১৩১৩।
১৬. আল জারহুল ওয়ালেজ ফী বাতনিল খাওয়ারেজ। হিজরী- ১৩০৫।
১৭. আচ্ছামছামুল হায়দরী আলা হুমকিল আয়্যারিল মুফতারী, হিজরী-১৩০৪।
১৮. আররাহেয়াতুল আম্বরীয়া আনিল জামরাতিল হায়দারীয়া, হিজরী- ১৩০০।
১৯.  লাময়াতুশাময়া লেহুদা শীয়াতিশ্ শানআহ, হিজরী- ১৩১২।
এমনিভাবে আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খাঁন রাহমাতুল্লাহি আলায়হি তাঁর রচিত সহস্রাধিক গ্রন্থের বিভিন্ন জায়গায় শিয়া রাফেযীদের দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন। এতদসত্ত্বেও কোন কোন বিবেকহীন শিয়াদের দালাল বলে অপবাদ দেয়া এটা তাদের মোগরাহীর পরিচায়ক। আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান রাহমাতুল্লাহি আলায়হি শিয়া, রাফেযী, কাদিয়ানী, আহলে হাদিস, নায়ছারী, ওহাবী, দেওবন্দী, তাবলীগি, সালাফীসহ সকল ভ্রান্ত দলের সফলভাবে মুখোশ উন্মোচন করেছেন এবং প্রত্যেকের ভ্রান্ত মতবাদ খন্ডনে কিতাব লিখে স্থায়ীভাবে অবদান রেখেছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা আ’লা হযরত রাহমাতুল্লাহি আলায়হিকে বাংলাদেশের মুসলমানদের নিকট যথাযথভাবে পরিচিত করে তুলতে পারিনি। তাই আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এর রচিত গ্রন্থসমূহ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করাই হবে তাঁর অবদানের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। মহান আল্লাহ্ পাকের দরবারে দো’আ করি তিনি যেন আমাদের সকলকে শরীয়ত ও তরীক্বতের সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করেন। আ-মী-ন।