তাফসীর শাস্ত্রে ইমাম আহমদ রেযা’র অনন্য দক্ষতা

0

 তাফসীর শাস্ত্রে ইমাম আহমদ রেযা’র অনন্য দক্ষতা-
মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল নোমান >
আ‘লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) হলেন জ্ঞানের ইনসাইক্লোপিডিয়া। সত্তরাধিক বিষয়ে ব্যুৎপত্তি, দক্ষতা ও পাণ্ডিত্যের অধিকারী আ’লা হযরত সহস্রাধিক প্রামাণ্য গ্রন্থ-রচনা করেন। এ সব বিষয়ের প্রত্যেকটিতে আ‘লা হযরত এক বা একাধিক গ্রন্থ- রচনা করেছেন। তবে ‘তাফসীরে কোরআন’ বিষয়ের উপর তাঁর পৃথক কোন বড় ও স্বতন্ত্র গ্রন্থ পাওয়া না গেলেও আনুষঙ্গিক ও প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি পবিত্র কোরআনের যেসব তাফসীর বা ব্যাখ্যা, তত্ব ও তথ্যাদি উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর পাঠ-পর্যালোচনা করলে এ কথা মধ্যাহ্ন সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আ‘লা হযরত একজন সুদক্ষ মুফাসসিরে কোরআনও ছিলেন। এ নিবন্ধে এতদসংক্রান্ত আলোচনার প্রয়াস পাবো। তাফসীর শাস্ত্রের ইমামগণ পবিত্র কোরআনুল কারীমের তাফসীরের ক্ষেত্রে চারটি পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন। যথা-
(১) تفسير القرآن بالقرآن (তাফসীরুল কোরআন বিল কোরআন) তথা কোরআন দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা।
(২) تفسير القرآن بالاحاديث (তাফসীরুল কোরআন বিল আহাদিস) তথা হাদিসসমূহ দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা।
(৩) تفسير القرآن باثار الصحابة والتابعين (তাফসীরুল কোরআন বিআসারিস সাহাবা ওয়াত্ তাবেয়ীন) তথা সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মতামত দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা।
(৪)تفسير القرآن باللغة العربية والقواعد الإسلامية (তাফসীরুল কোরআন বিল-লুগাতিল আরাবিয়্যাহ ওয়াল কাওয়ায়িদিল ইসলামিয়্যাহ) তথা আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা।
ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) তাঁর তাফসীর সংক্রান্ত আলোচনা উপরোক্ত যাবতীয় পদ্ধতির আলোকে বর্ণনা করেছেন। যা তাঁর এ বিষয়ে সুগভীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার প্রমাণ বহন করে।
(১) تفسير القرآن بالقرآن (তাফসীরুল কোরআন বিল কোরআন) তথা কোরআন দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা:
কোরআনুল কারীমের এক আয়াত দ্বারা অন্য আয়াতের ব্যাখ্যা করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় তাফসীরুল কোরআন বিল কোরআন বা কোরআন দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা। কোরআনুল কারীমের কিছু আয়াত এমন যে, তা বারংবার ইরশাদ হয়েছে। আবার কিছু সামান্য পার্থক্য সহকারে অন্য স্থানে অবতীর্ণ হয়েছে। তাফসীরের সময় ঐ আয়াতগুলোতে দৃষ্টি রাখা জরুরী। কেননা, এক আয়াত অন্য আয়াতের ব্যাখ্যা করছে। যাতে কোরআনুল কারীমের উদ্দেশ্য ও মহান রবের অভিপ্রায় সুস্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যায়। এ রকম অগণিত দৃষ্টান্ত ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি)’র অসংখ্য গ্রন্থে বিদ্যমান রয়েছে। এখানে শুধুমাত্র একটি উদাহরণ পেশ করছিÑ ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) হুযুর সায়্যিদে আলম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র প্রেরণের ব্যাপকতা বর্ণনায় এক আয়াত উপস্থাপন করেন,
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ.
Ñএবং হে মাহবুব! আমি আপনাকে প্রেরণ করিনি, কিন্তু এমন এক রিসালাত সহকারে, যা সমস্ত মানবজাতিকে পরিব্যাপ্ত করে নেয়, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী; কিন্তু অনেকেই জানেনা।
এই আয়াতের ব্যাখ্যা ও সুস্পষ্ট বিবরণ দিতে গিয়ে তিনি অন্য আয়াত পেশ করেন। যথাÑ
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا.
অত্যন্ত মঙ্গলময় তিনি, যিনি অবতীর্ণ করেছেন ক্বোরআন, আপন খাস বান্দার প্রতি, যাতে তিনি সমগ্র জগতের জন্য সতর্ককারী হন।
প্রথম আয়াতে হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সমস্ত মানুষের জন্য প্রেরণ হওয়া বুঝায়, কিন্তু অন্য আয়াত হতে স্পষ্ট হয়ে গেল যে, তিনি (শুধুমাত্র মানবজগতের জন্য নয়, বরং) সমস্ত জগতের জন্য রাসূল। এবার ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি)’র এই ব্যাখ্যার বিবরণ শুনুন। তিনি বলেন, হুযুর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে সমস্ত জিন ও ইনসানের রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। এই ‘মহান রিসালত’-এ সকল জিন ও ইনসান অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত্য রয়েছে এবং মুহাক্কিকীনের নিকট ফেরেশতাগণও এর অন্তর্ভুক্ত। এ ব্যাপারে আমি (আ‘লা হযরত) আল্লাহ তা‘আলার তাওফীকক্রমে আমার রচিত কিতাব اجلال جبريل (ইজলালে জিবরীল)-এ বিশদ আলোচনা করেছি। সারসংক্ষেপ কথা হলোÑ গাছ-পালা, পাথর-মাটি, আসমান-যমীন, পাহাড়-সাগর, এক কথায় আল্লাহ ব্যতীত সমগ্র সৃষ্টিরাজি এতে সন্নিবেশিত রয়েছে। তাইতো কোরআনুল কারীমে হুযুরের শ্রেষ্ঠত্বের ব্যাপারে عالمين (আলামীন) শব্দের প্রয়োগ হয়েছে। (যা আল্লাহ ব্যতীত সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে) আর সহীহ মুসলিম শরীফের হাদিসে خلق (খলকুন) শব্দটি এসেছে তাও তাগীদসূচক كافة (কাফফাতুন) শব্দ দ্বারা। হাদিসটি হলোÑ ارسلت الي الخلق كافة আমি গোটা সৃষ্টিজগতের জন্য প্রেরিত।
(২) تفسير القرآن بالاحاديث (তাফসীরুল কোরআন বিল আহাদিস) তথা হাদিসসমূহ দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা:
কাফের-মুশরিকগণের নিকট সাহায্য চাওয়া হারাম এটা প্রমাণ করার জন্য ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) তাঁর রচিত الحجة المؤتمنة (আল-হুজ্জাতুল মু’তামিনা) গ্রন্থে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করেছেন। হাদিসে পাকের আলোকে বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। আবার প্রত্যেক হাদিসের বিশুদ্ধতার বর্ণনা, বর্ণনাকারীর নির্ভরযোগ্যতা, ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদিতেও পরিপূর্ণ দৃষ্টিপাত করতেন। এক্ষেত্রেও তাঁর দক্ষতা প্রস্ফুটিত হয়। যেমনÑ কাফেরদের নিকট সাহায্য চাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে অসংখ্য আয়াত রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো,لاَّ يَتَّخِذِ الْمُؤْمِنُونَ الْكَافِرِينَ أَوْلِيَاء مِن دُوْنِ الْمُؤْمِنِينَ وَمَن يَفْعَلْ ذَلِكَ فَلَيْسَ مِنَ اللّهِ فِي شَيْءٍ Ñমুসলমানগণ যেন কাফেরদের আপন বন্ধু না বানিয়ে নেয়, মুসলমানগণ ব্যতীত। আর যে ব্যক্তি এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোনো সম্পর্ক রইলো না।  এবার এই আয়াতের ব্যাখ্যায় হাদিসে পাকের প্রতি দৃষ্টিপাত করি। হাদিসটি হলো, হযরত আবু হুমাইদ সাঈদী (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উহুদ যুদ্ধের দিন তাতে গমন করেন। যখন ‘ছানিয়াতুল বিদা’ উপত্যকা অতিক্রম করলেন, তখন একটি শক্তিশালী সৈন্যদল দেখতে পেলেন। তিনি বললেন, এরা কারা? সাহাবায়ে কেরামগণ বললেন, তারা হলো বনু কাইনুকা এবং আব্দুল্লাহ বিন সালামের অনুসারী। তিনি বললেন, তাঁরা কি আমাদের ইসলামকে স্বীকার করে? তারা বললেন, না, নিশ্চয় তারা তাদের ধর্মের উপর অটল রয়েছে। নবী পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন, তোমরা তাদেরকে বলে দাও যে, তারা যেন ফিরে যায়, নিশ্চয় আমরা মুশরিকদের সাহায্য কামনা করি না।
(৩) تفسير القرآن باثار الصحابة والتابعين (তাফসীরুল কোরআন বিআসারিস সাহাবা ওয়াত তাবেয়ীন) তথা সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মতমত দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা:
এ পদ্ধতির সাথে সংশ্লিষ্ট তাফসীরের আলোচনা ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি)’র বহু গ্রন্থে বিদ্যমান। যখন তিনি কোরআনুল কারীমের কোনো আয়াত নিয়ে আলোচনা করতেন তখন তার ব্যাখ্যায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র হাদিসে পাক, সাহাবায়ে কেরামের মতামত এবং তাবেয়ীগণের বাণীর আলোকে খুব চমৎকারভাবে এবং সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করতেন। কোনো আয়াত মনসুখ (রহিত) কিংবা মুহকাম (সুস্পষ্ট) এর ব্যাপারে নিজস্ব মতামতের ভিত্তিতে নয়; বরং তা অন্য কোনো আয়াতে কারীমা অথবা হাদিসে পাকের আলোকে করতেন, অতঃপর সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনে এজামদের আসারের ভিত্তিতে করতেন। এমন আয়াত যার অর্থ পরস্পর বিপরীত হয়। তখন এটাই প্রতীয়মান হয় যে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এভাবে এক আয়াত ‘মনসুখ’ (রহিত) হয় এবং অন্যটি ‘নাসেখ’ (রহিতকারী) হয়ে থাকে এবং এসব বিষয়ের জ্ঞান উল্লেখিত উত্তম পদ্ধতির মাধ্যম হিসেবে বিবেচ্য। ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) এই সমস্ত আলোচনার সাথে সম্পৃক্ত বিষয়সমূহ তাঁর গ্রন্থাবলিতে উল্লেখ করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় বিষয়াদি একত্রিত করেছেন। তন্মধ্যে একটি উদাহরণ নিম্নে পেশ করা হলো। উদাহরণ: سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ Ñতাদের চিহ্ন হচ্ছে তাদের চেহারার সাজদার চিহ্ন থাকে।  ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) বলেন, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীনে এজাম এই ‘দাগ’ এর ব্যাখ্যায় চারটি মতামত ব্যক্ত করেছেন। সেগুলো হলোÑ প্রথমত: কিয়ামত দিবসে সাজদার বরকতে তাদের চেহারায় সেই নূর প্রকাশ পাবে। এটা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইমাম হাসান বসরী, আতিয়া মওফী, খালিদ হানাফী এবং মুকাতিল ইবনে হায়য়ান (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম) হতে বর্ণিত। দ্বিতীয়ত: নম্র, বিনয়ী, সদ্ব্যবহারের প্রভাব দুনিয়ার মধ্যে সালিহীনের চেহারায় বানোয়াট ব্যতীত প্রকাশ পায়। তা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও ইমাম মুজাহিদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা)’র অভিমত। তৃতীয়ত: রাত্রি জাগরণ তথা কিয়ামুল লায়ল এর কারণে চেহারা হলুদ রং ধারণ করা। তা ইমাম হাসান বসরী, দ্বাহহাক, ইকরামা, শিমর বিন আত্বিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম) হতে বর্ণিত। চতুর্থত: তা হলো অযুর পানির আর্দ্রতা ও মাটির প্রভাব, যা যমীনে সাজদা করার কারণে নাকে ও কপালে লেগে যায়। এটা হযরত ইমাম সাঈদ বিন জুবাইর ও হযরত ইকরামা (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা)’র অভিমত। এ চারটি মতামত ব্যক্ত করার পর তিনি (আ‘লা হযরত) বলেন, এ চারটি অভিমতের মধ্যে প্রথম দুটি প্রণিধানযোগ্য ও শক্তিশালী। এ দুটোর ব্যাপারে সরাসরি নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র হাদিস বর্ণিত রয়েছে। তা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হতে হাসান পর্যায়ের সনদ দ্বারা সাব্যস্ত, যা ইমাম তবরানী (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) তাঁর লিখিত মু‘জাম-ই আওসাত ও সগীর এবং ইবনে মারদূভীয়া হযরত উবাই ইবনে কা‘ব (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) হতে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর বাণীÑ سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِم مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ -এর ব্যাপারে বলেছেন, اَلنُّوْرُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ Ñ‘কিয়ামত দিবসের নূর’ উদ্দেশ্য। তাইতো ইমাম জালালুদ্দীন মহল্লী (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) এ কথার উপর সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। আমি বলছি তৃতীয় অভিমতটি ঈষৎ দুর্বল। কপালের দাগ রাত্রি জাগরণের চিহ্ন, সাজদার চিহ্ন নয়। সাজদার উদ্দেশ্যে রাত্রি জাগরণ পাওয়া গেলে সঠিক হয়। চতুর্থ অভিমত একেবারে দুর্বল। অযুর পানি সাজদার চিহ্ন নয়। নামাযের পর কপালের মাটি ঝেড়ে ফেলার হুকুম রয়েছে। সাজদার চিহ্ন বা سِيمَا হলে তাকে দূর করার বিধান আসতো না। মনে হয় ঐ অভিমত সাঈদ বিন জুবাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) হতে সাব্যস্ত নয়। বস্তুতঃ কতেক মানুষের অধিক সাজদার কারণে যে কাল দাগ পড়ে নবীর হাদিসে তার ভিত্তি নেই। বরং হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, সায়িব বিন ইয়াযিদ ও মুজাহিদ (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুম) এ ধরনের হাদিসকে অস্বীকার করেন।
(৪) تفسير القرآن باللغة العربية والقواعد الإسلامية (তাফসীরুল কোরআন বিল-লুগাতিল আরাবিয়্যাহ ওয়াল কাওয়ায়িদিল ইসলামিয়্যাহ) তথা আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ দ্বারা কোরআনের ব্যাখ্যা
আরবি ভাষা ও ব্যাকরণেও ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) পূর্ণ দক্ষতার অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন উসূল ও কাওয়ায়েদের সাথে সম্পর্কিত স্বতন্ত্র অনেক কিতাবও তিনি রচনা করেন। তাঁর রচনাবলীতে ভাষার জ্ঞান, বিষয়ভিত্তিক নিয়মাবলী, যুক্তি-তর্ক ছাড়াও আকলী ও নকলী উভয় ধরনের জ্ঞান বিতরণে তিনি সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ইলমে নাহ্ভ ও ইলমে সরফের নিয়মাবলী, ইলমে মা‘আনী, ইলমে বয়ান, ইলমে বদী, উসূলুত্ তাফসীর, উসূলুল হাদিস, উসূলুল ফিক্হ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উৎপত্তি তো কোরআন-হাদিস বুঝা এবং বুঝানোর জন্যই হয়েছে। আর মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফুকাহা ও মুজতাহিদগণের জ্ঞানের স্রোতধারা এই জ্ঞানসমূহ হতে উৎসারিত। এ কারণে কোরআনুল কারীমের তাফসীরের সময় তাতে দৃষ্টিপাত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) এই পদ্ধতিতে তাফসীর উপস্থাপন করতেন, যাতে কোরআনুল কারীমের সূক্ষ্ম রহস্য উদঘাটন হতো এবং মহান রবের অতুলনীয় মর্যাদা উপস্থাপিত হতো। নিম্নে তার প্রকৃষ্ট একটি উদাহরণ পেশ করছি। যথাÑ মহান আল্লাহ হুযুর পুরনূর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)কে সমস্ত আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম) হতে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ও অতুলনীয় মর্যাদাসম্পন্ন করেছেন। কোরআনে পাকের অসংখ্য আয়াতে কারীমায় তা ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র সুউচ্চ মর্যাদা সম্বন্ধে আল্লাহর আকাক্সক্ষা তাতো সম্পূর্ণ কোরআন জুড়েই বিদ্যমান। মহান আল্লাহ ইরশাদ করছেন,
وَإِذْ أَخَذَ اللّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّيْنَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي قَالُواْ أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُواْ وَأَنَاْ مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ.
Ñএবং স্মরণ করুন! যখন আল্লাহ নবীগণের নিকট থেকে তাদের অঙ্গিকার নিয়েছিলেন। “আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমত প্রদান করবো, অতঃপর তাশরীফ আনবেন তোমাদের নিকট রাসূল, যিনি তোমাদের কিতাবগুলো সত্যায়ন করবেন, তখন তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং নিশ্চয় নিশ্চয় তাকে সাহায্য করবে।” এরশাদ করলেন, “তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এ সম্পর্কে আমার গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করলে?” সবাই আরজ করলো, “আমরা স্বীকার করলাম।” এরশাদ করলেন, “তবে (তোমরা) একে অপরের উপর সাক্ষী হয়ে যাও। এবং আমি নিজেই তোমাদের সাথে সাক্ষীদের মধ্যে রইলাম।
উক্ত আয়াতে হুযুরে আকরাম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র ব্যাপক ফযিলতের উপর বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়েছে। পরিশেষে (মহান আল্লাহর কৃপায় আমি বলছি) আবার এটাও দেখা যায় যে, উক্ত প্রসঙ্গটি পবিত্র কোরআন মাজীদে কিরূপ গুরুত্বের সাথে বর্ণনা করা হয়েছে এবং বারংবার তাগীদ দেওয়া হয়েছে।
প্রথমত: আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম নিষ্পাপ। আল্লাহর আদেশের পরিপন্থী কোনো কাজ তাদের থেকে প্রকাশিত হয় না যে, মহান রব নির্দেশ সূচকভাবে তাদের বলেছেন, যদি ঐ নবী তোমাদের কাছে আসেন তাঁর উপর ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে, কিন্তু তার উপর যথেষ্ট করেননি বরং তাদের থেকে অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। এই অঙ্গীকার (الست بربكم) “আমি কি তোমাদের রব নই?” মহান রবের সাথে কৃত অঙ্গিকারের বিষয়টি এমনভাবে সংযুক্ত ছিল, যেভাবে কালিমা-ই لا اله الا الله এর সাথে محمد الرسول الله সংযুক্ত রয়েছে। যেন প্রকাশ পায় যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য সবকিছুর জন্য প্রথম আবশ্যকীয় কর্তব্য হলো আল্লাহর রুবুবিয়্যতের উপর আস্থা রাখা। আল্লাহর পরই সাথে সাথে পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র রিসালাতের উপর ঈমান আনা। দ্বিতীয়ত: ঐ চুক্তিতে ‘লামে কসম’ (لام قسم) দ্বারা দৃঢ়তা প্রদান করা হয়েছে। لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ Ñ“তখন তোমরা তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং নিশ্চয় নিশ্চয় তাকে সাহায্য করবে।” যেভাবে নবাবগণ (রাজ্যের শাসক) বাদশাহদের থেকে অঙ্গিকার নিয়ে থাকেন। ইমাম সুবকী (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) বলেন, মাসআলা: বায়‘আত এই আয়াত হতে গৃহীত হয়েছে। তৃতীয়ত: নূনে তাকিদ (نون تاكيد) বা দৃঢ়তাসূচক নূন। চতুর্থত: তাও নূনে সক্বিলাহ (نون ثقيلة) বা তাশদীদবিশিষ্ট দৃঢ়তাসূচক নূন এনে তাগিদ তথা দৃঢ়তাকে দ্বিগুণ করা হয়েছে। পঞ্চমত: এই পরিপূর্ণ ব্যবস্থাপনায় দেখুন যে, সম্মানিত নবীগণ এখনো জবাব দিতে পারেননি, স্বয়ং আল্লাহই আগে জিজ্ঞেস করে বসলেন, আ-আক্বরারতুম (أَأَقْرَرْتُمْ) Ñতোমরা আমার এ ব্যাপারে স্বীকৃতি দিচ্ছ কি? অর্থাৎ, এর দ্বারা পূর্ণতা, দ্রুততা ও ধারাবাহিক অনুমোদন উদ্দেশ্য। ষষ্ঠত: এতটুতেও যথেষ্ট করেননি বরং বলেছেন, وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ إِصْرِي Ñ“আমার শুধু স্বীকৃতিই নয়; বরং এটার উপর আমার গুরুদায়িত্ব বুঝে নাও ।” সপ্তমত: আলাইহি (عليه) অথবা আলা হাযা (علي هذا) এর স্থলে আলা যালিকুম (على ذلكم) বলেছেন, ইঙ্গিতের পরেও মর্যাদা যাতে অটুট থাকে। অষ্টমত: আরো উন্নতি হলো যে, ফাশহাদু (فَاشْهَدُواْ) Ñতোমরা সাক্ষী হয়ে যাও একজন আরেকজনের উপর। যদিও (আল্লাহর পানাহ) প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা পূতঃপবিত্র মহান ব্যক্তিদের জন্য যৌক্তিক ছিল না। নবমত: পরিপূর্ণতা এটাই যে, শুধুমাত্র তাঁদের সাক্ষ্যের উপর যথেষ্ট হয়নি, বরং ইরশাদ করেছেন, وَأَنَاْ مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ Ñ“আর আমি নিজেও তোমাদের সাথে সাক্ষী হিসেবে রইলাম।” দশমত: সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও চূড়ান্ত বিষয় এটাই যে, ঐ মহান দৃঢ়তা জ্ঞাপনের পর সুদৃষ্টির সাথে আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম)’র নিষ্কলুষতা দান করার ঘোষণার পর অমান্যকারীদের প্রতি জোরালো ধমকও দেয়া হয়েছে, فَمَن تَوَلَّى بَعْدَ ذَلِكَ فَأُوْلَـئِكَ هُمُ الْفَاسِقُونَ সুতরাং যে কেউ এরপর ফিরে যাবে, তবে সেসব লোক ফাসিক্ব।  আর যে ব্যক্তি ঐ স্বীকৃতি প্রত্যাখ্যান করবে সে ফাসিক্বে (পাপাচারীতে) পরিণত হয়ে যাবে। আল্লাহর এই আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা, যা মহান রবের পক্ষ হতে গৃহীত হয়েছে যে, নিষ্পাপ ফেরেশতাগণের ব্যাপারে আল্লাহ বলছেন,
وَمَن يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَهٌ مِّن دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ.
Ñতাদের মধ্যে কেউ বলে, আমি (আল্লাহ) ব্যতীত উপাস্য, তবে আমি তাকে জাহান্নামের শাস্তি দেব। আমি এভাবেই যালিমদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি।
তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি বলবে, আল্লাহর সমকক্ষ মা’বুদ আছে, তাকে জাহান্নামের শাস্তি দেওয়া হবে। আমি এমনভাবেই শাস্তি প্রদান করব। এখানে অপরাধীদের যেনো ইঙ্গিত করেছেন, যেভাবে আমাদের ঈমানের প্রথম অংশ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (لا اله الا الله)’র বিষয় রয়েছে, একইভাবে দ্বিতীয়াংশে ‘মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ’ (محمد الرسول الله) রয়েছে। এটাকে পূর্ণতা দেওয়া হয়েছে যে, আমি সমগ্র জগতের রব, নৈকট্যধন্য ফেরেশতাকুলও আমার ইবাদত থেকে শির ফেরাতে পারে না। আর আমার মাহবুব হলেন, সমগ্র জগতের রাসূল এবং অনুকরণীয় যে, নবী-রাসূলগণও তাঁর সেবার গণ্ডিতে প্রবিষ্ট হয়েছেন। (আল্লাহর জন্যই সমস্ত প্রশংসা, নবী পাকের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ।) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)’র সুউচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনায় উপরোক্ত দলীল থাকা সত্ত্বেও অন্য প্রমাণের কি প্রয়োজন?
মোদ্দাকথা, আ‘লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি) তাফসীর শাস্ত্রে পূর্ণ দক্ষতা রাখেন এবং তাফসীর শাস্ত্রের যাবতীয় নীতিমালা ও পদ্ধতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাফসীর শাস্ত্রের আলোকে কোরআনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, যথাযথ মর্মার্থ নিরূপণ, মুসলিম উম্মাহর ঈমান-আক্বিদা সংরক্ষণ এবং কোরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যা ও বিকৃতকারীদের স্বরূপ উম্মোচনে তিনি অনন্য অবদান রাখেন। অনেকে তাফসীর শাস্ত্রে ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি)’র অবদান ও ভূমিকা মানতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে থাকে। ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি)’র ব্যাপারে তাদের এ ধারণা নিছক অজ্ঞতা ও বিদ্বেষ প্রসূত। ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি)’র রচনাবলী সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে এ জাতীয় অবান্তর মন্তব্য করার মূল কারণ। তাফসীর শাস্ত্রে ইমাম আহমদ রেযা (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি)’র জ্ঞান গভীরতা ও পরিধি কতো বিস্তৃত তা তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী মনযোগ সহকারে অধ্যায়ন করলেই অনুমেয় হবে।
লেখক: সুপার, জামেয়া রজভীয়া সুন্নিয়া মাদরাসা, বন্দর, চট্টগ্রাম।