ইসলামী ঐতিহ্য : আয়া সোপিয়া

0

ইসলামী ঐতিহ্য : আয়া সোপিয়া-
ডক্টর সাইয়েদ আব্দুল্লাহ্ আল্-মা‘রূফ >
আয়া সোপিয়া। বহুকাল পর যেন ইসলামের সোনালী অতীতের এক সুরভিত সমীরণ বুক ছুঁয়ে গেল। হতাশার বহু দৃশ্যের পর যেন আশার এক স্বর্ণালী ঝলক ভাস্বর হয়ে উঠলো। দৃপ্ত পদভারে এগিয়ে যাচ্ছেন বীর তায়েপ এরদোগান। এখনই বাতাসে ভেসে উঠবে সেই আজানের দীপ্ত ধ্বনি। আয়াসোপিয়ার শত বছরের অস্ফূট কান্না থেমে যাবে। বসফরাস প্রণালী, তাঁর ফেনায়িত তরঙ্গ, জাহাজের নাবিক, ইউরোপ-এশিয়ার মিলন-মোহনায় ঘরবাড়ির বাসিন্দারা আবার শুনবে সেই হারিয়ে যাওয়া আযান আয়া সোপিয়ার মিনারে।
আযান শুরু হয়নি এখনও। মহান আল্লাহর নাম ও তাঁর হাবিবের ওপর সালাত-সালাম দিয়ে শুরু হলো প্রাণ ফিরে পাওয়া মসজিদের মর্মস্পর্শী ধ্বনি, প্রতিধ্বনি। আল্লাহু আকবর। আস্সালাতু আস্সলামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ! যেন মসজিদের মুয়াজ্জিন আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় পয়গম্বরের প্রতি হৃদয় উজাড় করা বন্দেগী ও ভালবাসা জ্ঞাপন করছে। আমি নয়া যামানার নতুন মুয়াজ্জিন। কিন্তু সেই শব্দমালা আমার কন্ঠে, যা একদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তুলে দিয়েছিলেন বেলালে হাবশীর বাজখাঁই কন্ঠে। যে কণ্ঠ থেকে এই শব্দমালা উচ্চারিত হয়েছে পবিত্র কা‘বার ছাদ থেকে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে কেবলা করে। যে শব্দমালা ছড়িয়ে পড়তো নিঃশব্দ ঘুমের পাড়ায় ফজরের দাওয়াত দিতে, মসজিদে নববীর মিনারায়। যে শব্দমালা উচ্চারণ করেছিলেন মুহাম্মদ আল ফাতেহ ১৪৫৩ সালে। কন্সটান্টিনোপাল বিজয়ের চূড়ান্ত অভিযানের সময় দেখা দিয়েছিলেন মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। বলেছিলেন- হে সেনাপতি! তোমার হাতেই বিজয় হবে এবার।
নবীর শানে তাই বারবার দরূদ পড়ে তবে তো মুয়াজ্জিন উচ্চারণ করলো আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার… আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ… ইল্লাল্লাহ॥ ‘আল্লাহুম্মা রাব্বা হাযিহিদ্ দায়াউত্ তা-ম্মাহ… ওয়ারযুকনা শাফা‘আতাহু… ॥
বিশ্বের কোটি কোটি উম্মতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম টেলিভিশনের পর্দায় প্রতিক্ষণ, প্রতি মিনিটের ঘটমান অবস্থা দেখছিলেন। চোখকে বিশ্বাস করা যায়! বিশ্বের ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অগণিত দর্শক এই দৃশ্য দেখছিলেন।
আয়া সোপিয়া ১৫০ ফুট মাথা তুলে আছে। মনে হয় তার গম্বুজ আকাশ ছুঁয়েছে। কী সুন্দর স্থাপত্য কৌশল! চারটি মিনার এর সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। হ্যাঁ, আয়া সোপিয়া আজ তোমার ফ্লোরে রাজা-প্রজা একই কাতারে দাঁড়িয়ে। আজ যারা এই জামাতে যোগ দিল, মনে হয় তারা যেন কনস্টান্টিনোপোল জয় করে এসে এখন আল্লাহকে শোকরিয়া জ্ঞাপন করছে। জগত দেখুক, রাতের পর দিন আসে। “মোস্তফা কামাল পাশা। তুনে নিকম্মা কাম কিয়া ভাই। এরদোগান! তুনে কামাল কিয়া ভাই। তোমনে শামাল দিয়া, বহাল কিয়া ভাই। দুনিয়াতে এখন তোমার মেছাল নেহি ভাই। মুসলিম জাহানের সালাম তু নে ভাই।” আমাদের কাজী নজরুল যখন “তুনে কামাল কিয়া” লিখেছিলেন তখনও এটি মসজিদ ছিল। ৫০০ বছরের পুরোনো মসজিদকে জাদুঘর বানালে কবি কাজী নজরুল কখনও “কামাল কিয়া” বলতেন না। তাই এর ইতিহাস একটু তুলে ধরা দরকার।
বাইজাইন্টাইন আমলের এক অত্যাশ্চর্য স্থাপত্যকর্ম ছিল এই হাজিয়া সোপিয়া ঐধমরধ ঝড়ঢ়যরধ খ্রিস্টান ব্যাসিলিকা*। এ ছিল প্রায় ১৫০০ বছর পূর্বে। হাজিয়া অর্থ-পবিত্র, সোপিয়া অর্থ-জ্ঞান। “পবিত্র জ্ঞানের চার্চ” প্রথমে কাঠের ছাদ দিয়ে নির্মিত হয় ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে। দু’ দুবার আগুনে পুড়ে গেলে অবশেষে স¤্রাট জাস্টিনিয়ান ৫৩২ সালে এটি নির্মাণের আদেশ দেন এবং বিখ্যাত স্থপতি ইসিডোরোস এবং অ্যান্থিমিয়োস এটি শেষ করেন ৫৩৭ সালে। তারা এমনভাবে এটি তৈরি করেন যে একক গম্বুজের বিস্তৃতের দিক থেকে এত বড় ক্যাথেড্রাল বিশ্বে আর কোথাও ছিলনা। এর ভেতর আলোয় খেলা আধ্যাত্মিক জ্যোতি ও এর বিশালতার সামনে বান্দা নিজেকে ছোট ভাবার অনুভূতি এনে দেয়। গম্বুজটি ১৫০ ফুট উঁচুতে। সোনালী রঙের গম্বুজ থেকে ৪০টি রিব শেষ হয়েছে চল্লিশটি খিলানযুক্ত জানালাতে গিয়ে। ভেতরে রয়েছে চোখ ধাঁধানো সব ঝাড়বাতি। কিছুক্ষণের জন্য প্রার্থনাকারী হারিয়ে যায় এক বিস্ময়কর জগতে। ১৪৫৩ সালে এটি মসজিদে রূপান্তরের সময় মিনার সহ আরও কিছু পবিত্র ভাবমর্যাদা ব্যঞ্জক অনুষঙ্গ যোগ হয় এতে।
৯০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটা ছিল বাইজেন্টাইন সা¤্রাজ্যের সিগনেচার স্থাপত্য। এখানেই বাইজেন্টাইন নতুন স¤্রাটগণ মুকুট পরতেন, শপথ নিতেন।
৬ এপ্রিল থেকে ২৯ মে ১৪৫৩ সাল, ৫৩ দিনের অবরোধ ও যুদ্ধের পর কনস্টান্টিনোপাল জয় করেন সুলতান দ্বিতীয় মুহাম্মদ মুহাম্মদ আল ফাতেহ (বিজয়ী মুহাম্মদ)। বাইজেন্টাইন স¤্রাটদের রাজধানী ছিল এটি।
ইল্মুল গায়ব মারফত মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে জানিয়েছিলেন যে, ‘কুস্তুনতুনিয়া’ মুসলিমগণ জয় করবেই। সৌভাগ্যবান সে সেনাপতি! সৌভাগ্যবান সেই সৈনিকগণ! মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যৎবাণী বাস্তবায়িত হয়েছিল এই দিন।
যখন রাজধানী দখল করল, তখন এর সবকিছুই তো বিজয়ীদের দখলে আসে। তারপরও সুলতান ওই আয়া সোপিয়া কিনে নেন এর যাজক থেকে। যার সূত্র ধরেই সম্প্রতি তুর্কি জাস্টিস এটি পুনরায় মসজিদ হিসেবে খুলে দেবার রায় দেন। বার বছর দখলে থাকলে ১৯২১ সালের বৃটিশ আইনে জমির মালিক হয়ে যায়। সেখানে ৫০০ বছর মসজিদ থাকা ওই স্থাপনাটি মুসলিম দেশে কিভাবে জাদুঘর হয় এবং সেখানে খ্রিস্টান ও মুসলিম বিশ্বাসের প্রতীক যুগপৎভাবে দেয়ালে থাকে?।
ওই স্থাপত্য নিদর্শন দেখার জন্য প্রতিবছর তিন মিলিয়নেরও বেশি দর্শনার্থী তুরস্কে আসেন। যদি বিশ্বখ্যাত স্থপতি সিনান বুø-মসজিদ ও ইস্তাম্বুলের অভিনব ও নয়নাভিরাম মসজিদগুলো নির্মাণ না করতেন তাহলে হয়তো স্থাপত্য-বিদ্যায় মুসলিম শ্রেষ্ঠত্ব এত উজ্জ্বল হতো না। তবে এক্ষেত্রে উত্তর আমেরিকার উচ্চতম ভবন, একসময়ের পৃথিবীর উচ্চতম ভবন চিয়ার্স টাওয়ারের স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বাংলাদেশের এফ আর খান কিন্তু কম নয়। ইনিই জেদ্দা বিমান বন্দরেরও স্থপতি যা হজের সময় পৃথিবীর ব্যস্ততম (এমনকি হিথ্রো বিমানবন্দর থেকেও) বৃহৎ বিমান বন্দর। টুইন টাওয়ার ও বুরজ আল্-শেখ এর কথা না-ই বললাম।
কিন্তু আয়া সুপিয়া মসজিদটি জাদুঘর হয়ে থাকবে এবং ইউরোপিয়ান অর্ধনগ্ন নারীরা জুতা পায়ে এই জাদুঘরে পায়চারী করবে এটা কি মেনে নেওয়া যায়? ১ম মহাযুদ্ধের পর ১৯৩৫ সালে এটিকে জাদুঘর করা হলো, তো এর ৫০০ বছর আগে থেকে যে কত কোটি মুসলিম এখানে কপাল ঠেকিয়ে আল্লাহকে সিজদা দিয়েছে, কত লক্ষ বার এই মিনারগুলো থেকে আযানের ধ্বনি দিগন্ত কাঁপিয়েছে এবং ইসলামী ঐতিহ্যের ধারক হয়ে এই ইসলামী জমিনে মাথা উঁচু করে ছিল। সেই ভূখণ্ডে, সেই মুসলিম শাসক ও মুসলিম জনসাধারণ আছে, কিন্তু সেই ইসলামী চেতনা পাথর চাপা ছিল। এরদোগান বিচারিক আদালতে লড়ে যখনই সুযোগ পেলেন অবিলম্বে তিনি তা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিলেন। ফরাসীরা নাখোশ হয়ে ফ্রান্সে অবস্থিত ১২টি তুর্কি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছিল। বাপের ব্যাটা এরদোগান তখন তুরস্কে অবস্থিত ফরাসী প্রায় ৯০টি স্কুল ও কেন্দ্র বন্ধ করে দিলেন। এবার তো ফরাসী প্রেসিডেন্ট ক্ষমা চেয়ে ওই ১২টি স্কুল খুলে দিলেন। ঠেলার নাম বাবাজি। মুসলিম হো তো এয়সা।
ইসলামের শান্তির বাণী পৌঁছাতে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করতে হয়েছে। তারপর ত্রিত্ববাদের স্থলে তাওহীদের চর্চা হয়েছে। ওই স্থাপনাতে ৫০০ বছর ধরে এক আল্লাহ্্র সকাশে সিজদাহ অবনত হয়েছে মুসলিমগণ। সেই মসজিদের বেহুরমতি ৮৬ বছর ধরে দেখে বেদনাহত হয়েছিল বান্দাহদের হৃদয়। হতাশার অন্ধকার যেন জমাট বেঁধে ছিল এখানে। জীবন পণ জেহাদের মাধ্যমে তুর্কিস্তান মুসলমানদের অধিকারে আসে। মহান সেই মসজিদটি এতকাল পর আবার সিজদাহ্ গাহ্ হয়েছে, এটা সাম্প্রতিক বিশ্বে এক আশা জাগানিয়া ঘটনা।
সুলতান মুহাম্মদ আল্-ফাতেহ (১৪৩২-১৪৮১) ৫১ বছর বেঁচে ছিলেন। এর ভেতর ২৮ বছরের শাসনে দুটি সা¤্রাজ্যকে পদানত করেন, ১৪টি রাষ্ট্র এবং ২০০ নগর-মহানগর দখল করেন। বেলগ্রেড ব্যতিত সমগ্র বলকান অঞ্চল তার দখলে আসে।
দানুব নদী থেকে কাইযেল এরমাক বা লোহিত নদী পর্যন্ত তার রাজ্য বিস্তৃত ছিল। কিন্তু এতসবের পরও তাকে ফাতেহ (বিজয়ী) উপাধী দেওয়া হয়েছিল ফাত্হে ইস্তাম্বুলের জন্য। কারণ তিনিই শেষ পর্যন্ত মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যৎবাণী বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সে অনেক ঘটনা। তবে এইটুকু বলে নেই- এই সেই আয়াসোপিয়া যেখানে বসে ১২ ডিসেম্বর ১৪৫২ খ্রিঃ ২১ যুল-কা‘দাহ ৮৫৬ হিঃ) তারিখে বাইজেন্টাইন প্রধানমন্ত্রী নোতারাস সিদ্ধান্ত নেন: “বাইজেন্টাইন ভূমিতে ল্যাটিন হ্যাট দেখার চেয়ে উসমানী পাগড়ি দেখা শ্রেয় মনে করি।” এ কথাটি বলেছিলেন ঠিক ওই সময় যখন মুহাম্মদ আল্-ফাতেহ এশিয়া অংশে তার উদ্ভাবিত কামান দাগিয়ে এর কার্যকারিতা দেখে খুশি হন। বাইজেন্টাইন অর্থডক্স বা সনাতনী খৃস্টানীরা ইউরোপের কাছে সাহায্য চাইলে তারা শর্ত দিয়েছিল যে- আগে ক্যাথোলিক হয়ে আস, তারপর দেখব। আর অর্থডক্স মানেই তো গোঁড়া। তাই জবাবে ও কথা বলেছিলেন।
এ সময় ৫৩ দিনের মাথায় বিজয় এসেছিল। তবে এমনি এমনি আসেনি। বাইজেন্টাইনরা গাল্তা থেকে বোরনো পর্যন্ত জলপথগুলো লোহার শিকল বা বেড়িদিয়ে বন্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু বীর মুসলিম সেনারা পাহাড়ের উপর দিয়ে তাদের যুদ্ধ জাহাজগুলো টেনে নিয়ে উপসাগরের পানিতে নামায় এবং ওইসব লোহার চেইন ভেঙে ফেলে। তোপকাপি ও আগরিকাপি দিয়ে আকাশ বাতাস কাপানো তাকবীর ধ্বনি দিয়ে মুসলিম বাহিনী ইস্তাম্বুলে ঢুকে তারা। তবে এই আয়াসোপিয়ায় আশ্রয় নেওয়া হাজার হাজার ইস্তাম্বুলবাসীকে কোন আঘাত করেনি। ইসলামী জেহাদের এটাই সৌন্দর্য। বরং তাদেরকে তাদের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছিল।
যাহোক, এই সেই মুহাম্মদ আল্-ফাতেহ, যার রাজ্যের আয়তন ছিল ২,২১,৪০০০ কিলোমিটার আজকের তুরস্কেরও তিনগুণ বড়।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ইহুদী ওয়াইজমেন বৃটেনকে এসিটোন দিয়ে সাহায্য করেছিল বলেই উইন্সটন চার্চিল বেলফোর অঙ্গীকার করেছিল- যার মাধ্যমে ইসরাইল পেল ইয়াহুদীরা।
দেখুন, মুহাম্মদ আল্-ফাতেহ, তিনিও নতুন ক্ষেপণাস্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন, তার অসাধারণ মেধা দিয়ে। তিনি ছিলেন অঙ্কশাস্ত্রে গভীর জ্ঞানী, দূরদর্শী সমর কৌশলী । তবে সবার চেয়ে বড় কথা, তিনি ছিলেন একজন ধর্মতাত্ত্বিক আলেম। আরবী, পার্সী, গ্রিক, সার্বিয়ান, ইতালিয়ান, ইত্যাদি প্রায় ৯টি ভাষা জানতেন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, মহান আল্লাহ প্রদত্ত ইলম গায়ব মহানবী জানতেন এবং তাঁর ভবিষ্যৎ বাণী ফলবেই ফলবে। এ বিশ্বাস না থাকলে ইস্তাম্বুল জয় করতে পারতেন না। ইস্তাম্বুলের মাটিতে পা রাখতেই মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। এটি তাঁর মুখেই শোনা, যা ইতিহাসে লেখা আছে। আমি ফাত্হুল্লাহ্ গুলান এর কিতাবে পড়েছি। গ্রন্থটি আমার কাছে আছে।
ইস্তাম্বুল বিজয়ের পর তিনি এই আয়া সোপিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করেন। কেবলা ঠিক করে মেহরাব স্থাপন করেন এবং চারটি মিনার দিয়ে ইসলামী ঐতিহ্যগত মসজিদে রূপ দেন। শিরক এর স্থানে তাওহীদ গালেব হলো। আয়া সোপিয়া তাই কেবল ইট-সুরকির একটি ইমারত নয়। এটি মহান বিজয়ের এক ল্যান্ডমার্ক। তবে ইস্তাম্বুলের ল্যান্ডমার্ক হচ্ছে মসজিদে মুহাম্মদ আল্-ফাতেহ। এটি স্থপতি সিনান নির্মাণ করেছিলেন।
আমি আল্লামা সিনানের মাযার যেয়ারত করেছি। হুররম সুলতানের মাযার, সুলতান সোলেমান এর মাযার যেয়ারত করেছি। অবশ্যই মুহাম্মদ আল্-ফাতেহ্ রহমাতুল্লাহি আলায়হির মাযারও যেয়ারত করেছিলাম।
তবে সেই মাযারটি আমি প্রতিবারই যিয়ারত করেছি যার নামে ইস্তাম্বুল চলে সাইয়েদুনা আবু আইয়্যুব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। এই তুরস্কে চারবার সফর করার সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রথমবার সফরের পর ভ্রমণ কাহিনী লিখেছিলাম: “আধ্যাত্মিক নগরী ইস্তাম্বুল ও ভ্যাটিকান সিটি”। এতে ৪০টি ছবিও আছে। অনেক কিছুর সাথে নবী ইউশা বিন-নূন আলায়হিস্ সালাম-এর মাযার, তোপাকাপি মিউজিয়ামে আমাদের প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও অন্যান্য বহু নবী আলায়হিস্ সালাম-এর স্মৃতিচিহ্ন আছে। যেমন মূসা আলায়হিস্ সালাম-এর সেই সাপ হয়ে যাওয়া লাঠিখনি, মহানবী সাইয়েদুনা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শহীদ হয়ে যাওয়া দান্দান, হাতের তরবারি আরও কতকি।
কিন্তু আয়া সোপিয়ার বর্ণনা সেখানে নেই। কারণ ওই মিউজিয়ামে না গিয়ে আমরা তোপাকাপি মিউজিয়ামে গিয়েছিলাম। তোপকাপি না দেখা তো কুচ নেহী দেখা। অবশ্য আয়াসোপিয়াতে পরে গিয়েছিলাম।
ফিরে আসি আয়াসোফিয়ার পুনরায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে, যা হয়ে গিয়েছিল এ বছরেরই গেল ২৪ জুলাই, শুক্রবার- সুদীর্ঘ ৮৬ বছর পর। সবাই অপেক্ষামান কখন তায়েপ এরদোগান মাইক হাতে দাঁড়িয়ে সেই প্রত্যাশিত ঘোষণাটি দেবেন। হ্যাঁ, তিনি টুপি মাথায় দিয়ে মেহরাবের সামনে এসে দৃঢ়চেতাভাবে ঘোষণাটি দিলেন-তবে উদ্ধত অহংকারী ভঙ্গিতে নয়। সাবাশ এরদোয়ান! সাবাশ!
টেলিভিশনের পর্দায় যখন ভেসে উঠল সেই লালচে গোলাপী হাজিয়া সোপিয়া, উপসাগরের নিটল নীল পানি এবং পাহাড়ের ঢালুতে লাল ইটের ঘরবাড়ি তখন উদ্বেল-উৎসুক চোখে সবাই এই দৃশ্য উপভোগ করল। যখন আযান শুরু হলো, তখন মনে জাগলো মহাকবি কায়কোবাদের সেই অমর কবিতাটি:
কে ওই শোনালো মোরে আজানের ধ্বনি,
মর্মে মর্মে সেই সূর, বাজিল কী সুমধুর!
আকূল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী
এরদোয়ানের মত সাহসী নেতা পেলে বিশ্বের বহু মসজিদ ও মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন ফিরে পাওয়া যাবে।
ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ
লড়ে যায় বীর”।
বায়তুল মুাকাদ্দাস, বাবরী মসজিদ, আল-হামরা প্রাসাদ আরও কত কি আমাদের অপেক্ষায় করুণ ক্রন্দনে দিনরাত পার করছে।
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান
হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
লেখক: অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
ওআইসি ফিকহ একাডেমি বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি।