শানে রিসালত

0

শানে রিসালত- মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান >
হাদীস-ই সালাস: তিনটি পছন্দনীয় কাজ
একটি দীর্ঘ হাদীস শরীফ, যাকে সাধারণত লোকেরা ‘হাদীসে সালাস’ (তিন তিনটি পছন্দনীয় কাজের বর্ণনা বিশিষ্ট হাদীস বলা হয়। ‘পছন্দনীয়’ও কার নিকট? স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট, আল্লাহ্ তা‘আলার রসূল ও হাবীবের নিকট, হযরত জিব্রাঈলের নিকট, খোলাফা-ই রাশেদীনের নিকট, অর্থাৎ আল্লাহ্ ও তাঁর হাবীবের প্রিয় বান্দাদের নিকট। সুতরাং এ কাজগুলো যেই সৌভাগ্যবান বান্দা করতে পারবেন, তিনিও এক পছন্দনীয় বান্দা হয়ে যাবেন তাতে সন্দেহ কিসের? হাদীস শরীফখানা আল্লামা ইবনে হাজার রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁর কিতাব ‘মুনব্বিহাত’-এ উদ্ধৃত করেছেন। হাদীস শরীফটি’র সরল অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, তারপর হাদীস শরীফটি থেকে প্রতিভাত বিধানাবলী ও মাসাইল নি¤œরূপঃ
একদিন শাহানশাহে রিসালত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর নবূয়ত প্রদীপের উপর প্রাণোৎসর্গকারী পতঙ্গরূপ সাহাবা-ই কেরামের মজলিসে তাশরীফ রাখলেন। সাহাবা-ই কেরাম কায়মনোবাক্যে একাগ্রচিত্তে পিনপতন নিরবতাসহকারে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মুক্তাবর্ষী মুখ মুবারকের দিকে উদগ্রীব হয়ে হিদায়তের বাণী শ্রবণ করার জন্য অপেক্ষমান হয়ে আছেন। এমতাবস্থায় হাদী-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
حُبِّبَ اِلَىَّ مِنْ دُنْيَاكُمْ ثَلثٌ : اَلطِّيْبُ
وَالنِّسَآءُ وَجُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِىْ فِى الصَّلوةِ
অর্থ: আমার নিকট তোমাদের এ দুনিয়া থেকে তিনটি জিনিষ পছন্দনীয়। ১. খুশবু, ২. (আমার) স্ত্রীগণ এবং ৩. নামাযের মধ্যে আমার চোখের শান্তি রাখা হয়েছে।
فَقَالَ اَبُوْ بَكْرِنِ الصِّدِّيْقُ رَضِىَ اللهُ تَعَالَى عَنْهُ صَدَقْتَ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَحُبِّبَ اِلَىَّ مِنَ الدُّنْيَا ثَلثٌ : اَلنَّظْرُ اِلى وَجْهِ رَسُوْلِ اللهِ وَاِنْفَاقُ مَالِىْ عَلَى رَسُوْلِ اللهِ وَ اَنْ يَكُوْنَ اِبْنَتِىْ تَحْتَ رَسُوْلِ اللهِ ـ
অর্থ: (রহমতে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এরশাদ মুবারক শুনে) হযরত আবূ বকর সিদ্দীক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরয করলেন, ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আপনি যা কিছু বলেছেন, এ একেবারে সত্য। আমার নিকটও দুনিয়ার তিনটি জিনিস পছন্দনীয়ঃ ১. রসূলুল্লাহর চেহারা মুবারকের দিদার (দর্শন), ২. রসূলুল্লাহর জন্য নিজের সম্পদ ব্যয় করা এবং ৩. আমার কন্যা আয়েশার হুযূরের বিবাহাধীন থাকা।’’
فَقَالَ عُمَرُ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ صَدَقْتَ يَا اَبَابَكْرٍ وَحُبِّبَ اِلَىَّ مِنَ الدُّنْيَا ثَلثٌ : اَلْاَمْرُ بِالْمَعْرُوْفِ وَالنَّهِىُ عَنِ الْمُنْكَرِ وَالثَّوْبُ الْخُلِقُ ـ
অর্থ:(হযরত আবূ বকরের কথা শুনে) হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আরয করলেন, ‘‘হে আবূ বকর! আপনি সত্য বলেছেন, আমার নিকটও দুনিয়ার তিন জিনিসের প্রতি ভালবাসা রয়েছে: ১. সৎ কর্মের নির্দেশ দেওয়া, ২. মন্দ কথা বলতে ও মন্দ কাজ করতে নিষেধ করা এবং ৩. ছেঁড়া-পুরানা কাপড় পরিধান করা।’’
فَقَالَ عُثْمَانُ رَضِىَ اللهُ عَنْه صَدَقْتَ يَا عُمَرُ وَحُبِّبَ اِلَىَّ مِنَ الدُّنْيَا ثَلثٌ : اِشْبَاعُ الْجِيْعَانِ وَكِسْوَةُ الْعُرْيَانِ وَتِلاَوَةُ الْقُرْانِ
অর্থ: হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বক্তব্য শুনে হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, ‘‘হে ওমর! আপনি যা বলেছেন, তা সত্য। আমার নিকটও দুনিয়ার তিনটি জিনিস পছন্দনীয়: ক্ষুধার্তদেরকে আহার করানো, ২. উলঙ্গ তথা অপ্রতুল কাপড় পরিধাণকারীদেরকে কাপড় পরানো এবং ৩. ক্বোরআন মজীদ তিলাওয়াত করা।’’
فَقَالَ عَلِىٌّ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ صَدَقْتَ يَا عُثْمَانُ وَحُبِّبَ اِلَىَّ مِنَ الدُّنْيَا ثَلثٌ : اَلْخِدْمَةُ لِلضَّيْفِ وَالصَّوْمُ فِى الصَّيْفِ وَالضَّرْبُ بِالسَّيْفِ
অর্থ: (হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বর্ণনা শুনে) হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘হে ওসমান! আপনার কথা সত্য। আমার নিকটও দুনিয়ার তিনটি জিনিষ পছন্দনীয়: ১. অতিথির সেবা করা, ২. গ্রীষ্মকালে রোযা রাখা এবং ৩. জিহাদের ময়দানে তরবারি চালানো।’’
فَبَيْنَاهُمْ كَذلِكَ اِذْجَآءَ جِبْرَئِيْلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ وَقَالَ اَرْسَلَنِىَ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالى لَمَّا سَمِعَ مَقَالَتَكُمْ وَاَمَرَ اَنْ تُسْئَلَنِىْ عَمَّا اُحِبُّ اِنْ كُنْتُ مِنْ اَهْلِ الدُّنْيَا ـ
অর্থঃ অতঃপর, ইত্যবসরে তাঁরা এসব অবস্থায় ছিলেন, হঠাৎ হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম এসে গেলেন। আর বলতে লাগলেন, ‘‘হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তা‘আলা আপনাদের কথোপকথন শুনে আমাকে পাঠিয়েছেন। আর আপনাকে হুকুম দিয়েছেন যেন আপনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি যদি দুনিয়ায় বসবাসকারী হতাম, তবে আমি এ দুনিয়ার কোন কোন জিনিষ পছন্দ করতাম।
فَقَالَ مَا تُحِبُّ اِنْ كُنْتَ مِنْ اَهْلِ الدُّنْيَا
অর্থ: রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে জিব্রাঈল! তুমি বলো, যদি তুমি দুনিয়ার বাসিন্দা হতে, তবে দুনিয়ার কোন কোন জিনিষকে পছন্দ করতে?
فَقَالَ اِرْشَادُ الضَّالِّيْنَ وَمَوَانَسَةُ الْغُرَبَآءِ الْقَانِتِيْنَ وَمُعَاوَنَةُ اَهْلِ الْعَيَالِ الْمُعْسِرِيْنَ
অর্থ:অতঃপর হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম আরয করলেন, ‘‘(আমিও তিনটি জিনিষকে পছন্দ করতাম:)১. পথভ্রষ্টদের সরল পথ দেখানো, ২. ওইসব মুসাফিরের মনোরঞ্জন করা ও তাদের দু:খ-বেদনা দূর করা, যারা আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগত এবং ৩. পরিবার-পরিজন ও সন্তান-সন্তুতি বিশিষ্ট গরীব লোকদের সাহায্য করা।’’
وَقَالَ جِبْرَئِيْلُ يُحِبُّ رَبُّ الْعِزَّةِ جَلَّ جَلاَلَه مِنْ عِبَادِه ثَلثَ خِصَالٍ : بَذْلُ الْاِسْتِطَاعَةِ وَالْبُكَاءُ عِنْدَ النَّدَامَةِ وَالصَّبْرُ عِنْدَ الْفَاقَةِ ـ
অর্থ: হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম এটাও বলেছেন, মহামহিম রাব্বুল ইযাযাত তাঁর বান্দাদের তিন স্বভাব পছন্দ করেন-১. নিজের পূর্ণ সার্মথ্য আল্লাহর রাহে ব্যয় করা, ২. গুনাহর জন্য লজ্জিত হয়ে কান্না করা এবং ৩. অনাহারের সময় ধৈর্য ধারণ করা।
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! আপনারা হাদীস শরীফটির মতন (বচনগুলো) ও সেটার অনুবাদ পড়ে খুব ভালভাবে জেনেছেন যে, রসূলে আকরাম, সিদ্দীক্বে আকবার, ফারূক্বে আ’যম, ওসমান গণী, হায়দার-ই কাররার, জিব্রাঈল আমীন এবং রাব্বুল আলামীনের নিকট এ দুনিয়ার কোন কোন জিনিষ পছন্দনীয় জিনিস (কাজ) বিশেষভাবে পছন্দনীয়। সর্বমোট একুশটি বিষয় নিশ্চিত ও সন্দেহাতীতভাবে পছন্দনীয় ও প্রিয়। এ’তেও কোন সন্দেহ নেই যে, যে বা যারা মুমিন-মুসলমান হবে, তার বা তাদের নিকট আল্লাহ্, রসূল, সিদ্দীক্বে আকবার, ফারূকে আযম, ওসমান গণী, হযরত আলী ও হযরত জিব্রাঈল আমীনের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা থাকবে। আর যেহেতু মাহবূবের পছন্দনীয় জিনিষ ও নিজের নিকট পছন্দনীয় হয়, সেহেতু প্রত্যেক ওই ব্যক্তি যার মধ্যে ঈমানের অমূল্য সম্পদ রয়েছে, সে অবশ্যই এ একুশ জিনিষের প্রতিও ভালবাসা পোষণ করবে।
উল্লেখ্য, এ একুশ পছন্দনীয় কাজের প্রত্যেকটা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করাও দরকার। নি¤েœ এগুলো আলোচনা উপস্থাপন করা হলোঃ (চলবে)