প্রশ্নোত্তর : উত্তর দিচ্ছেন-অধ্যক্ষ মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান

0

প্রশ্নোত্তর: উত্তর দিচ্ছেন-অধ্যক্ষ মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান
মুহাম্মদ আবুল কালাম- উত্তর চরলক্ষ্যা, কর্ণফুলী, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: নিজের জীবদ্দশায় খতমে তাহলিল নিজে আদায় করার শরীয়তের হুকুম আছে কিনা জানালে উপকৃত হবে।
 উত্তর: কোন অসূবিধা নাই। বরং ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে উত্তম ও অনেক সওয়াব।
প্রশ্ন: একজন মুসলমান ব্যক্তি ব্যাংক, বীমা, এনজিও সংস্থা অর্থাৎ যেখানে সুদ জড়িত আছে অথবা সুদ গ্রহণ করে সে সব প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করা ইসলামী শরীয়তে বৈধ কিনা জানতে চাই।
 উত্তর: যে সব মুসলমান সামর্থবান এবং সুদবিহীন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করতে সক্ষম তাদের জন্য জেনে-শুনে সুদি কারবারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করা গুনাহ্। তবে একান্ত প্রয়োজনে নিরূপায় অবস্থায় অন্য ভাল সুযোগ না হওয়া পর্যন্ত সুদি কারবারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করতে বাধ্য হলেও যথাসময়ে সুদ গ্রহণ করা থেকে নিজকে মুক্ত রাখবে আর সম্মানজনক সুদমুক্ত চাকুরীর সুযোগ হলে কাল বিলম্ব না করে সুদী প্রতিষ্ঠান হতে পৃথক হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ তা‘আলার দরবারে খালিস নিয়তে তওবা করবে। উল্লেখ্য, হালাল ও পবিত্র রিযিক ইবাদত-বন্দেগী কবুল হওয়ার জন্য অন্যতম শর্ত।
প্রশ্ন: অনেকে বলে ব্যাংকে চাকরি করা হারাম। এটা কতটুকু সত্য।
 উত্তর: ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম সুদের অবকাশ থেকে মুক্ত নয়। বিধায় ব্যাংকের চাকুরি থেকে বেচে থাকাই নিরাপদ।
প্রশ্ন: ব্যাংকে টাকা জমা রাখলে ব্যাংক যদি নিজের ইচ্ছায় কিছু টাকা লাভ দেয়; এটা কি সুদ হবে? বা কোন মানুষকে কিছু টাকা ধার দিলে সে নিজের ইচ্ছায় কিছু টাকা লাভ দিলে তা সুদ বলে গণ্য হবে কিনা?
 উত্তর: বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং লেন-দেনে ব্যাংকে জমাকৃত টাকা বা আমানতের উপর ব্যাংক কতৃপক্ষ বা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট হারে শতকরা হিসেবে যে টাকা আমানতদানকারী/জমাদানকারীকে যে ইনট্রেস্ট বা অতিরিক্ত লভ্যাংশ প্রদান করা হয় তা গ্রাহকের দাবী ব্যতিত, তা যদিও বর্তমান যুগের কিছু কিছু মুফতি/ফকিহ্ সুদের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে মত ব্যক্ত করেছেন। তবে মুহাক্বিক্ব ফোকাহায়ে কেরামের মতে তা সুদের অবকাশ হতে মুক্ত নয় বিধায় ব্যাংকে জমা টাকার উপর শতকরা হারে যা অতিরিক্ত লভ্যাংশ দেয়া হয় তা গ্রাহক গ্রহণ করে গরীব-মিসকিন ও অসহায় ব্যক্তিকে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া দিয়ে দেবে। এটাই নিরাপদ ও সতর্কতা। ঋণ/ধারের টাকার সাথে স্ব-ইচ্ছায় লাভ হিসেবে কিছু দিলে সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে। কেননা হাদীসে পাকে রয়েছে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- যে ঋণ কোনো মুনাফা/লাভ নিয়ে আসে তাও রিবা/সূদের অন্তর্ভুক্ত। [সুনানে বায়হাক্বী,৫/৩৫০] সুতরাং কোন আত্মীয়-স্বজন বা কোন ঈমানদার নর-নারীকে কর্জদাতা কর্জ/ধার দেবে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কর্জ গ্রহিতাকে সহায়তা করার নিয়তে। সেখানে অন্য কোন দুনিয়াবী লাভ বা ফায়দা অর্জনের উদ্দেশ্যে থাকবে না।
[মিশকাত শরহে মিশকাত কৃত, হযরত মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী রহ. ও ফতোয়ায়ে রজভীয়া, কৃত. ইমাম আলা হযরত শাহ্ আহমদ রেযা খান রহ. ইত্যাদি]
মুহাম্মদ ইব্রাহীম
কর্ণফুলী থানা, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: ৭২ ফিরকা বাতেলের মধ্যে যারা জাহান্নামী, এরা কি চিরস্থায়ী জাহান্নামী? রসূল-ই করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ এদের নসীব হবে কিনা? শরীয়তের আলোকে জানতে আগ্রহী।
 উত্তর: ৭২টি বাতিল ফেরক্বা বা দল-উপদলের মধ্যে যাদের আক্বিদা-বিশ্বাস ও মতাদর্শ কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যেমন আল্লাহ-রসূলের ও নবীগণের শান-মানে বেয়াদবী ও কটুক্তি, যা কুফরী ও বেঈমানীর নামান্তর, তাদের ঠিকানা চিরস্থায়ী জাহান্নাম, তারা জাহান্নাম থেকে কখনো নাজাত পাবে না এবং হুযূরে আনোয়ার, রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার শাফায়াত/সুপারিশ তাদের নসিব হবে না। তবে যেসব সাধারণ সরলপ্রাণ মুসলমান ৭২টি জাহান্নামী দলের বাহ্যিক লেবাস, নামায-কালাম ও তাকওয়া, দাড়ি, জোব্বা ও কোরআন তেলাওয়াত দেখে তাদেরকে সমর্থন করেছে বা তাদের ধোঁকার শিকার হয়েছে কিন্তু কখনো তারা আল্লাহ্-রসূল, নবী-অলি- আবদালের শানে বেয়াদবী ও কটুক্তি করে নাই, তারা জাহান্নাম থেকে শাস্তি ভোগ করার পর মুক্তি পাওয়ার আশা করা যায়।
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল,
মধ্য হালিশহর, বন্দর, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: পবিত্র ক্বোরআন শরীফ স্পর্শ করে যদি শপথ করে তাহলে তা কি শপথ হবে? যদি শপথ হয় তার কাফ্ফারা কি হবে? জানালে ধন্য হবো।
 উত্তর: কোন মুসলিম নর-নারী পবিত্র কুরআন শরীফ স্পর্শ করে হলফ বা শপথ করে অথবা আল্লাহর নামে শপথ করে, তা শপথ/কসম হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে শপথ ভঙ্গ করলে কাফ্ফারা দেয়া ওয়াজিব। কাফ্ফারা হলো-একজন দাস-দাসী আযাদ করা যা বর্তমানে প্রচলন নাই অথবা দশজন মিসকিনকে এক জোড়া পোশাক দেয়া অথবা দশজন মিসকিনকে দুই বেলা খাওয়ানো। ইচ্ছা করলে সমপরিমাণ টাকা কাফফারা হিসেবে প্রদান করবে। তবে কেউ যদি অক্ষম হয় তিনদিন রোযা রাখবে কাফ্ফারার নিয়তে। (এটি হল অসহায় বা অভাবগ্রস্থ ব্যক্তির কাফফারা।
[ওমাদতুর রেয়ায়া, ফতহুল কাদীর, বাহারে শরীয়ত, ফতোয়ায়ে আলমগীরী ও যুগ জিজ্ঞাসা ইত্যাদি]
প্রশ্ন: ইসলামী শরীয়তের মধ্যে কি কি বাক্য দ্বারা শপথ করা জায়েয। আর কি কি বাক্য দ্বারা শপথ করা নাজায়েয জানালে ধন্য হবো।
 উত্তর: ইসলামী শরীয়তের দৃষ্টিতে মহান আল্লাহর নামে শপথ করা জায়েয। এমনিভাবে আল্লাহর পবিত্র জাতি ও সিফাতি নামসমূহ থেকে কোন এক নাম দ্বারা শপথ করাও জায়েয। যেমন-রহমান, রহীম ইত্যাদি। আর শপথের ক্ষেত্রে আল্লাহর সমস্ত নামই সমান, চাই এসব নামের সাথে কসম বা শপথ করার বিষয়টি মানুষের জানা/অবগতিতে থাকুক বা না থাকুক। আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলীসমূহ থেকে যেসব সিফাতের দ্বারা শপথ করার প্রচলন সমাজে প্রচলিত আছে তা দ্বারা শপথ করাও জায়েজ। যেমন- আল্লাহর ইজ্জতের শপথ, আল্লাহর বড়ত্বের শপথ বা আল্লাহর মহিমার শপথ ইত্যাদি। বিশুদ্ধমতে, আল্লাহর গুণাবলী উল্লেখ করে কসম করার ক্ষেত্রে ওরফ বা দেশের প্রথা ধর্তব্য হবে। [শরহুন নিকায়া: আল বুরজন্দী] তাছাড়া حروف القسم বা কসমের হরফসমূহ দ্বারা আল্লাহর নামযুক্ত করে শপথ করলে কসম বা শপথ সংঘটিত হয়ে যাবে। যেমন- تالله ـ بالله ـ والله (ওয়াল্লাহ্, বিল্লাহ, তাল্লাহ্) আমি এ কাজটি করব বা করব না, শপথ হয়ে যাবে। ভঙ্গ করলে কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে।
[শরহুল বেকায়া ও ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ইয়ামিন/শপথ অধ্যায় ইত্যাদি]
মুহাম্মদ ইব্রাহীম তাহেরী
ছাত্র-জামেয়া গাউসিয়া তৈয়্যবিয়া তাহেরিয়া মাদরাসা,
বন্দর, নারায়ণগঞ্জ।
প্রশ্ন: হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পায়ে তীরের আঘাতপ্রাপ্ত হলে নামাযের অবস্থায় তাঁর পা থেকে তীর বের করা হয়। কেউ কেউ উক্ত ঘটনাকে বানোয়াট বলতে চায়, কিতাবের রেফারেন্স, পৃষ্ঠা নম্বরসহ প্রমাণ ও দলীল দিতে হুযুরের নিকট আবেদন করছি।
 উত্তর: একদা হযরত মওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর পায়ের গোড়ালিতে তীরবিদ্ধ হয়েছিল। লোকেরা অনেক চেষ্টা করেও সেটি বের করে আনতে পারেনি। কিন্তু যখন নামাযে দাঁড়ালেন তখন সেই তীর লোকেরা বের করে আনেন; কিন্তু তিনি নামাযে এতই ধ্যানমগ্ন ছিলেন তার মোটেই খবর ছিলনা। উল্লেখ্য যে, উক্ত ঘটনা সত্য, জাল বা বানোয়াট নয়। প্রখ্যাত মুফাসসিরে ক্বোরআন মুফতি আহমদ ইয়ার খাঁন নঈমী (রহ.)সহ অনেকেই উক্ত ঘটনা নেহায়ত গুরুত্ব সহকারে বর্ণনা করেছেন।[আনীসুল ওয়ায়েযীন, পৃ. ৩৩, مواعظ نعيميه حصه اول ৬৯ পৃষ্ঠা,  কৃত. হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (রহ.) ইত্যাদি]
 তাসলিমা আকতার
লালিয়ারহাট, ফতেয়াবাদ, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: কারো হাত হতে যদি কুরআন শরীফ পড়ে যায় তার করণীয় কি? এ ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম কি জানালে উপকৃত হব।
 উত্তর: অনিচ্ছাকৃত কারো হাত থেকে কোরআন শরীফ পড়ে গেলে ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিকোণে এটাকে গুনাহ্ বলা যাবে না। অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি ক্ষমাযোগ্য। হাদিস শরীফে রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-رفع عن امتى الخطاء والنسيان الحديث অর্থাৎ আমার উম্মত হতে অনিচ্ছাকৃত ভুল-ত্রুটি এবং কোন কিছু ভুলে যাওয়া মাফ করা হয়েছে। তারপরেও যদি কেউ অনিচ্ছাকৃত এ ধরনের ভুলের জন্য গরীব-দুঃখির প্রতি কিছু সাদকা/দান-দক্ষিণা করতে চায়, তা ভাল ও উত্তম। যেহেতু সাদকা ও দান-দক্ষিণার মাধ্যমে বালা-মুসিবত দুরীভুত হয়। আর ইচ্ছাকৃত এ ধরনের অপরাধ কেউ করলে মারাত্মক গুনাহ্গার ও অপরাধী হিসেবে স্বাব্যস্থ হবে। এমনকি তখন কোরআনে পাকের প্রতি বেহুরমতি ও অসম্মান করার কারণে ঈমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা হবে।
 সৈয়দ কামাল পাশা
বখতপুর ছৈয়দ বাড়ী
আজাদী বাজার, ফটিকছড়ি
প্রশ্ন: মাসিক তরজুমান রজব ১৪৩৮হিজরী এপ্রিল ২০১৭সাল কাজী মুহাম্মদ ইব্রাহিম লিখিত প্রবন্ধ অনুসারে হযরত ইমাম জাফর সাদেক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাজার শরীফ জান্নাতুল বকীতে অবস্থিত কিন্তু শাওয়াল ১৪৩৮হিজরি, জুলাই ২০১৭সাল, আহমদুল ইসলাম চৌধুরী রচিত সফরনামা অনুযায়ী ইমাম জাফর সাদিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাজার শরীফ ইরানের বোস্তাম শহরে হযরত বায়েজিদ বোস্তামি রহমাতুল্লাহি আলায়হির মাজার সংলগ্ন অবস্থিত। প্রকৃতপক্ষে উক্ত মাজার শরীফ কোথায় কোন স্থানে বিস্তারিত জানালে খুশী হব।
 উত্তর: আহলে বায়তে রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত সৈয়্যদুনা ইমাম জাফর সাদিক ইবনে হযরত ইমাম বাকের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা ছিলেন মুসলিম মিল্লাতের অলৌকিক ও অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর উপনাম ছিল আবু আব্দুল্লাহ্ এবং উপাধী ছিল সাদিক বা সত্যবাদি। তিনি ৮৩ হিজরীর ১৫/১৭ রবিউল আউয়াল মদীনায়ে পাকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার পবিত্র বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ৫ম উত্তরসূরি এবং জ্ঞানের সকল শাখায় অলৌকিক দক্ষতার অধিকারী। এ মহান ইমামের হাজারো উচ্চশিক্ষিত ছাত্রদের মধ্যে অনেক উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ ও খ্যাতনামা বিজ্ঞানীও ছিলেন। রসায়ন বিজ্ঞানের জনক জাবির ইবনে হাইয়ান ছিলেন তাঁর সুযোগ্য ছাত্র। বিশেষত মাযহাবের শ্রেষ্ঠ দুই ইমাম তাঁর প্রত্যক্ষ শিষ্য ছিলেন-(ক.) ইমামে আজম আবু হানিফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি, (খ.) ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলায়হি। হযরত ইমাম জাফর সাদিক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ১৫ শাওয়াল ১৪৮ হিজরিতে ৬৫ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করেন। মদিনা শরীফের কবরস্থান জান্নাতুল বকীতে স্বীয় পিতা হযরত ইমাম বাকের রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ও পিতামহ হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর মাজারের পাশে দাফন করা হয়। ঐতিহাসিকগণের মতে ইমাম জাফর সাদেক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর দাফনস্থল নিয়ে মতানৈক্য থাকতে পারে, তবে ইমাম আবদুর রহমান জামি রহমাতুল্লাহি আলায়হি এ মনিষী ও ইমামের দাফন মদিনার জান্নাতুল বকী শরীফে হওয়াকে জোর দিয়েছেন। [শাওয়াহেদুন নবুওয়াত কৃত. আল্লামা আব্দুর রহমান জামী রহ.]
মুহাম্মদ বাদশা সেকান্দর
চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: বাতিল ফেরকা ৭৩টি দলের মধ্যে একটি দল জান্নাতি, ৭২ দল জাহান্নামী সে জাহান্নামী দলসমূহের পরিচয় বা নিদর্শন উল্লেখ করার জন্য অনুরোধ করছি।
 উত্তর: ৭৩ দলের মধ্যে একটি মাত্র দল জান্নাতী, আর ৭২টি দল জাহান্নামী। [আল-হাদীস। জান্নাতী হক দলের প্রধান ও অন্যতম বৈশিষ্ট্য ও পরিচয় হল তারা মহান আল্লাহ্ তা‘আলা, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, আল্লাহর প্রিয় রসূলগণ, সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বায়তে রসূল, তাবেয়ীন, তবে তাবেয়ীন, অলি-গাউস, আবদালের শানে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে, তাদের শানে বিন্দুমাত্র কটুক্তি ও বেয়াদবী করা দুরের কথা, সহ্যও করতে পারে না এবং তাঁদের শানে কোন প্রকার বদ আক্বিদা পোষণ করে না, আর ৭২টি জাহান্নামী দল-উপদলের অন্যতম পরিচয় হল তারা বক্তৃতায় ও লেখায় সুযোগ পেলেই আল্লাহ্, রসূল, নবী, ওলী, গাউস, কুতুব, সাহাবাযে কেরাম, তাবেয়ীন, তবে তাবেয়ীনের শানে বেয়াদবী ও কটুক্তি করতে দ্বীধাবোধ করে না বরং তাদের শানে-মানে তাদের লিখিত বই-পুস্তকে অসংখ্য বেয়াদবী ও মানহানিকর উক্তি বিদ্যমান, যা ঈমান ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট। যেমন- খারেজী, রাফেজী, শিয়া, ওহাবী, নজদী, কাদিয়ানী, মওদুদী, কদরিয়া, জবরিয়া, মুতাজালা, লা-মাযহাবী, আহলে হাদীস প্রমুখ তাদের লিখিত বই-পুস্তকে অসংখ্য বেয়াদবী-কটুক্তি করেছে, তাদের নাম ও বদ আক্বিদাসহ বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন গাউসুল আজম হযরত শেখ সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী রহমাতুল্লাহি আলায়হি গুনিয়াতুত্ তালেবীনে, হযরত মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী রহ. মেরকাত শরহে মেশকাত ও মোল্লা আহমদ জিয়ন ফসিরাতে আহমদিয়া। [যুগ জিজ্ঞাসা, ৫৬পৃ. ইত্যাদি]
প্রশ্ন: আজানের সময় কাজ করা, ভাত খাওয়া, কোরআন পড়া, নামাজের ওযু করা যাবে কিনা।
 উত্তর: আযান হলো নামাজের আহ্বান, তাই আযান শুনলে আযানের জবাব দেয়া ওয়াজিব ও অপরিহার্য। যেমন এ প্রসঙ্গে নুরুল ঈযাহ্ ফিক্বহের কিতাবে উল্লেখ রয়েছে-اذا سمع المسنون منه امسك وقال مثله الخـ অর্থাৎ যখন কেউ সুন্নতসম্মত আযান শুনবে তখন সে (অন্যান্য ব্যস্ততা বাদ দিয়ে) থেমে যাবে এবং মুআয্যিন আযানের যে বাক্য বলবে সেটা শুনার পর শ্রোতাও একই বাক্য বলবে অর্থাৎ আযানের জবাব/উত্তর দিবে। তাই আযান শোনামাত্র অন্যসব ব্যস্ততা ছেড়ে আযানের প্রতি মনোযোগ দেবে এবং আযানের জবাব দেবে। আর যখন আযান হয় তখন ওই সময়ের জন্য সালাম, কালাম, সালামের জবাব ও অন্যান্য যাবতীয় দুনিয়াবী অহেতুক কার্যাদি বন্ধ করে দেবে। এমনকি কুরআন মজীদ তেলাওয়াত অবস্থায় আযানের আওয়াজ শুনলে তেলাওয়াত বন্ধ করে দেবে এবং মনোযোগ সহকারে আযান শুনবে ও জবাব দেবে। এটাই শরিয়তের বিধান। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আযানের আওয়াজ শুনলে আযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত সম্ভব হলে দাঁড়িয়ে থাকবে এবং আযান শুনবে এবং এর জবাব দেবে। [ফতোয়ায়ে আলমগীরী, বায্যিয়া] আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী হানাফী রহ রহমাতুল্লাহি আলায়হিসহ অনেক ইমামগণ বর্ণনা করেছেন আযানের জবাব দুই ধরনের (এক) মুখে উচ্চারণ করে আযানের উত্তর দেয়া, তা সুন্নাত (দুই.) আযান শুনে নামাযের দিকে অগ্রসর হওয়া এটা ওয়াজিব। তবে কেউ যদি খানা-পিনায়, অযু, গোসল ও পায়খানা-প্র¯্রাবরত থাকাবস্থায় অথবা কোন জরুরী কাজ ও দায়িত্বে থাকাকালীন আযান শুনে তখন মনোযোগ সহকারে আযান শুনবে আর এসব কাজ সেরে নামাজের দিকে অগ্রসর হবে।
[ফতোয়ায়ে আলমগীরী, দুররুল মুখতার, রদ্দুল মোহতার, ফতোয়ায়ে বাযায়িয়া, নুরুল ঈযাহ, কৃত. শায়খ আবুল ইখলাস হাসান
ইবনে আম্মার আল-মিসরী, রহ., ফতোয়ায়ে রজভীয়া, কৃত. ইমাম আহমদ রেযা আলা হযরত রহ.
আজান অধ্যায় ও আমার রচিত যুগ জিজ্ঞাসা, পৃ. ১৩৮,]
মুহাম্মদ গোলাম মোস্তফা
পেনসিলভিনিয়া, আমেরিকা প্রবাসী।
প্রশ্ন: আশুরা কি? এর গুরুত্ব ও ফজিলত ক্বোরআন ও হাদীসের আলোকে জানালে উপকৃত হব। কেউ কেউ আশুরার ফজিলত ও গুরুত্ব সংক্রান্ত হাদিস ও বর্ণনাসমূহকে জঈফ বা দুর্বল বলে আশুরার ফজিলত ও গুরুত্বকে খাটো করতে চাই। তাই বিস্তারিত জানানোর নিবেদন রইল।
 উত্তর: ‘আশুরা’ শব্দটি আরবি, এটা আশারুন বা আশেরুন’ থেকে নির্গত। আভিধানিক অর্থ দশম, শরিয়তের পরিভাষায় ও ইসলামী ইতিহাসের দৃষ্টিকোণে হিজরী সনের প্রথম মাস মহররম মাসের দশম তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। ‘আশুরা’ নামকরণের পিছনে বেশ কিছু বর্ণনা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমতঃ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতদেরকে আল্লাহ্ তা‘আলা বিশেষ ফজিলতপূর্ণ যে দশটি দিন দান করেছেন তন্মধ্যে আশুরার দিনের অবস্থান ১০ম নম্বরে হওয়ার কারণে এটাকে ‘ইয়াওমে আশুরা’ বা আশুরা দিবস বলা হয়। দ্বিতীয়তঃ প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরাম আশুরা দিবসের নামকরণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায় মুহররমের ১০ তারিখে রহমত ও বরকতমন্ডিত ১০টি ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল বিধায় ‘আশুরা’ করে নামকরণ করা হয়েছে। তৃতীয়তঃ সবচেয়ে প্রসিদ্ধ মত হল যেহেতু এদিনটি মহররমের দশ তারিখ সে কারণে এর নামকরণ ‘ইয়াওমে আশুরা’ করা হয়েছে। তবে এ দিনটি পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে বিভিন্ন কারণে সম্মানিত ও বরকতমন্ডিত। এ দিনে যে সমস্ত ঘটনাবলী রয়েছে তন্মধ্যে সমগ্র বিশ্বের সাড়া জাগানো নজীরবিহীন ও হৃদয় বিদারক মর্মস্পর্শী ঘটনা হলো- ৬১ হিজরীর মুহররম মাসের ১০ তারিখে প্রিয়নবী রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামার দ্বীন-ইসলামকে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে সজীব রাখতে ঐতিহাসিক কারবালা প্রান্তরে প্রিয়নবীর কলিজার টুকরা হযরত ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুসহ ৭২/৮২জন আহলে বায়তে রসূল ও তাদের অনুসারীদের দুষ্ট, পাপিষ্ঠ ও কুখ্যাত ইয়াজিদের নির্দেশে তার জালিম বাহিনীর হাতে শাহাদতের ঘটনা অবিস্মরণীয় হয়ে আছে আজও।
উপরোক্ত নামকরণের প্রেক্ষাপটসমূহ হতে আশুরার ফজিলত ও তাৎপর্য কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়। অন্যতম তাফসির বিশারদ হযরত কাতাদাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, পবিত্র কুরআনের সূরা ফজরের শুরুতে আল্লাহ্ তা‘আলা যে ফজরের শপথ করেছেন তা হল মুহররম মাসের প্রথম ফজর যা দিয়ে নতুন বছর আরম্ভ হয়। [লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ৪৫] তবে এখানে অন্য তাফসির ও ব্যাখ্যাও আছে। আশুরার দিনে রোযা পালন অন্যতম বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ আমল- এ প্রসঙ্গে পবিত্র হাদীসে পাকে উম্মুল মু’মিনীন হযরত মা আয়েশা সিদ্দীক্বা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা হতে বর্ণিত রয়েছে, তিনি বলেন-
كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَمَرَ بِصِيَامِ يَوْمِ عَاشُوْرَاءَ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ كَانَ مَنْ شَاءَ صَامَ وَمَنْ ثَاءَ اَفْطَرَ
অর্থাৎ রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রথমে আশুরার দিনে রোযা পালনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, পরে যখন রমযানের রোযা ফরয করা হলো তখন যার ইচ্ছা আশুরার রোযা পালন করত আর যা ইচ্ছা করত না।
[সহীহ্ বুখারী শরীফ, হাদিস নং-১৮৭৫] জলীলুল কদর সাহাবী হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন-
مَا رَاَيْتُ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَتَحَرَّى صَوْمًا فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِه اِلاَّ هذَا الْيَوْمُ اى عَاشُوْرَاءَ وَهذَا الشَّهْرُ يَعْنِىْ شَهْرَ رَمَضَانُ
অর্থাৎ আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আশুরার দিনের রোযার উপর (রমযান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে) অন্যকোন দিনের রোযাকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি এবং এ মাস তথা রমযান মাসের উপর অন্য কোন মাসকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি। আশুরার ফজিলত সম্পর্কে হযরত আবু কাতাদাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, অপর একটি হাদীসে উল্লেখ রয়েছে-
اِنَّ رَجُلاً سَأَلَ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ صَوْمِ عَاشُوْرَاءُ فَقَالَ اَحْتَسِبْ عَلَى اللهِ اَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ اَلَّتِىْ قَبْلَه
অর্থাৎ এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আশুরার দিনে রোযা পালন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে তিনি বলেন, আমি আশা করি এ দিন রোযা রাখলে আল্লাহ্ তা‘আলা পূর্বের এক বছরের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেবেন। [সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৪২] অপর এক হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, হযরত হাফসা বিনতে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা হতে বর্ণিত,
اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَكُنْ يَدَعُ صِيَامَ يَوْمِ عَاشُوْرَاء وَالْعَشْرِ وَثَلاَثَةَ اَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ
অর্থাৎ নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কখনো আশুরার রোযা, জিলহজ্ব মাসের প্রথম নয় দিন এবং প্রত্যেক মাসের তিনদিন (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখের) রোযা থেকে বিরত থাকেননি।
[আল মুসনাদ-৬ খন্ড, পৃ.-২৮৭] হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আমর ইবনুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
مَنْ صَامَ عَاشُوْرَاءَ فَكَاَنَّمَا صَامَ السَّنَةُ وَمَنْ تَصَدَّقَ فِيْهِ كَصَدَقَةِ السَّنَةِ
অর্থাৎ যে ব্যক্তি আশুরার দিন রোযা রাখে সে যেন পুরো বছর রোযা রাখল আর যে ব্যক্তি ঐদিনে সাদকা করল। সে যেন গোটা বছর সাদকা করল।
[আদ্ দুরুল মনসূর, ৪/৫৪০, কৃত. আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়ুতী রহ.] তাই আশুরার দিন ও আশুরার মাসে রোযা রাখা, নামায পড়া, সদকা-খায়রাত করা, কারবালার শহীদের স্মরণে কুরআন খানীর ব্যবস্থা করা, ফাতিহাখানী করা, মিলাদ-মাহফিল, যিকর-আযকার ও আলোচনা সভা ইত্যাদি করা অতি ফযিলত ও পূণ্যময় আমল এবং সাওয়াব লাভের অন্যতম ওসিলা। হযরত নিজাম উদ্দিন আউলিয়া মাহবুবে এলাহী কুদ্দিসা সিররুহু হযরত বাবা ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকর রহমাতুল্লাহি আলায়হির বরাতে বর্ণনা করেছেন, আশুরার এ মহান দিবসে ইবাদত-বন্দেগী, কুরআন তেলাওয়াত, নামায কলমা ও দরুদ শরীফ পাঠ ব্যতীত অযথা দুনিয়াবী বাজে কাজে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। এসব বর্ণনাসমূহকে কেউ কেউ জয়ীফ ও দুর্বল বলে সরলপ্রাণ ও সাধারণ মুসলমান নর-নারীকে এ মহান দিবসের ইবাদত-বন্দেগী হতে বঞ্চিত করার অপচেষ্টা করে থাকে তা উচিৎ নয়। অথচ এসব বর্ণনাসমূহ সনদের দিক দিয়ে জয়ীফ ও দুর্বল হলেও ফজিলত ও সওয়াব অর্জনের জন্য যথেষ্ট। সুতরাং সাধারণ মুসলমানগণকে ইবাদত হতে বঞ্চিত করতে এসব বর্ণনাসমূহকে জয়ীফ ও দুর্বল বলে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী ও ফজিলত অর্জন করা থেকে বঞ্চিত করা অজ্ঞতা ও ভ্রান্তির নামান্তর।
[গুনিয়াতুত্ তালেবীন, কৃত. গাউসে আযম শায়খ সৈয়্যদ
আব্দুল কাদির জিলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ইত্যাদি]
প্রশ্ন: আহলে বায়তের মহব্বত বা ভালবাসা কি? আহলে বায়ত কারা? বিস্তারিত জানালে কৃতজ্ঞ হব।
 উত্তর: আহলে বায়ত হলেন বস্তুত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটতম অতীব প্রিয় ও ¯েœহের পাত্র এবং প্রিয়নবীর পরিবারভুক্ত সদস্যগণ। পবিত্র কুরআন মজীদে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন-
إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ
وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا [سوره احزاب ـ ايت ـ ৩৩] অর্থাৎ হে আহলে বায়ত! নিশ্চয় আল্লাহ্ পাক চান, তোমাদের থেকে যাবতীয় অপবিত্র দূর করতে এবং আরো চান তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পুত:পবিত্র করতে। [সূরা আহযাব: আয়াত-৩৩] হুযূরে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম রাব্বুল আলামীনের দরবারে এভাবে ফরিয়াদ জানালেন-
اَللّهُمَّ هوُلآءِ اَهْل بَيْتِىْ وَخَاصَّتِىْ فَاذْهَبْ
عَنْهُمُ الرِّجْسَ وَطَهِّرهُمْ تَطْهِيْرًا
অর্থাৎ হে আল্লাহ্! এরাই আমার আহলে বায়ত এবং বংশীয় ও ঘনিষ্ট আপনজন, আপনি এদের থেকে অপবিত্রতা দূরীভূত করুন আর এদেরকে পরিপূর্ণভাবে পবিত্র করুন। [মুসলিম শরীফ বরাতে মেশকাত শরীফ, পৃ. ৫৬৮] মুহাক্বক্বিক্ব ওলামায়ে কেরামের অনেকেই বলেছেন- আহলে বায়তে রসূল হলেন শেরে খোদা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত মা ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা, হযরত ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা এবং তাদের আওলাদগণ আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত। কেউ কেউ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার বিবিগণ তথা মুসলিম জাহানের মাতাগণকে আহলে বায়তে রসূলের মধ্যে গণ্য করেছেন। তাই এদের ফজিলত ও মান মর্যাদা অপরিসীম। আহলে বায়তগণ রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার প্রিয়ভাজন ও ¯েœহের পাত্র। তাই তাঁদের প্রতি মুহাব্বত রাখা ও তাঁদেরকে ভালোবাসার জন্য সরাসরি মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ রয়েছে। সেদিকে নির্দেশ করেই আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীন পবিত্র ক্বোরআনুল করীমে এরশাদ করেন-
قُلْ لاَ اَسْئَلُكُمْ عَلَيْهِ اَجْرًا اِلاَّ الْمَوَدَّةَ فِى الْقُرْبى
অর্থাৎ (হে হাবীব) আপনি বলেদিন যে, আমি (রাসূল) তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান (বিনিময়) চাইনা, আমার বংশধরগণ ও নিকটাত্মীয়দের (প্রতি তোমাদের) ভালোবাসা ব্যতীত। [সূরা শূরা, আয়াত-২৩] এই আয়াতে কারীমা নাজিল হলে সাহাবাযে কেরাম নবীজী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার নিকট বিনয়ের সাথে আরয করলেন, হে আল্লাহর রসূল, আপনার নিকটাত্মীয় কারা? তখন হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উপরে বর্ণিত হাদীসটি এরশাদ করেন। আহলে বায়তদেরকে ভালোবাসার ব্যাপারে তবরানী শরীফে বর্ণিত রয়েছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
لاَ يُؤْمِنُ عَبْد حَتَّى اَكُوْنَ اَحَبَّ اِلِيْهِ منْ نَفْسِه وَتَكُوْنُ عِتْرَتِىْ اَحَبَّ اِلَيْهِ مِنْ عَتْرَتِه وَاَهْلِىْ اَحَبَّ اِلَيْهِ مِنْ اَهْلِه وَذَاتِىْ [اَلْحَدِيْث] অর্থাৎ অর্থাৎ কোন বান্দা ততক্ষণ মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আমাকে তার নিজের সত্ত্বা থেকে বেশি ভালবাসবে না, আর আমার বংশধরকে তার বংশধর থেকে বেশি ভালবাসবে না, আমার পরিবার-পরিজনকে তার পরিবার-পরিজন থেকে বেশি ভালোবাসবে না। [আল-হাদিস] ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন তথা নবী বংশধরকে ভালোবাসা তাঁদের মত ও পথকে আঁকড়িয়ে ধরা মুসলমানের ওপর ঈমানী দায়িত্ব।
আহলে বায়তের মর্যাদা ও সম্মানের ব্যাপারে খলিফাতুল মুসলেমীন হযরত আবু বকর সিদ্দীক্ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, (যার হাতে আমার প্রাণ ও সত্তা, তাঁর শপথ) আমার নিকট আমার আত্মীয়গণ অপেক্ষা নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আত্মীয় ও বংশধরেরা ভালোবাসার দিক দিয়ে অধিক প্রিয়। [সহীহ বুখারী শরীফ ও আশশরফুল মুয়াববাদ, পৃ. ৮৭] ইমাম শাফেয়ী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, আমি আহলে বায়তে রসূলকে এত বেশি ভালোবাসতাম যে, তা দেখে লোকেরা আমাকে রাফেজী বলা শুরু করল, আমি তাদেরকে জবাবে বললাম, আলে রাসূলের প্রতি ভালোবাসার নাম যদি রাফেযী হয়, তাহলে হে জিন জাতি ও মানব জাতি এবং বিশ্ববাসী সাক্ষী হয়ে যাও, আমি রাফেজী অর্থাৎ আহলে বায়তে রসূলের প্রতি অধিক ভালবাসার নাম রাফেজী নয় বরং তাদের প্রতি অধিক ভালবাসার নামে সাহাবায়ে রাসূলের প্রতি বেয়াদবী ও কটুক্তি করাই শিয়া-রাফেজীদের অন্যতম নিদর্শন। এরপর আহলে বায়তের প্রতি মহব্বতে তিনি আরো বলেন, হে নবীজির বংশধরগণ, আপনাদেরকে মহব্বত করা বা ভালোবাসা আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরয। আর এ হুকুম মহান আল্লাহ্ পাক পবিত্র ক্বোরআনে নাযিল করেছেন। তদ্রুপ তাঁদের সাথে যারা শত্রুতা পোষণ করবে তারা মূলত আল্লাহ্ ও রসূলের সাথে শত্রুতা পোষণ করে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনে-
اشتد غَضَبُ اللهَ عَلى مَنْ اَذَانِىْ فِىْ عَشِيْرَتِىْ ـ الحديث
অর্থাৎ আল্লাহর ক্রোধ অতীব কঠোর ও কঠিন হবে যারা আমার বংশধরকে কষ্ট দিয়েছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, যে আমার বংশধরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, সে আমার সাথেই বিদ্বেষ পোষণ করল, কারণ নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
حُسَيْنٌ مِنِّىْ وَاَنَا مِنْ حُسَيْنِ اَحَبَّ اللهُ مَنْ اَحَبَّ حُسَيْنًا
অর্থাৎ হোসাইন আমার থেকে আমি হোসাইন থেকে, যে হোসাইনকে ভালোবাসে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে ভালোবাসে। সুতরাং আহলে বায়তে রসূলকে ভালোবাসাই আল্লাহর পক্ষ হতে ফরয করা হয়েছে এবং রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশও রয়েছে।
[আশশরফুল মুয়াববদ, কৃত. আল্লামা ইউসুফ নাবহানী রহ. ও
খোতবাতে মহররম কৃত. মুফতি জালাল উদ্দিন আমজাদী রহ. ইত্যাদি]
দু’টির বেশি প্রশ্ন গৃহীত হবেনা  একটি কাগজের পূর্ণপৃষ্ঠায় প্রশ্ন লিখে নিচে প্রশ্নকারীর নাম, ঠিকানা লিখতে হবে  প্রশ্নের উত্তর প্রকাশের জন্য উত্তরদাতার সাথে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বাঞ্ছনীয় নয়। প্রশ্ন পাঠানোর ঠিকানা: প্রশ্নোত্তর বিভাগ, মাসিক তরজুমান, ৩২১, দিদার মার্কেট (৩য় তলা), দেওয়ান বাজার, চট্টগ্রাম-৪০০০।