কোন মসজিদ ওয়াকফ না হলে জুমা-জামাত আদায় হবে কিনা?

0

আলহাজ্ব শওকত হোসেন-খাজা রোড, বাকলিয়া, চট্টগ্রাম।
প্রশ্ন: সম্মানিত ওলামায়ে কেরাম ও মুফতিয়ানে এজামের নিকট আবেদন এ যে, স্বীয় খরিদা ২ গন্ডা নাল জমির উপর জমির মালিক বিগত ০১/০১/২০২০ইংরেজী তারিখে একটি জামে মসজিদ কায়েম/নির্মাণ করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালের মুক্তির আশায় আল্লাহর ওয়াস্তে ফি ছাবিলিল্লাহ্ দান করত: ৩০০/- (তিন শত) টাকার স্টাম্পে দস্তখত করেন। তিনি উক্ত স্টাম্পে উল্লেখ করেন যে, উক্ত মসজিদ ‘‘মরহুম মনির আহমেদ জামে মসজিদ’’ নামে নামজারী ও রেজিস্টারী মূলে ওয়াকফ নামা করাতে পারবেন। আমার অথবা আমার অলি-ওয়ারিশগণের কোন প্রকার ওজর-আপত্তি চলবে না। যদি কেউ ওজর/আপত্তি করে তা সর্ব আদালতে অগ্রাহ্য ও বাতিল বলিয়া গণ্য হবে। উক্ত মসজিদ সুন্দরভাবে পরিচালনা ও দেখা-শুনা করার জন্য আমরা চার জনকে ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্পন করেন। আলহামদুলিল্লাহ্ বিগত পহেলা জানুয়ারী ২০২০ ইংরেজী হতে অদ্যবধি ‘‘মরহুম মনির আহমদ জামে মসজিদ’’ সুন্দরভাবে সূচারুরূপে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে কিছু দিন যাবৎ কিছু লোক সরলপ্রাণ মুসল্লি ও এলাকাবাসীদের বিভ্রান্ত করছে এ বলে যে, এ মসজিদে জুমা-জামাত নামায-কলমা শুদ্ধ হবে না। যেহেতু এখনো রেজিষ্টারী মূলে ওয়াক্ফ করা হয়নি।
অতএব, আমাদের আবেদন এই যে, উক্ত ‘‘জামে মসজিদে’’ জুমা-জামাত, ইবাদত-বন্দেগী ও নামায কলমা করতে কোন প্রকারের অসুবিধা আছে কি না? এবং এতোদিন জুমা-জামাত, ইবাদত-বন্দেগী ও নামায কলমা যা হয়েছে তা শুদ্ধ হয়েছে কি না? ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক ফতোয়া/ফায়সালা প্রদান করত: চিরকৃতজ্ঞ করবেন।
উত্তর: উপরোক্ত বিষয় ও বিবরণ পর্যালোচনা করে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক এই মর্মে ফতোয়া/ফয়সালা প্রদান করা যাচ্ছে যে, উক্ত জামে মসজিদে যেহেতু পহেলা জানুয়ারী ২০২০ ইংরেজী হতে এ যাবৎ নামায ও জুমা জামাত হয়েছে- বিধায় উক্ত জামে মসজিদের চিহ্নিত জায়গাটি (মূল মসজিদ বারান্দাসহ) কিয়ামত পর্যন্ত মসজিদে হিসেবে সাব্যস্ত থাকবে। যেমন ক. হানাফী মাজহাবের নির্ভরযোগ্য কিতাব আদর্দুরুল মুখতার কৃত আল্লামা ইমাম আলাউদ্দীন খাসকাফি হানাফী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি সহ ইসলামী ফিকহের নির্ভরযোগ্য ফতোয়াগ্রন্থ সমূহে উল্লেখ করা হয়েছে। (ان المسجد الى السماء) অর্থাৎ- মসজিদ আসমান পর্যন্ত। আর রদ্দুল মোহতার এ আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী হানাফী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন- (كذا الى تحت الثرى) অর্থাৎ- তদ্রুপ মসজিদ সর্বনি¤œ তাহতুছ ছারা পর্যন্ত। বস্তুত: মসজিদের চিহ্নিত জায়গা বরাবর উপরে আসমান নি¤েœ তাহতুছ ছারা পর্যন্ত মসজিদ হিসেবে নির্ধারিত বিধায় লিখিতভাবে রেজিষ্ট্রি মূলে ওয়াকফ করা না হলেও সেখানে নামায, জুমা-জামাত, দো’আ-দুরূদ পড়তে কোন প্রকার অসুবিধা নেই। নামায-জুমা-জামাত শুদ্ধ হওয়ার জন্য লিখিতভাবে রেজিষ্ট্রিমূলে ওয়াকফ করা শর্ত নয়। বরং মৌখিকভাবে অথবা স্টাম্পে লিখে জায়গার মালিক যদি বলে- ‘আমি এই জায়গাটি মসজিদের জন্য আল্লাহর ওয়াস্তে দিয়ে দিলাম।’ ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক তা মসজিদ হয়ে যাবে। যেহেতু অনেক দিন ধরে উক্ত মসজিদে জুমা-জামাত হয়ে আসছে বিধায় তা শরিয়ত মোতাবেক মসজিদ হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে গেছে। যেমন- ফতোয়ায়ে আলমগীরীতে আছে-
لو جعل رجلًا واحدا مؤذنًا وامامًا فاذّن واقام وصلّى وحده صار مسجدا بالاتفاق كذا فى الكفاية وفتح القدير واذا سلم المسجد الى متولٍ يقوم مصالحه – تجور وان لم يُصلّ فيه وهو الصحيح كذا فى الاختيار شرح المختار وهو الاصح كذا فى محيط السر خسى (الفتاوى الهنديه الصفحة ৪৫৫ -ج২)
অর্থাৎ- কোন মুমিন বান্দা স্বীয় মালিকানাধীন কোন জায়গায় মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে কোন একজন ব্যক্তি কে মুয়াজ্জিন ও ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করলেন, উক্ত ব্যক্তি আযান-ইকামত সহকারে একাকিও যদি নামায পড়ে তা সকল ইমামগণের ঐক্যমতে মসজিদ হিসেবে সাব্যস্ত হয়ে যাবে। কেফায়া ও ফতহুল কদ্বীর কিতাবে এভাবে বর্ণনা হয়েছে। আর যদি মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা মসজিদ সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করার জন্য কোন মতোয়াল্লীর নিকট উক্ত মসজিদ সোপর্দ করে তা বৈধ ও জায়েয। যদিও উক্ত মতোয়াল্লী উক্ত মসজিদে নামায আদায় না করে। এটা বিশুদ্ধ অভিমত। আল মোখতারের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ইখতিয়ার গ্রন্থে এ রকম বর্ণনা আছে। ইমাম সরখছি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এটাকে অধিকতর বিশুদ্ধমত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। [ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া বা আলমগীরী ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা নং ৪৫৫] ফিকহের প্রসিদ্ধ কিতাবে হেদায়াতে আছে- ثم يكتفى بصلوة الواحد فيه رواية عن ابى حنفية رضى الله عنه وكذا محمد رضى الله عنه وقال ابويوسف رضى الله عنه يزول بقوله جعلته مسجدا- كتاب الهداية- كتاب الوقف الاولين- الصفحة ৬২০-
অর্থাৎ- কোন মুসলমান (স্বীয় জাগায়) মসজিদ প্রতিষ্ঠা করে এলাকাবাসীকে নামায আদায়ের অনুমতি প্রদানের পর শুধু একজন মুসল্লিও যদি উক্ত মসজিদে নামায আদায় করে তখন তা ইমাম আযম আবূ হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এবং ইমাম মুহাম্মদ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির এক বর্ণনা মতে ইসলামী শরিয়তের আলোকে মসজিদ হিসেবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর ইমাম আবু ইউসুফ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, যদি কেউ বলে আমি এ স্থানকে মসজিদ করে দিলাম বা মসজিদ করে দিয়েছি তা ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক মসজিদ হয়ে যাবে এবং মসজিদ প্রতিষ্ঠার মালিকানা সত্ত্ব বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
[হেদায়া- ওয়াকফ অধ্যায়, পৃষ্ঠা নং ৬২০] ফিকহ/ফতোয়ার উপরোক্ত উদ্ধৃতি সমূহের আলোকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, মরহুম মনির আহমদ জামে মসজিদ ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক মসজিদ হিসেবে নির্ধারিত ও চিহ্নিত হয়ে গেছে। যেহেতু উক্ত মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ৩০০টাকার স্টাম্পে লিখিতভাবে আল্লাহর ওয়াস্তে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সওয়াব ও পরকালের শান্তি ও নাজাতের উদ্দেশ্যে এলাকার মুসলমানগণ নামায কলমা, পঞ্জেগানা, জুমা-জামাত আদায় করার জন্য স্বীয় খরিদকৃত জায়গায় উক্ত মসজিদ প্রতিষ্ঠা করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। তদুপরি উক্ত মসজিদে একজন/দুইজন নয় ইমাম মুয়াজ্জিনসহ বহু মুসল্লি পহেলা জানুয়ারী ২০২০ ইংরেজী হতে পঞ্জেগানা নামায সহ জুমা-জামাত আদায় করে আসছেন। সাথে সাথে তিনি সুষ্ঠভাবে মসজিদ পরিচালনা করার জন্য তার আত্মীয় হতে চারজনকে ক্ষমতা ও দায়িত্ব অর্র্পণ করেছেন। নিঃসন্দেহে উক্ত মসজিদ নীচে তাহতুছ ছারা হতে উপরে আসমান পর্যন্ত মসজিদ হিসেবে নির্ধারিত হয়ে গেছে। সুতারাং সেখানে নামায-কলমা, ইবাদত-বন্দেগী ও পঞ্জেগানাসহ জুমা-জামাত আদায় করতে কোন প্রকার অসুবিধা/আপত্তি নেই। এতদিন যা নামায ও জুমা-জামাত হয়েছে তা নিঃসন্দেহে শুদ্ধ হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি আপত্তি করে বা বলে এটা রেজিস্ট্রি মূলে ওয়াকফ হয়নি, ফলে এখানে পঞ্জেগানাসহ জুমা-জামাত আদায় করা শুদ্ধ হবে না। এ ধরনের কথা অগ্রাহ্য/মনগড়া ও ভিত্তিহীন। তবে ভবিষ্যতে ফিতনা-ফ্যাসাদ হতে বাচাঁর জন্য উক্ত মসজিদ রেজিষ্ট্রি মূলে ওয়াকফ করা ও নামজারী করা ভাল ও নেহায়ত উত্তম। উপরোক্ত বিষয়ে এটাই ইসলামী শরিয়তের ফতোয়া/ফয়সালা।