ধ্বংসকারী সাতটি বিষয় থেকে বেঁচে থাকতে হবে

0

ধ্বংসকারী সাতটি বিষয় থেকে বেঁচে থাকতে হবে-
মাওলানা মুহাম্মদ ইমরান হাসান আলকাদেরী >
মহান রাব্বুল আলামীন এই সুন্দর পৃথিবীতে জ্বীন এবং মানব সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত করার জন্য জাতি। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অনেক নিয়ামত ভোগ করছি। তথাপি আমরা আল্লাহর স্মরণ হতে বিমুখ হয়ে আছি। আল্লাহর অনুগ্রহ রাজির শোকরিয়া আদায় করছিনা। বরং নাফরমানি কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ছি। কুফরসহ যাবতীয় গুনাহের অবস্থা এতই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বিশ্বব্যাপী যা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। অনেকে গুনাহের কার্যক্রমকে গুনাহ মনে করছেনা। খুন, হত্যা, যিনা, মদ পান, সুদ, ঘুষ, কলহ, জুলুম নির্যাতন ইত্যাদি নিত্য দিনের সাধারণ বিষয়ে রূপ নিয়েছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এই সমুদয় পাপকার্যাদির ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন- ظَهَرَ الْفَسَادِ فِيْ الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيْ النَّاسِ لِيُذِ يْقِهِمْ بَعْضَ الَّذِيْ عَمِلُوْا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُوْنَ- তরজমা:- ছড়িয়ে পড়েছে অশান্তি স্থলে ও জলে ওই সব কুকর্মের কারণে যেগুলো মানুষের হাতগুলো অর্জন করেছে, যাতে তাদেরকে কোন কোন কর্মের স্বাদ গ্রহণ করান, যাতে তারা ফিরে আসে।
সুতরাং কুফর ও গুনাহের কারণে, দুর্ভিক্ষ, রোগ-ব্যাধি, মহামারী রোগসমূহ, প্লাবন, অগ্নিকান্ড ও জীবিকায় বরকত- শুন্যতা আসে। আর বৃষ্টি না হবার কারণে সামুদ্রিক প্রাণীগুলো অন্ধ হয়ে যায়। ঝিনুকে মুক্তা পয়দা হয় না। মোটকথা গুনাহের কারণে স্থলে ও জলে সৃষ্টি জগৎ বিপদের সম্মুখীন হয়। এ থেকে বুঝা গেল যে, দুনিয়ার দুঃখ- কষ্ট মানুষের কিছু গুনাহের শাস্তি। মূল শাস্তি তো আখিরাতে দেওয়া হবে অথবা উদ্দেশ্য এই যে, অধিকাংশ গুনাহ মহান রব ক্ষমা করে দেন, কোন কোন গুনাহের জন্য পাকড়াও করেন। বুঝা গেল যে, মানুষের অপকর্মের কারণে কখনো পশু গুলোর উপরও বিপদ এসে যায়। গমের সাথে পোকাও পিষ্ট হয়ে যায়। যেমনিভাবে কখনো পশুগুলোর কারণে আমাদের উপরেও বৃষ্টি বর্ষিত হয়। যিনার অধিক্য ঘটলে, লুটতরাজ হয়। যাকাত প্রদান করা না হলে বৃষ্টি রুখে যায়। ওজনে কম দিলে অত্যাচারী শাসক নিযুক্ত হয়। সুদ খোরীর কারণে ভুমিকম্প ইত্যাদি হয়। [তাফসীরে রুহুল বায়ান]
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সাতটি ধ্বংসকারী জিনিস থেকে বেঁচে থাকতে বলেছেন-
عن ابي هريرة رضي الله تعالي عنه قال قال رسول الله صلّي الله عليه وسلم اجتنبوا السبع الموبقات قالوا يا رسول الله ومَا هن؟ قال الشرك بالله والسحر وقتل النفس التي حرم الله الا بالحق وأكل الربا واكل مال اليتيم والتولي يوم الزحف وقذف المحصنات المؤمنات الغافلات متفق عليه-
অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “সাতটি ধ্বংসকারী জিনিস থেকে বেঁচে থাক। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সে সাতটি জিনিস কি কি? রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহর সাথে শরীক করা, যাদু করা, অন্যায়ভাবে ওই ব্যক্তিকে হত্যা করা যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, জিহাদের দিন পৃষ্ঠ প্রদর্শন (পলায়ন) করা। সহজ-সরল সচ্চরিত্রবতী নারীদেরকে অপবাদ দেওয়া।
[বুখারী ও মুসলিম শরীফ]
নিঃশর্ত কুফর কোন কুফরই সগীরাহ গুনাহ নয়, সবই কবীরাহ গুনাহ। যাদু করা যদি যাদুতে কুফরী শব্দাবলী থাকে তাহলে যাদুকর মুরতাদ হয়ে যায়। নতুবা নিছক বিপর্যয় সৃষ্টিকারী হবে। উভয় প্রকার যাদুকরের শাস্তি মৃত্যুদন্ড। প্রথম প্রকারের যাদুকরকে ধর্ম ত্যাগ ও ফ্যাসাদের কারণে এবং দ্বিতীয় প্রকারের যাদুকরকে শুধু ফ্যাসাদের কারণে। সুদ খাওয়া চাই ভক্ষণ করুক নতুবা তা দ্বারা পরিধান করুক অথবা অন্য কোন কাজে লাগাক। এ থেকে বুঝা গেল যে, সুদ নেওয়া কবীরাহ গুনাহ, সুদ দেওয়াও কবীরাহ গুনাহ। যুলুম করে ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা। ইয়াতীম দয়া পাবার উপযুক্ত। তার ওপর যুলুম করা অত্যন্ত জঘন্য গুনাহ্। কাফিরদের সাথে মোকাবেলা না করে পালিয়ে যাওয়া। কেননা, এতে মুজাহিদদের ক্ষতি এবং ইসলামের অবমাননা করা হয়।
জিহাদ থেকে পলায়ন করা কবীরাহ গুনাহ- যদি কাপুরুষোচিত কারণে হয়; যদি কাফিরদের প্রভাব বৃদ্ধি পাবার কারণে বাধ্য হয়ে মোর্চা ত্যাগ করতে হয় তাহলে এ বিধান প্রযোজ্য নয়। এমন পরিস্থিতিতে অটল থাকা এবং শহীদ হয়ে যাওয়া উত্তম; কিন্তু পেছনে সরে যাওয়া কবীরাহ গুনাহ নয়। যুদ্ধের রণকৌশলের ভিত্তিতে পিছনে সরে যাওয়াও সাওয়াব।
যিনার অপবাদ, যে পূণ্যবতী নারী যিনা সম্পর্কে জানেও না তাকে প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য যিনার অপবাদ দেওয়া। সুতরাং ক্ষুব্ধ হয়ে কোন মহিলাকে যিনা কারিণী বা চরিত্রহীনা বলাও এর অন্তর্ভূক্ত। স্মর্তব্য, যে নেককার পুরুষ ও সচেতন মহিলাদেরকে যিনার অপবাদ দেওয়াও গুনাহ। কিন্তু অনবহিত মহিলাদেরকে অপবাদ দেওয়া অধিকতর গুনাহ। যার শাস্তি হচ্ছে দুনিয়ায় আশি চাবুক মারা, আখিরাতে রয়েছে কঠিন আযাব।
মিরকাত কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৭ টি গুনাহ অতি জঘন্য।
৪টি অন্তরের:-
১) শিরক ও কুফর, ২) গুনাহর উপর অটল থাকার নিয়্যত করা,
২) আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া, ৪) আযাব হতে নিরাপদ মনে করা।
৪ টি জিহ্বার:-
১) মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, ২) পুত: পবিত্রদেরকে অপবাদ দেওয়া
২) মিথ্যা শপথ করা, ৪) যাদু করা।
৩ টি পেটের গুনাহ:-
১) ইয়াতীমের মাল ভক্ষণ করা, ২) সুদ খাওয়া, ৩) মদ্য পান করা।
২ টি লজ্জাস্থানের:-
১) যিনা করা, ২) পায়ু সঙ্গম করা।
২টি হাতের গুনাহ:-
১) চুরি করা, ২) অন্যায়ভাবে হত্যা করা।
১টি পায়ের গুনাহ:-
১) জিহাদের ময়দান হতে পলায়ন করা।
১ টি সমস্ত শরীরের গুনাহ:-
১) মাতা পিতার অবাধ্য হওয়া।
আসুন আমরা তাওবা করি, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহান দরবারে ফরিয়াদ করি যেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রাসুল করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওসীলায় আমাদের তাওবা ও ফরিয়াদ কবুল করেন।
বর্তমানে সারা বিশ্বে বিরাজমান এই মহামারী রোগে আমাদেরকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের উপর ভরসা রাখতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন: وهو القاهر فوق عباده ويرسل عليكم حفظة حتي اذا جاء احدكم الموت توفته رسلنا وهم لا يفرطون-
অনুবাদ: এবং তিনি পরাক্রমশালী আপন বান্দাদের উপর আর তোমাদের উপর রক্ষক প্রেরণ করেন। অবশেষে যখন তোমাদের মধ্য থেকে কারো নিকট মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন আমার ফিরিশতাগণ তার রূহ হনন করে, এবং তারা ক্রটি করেনা। (সূরা আন্‘আম, আয়াত নং- ৬১)
অর্থাৎ: ফিরিশতাকুল যাঁদের কেউ কেউ আমাদের কার্যাদির তত্বাবধান করেন, আর কেউ কেউ দেহের। বুঝা গেলো যে, মহান রব সর্বশক্তিমান। নিঃসন্দেহে আমাদের রক্ষণা বেক্ষণ সরাসরি নিজেই করেন; কিন্তু উপকরণাদির মাধ্যমেও করেন। ক্ষমতা এক জিনিষ। নিয়ম-কানুন অন্য। উভয়টা মেনে নেওয়াই হচ্ছে ঈমান।
কোন কোন স্থানে একদল ফিরিশতা রূহ কবজ করেন। আর অন্যত্র ফিরিশতাদের অন্যদল। বরং মালাকুল মওত (মৃত্যুদূত ফিরিশতা) এবং সেবক ফিরিশতারাই সমগ্র দুনিয়ার রূহ কবজ করেন। বুঝা গেল যে, তারা সর্বত্র উপস্থিত সর্বত্র দেখেন। এমন বৈশিষ্ট্য ব্যতীত এই কাজ সম্পন্ন করা যাবেনা। সমগ্র দুনিয়াটা তাদের সামনে তেমনি, যেমন আমাদের হাতের তালু।
এই সব ফিরিশতা থেকে প্রাণ হনন করার ক্ষেত্রে অলসতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘঠিত হয় না। নির্ধারিত সময় থেকে একটা মাত্র মুহুর্তও আগে পরে হয়না। এ থেকে বুঝা গেল যে, এইসব ফিরিশতা প্রত্যেকের মৃত্যুর সময়, মৃত্যুরস্থান ও মৃত্যুর অবস্থা সম্পর্কে জানেন। এটাও পঞ্চ বিষয়ের অর্šÍভূক্ত। যখন এইসব ফিরিশতার এ অবস্থা, তখন যিনি সমস্ত সৃষ্টি অপেক্ষা বেশী জ্ঞানী অর্থাৎ মদিনা ওয়ালে সুলতান (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর জ্ঞান সমুদ্রের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেসারই অবকাশ কোথায়?
তাই বর্তমান করোনা মহামারীর এ সময়ে মুসলমানদের উচিৎ যাবতীয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। অপর মুসলমান ভাইকে গুনাহ্ হতে বাঁচতে সহায়তা করা। প্রত্যহ গুনাহ্ থেকে বেঁচে থাকার জন্য অত্যন্ত ফজিলতময় সৈয়দুল ইসতিগফার পাঠ করা।
عن شداد بن أوس رضي الله عنه قال قال رسول الله صلّي الله عليه وسلم سيد الاستغفار أن تقول اللهم انت ربي لا اله الا انت خلقتني وانا عبدك وانا علي عهدك ووعدك ما استطعت اعوذبك من شر ما صنعت ابوء لك بنعمتك علي وابوء لك بذنبي فاغفرلي فانه لا يغفر الذنوب الا انت- قال ومن قالها من النهار موقنا بها فمات من يومه قبل أن يمسي فهو من أهل الجنة ومن قالها من الليل وهو موقن بها فمات قبل أن يصبح فهو من اهل الجنة- رواه البحاري
অনুবাদ: হযরত শাদ্দাদ ইবনে আউস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ইস্তিগফার এর সরদার এটা যে, তুমি বলবে (আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বী লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খলাক্বতানী ওয়া আনা আবদুকা ওয়ানা ‘আলা আহাদিকা ওয়া ওয়া’দিকা মাছস্তাত্বাতু আউযুবিকা মিন র্শানি মা সানা’তু আবূউ লাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবুউ বিযাম্বী ফাগফিরলী ফা ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুয্যুনুবা ইল্লা আন্তা) হুযুর ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি অন্তরের নিশ্চিত বিশ্বাস সহকারে দিনের বেলায় এটা বলবে, তারপর সন্ধ্যার আগে সে মৃত্যুবরণ করে তবে সে জান্নাতী হবে। আর যে অন্তরের বিশ্বাস সহকারে রাতের বেলায় এটা পড়বে এবং ভোর হবার পূর্বে মৃত্যুবরণ করবে। সে জান্নাতি হবে।
আসুন আমরা নিজের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে ইখলাসের সহিত তাওবা করি এবং নবী করীম এর উসিলায় রহমত কামনায় ফরিয়াদ করি।