বিশ্বব্যাপী সুন্নী মুসলমানদের অবস্থা ও অবস্থান

0

বিশ্বব্যাপী সুন্নী মুসলমানদের অবস্থা ও অবস্থান-

ডক্টর সাইয়েদ আব্দুল্লাহ্ আল্-মা‘রূফ>

বিশ্বব্যাপী প্রায় সাড়ে সাতশ’ কোটি বনি আদমের মধ্যে প্রায় দেড়শ’ কোটি হচ্ছে মুসলমান। এমন কোন দেশ নেই, যেখানে মুসলমান নেই। আমেরিকার মত দেশে ইহুদী-খ্রিস্টানদের অনেকের ভেতর এই মনোভাব কাজ করছে যে – “ওই তো মুসলিমরা এগিয়ে আসছে!” ইউরোপের প্রতিটি শহরে প্রভাবশালী মুসলিম সমাজ আছে। চীনেও আছে দু কোটি ৩০ লাখ মুসলিম। ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের নতুন দেশগুলোতে সেই পুরোনো মুসলিম বংশোদ্ভূত লোকের সংখ্যাই গরিষ্ঠ। এশিয়া তো মুসলিমদেরই মহাদেশ। ভারতেও ৩৫ কোটি মুসলিমের বাস। আফ্রিকাকে ইসলামী মহাদেশ বলে আগেই নাম রাখা আছে। সাদা আফ্রিকা, যেমন মরক্কো, মিসর, লিবিয়া, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইত্যাদি দেশ আর কালো হচ্ছে সুদান, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া, নাইজেরিয়া, আইভেরি কোস্ট, চাদ, তানজানিয়া, উগান্ডা, প্রভৃতি দেশ। 01. Moharram ডাউনলোড করুন)
চলমান পৃথিবীর উৎপাদন ও গবেষণা প্রক্রিয়ায় মুসলিম জনবল সারা বিশ্বের প্রায় সব জায়গায় সক্রিয় আছে। একা বাংলাদেশেরই ১১ মিলিয়ন লোক বিদেশে কর্মরত। ওআইসি-এর সদস্যভুক্ত মুসলিম দেশের সংখ্যা ৫৭ টি।
সবার একনাম মুসলিম। যেমন বিভিন্ন বর্ণ ও জাত-পাত সহ হিন্দুদের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটি। তাদের মূল দেশ হচ্ছে ভারত, নেপাল। খ্রিস্টানদের বাস ইউরোপ-আমেরিকায়। তাদেরও প্রটেস্ট্যান্ট, ক্যাথলিক, মরমেন, অ্যামিশ ও ম্যানানাইট, ইত্যাদি বর্ণগত পরিচয় আছে। তবে কেউ হিন্দুদের মত অস্পৃশ্য নয়। আফ্রিকার বহুদেশে গোত্রতান্ত্রিক পরিচয় আছে। এরা উল্লেখযোগ্য কোনও ধর্মালম্বী নয়, যেমন দক্ষিণ সুদানের কয়লা কালো লোকেরা।
বৌদ্ধরা এশিয়াতে বিশাল সংখ্যক থাকলেও এখন কমিউনিস্ট চীনাদেরকে তো বৌদ্ধ বলা যাবে না। জাপানেও এখন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা তলানীতে গিয়ে ঠেকেছে। চীন-জাপানে চলছে ধর্মের বিশাল শূন্যতা। ইহুদীরা যদিও ইসরাঈলে জড়ো হয়েছে, তবে তারা বিশ্বের বিভিন্ন শহরে আর্থিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, যারা মানচিত্র বিহীন এই ইসরাঈলকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন যোগাচ্ছে।
পৃথিবীর মুসলিমগণ এক উম্মাহ্ এক জাতি। যুগে যুগে যে সব বাতিল ফেরকা জন্ম নিয়েছে, তারাও মুসলিম বলে দাবী করে। সুতরাং সহীহ ও ভেজাল মিলেই মুসলিম জাতি। দেড় শ কোটির ভেতর আক্বীদা-বিশ^াসের ভিত্তিতে আনুপাতিক হারে এদের আদম শুমারি কেউ না করলেও মোটামুটি বোঝা যায় কোন রঙের বিস্তৃতি কতটুকু। সবুজ, কমলা, হলুদ, নীল, আর কত রঙের মুসলমান আছে। খারেজি, শিয়া (শী‘আহ), মু‘তাজেলা, ক্বদরিয়া, জবরিয়া কত বাতিল বিশ^াসীদের গোষ্ঠীগত নাম। শত শত ফেরকা ছিল, এখন আছে হাতে গোণা কয়েকটি। শিয়া, ওয়াহাবী, ইয়াজদী, ইত্যাদি। মু‘তাজেলা-খারেজি-ক্বদরিয়া-জবরিয়া এখনও আছে, তবে দলগত পরিচয়ে নয়।
মুসলিম মানেই আহ্লে সুন্নাহ্্ ওয়াল জামা‘আহ। কাজেই সুন্নী কোন ফেরকা নয়। এটি মূলধারা। এটিকে একটি দল ধরে ৭৩টি দল আছে। এর মধ্যে আহলে সুন্নাহ্ ছাড়া বাকীগুলো বাতিল। অর্থাৎ আক্বীদার জন্য আযাব ভোগ করবে বলে দাবীদার মুসলিম তারাও। হ্যাঁ, কোন ব্যক্তি বিশেষ যদি কোন এমন কথা বলেন যার কোন ব্যাখ্যাই করা যায় না কেবল কুফরি ছাড়া, তাকে কাফের সাব্যস্ত করা যাবে।
তাহলে সুন্নী কারা? সৌদী আরবের রাজসমর্থন নিয়ে যে মুআহ্হেদ আন্দোলন করেছে মিস্টার মুহাম্মাদ ইব্ন আব্দুল ওয়াহ্্হাব তারাও নিজেদের আহ্লে সুন্নাহ্্ দাবী করেন। সালাফী, লা-মাযহাবী বা আহ্লে হাদীস তারাও নিজেদের আহ্লে সুন্নাহ্্ দাবী করেন। ওয়াহাবী আক্বীদার ধারক আই.এস. জঙ্গিবাদীরাও আহ্লে সুন্নাহ্্ দাবী করে। তালেবানরা যে খন্ডিত ইসলাম ধারণ করে তারাও আহ্লে সুন্নাহ্্ দাবী করে। বিগত শতাব্দীতে ভারতে সৃষ্ট বা স্বপ্নেপ্রাপ্ত কিছু দল বা জমাত নিজেদেরকে আহ্লে সুন্নাহ্্ দাবী করে।
এ কারণে মোটাদাগে পৃথিবীতে এখন আছে তিনটি ধারা: সুন্নী, ওয়াহাবী ও শিয়া। এ ক্ষেত্রে নবীজিও তাঁর আহলে বায়তের প্রতি ভালোবাসার দিক থেকে দাবী করে শিয়ারা কিন্তু সুন্নী নয়, সুন্নী হতে হলে সাহাবা-ই কেরামকেও ভালবাসতে হবে, ইত্যাদি। কিন্তু শিয়াদের মধ্যে এটা অনুপস্থিত। নবীজির প্রতি অবজ্ঞার দিক থেকে ওয়াহাবীরা হচ্ছে সকলের থেকে এগিয়ে। মহানবীর প্রতি ভালোবাসা দেখালেই বেদ্আত বেদ্আত বলে তারা সমস্বরে চিৎকার করে ওঠে। তাদের ভাবটা হচ্ছে পৃথিবীর সব কিছু হারাম, কেবল যা হালাল বলে কুর‘আন-হাদীসে উল্লেখ আছে, তা ছাড়া। এ কারণে টমেটো, পটোটো, কলা, নারিকেল, এগুলো হারাম হওয়ার কথা। কিন্তু ওয়াহাবীরা নিজের স্বার্থে আবার ফাতওয়া ঘুরিয়ে ফেলে। তবে জিজ্ঞেস করলে তাদের মধ্যে যাদের কিছু লেখাপড়া আছে, তারা স্বীকার করে যে (আস্লুল আশইয়াই আল্-ইবা-হাহ্)
“সব কিছু প্রাথমিক ও মৌলিকভাবে বৈধ ধরে নিতে হবে, যদি না নিষেধাজ্ঞা আসে।” যা হোক, সুন্নী হচ্ছে যারা তাসাওউফ বা ইহ্্সান মানে। এদের চেনার বিশেষ, আরো অনেক বৈশিষ্ট্য আছে। উপায় হচ্ছে তারা মীলাদে কেয়াম করে। ভারত উপমহাদেশে ওয়াহাবী চেনার উপায় তাদেরটুপি। আরবের ওয়াহাবীদের চেনা যায় না। তবে যারা টাখনু থেকে বেশি উপরে জামা পরে, পায়ের নলা খালি থাকে, তাদেরকে বুঝতে হবে যে, something wrong. এখানে ব্যাখ্যা করার অবকাশ নেই, তবে এটা আমার পর্যবেক্ষণ।
এবার আসা যাক মূল আলোচনায়। সুন্নীদের অবস্থান ও অবস্থার কথা এক বাক্যে বলা যাবে না। যদি প্রশ্ন করেন সুন্নীদের সংখ্যা কত? আমার ধারণা সোয়া শ’ কোটি। ২৫ কোটি হচ্ছে others, ৩৫ কোটির বেশি হতে পারে না। কারণ সৌদী আরবের সবাই ওয়াহাবী নয়। সরকারের ভয়ে কথা বলেন না। কিন্তু সেখানেও সাইয়েদ আলভী মালেকী (মক্কা), শেখ রেদওয়ান (মদীনা) এর মত সুন্নী ঘরানা আছে। ওখানকার কালোরা অধিকাংশ সুন্নী। আশরাফরাও নামের আগে “সাইয়েদ” লিখতে না পারলেও পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন।
এদিকে ইরান ছাড়াও ইরাকের অর্ধেক লোক শিয়া। বর্তমান শাসকরাও শিয়া। বাহরাইনে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কুয়েতে ৩০ ভাগ লোক শিয়া, ইয়েমেনেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিয়া আছে, যারা এখন ক্ষমতায়। সামান্য সংখ্যক শিয়া তো বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ একাধিক দেশেই আছে। সিরিয়ার শাসকশ্রেণীকে শিয়া মনে করা হয়।
তবে এ পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সুন্নিরাই। তুর্কিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভারত, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো, আফ্রিকার প্রায় সব মুসলিম দেশ এবং গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা মুসলিমরা হচ্ছে সুন্নি। আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সবাই সুন্নি। মরক্কো, মিসর এসবের উল্লেখ তো করলাম।
কিন্তু যেটি আজ এখানে প্রধানত উল্লেখ করতে চাই, তা হচ্ছে সুন্নী মুসলিমদের মূল যেখানে গভীরে প্রোথিত, তা হচ্ছে এর সূফি তরিকাসমূহ। যেকোন সংস্থা ও সংগঠনের চেয়ে এগুলো দৃঢ় ও দীর্ঘস্থায়ী। প্রতিটি মুসলিম দেশেই এদের কার্যক্রম চোখে পড়বে। এগুলো ধীর তবে steady ধীর লয়ে সামনেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশে কাদেরিয়া চিশ্তিয়া, নক্বশবন্দিয়া ও মুজাদ্দেদিয়া তরীকা প্রধান। আফ্রিকাতে তিজানিয়া, মাহ্দিয়া, সনুসিয়া, ইত্যাদি বেশি প্রচলিত। ব্রিটেনে মোহাম্মাদিয়া, মরক্কোতে ইদরিসিয়া, দব্বাগিয়া, পাকিস্তানে সোওরাওয়ার্দিয়া তরীকা চলছে চার তরিকার পরেই। তুরস্কে নক্্শবন্দিরা বেশি প্রবল। ইরাক-জর্ডানে ক্বাদেরিয়া তরীকা প্রবল। জর্ডানের রাজবংশ আহ্লে বাইত হওয়ায় এই নিসবতকে অনেক সম্মান জানানো হয়।
আমেরিকার Salt lake রাজ্যে একজন মহিলাকে পেয়েছিলাম, তিনি হযরত রাবেয়া বসরীর মতো অত্যন্ত আবিদা-জাহিদা। তবে রাবেয়া বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা। চিরকুমারী হলেও এই রাবেয়া (তার নাম এখন মনে নেই) বিবাহিত। নারী পীর হতে পারবে কিনা তা আলোচনা, গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের ব্যাপার। এ মহিলা কিন্তু আধ্যাত্মিকায় অতি সমৃদ্ধ বলে তাঁকে সেখানে খুব সম্মান করার হয়। জানি, আবেগ থেকে চা দোকানের কাস্টোমার রিকশাঅলা বা শ্রমিকরাও ফতুয়া দিতে দেরি করবে না। তবে জানা উচিত, বাংলাদেশের আইনে যোগ্য মুফতি ছাড়া কেউ ফাত্্ওয়া দিতে পারবে না। থার্ড ক্লাসে কামিল বা দাওরা পাশ হলেই নামের আগে “মুফতি” লেখে। অযোগ্যরা সাবধান! যের-যবর ছাড়া শুদ্ধ করে আরবী ফাত্ওয়ার কিতাব পড়তে না পারলেও “মুফতি” সাহেবের চাপাবাজি কিন্তু বন্ধ নেই।
যাহোক, সুন্নী মুসলিমদের অবস্থান এ বিশ্বে সব সময় সুদৃঢ় ছিল, আছে এবং থাকবে ইনশা-আল্লাহ্। নানান নামে তারা আছেন, গাওসিয়া কমিটি, মারকাযুছ সাকাফাহ্ আস্-সুন্নিয়্যাহ (কেরালা), ইত্যাদি নামের বহু সুন্নী সংস্থা সংগঠনের সংখ্যাও কম নয়।
এই সুন্নিরাই ব্যাংকের মালিক, জাহাজের মালিক, বিশ^বাণিজ্যের শক্তি, এরাই দেশে দেশে রাষ্ট্রনায়ক। বাংলাদেশে তো সুন্নী আক্বীদার রাষ্ট্রনায়ক আছেনই। এঁদের মধ্যেই আছে শিক্ষক, বিজ্ঞানী, আলেম, সমাজসেবী, সংগঠক, আরও অনেক কিছু।
সুন্নীদের হাতে অফুরন্ত সম্পদ আছে, কৌশলগত ভূমি, নদী, সাগর ও পাহাড় আছে। বিজ্ঞান গবেষণাগারে, পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে, উদ্ভাবনী প্রক্রিয়ায় এই সুন্নী মুসলিমরা আছেনই। সামরিক শক্তি যাদের কাছে তারাও সুন্নি। জনবল, দক্ষ জনশক্তি আছে সুন্নি আক্বীদার।
একজন সুন্নী মানে একজন আশেকে রাসূল। একজন নবীপ্রেমিক তো আরেকজন নবীপ্রেমিকের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত। নবী প্রেমিকদের কোন দেশ বিভক্তি নেই, সারা পৃথিবীই তাদের। কবি ইকবাল ছিলেন এক গভীর নবী-প্রেমিক। তিনি বলেছেন:
চীন ও আরব হামারা, হিন্দুস্তান হামারা
মুসলিম হ্যাঁয় হাম, সা-রা জাহান হামারা।
অর্থ: চীন ও আরব আমাদের, হিন্দুস্তান আমাদের, আমরা হলাম মুসলিম, সমগ্র বিশ্ব আমাদের।
কিন্তু সুন্নীদের আওয়াযে ঐক্য ও বুলন্দী নেই কেন? কারণ তারা ঐক্যবদ্ধ নয়। তারা নিজের পীরকে বড় দেখাতে গিয়ে অন্য পীরের সমালোচনা করে। দুশমন ঘিরে রেখেছে, তাদের প্রতি খেয়াল না করে ক্বেয়ামীদের দোষত্রুটি ধরার তালে আছে। আল্লাহ্ জাল্লা-শা-নুহু তো বলেই রেখেছেন(ওয়ালা তানা-যা‘উ …. রীহুকুম) “তোমরা পরস্পর ঝগড়া করো না, তাহলে তোমরা ব্যর্থ হয়ে যাবে এবং তোমাদের শক্তি হাওয়ায় উবে যাবে।” (আল্-কুরআন ৮: ৪৬)
বিশে^ উন্নতশির থাকতে হলে ঈমানী শক্তি লাগবে। আকীদা সহীহ না হলে ঈমান দুর্বল এমন কি “নাই” হয়ে যাবে। এজন্যই আল্লাহ্ তা‘আলা বলেছেন: (ওয়ালা তাহেনূ …. মু‘মিনীন।) “তোমরা হতবল হয়ো না, দুশ্চিন্তা করো না, আরে তোমরাই তো উচ্চশির, যদি তোমরা হও মুমিন।” (৩: ১৩৯)
আকীদা সহীহ ও আমল দুরস্ত আছে, আমাদের নাই অবিসংবাদিত নেতৃত্ব! এটাই সমস্যা।
সময় এসেছে এই সমস্যা নিরসন করে এগিয়ে যাবার। মহান আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে তাওফীক দিন। আমীন।
লেখক: অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও
ওআইসি ফিকহ একাডেমিতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি।