প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ইসলাম

0

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ইসলাম

অধ্যাপক ড. সাইয়েদ আবদুল্লাহ্ আল-মা‘রূফ
শেষ কিস্তি

করোনা ভাইরাস কি আল্লাহর অনুগ্রহ?
করোনা ভাইরাস অবশ্যই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আযাব ও লা‘নাত। হাঁ, মু’মিনদের বিষয়টি একটু আলাদা। আল্লাহতে বিশ্বসীরা যদি এই মসিবতে ধৈর্যধারণ করে তাহলে আল্লাহ তাদেরকে যে পুরস্কার দেন তা পাবার পর তাদের পক্ষে এটি শাপে বর হয়ে যায়। ইতিপূর্বে যে হাদীসে বলা হয়েছে যে, মু’মিন যদি সবর করে এবং সওয়াবের নিয়তে নিজ ঘরে স্বেচ্ছাবন্দী থাকলে তাকে শহীদের সওয়াব দেওয়া হবে। বুখারী শরীফের ওই হাদীস (৩৪৭৪) এর ব্যাখ্যায় ‘ফাতহুল বারী’তে ব্যাখ্যাকার ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, এখানে শহীদের সওয়াব পাওয়ার জন্য মৃত্যু শর্ত নয়। জীবিত থাকলেও তা পাবে।
ব্যস্ত মানুষ ঘরে নিঃসঙ্গ নিজেকে আটকে রাখাও একটি যুদ্ধ। তাই শহীদের সওয়াব পাবে। বাকী থাকলো তাদের কষ্ট ও জীবনাবসান। তাই এটিকে আযাব বলা হয়েছে। তবে মানুষ হিসেবে আমরা কোন মানুষের জন্য এই আযাব কামনা করি না। হাদীসটিতে যৌক্তিক পক্ষপাত রয়েছে, এ নিয়ে বিরূপ ভাবনা সঠিক নয়। এমন বহু ঘটনা রয়েছে যা একজনের জন্য অকল্যাণ হলে অন্যের জন্য কল্যাণ হয়ে থাকে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে আদ, সামুদ জাতি ফেরাউন, নমরুদ এর মতো স্বেচ্ছাচারী রাজাদের পতন হয়েছিল তা তো শাস্তিই ছিল।
এই করোনা ভাইরাস আরেকবার বিশ্বের ক্ষমতাসীনদেরকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, আল্লাহর শক্তির সামনে মানুষ কত অসহায়। এ থেকে আমাদের উপদেশ গ্রহণের সুযোগ আছে। কাজেই ভাইরাসঘটিত অবস্থা কখনও কখনও অনুগ্রহ রূপে আবির্ভূত হয়। এটি কঠিন পরীক্ষা। এতে ধৈর্যের সাথে যারা উত্তীর্ণ হবে তাদের জন্য পুরস্কার আছে। পুরস্কার হোক আর তিরস্কার এ থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতে হবে। ধৈর্য, সাহস ও ঈমানী শক্তি দিয়ে একে সামাল দিতে হবে।
মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী সংস্কৃতি ও নৈতিকতা বিভাগের দায়িত্বশীল প্রফেসর ও প্রাক্তন সংসদ সদস্য, শায়খুল আযহার আহমাদ আত-তায়্যিব নিম্নরূপ একটি বার্তা প্রেরণ করেন :
“করোনা ভাইরাসকে ঘৃণা করবেন না। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ, এই ভাইরাস বিশ্ব মানবতাকে তার সঠিক পথে ফিরিয়ে এনেছে। এতে মানুষ তার স্রষ্টার কাছে ফিরে এসেছে এবং নৈতিক মূল্যবোধকে পুনরায় ধারণ করছে। অনৈতিক কাজগুলো যথা- মদের বার, নাইট ক্লাব, পতিতালয়, ক্যাসিনো বন্ধ করে দিয়েছে। এছাড়াও
*    এটি সুদের হারকে কমিয়ে এনেছে।
*    পরিবারের সদস্যদের একত্রিত করেছে। পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
*    যাবতীয় অশ্লীল আচরণ বন্ধ করেছে।
*    এটি মৃত পশু-পাখি, অখাদ্য এবং নিষিদ্ধ প্রাণী খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
*    এরই মধ্যে এর কারণে সামরিক ব্যয়ের এক-তৃতীয়াংশ স্বাস্থ্যসেবাতে স্থানান্তরিত হয়েছে।
*    বিভিন্ন মুসলিম দেশে শিশা, হুক্কা পান, জনসমক্ষে অশ্লীল বেলি ড্যান্স ও আবাসিক অশ্লীলতা ও সকল অনৈতিক কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
*    করোনা ভাইরাস মানুষকে স্রষ্টার কাছে দু‘আ করতে বাধ্য করছে।
*    এটি স্বৈরশাসক এবং তাদের ক্ষমতাকে তুচ্ছ করে স্রষ্টার ক্ষমতাকে সামনে মাথা নত করতে বাধ্য করেছে।
*    প্রযুক্তির উপর একান্ত নির্ভরতা না করে মহান প্রভুর ইবাদতে মনোযোগী হচ্ছে। কারাগার ও বন্দীদের প্রতি কর্তৃপক্ষের সহানুভূতি সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন দেশে কিছু বন্দী মুক্তি দেওয়া হচ্ছে।
*    এটি মানুষকে হাঁচি, কাশি দেওয়ার তালীম দিচ্ছে যেমনটি আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ১৪০০ বছর আগে শিখিয়েছিলেন।
*    ঘরে সময় কাটালে সহজ জীবন যাপন হয়। অহেতুক প্রতিযোগিতা না করতে শিখিয়েছে।
*    আমাদের মধ্যে ইসলামী চেতনা জাগ্রত করে, মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট ক্ষমা ও প্রার্থনা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে শোকরিয়া জ্ঞাপন করি।
আলহামদুলিল্লাহ, জ্ঞানীদের জন্য এতে মূল্যবান শিক্ষা রয়েছে। (আরব নিউজ)
অনেকে আবার এও বলেছে এই মহাপরীক্ষায় – প্রাণপ্রকৃতি দূষণমুক্ত হয়েছে। লকডাউনের কারণে কার্বন নিঃসরণ বন্ধ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অনুভূত হচ্ছে। গাছে গাছে পাখ-পাখালীর কলরবে মুখরিত হচ্ছে আমাদের প্রতিবেশ। সৈকতে ডলফিনেরা এখন আবার নিরুপদ্রবভাবে জলকেলি করছে। যান-জটের লা‘নতমুক্ত রাস্তা আর শব্দ ও গ্যাসের দূষণমুক্ত শান্ত-সুন্দর নীরবতা যেন আমাদের চৈতন্যে এক নব-বারতা নিয়ে এসেছে।

এইসব স্বপ্ন কি গ্রহণযোগ্য?  
ফেইসবুকে দেখা যায়, কোন কোন তথাকথিত বুযুর্গ (?) স্বপ্নে করোনা ভাইরাসের সাথে কথা বলেছেন। এমন এমন কিছু কথা বলেছেন যাতে কিছু আবেগী মুসলিম উদ্বেলিত ও উৎফুল্ল হয়েছে। তবে স্বপ্ন তো স্বপ্নই। বাস্তবে তার কোন ভিত্তি নেই। শুদ্ধ স্বপ্ন সত্যের ৪৬ ভাগের একভাগ। আর অশুদ্ধ স্বপ্নের তো কোন দামই নেই। শুদ্ধ স্বপ্নও অন্যের জন্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না। অভিজ্ঞ আলেমই কেবল শুদ্ধাশুদ্ধ আন্দাজ করতে পারেন। এ ধরনের স্বপ্ন বলার কী দরকার। চোখ খুললেই তো আমরা সত্য দেখতে পাই। আমাদের সামনে পবিত্র কুরআন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের পরামর্শ রয়েছে। এ ধরনের স্বপ্ন গুজবের বাহন। এ সব দায়িত্বহীন কথাবার্তা থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন:
كَفٰى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُّحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ০
“একটি লোক মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শুনে তা ই বলে বেড়ায়।”
“ওহে, যারা ঈমান এনেছ! যদি তোমার নিকট কোন অনির্ভরযোগ্য ব্যক্তি কোন সংবাদ নিয়ে আসে তাহলে তা যাচাই করে নেবে।” [সূরা আল্-হুজুরাত – আয়াত: ৬] গুজব এখন গজব। গুজব এমনই যে করোনা ভাইরাস চাঁদের বুড়ির কোলে বসে দাঁত কেলিয়ে হাসে। কিন্তু সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে গুজব ছড়ানো এখন এত সহজ নয়। তারপরও সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যে অনেকেই অপপ্রচার করে। এক্ষেত্রে কাউকে হেয় করার জন্য করোনা আক্রান্ত বলে প্রচার করা, বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়াবার জন্য মিথ্যা কথা রটানো। আতঙ্ক ছাড়ানো এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অপপ্রচার চালানোর সম্ভবনা আছে। মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনেক সুযোগসন্ধানী পাপাত্মা ভিত্তিহীন খবর ফেরি করে থাকে। তাদেরকে আখেরাতের ভয় দেখানো যেতে পারে। দুষ্ট লোকদের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তো আছেই। তবে এই বিপদের সময় সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে ভাই বন্ধুদের নসিহত করা উচিত। সবাই জানি দুষ্ট লোকের সংখ্যা কম থাকে। তবে তারা সক্রিয় থাকে আর ভাল লোকেরা প্রয়াশ নিষ্ক্রীয় থাকে। এটিই অসুবিধা।

জীবাণু রোধক দু‘আ আছে?
জীবাণুু ভাইরাস”-এর সরাসরি দু‘আ নেই। তবে এমন দু‘আ আছে যা সকল জীবাণু, সকল রোগ, সকল মন্দ থেকে সুরক্ষা দেয়। কেউ হয়তো বলবেন, দু‘আ দিয়ে কি হবে। ফিলিস্তিনে যে ‘এমওয়াস’ নামক তাউন বা মহামারী হয়েছিল তাতে তো জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীরাও মারা পড়েছিলেন। এর জবাবে বলব, ডাক্তারগণ রোগীকে ওষুধের প্রেসক্রিপশন দেন, সে ওষুধ সেবন করার পরও অনেক রোগী মারা যায়। এজন্য কি বলবেন যে, ওষুধে কোন লাভ নেই?
আগেই বলেছি চিকিৎসকদের পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করুন। তবে পাশাপাশি আল্লাহর কাছে রোগ থেকে সুরক্ষা অথবা মুক্তির জন্য প্রার্থনাও করুন। কারণ আল্লাহর দয়া না হলে ডাক্তারের ওষুধ কোন কাজেই আসবে না। চিকিৎসাই শেষ কথা হলে তো হাসপাতাল থেকে এত লাশ বের হতো না। যারা দু‘আ বিশ^াস করেন না, এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু যারা কুরআন সুন্নাহ বিশ^াস করেন তাদের জন্য কয়েকটি দু‘আ এখানে লিখে দিলাম, পবিত্র কুরআন থেকে :
১. قُلْ أَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ ، مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
প্রভাত অরুণিমার মালিক এর নিকট আশ্রয় চাই, যা তিনি মন্দ সৃষ্টি করেছেন তা থেকে।
মূলতঃ সূরা আল্-ফালাক ও সূরা আন্-নাস এ দুটো সূরা নাযিল হয়েছিল মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে এক ইহুদী চুলে যাদু করার কারণে তা নস্যাৎ করে দেওয়ার জন্য। এ জন্যই এ দুটি সূরাকে মন্দ মুক্তির (معوّذتان) সূরা বলা হয়। এ দুটি সূরা দিয়ে দু‘আ করলে তা অব্যর্থ।
২. পবিত্র কুর‘আনে একজন নবীর জবানীতে আছে: وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِيْنِ  “আমি যখন অসুস্থ হই তখন তিনিই আমাকে নিরাময় করেন।”
[সূরা আশ্-শু‘আরা: ৮০] ৩. وَإِن يَّمْسَسْكَ اللهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَه إِلَّا هُوَ যখন আল্লাহ তোমাকে কোন ব্যাধি দিয়ে পাকড়াও করে তখন তিনি ছাড়া আর কেউ নেই যে তা অপসারণ করবে। (সূরা আল্-আন‘আম: ১৭)
৪. এছাড়া সূরা ফাতিহা দিয়ে তো সাপের বিষও নামিয়ে দিয়েছিলেন সাহাবা কেরাম দূর দেশে, নিজেরা ইজতেহাদ করে। বিনিময়ে খাসি নিয়ে খেয়েছিলেন। ফিরে এসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বিষয়টি বলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কিভাবে জানতে পারলে যে ফাতিহা দিয়ে সাপের বিষ নামানো যায়? আমার অংশ কই? এ হাদীসটি তো সহীহ বুখারীতে আছে। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে বলেই দিয়েছেন :
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْاٰنِ مَا هُوَ شِفَآءٌ وَّرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ ۙ وَلَا يَزِيْدُ الظَّالِمِيْنَ إِلَّا خَسَارًا০
“আমি অবতীর্ণ করি কুরআন, যা মু’মিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত; কিন্তু তা যালিমদের ক্ষতি বৃদ্ধি করে।”
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَآءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَشِفَآءٌ لِّمَا فِي الصُّدُوْرِ وَهُدًى وَّرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِيْنَ.
“হে মানবমন্ডলী! তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে এসেছে উপদেশ ও তোমাদের অন্তরে যা আছে তার অরোগ্য এবং মু’মিনদের জন্য হেদায়ত ও রহমত।”
পবিত্র কুরআনে বিশেষ বিশেষ আয়াত বিশেষ বিশেষ রোগের জন্য নিরাময় হিসাবে কাজ করে। তবে পবিত্র কুরআন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে সঠিক পথ দেখানো।
তবে কেউ ফুঁক দিলে গ্লাস ফেটে যায়। আবার কেউ কেউ ফুঁ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেলেও কাজ হয় না। কারণ মহান আল্লাহর বাণী ফাসেক লোকের ঝাড়-ফুঁেকর জন্য আসেনি। গভীর ঈমান নিয়ে আমলদার লোক আল্লাহর বাণী আবৃত্তি করে ফুঁ দিলে তা শেফা হয়ে থাকে।

হাদীসে মহামারীর সুনির্দিষ্ট দু‘আ
১। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শেখানো হাদীস :
اللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُوْنِ وَالْجُذَامِ، وَمِنْ سَيِّئِ الْأَسْقَامِ.
“হে আল্লাহ আমি আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। শে^ত রোগ, উন্মাদ হওয়া, কুষ্ঠ রোগ ও যাবতীয় দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে।”
২.  أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ الله التَّامَّاتِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ
“আমি মহান আল্লাহর সম্পূর্ণ বাণীসমূহ এর উসিলায় পানাহ চাচ্ছি, তার সৃষ্টির সকল মন্দের অনিষ্ট থেকে।”
৩.  মাহনবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শেখানো আরেকটি দু‘আ যা সর্ব রোগের জন্য প্রযোজ্য :
اللهم رب الناس، أذهب الباس، واشفه وأنت الشافي؛ لا شفاء إلا شفاؤك، شفاء لا يغادر سقمًا০
“মানুষের প্রভু, করে দিন মন্দকে দূর, শেফা দিন, আপনিই তো নিরাময়কারী আপনার শেফা ছাড়া নাই কোন শেফা, এমনই নিরাময় যারপর থাকে না কোন ব্যাধি।”
৪. بِسْمِ اللهِ الَّذِيْ لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِه شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ
“আমি সকাল বা সন্ধ্যায় উপনিত হয়েছি এমন আল্লাহর নামে। যার নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোন কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।”
৫.    أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَّهَامَّةٍ وَّمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَّامَّةٍ
আমরা জানি এ ভাইরাসটি অভিনব (ঘড়াবষ) এবং দ্রুত বিস্তারকারী ঘাতক জীবাণু। এটি ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া নয়। ভাইরাসকে খালি চোখে দেখা যায় না। ব্যাকটেরিয়ায় একটি কোষ থাকে এবং অনেকগুলো এক জায়গায় বাসা বাঁধলে দেখা যেতেও পারে। ভাইরাস আল্লাহর সৃষ্টি, এর জীবন ও বংশ বিস্তার আছে। এর মৃত্যু আছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা জীবাণু এর প্রকারভেদ, এগুলোর গতি-প্রতিরোধ, প্রতিকার ইত্যাদি বিষয় আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু করোনা ভাইরাস, যাকে World Health Organization (WHO) Covid-19-১৯  নাম দিয়েছেন। তা প্রতিরোধ করার কোন উপায় এখনও জানতে পারেনি। চেষ্টা চলছে। এ অবস্থায় এই ঘাতক থেকে দূরে থাকাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় দরকার।
রেডিও, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকায় ও মসজিদের ইমামদের মাধ্যমে দেশের প্রায় সাবাই জানে যে, হাত ধোয়া, কতটুকু দূরত্বে থাকা, আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। অসুবিধা হলো হাত ধুলেও সাবান ব্যবহার করে না, সাবান ব্যবহার করলেও ২০ সেকেন্ড ধরে তা কচলায় না, দূরত্ব বজায় রাখে না, হাঁচি, কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু বা রুমাল ব্যবহার করে না। লোকে জানবে বলে চেপে রাখে, ডাক্তারের কাছে যায় না। জামাই বাবু ইতালি থেকে এসে শ্বশুর বাড়িতে নিবিড় মেলামেশায় মগ্ন হয়। মাত্রই স্পেন বা আরব থেকে এলো, পরের দিনই শাদী মোবারক সেরে নিল। এসব মূর্খ গোয়ার হঠাৎ দু’পয়সা হওয়া ব্যক্তিদের কারণে আজ মা-বাবা, শ্বশুর-শাশুড়ী পর্যন্ত আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। চোখে না দেখলে বিশ্বাস পূর্ণ হয় না।
জীবাণু আছে কিন্তু আমার কিছুই হবে না। আল্লাহ আছে। কিন্তু তাকে না দেখার কারণে পাপ করতে ভয় পায় না, এই যে আত্মপ্রবঞ্চনা, এই অসচেতনতাই আমদের জন্য এই ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মু’মিন তো অদৃশ্যকে বিশ্বাস করে “ يُؤْمِنُوْنَ بِالْغَيْبِ ” দেখা না গেলেও অস্তিত্ব, বায়ুর মত টের পাওয়া যায়, সে জন্যই মৃত্যু দূতকে যেমন দেখা যায় না, বিশ্বাস করতে হবে। করোনা ভাইরাসকেও দেখা যায় না তবে তা মৃত্যু ঘটাতে পারে। সে জন্যই জীবাণু ভাইরাসকে বিশ্বাস করে এ থেকে অত্যন্ত সর্তক থাকতে হবে।

এ সময় মেহেমানদারী কিভাবে করবে?
এ সময় কোন মেহেমানদারী নয়। ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন যখন বিনা নোটিশে এসে দরজার সামনে দাঁড়ায় তখন তাদেরকে ফেরানো খুবই বিব্রতকর। তবুও দাঁতে দাঁত চেপে তাকে বলতে হয় কিছু বলার থাকলে দূর থেকে বলে যান। আপনার নিজের স্বার্থে বাসায় না ঢুকে ফিরে চলে যান।Please don’t mind! এরপরও মাইন্ড করলে পরে সুধরে নেওয়া যাবে। এখনতো জীবন বাঁচাই। জীবনের দাম মেহমানদারীর বা অনাকাক্সিক্ষত অতিথির বেজার হওয়া থেকে অনেক বেশি মূল্যবান।

মুসাফাহা
মুসাফাহা করা যাবে না, হাতের তালু, চোখ, মুখ, ঠোট বরং মুখমন্ডলের জায়গা নরম হওয়ায় ভাইরাসটি এ পথগুলো দিয়ে সহজেই গমনাগমন করতে পারে।
হাঁ, দুজন মুসলিম কিছু সময়ের ব্যবধানে সাক্ষাৎ হলে হাত মেলানোর সময় বলে يَغْفِرُ اللهُ لَنَا وَلَكُمْ “আল্লাহ আমাদেরকে এবং আপনাকে ক্ষমা করুন।” এতে ঝরা পাতার মত তাদের হাত হতে গোনাহ ঝরে পড়ে। এটি সহি হাদীস। কিন্তু এমন হাদীস কি আছে যে, মুসাফাহা করলে দু‘আ পড়লে এই ভাইরাস এক দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়াবে না? তাহলে অবশ্যই মুসাফাহা করবেন না। আবেগে কোলাকুলি করোনা ভাইরাস আপনাকে আলিঙ্গন করবে। কাজেই মানুষ মানুষে কমপক্ষে ৬ ফুট বা এক মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। এটিই Social distancing মনে রাখবেন। একদিকে একটি সুন্নাত যা পালন না করলে ছোট গোনাহও হবে না। অপরদিকে জীবন যা একবার নিভে গেলে আর জ¦ালানো যাবে না। কাজেই যে যে কাজে ভাইরাসটি স্থানান্তরিত হয় তা থেকে সাবধান থাকতে হবে। বিষয়টি এত বেশি আলোচিত যে, এখানে বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই, বাইরে না গিয়ে স্বেচ্ছাবন্দী জীবন এবং জীবাণুনাশক বা সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া ও শরীর ভাইরাস মুক্ত রাখার ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতে হবে।
বর্তমান সরকার বিভিন্ন দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে নিজে প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন এবং ব্যবসায়ীসহ সকলকে দরিদ্র ও অসহায় লোকদের পাশে দাঁড়াতে আহ্বান করেছেন। … হাজার কোটি টাকার প্রনোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা অব্যাহত রাখার জন্য। ব্যাংক, এনজিও ও সরকারী প্রতিষ্ঠানকে ঋণ, কিস্তি ইত্যাদি বিষয়ে কড়াকড়ি না করে অবকাশ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের দেশের ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা খুবই আন্তরিক।
বিপদে বিভেদ নয় ঐক্য চাই। এই বিপদের পর আরেক বিপদ আছে। তা হচ্ছে অর্থনৈতিক মন্দা। তবে আজকের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ হেরে যাবে না। আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে এখন পিপিই ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক বানানো শুরু করছে। আমরা ইবলা, ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া কতকিছুই পিছনে ফেলে এসেছি। করোনাও পরাজিত হবে। এক সময় কলেরা, বসন্ত, মহামারী আমাদের চোখের সামনে মা-বাবা, ভাই-বোন কেড়ে নিয়েছিল, আমরা অসহায়ের মত চেয়ে চেয়ে দেখেছি আর কেঁদেছি। সে দিনও শেষ হয়েছে। সারা বিশ্ব এখন একটি গ্রামের মত। সবাই মিলে মিশে চেষ্টা করছে এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে।
পূর্ব পশ্চিমের দম্ভ, জাতিতে জাতিতে ধ্বংসের প্রতিযোগিতা বিশ্বজুড়ে হানাহানি সব কিছুকে থামিয়ে দিয়ে এই করুণাহীন করোনা ভাইরাস তার দামামা বাজাচ্ছে। সবকিছু ছাপিয়ে এখন মানবতাই একটিমাত্র ব্যানার আমাদের। বিশ্ব মনবতার জয় হোক এ হোক আমাদের সম্মিলিত গণকন্ঠ।

করোনায় করণীয়
হাত ধোয়া। কাঙ্গালের কথা বাসি হলেই ফলে। নবীর কথা সব যমানায় চলে।
আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম হাত ধোয়ার উপর খুবই গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। বলেছেন খাবার গ্রহণের আগে ও পরে হাত ধুয়ে নেবে। ঘুম থেকে উঠে পানির বালতিতে হাত ঢুকাবার আগে আলাদা হাত ধুয়ে নেবে। তখন তো টেপ বা আধুনিক পাত্র ছিল না। সাধারণ সাহাবীদের হাত পরিষ্কার রাখার কারণ বলেছিলেন : فإنك لا تدري أين باتت يدك “তুমি জানোনা রাতে ঘুমের মধ্যে তোমার হাত কোথায় কোথায় স্পর্শ করেছিল।”  তিনি বলেছেন, النظافة من الإيمان، الطهور شطر الإيمان “পবিত্রতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা হচ্ছে ঈমানের অর্ধেক।” সেই উম্মতকে হাত ধোয়া প্রজেক্ট নিয়ে পশ্চিমের লোকেরা বাংলাদেশে আসে এবং সেমিনার করে। এখন বলা হচ্ছে, নামাযের দেশে করোনার প্রকোপ খুবই কম, মনে হয়। এই করোনা বিপর্যয় যদি ভাল কিছু রেখে যায় তা হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নতের উপর আমল।
করোনা চলে গেলেও হাত ধোয়া, গোসল করা ও পরিচ্ছন্নতা এই অভ্যাস অব্যাহত রাখতে হবে।

করোনার কথোকথা
করোনা নিয়ে কত কথা (১) ২য় বার আক্রান্ত হতে পারে তবে সম্ভাবনা কম, (২) আক্রান্ত ব্যক্তি যে পুকুরে গোসল করে সেখানে অন্যরা ৩ দিন গোসল করা একটু হলেও ঝুকিপূর্ণ, (৩) একই ঘরে আলাদা থাকা, Home Quaraintaine। আসলে No Quaraintaine কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, (৪) Wash room আলাদা ব্যবহার করতে হবে, (৫) ৬ ফুট দূর থেকে খাবার দেবে, (৬) নিজের প্রটেকশন নিয়ে রোগীর সেবা করতে হবে। প্রবাসী ফেরত এলে কথা না শুনলে ভর্ৎসনা করা যায়, তবে পেটানো ঠিক নয়, (৭) সেনাবহিনী অফিসার  ৩ দেশে ইবলা মোকাবেলা করার অভিজ্ঞতা নিয়েছে তাদেরকে কাজে লাগানো বাঞ্ছনীয়, (৮) কাজের বুয়াকে ছুটি দেওয়া আবশ্যক, (৯) টেস্ট বাড়াতে হবে, বিশেষায়িত হাসপাতাল, যেমন সংক্রামক রোগের হাসপাতালের মতো করে ছোট ছোট ইউনিট স্থাপন, (১০) আমাদের ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আছে, তা কাজে লাগাতে হবে পূর্ণমাত্রায়, (১১) ২০ লিটার পানিতে ২/৩  টেবলেট দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে পানি পান করা যেতে পারে, (১২) বাজার, হাসপাতাল, সংবাদকর্মী ইত্যাদির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াবার ফাঁক বন্ধ করতে হবে, (১৩) আবার, ডাক্তার, নার্স ও সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ, (১৪) কেবল যুবক কয়েকজন জামাত কায়েম করবেন, তবে না যাওয়াই ঝুঁকিমুক্ত। আলাদা জায়নামায ব্যবহার করা উচিত, সেজদায় বেশি সময় রাখলে নিঃশ^াস বন্ধ রাখা যায় না, (১৫) আন্যকে আক্রান্ত করার অধিকার করো নেই, এ ব্যাপারে খামখেয়ালী করলে তাকে সবাই মিলে বুঝাতে হবে।

এ লেখার উদ্দেশ্য ইসলামী নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি উভয়টিই প্রয়োজন
মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন :
يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا قُوْۤا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَارًا০
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে বাচাঁও এবং আগুন থেকে নিজেদের পরিবারকে বাঁচাও।”  হাদীসে আছে : لا ضرر ولا ضرار  “নিজের ক্ষতি নয়, অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।”
যে ব্যক্তি বিদেশ থেকে ফিরে নিজের টেস্ট করালো না ফলে অসুস্থতা বাড়ছে। সে নিজের ক্ষতি করছে, সে আশেপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সে অন্যের ক্ষতি করছে। সে যেন নিজেকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করছে এবং তার পরিবারকেও। ইসলামে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কাজেই ইসলামী নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্য বিধি মানাও ইসলাম।

আমাদের করণীয়
সাধারণভাবে সকলের জন্য: বিশ্বমানবতা আজ মহা দুর্যোগের মধ্যে পড়ে গেছে। এখন পৃথিবীর সকল মানুষ একে অন্যের ভাইবোন। পরম মমতায় একে অন্যের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে। আফ্রিকায় ৩টি দেশে ইবোলা ভাইরাস আক্রান্তদের যেভাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সাহায্য করেছিল, যেভাবে চীনারা এখন ঘর শামলিয়ে মৃত্যুপুরী ইতালিতে গিয়ে সেবা করছে। তেমনি যার যেখানে, যেভাবে মানবতার সেবা করার সুযোগ আছে তা করতে কার্পণ্য করবে না। টেলিভিশনে দুর্দশার খবর দেখেই সময় পার করা সমীচীন নয়। ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও দেশ নির্বিশেষে সকলকেই সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে নিজ নিজ দায় দায়িত্ব পালন করতে হবে। যার আলাদা থাকার কথা তার কষ্ট করে আলাদা থাকাই একটি সহযোগিতা। যে তার সেবা করছে সে দূরত্ব ও সুরক্ষা ব্যবস্থা মেনে চলাই তার পক্ষ থেকে সবাইকে সহযোগিতা। মহান আল্লাহ বলেন : وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيْعًا০
“যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে বাঁচাবে সে যেন বিশ্বের সকল মানুষকে বাঁচালো।”
ডাক্তার, নার্স, পরিবহন শ্রমিক, ড্রাইভার, ওষুধ বিক্রেতা, সরবরাহকারী, নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উৎপাদক, সরবরাহকারী, পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতা, সংবাদকর্মী, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, শিল্প কারখানার শ্রমিক, মালিক, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মুসল্লী, এক কথায় জরুরী সেবাদানকারী সরকারী, বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন জনগণ, পরস্পরকে সহযোগিতা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন : وَتَعَاوَنُوْا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوٰى  ۖ وَلَا تَعَاوَنُوْا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ০
“আর তোমরা কল্যাণকর কাজ ও সংযমী কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে, তবে পাপ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করবে না।”
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :  خير الناس من ينفع الناس“মানুষের মধ্যে সে-ই উত্তম যে মানুষের কল্যাণ করে।” – [তাবরানী, আওসাত] এ ছাড়া ধৈর্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, মহান আল্লাহ বলেছেন :
إِنَّ اللهَ مَعَ الصَّابِرِيْنَ০
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।”
وَبَشِّرِ الصَّابِرِيْنَ.
“ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন।”
আল্লাহ তা‘আলা সম্মিলিতভাবে ধৈর্য ধারণ ও সংহতির নির্দেশনা দিয়েছেন :
يَاۤ أَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوا اصْبِرُوْا وَصَابِرُوْا وَرَابِطُوْا وَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ০
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্যধারণ কর। সমিল্লিতভাবে ধৈর্যধারণ কর এবং সদা সুসংহত থাক আর আল্লাহকে ভয় কর যাতে তোমরা সফল হতে পার।”

ব্যক্তিগতভাবে করণীয়
ব্যক্তিগতভাবে করণীয় হচ্ছে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ বলেন :
وَمَا كَانَ اللهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنتَ فِيْهِمْ ۚ وَمَا كَانَ اللهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُوْنَ০
“আপনি তাদের মধ্যে আছেন এ অবস্থায় আল্লাহ তাদেরকে শাস্তি দেবার নন। আর তারা ক্ষমা প্রার্থনা করছে এ অবস্থায়ও আল্লাহ্ তাদেরকে শাস্তি দেবার নন।”
কেবল মুখে আস্তাগফিরুল্লাহ পড়লেই হবে না। আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে মহান প্রভুর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করতে হবে, তাওবা করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন :
مَنْ عَمِلَ مِنْكُمْ سُوْءًا بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابَ مِنْ بَعْدِه وَأَصْلَحَ فَأَنَّه غَفُورٌ رَّحِيْمٌ০
“তোমাদের মধ্যে কেউ অজ্ঞতাবশত যদি মন্দ কার্য করে তারপর তাওবা করে এবং সংশোধন করে সে ক্ষেত্রে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”  অপর এক আয়াতে ইস্তেগফার এর সাথে তাওবাকে উল্লেখ করে বলেছেন :
وَأَنِ اسْتَغْفِرُوْا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوْبُوْا إِلَيْهِ يُمَتِّعْكُمْ مَّتَاعًا حَسَنًا إِلٰى أَجَلٍ مُّسَمًّى وَيُؤْتِ كُلَّ ذِيْ فَضْلٍ فَضْلَه০
“আর তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার দিকে তাওবা প্রত্যাবর্তন কর তাহলে তিনি তোমাদেরকে এক নির্দিষ্ট কালের জন্য উত্তম জীবন উপভোগ করতে দেবেন এবং তিনি প্রত্যেক গুণীজনকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দান করবেন।”  [বুখারি, মুসলিম]

সাদাকাহ
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “الصدقة ترد البلاء” নফল দান বালা-মুসিবতকে প্রতিহত করে। এ সময় ব্যক্তিগতভাবে যার যা তাওফিকে কুলায় দান-সাদাকাহ করা সময় সঙ্গত হবে।

দয়া করা  
কেউ দয়াপরবশ হয়ে যদি কাউকে খাবারের যোগান দেয়, রুগ্ন ব্যক্তিকে চিকিৎসা সহায়তা দেয়, হতাশ ব্যক্তিকে মনোবল যোগায়, অসহায়কে সাহায্য করে এবং অন্যের দুঃখে দরদী হয় তাহলে আল্লাহ তাকে দয়া ও সাহায্য করবেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন : إن الله في عون العبد ما دام العبد في عون أخيه “নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তার বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ ওই বান্দাহ তার আরেক ভাইয়ের সাহায্যে ব্যাপৃত থাকে।”  إن الله رحيم على عباده الرحماء “আল্লাহ্ তো তাঁর দয়ালু বান্দাহদেরকেই দয়া করেন।” (বুখারি, মুসলিম)
বিপদে তাওবাহ করা স্রষ্টার কাছে আনত, বিনীত ও বিগলিত হয়ে দু‘আ করার পর আবার বিপদ কেটে গেলে যেন আমরা মুখ ফিরিয়ে না নেই। এই খাসলত তো আমাদের আছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَإِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فِي الْبَحْرِ ضَلَّ مَن تَدْعُوْنَ إِلَّا إِيَّاهُ ـ فَلَمَّا نَجَّاكُمْ إِلَى الْبَرِّ أَعْرَضْتُمْ ۚ وَكَانَ الْإِنسَانُ كَفُورًا০
“সমুদ্রে যখন তোমাদেরকে বিপদ স্পর্শ করে তখন শুধু আল্লাহ ব্যতীত যাদেরকে তোমরা আহ্বান করে থাক তাদেরকে তোমরা বিস্মৃত হয়ে যাও। তারপর তিনি যখন তোমাদেরকে উদ্ধার করে স্থলে আনেন তখন তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও। আর মানুষ তো অতিশয় অকৃতজ্ঞ।”
আল্লাহ তা‘আলা আবার বলেছেন :
وَإِذَا أَنْعَمْنَا عَلَى الْإِنسَانِ أَعْرَضَ وَنَأٰ بِجَانِبِه ۖ وَإِذَا مَسَّهُ الشَّرُّ كَانَ يَئُوْسًا০
“আমি যখন মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করি তখন যে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং দূরে সরে যায় আবার যখন তাকে অনিষ্ট স্পর্শ করলে সে একেবারে হতাশ হয়ে পড়ে।”
কাজেই এস্তেগফার ও তাওবা এর পর তা ভুলে না গিয়ে সদা ক্ষমা চেয়ে যেতে হবে। এস্তেগফারের সেরা দু‘আ হচ্ছে :
اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّيْ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِيْ وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلٰى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوْءُ لَكَ بِذَنْبِيْ؛ فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّه لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ إِلَّا أَنْتَ০
কাজেই বিপদ বিপর্যয়ে মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, বিপদ চলে গেলে আল্লাহকে স্মরণ রাখতে হবে।

সরকারের করণীয়
সরকারের দায়িত্ব হলো জনগণকে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও চিকিৎসা দেওয়া। Prevention & Protection দেওয়া এবং জনগনকে সচেতন করা। প্রয়োজনীয় সুবিধাদি (Provision) নিশ্চিত করা। সরকার সবই করছেন। কেউ কেউ বলে থাকেন সরকারের উচিৎ ছিল এটা করা, ওটা করা। আসলে আগে থেকে সব জানা যায় না। তবে সরকারকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে Proactive কাজ করতে হবে। সরকার সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীদেরকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। আমাদের সদাশয় সরকার সবই করছেন। ড. মীরজাদী মনে হয় বাড়িতেও যায় না। তাজা খবর দিয়ে যাচ্ছেন।  ডা. আব্দুল্লাহ মূল্যবান পরামর্শ ও সাহস দিয়ে যাচ্ছেন। সমাজে কিছু নন্দলালও আছেন। এখন পর্যন্ত আমার মনে হয়, সরকার সঠিক পথে এগুচ্ছে। ইন্টারনেট ও টিভি চ্যানেলের কল্যাণে পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারি। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও চলছে। সশস্ত্রবাহিনী নেমে গেছে। সরকার প্রধান৭২৭৫০  হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সতের লক্ষ টন খাদ্যশস্য মওজুদ আছে। আলু-পেয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। এক কথায় শেখ হাসিনার সরকার সম্ভাব্য সর্বোত্তম কাজটি করে যাবেন। এ সময় এটা আমাদের বিশ^াস আছে।
কেউ বলছে করোনায় মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেবে, কেউ বলে তায়াম্মুম করাবে। এখানে কেন্দ্রীয় কোন সিদ্ধান্তের ফোরাম নেই। অথচ OIC ফিকহ একাডেমিকে এ ব্যাপারে আমরা একটি Reference হিসেবে নিতে পারি।
আমি মনে করি যথাযথ সুরক্ষা গ্রহণ করে গোসল দেওয়া বাঞ্ছনীয়। রোগীর চিকিৎসা ও সেবা করা গেলে মৃত রোগীকে গোসল করানো যাবে না কেন? পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। মৃতেরও অধিকার আছে, সম্মান আছে।
দেশের প্রখ্যাত আলেমদের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। আশা করি, এই প্রবন্ধটির মাধ্যমে ধর্মীয় দিক নিদের্শনার প্রয়োজনীয়তা প্রতিভাত হবে।
বিপদ-আপদ, জান-মালের ক্ষতি যে একটি পরীক্ষা, এটি মুসলমানদের পক্ষপাতমূলক, আত্মশ্লাঘা নয়। আল্লাহ বলেছেন
وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوْعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِيْنَ ، الَّذِيْنَ إِذَاۤ أَصَابَتْهُمْ مُّصِيْبَةٌ قَالُوْۤا إِنَّا لِلّٰهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُوْنَ০
“আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করি কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফসলের ক্ষয়-ক্ষতি দ্বারা। তবে ধৈর্যশীলদের আপনি সুসংবাদ দিন। যারা তাদের ওপর বিপদ আপতিত হলে বলে আমরা তো আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চিতভাবেই তার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী।”
أُولٰٓئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولٰٓئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ.
“এরাই তারা যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষিত হয়। আর এরাই সৎপথে পরিচালিত।”
এ আয়াতগুলো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষায় পাশ করলেই মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। মু’মিন যদি বিপদে ধৈর্যধারণ করে মরেও যায় তাহলেও সে মর্যাদা পায়। নিশ্চেষ্ট বসে থাকা ধৈর্য নয়; বরং মহান লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থাকাই হচ্ছে সবর। নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাই ঈমানী ও নাগরিক এবং মানবিক দায়িত্ব পালন করব। তাহলে আমরা লাভ করব মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত।
মহান আল্লাহর নিকট সেই দু‘আটি করছি -যা ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে তালুত বাহিনী জালুত বাহিনীর সম্মুখীন হয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে করেছিল:
رَبَّنَاۤ أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَّثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِيْنَ০
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্য দান করুন, আমাদের পদসমূহ অবিচলিত রাখুন এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য দান করুন।”

লেখক: অধ্যাপক, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
স্থায়ী প্রতিনিধি- OIC আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিক্হ একাডেমী।