দরসে কোরআন

0

দরসে কোরআন -হাফেয কাজী আবদুল আলীম রিজভী
আল্লাহ্র নামে আরম্ভ, যিনি পরম দয়ালু, করুণাময়

عَسَى اللهُ أَن یَجۡعَلَ بَیۡنَكُمۡ وَبَیۡنَ الَّذِینَ عَادَیۡتُم مِّنۡهُم مَّوَدَّة وَاللهُ قَدِیر وَاللهُ غَفُوررَّحِیم (٨7)٧ لَّا یَنۡهَىٰكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِینَ لَمۡ یُقَـٰتِلُوكُمۡ فِی الدِّینِ وَلَمۡ یُخۡرِجُوكُم مِّن دِیَـٰرِكُمۡ أَن تَبَرُّوهُمۡ وَتُقۡسِطُوۤا۟ إِلَیۡهِمۡۚ إِنَّ اللهَ یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِینَ (٨8) إِنَّمَا یَنۡهَىٰكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِینَ قَـٰتَلُوكُمۡ فِی الدِّینِ وَأَخۡرَجُوكُم مِّن دِیَـٰرِكُمۡ وَظَـٰهَرُوا۟ عَلَىٰۤ إِخۡرَاجِكُمۡ أَن تَوَلَّوۡهُمۡۚ وَمَن یَتَوَلَّهُمۡ فَأُو۟لَـٰۤىِٕكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ (٩9) یَـٰۤأَیُّهَا ٱلَّذِینَ ءَامَنُوۤا۟ إِذَا جَاۤءَكُمُ ٱلۡمُؤۡمِنَـٰتُ مُهَـٰجِرَ ٰت فَٱمۡتَحِنُوهُنَّۖ اللهُ أَعۡلَمُ بِإِیمَـٰنِهِنَّۖ فَإِنۡ عَلِمۡتُمُوهُنَّ مُؤۡمِنَـٰت فَلَا تَرۡجِعُوهُنَّ إِلَى ٱلۡكُفَّارِۖ لَا هُنَّ حِلّ لَّهُمۡ وَلَا هُمۡ یَحِلُّونَ لَهُنَّۖ وَءَاتُوهُم مَّاۤ أَنفَقُوا۟ۚ وَلَا جُنَاحَ عَلَیۡكُمۡ أَن تَنكِحُوهُنَّ إِذَاۤ ءَاتَیۡتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّۚ وَلَا تُمۡسِكُوا۟ بِعِصَمِ ٱلۡكَوَافِرِ وَسۡـَٔلُوا۟ مَاۤ أَنفَقۡتُمۡ وَلۡیَسۡـَٔلُوا۟ مَاۤ أَنفَقُوا۟ۚ ذَ ٰلِكُمۡ حُكۡمُ ٱللَّهِ یَحۡكُمُ بَیۡنَكُمۡۖ وَٱللَّهُ عَلِیمٌ حَكِیم(10)

তরজমা ঃ অদূর ভবিষ্যতে আল্লাহ তোমাদের মধ্যে (অর্থাৎ মুমিনদের মধ্যে) ও তাদের (অর্থাৎ কাফিরদের) মধ্যে যারা তোমাদের শত্রু, বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দিবেন। এবং আল্লাহ ক্ষমতাবান। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়। ( হে মুমিন!) আল্লাহ তোমাদের কে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে ও তাদের প্রতি সুবিচার করতে বারণ করেন না, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে দ্বীনের কারণে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত করেনি। নিশ্চয় ন্যায় বিচারকগণ আল্লাহর প্রিয়। আল্লাহ তোমাদেরকে তাদেরই সাথে বন্ধুত্ব করতে বারণ করেন, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে ধর্মের কারণে যুদ্ধ করেছে, অথবা তোমাদেরকে তোমাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে অথবা তোমাদেরকে বহিষ্কার করতে (অন্যান্যদেরকে) সাহায্য করেছে। আর যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে , সুতরাং তারাই জালিম। হে মুমিনগণ! যখন তোমাদের কাছে মুমিন নারীরা হিজরত করে আগমন করে তখন তাদেরকে পরীক্ষা করো। আল্লাহ তাদের ঈমান সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। অতঃপর যদি তোমরা জানতে পারো যে, তারা ঈমানদার, তবে তাদেরকে কাফিরদের নিকট ফেরত দিওনা। না এরা (অর্থাৎ মুমিন নারীরা) তাদের জন্য হালাল, না তারা (অর্থাৎ কাফের পুরুষরা) এদের জন্য হালাল। এবং তাদেরকে (অর্থাৎ কাফের স্বাক্ষীদের কে) দিয়ে দাও। যা তারা ব্যয় করেছে। এবং তোমাদের উপর কোন গুনাহ নেই, তাদেরকে বিবাহ করে নিলে। যখন তাদের মহর তাদেরকে দিয়ে দাও। তোমরা কাফের নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না। তোমরা চেয়ে নাও, যা তোমরা ব্যয় করেছ এবং তারাও চেয়ে নিবে (অর্থাৎ কাফেররা) যা তারা ব্যয় করেছে। এটা আল্লাহর বিধান। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। [৭-১০ নং আয়াত, সূরা আল-মুমতাহিনাহ]

আনুষঙ্গিক আলোচনা ঃ
لَّا يَنْهَىٰكُمُ ٱللَّهُ عَنِ ٱلَّذِينَ لَمْ يُقَٰتِلُوكُمْ فِى ٱلدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَٰرِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوٓا۟ إِلَيْهِمْ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ
এর শানে নুযুল ঃ
উদ্ধৃত আয়াতের শানে নুযুল বর্ণনায় মুফাসসেরীনে কেরাম উল্লেখ করেছেন-বনু খোযাআ্হ প্রসঙ্গে আয়াতখানা অবতীর্ণ হয়েছে। যারা কাফের-মুশরিক হওয়া সত্ত্বেও রহমতে আলম নূরে মুজাস্সাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে এ মর্মে সন্ধিতে আবদ্ধ হয়েছিল যে, আমরা আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করবো না, এবং আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী কোন গোত্রকে সাহায্য করবো না। মহান আল্লাহ উপরিউক্ত আয়াত নাযিল করে মুমিনদেরকে তাদের সাথে সদ্ব্যাবহার করার অনুমতি প্রদান করেন।
ছহীহ বুখারী শরীফ ও মুসনাদে আহমদ এর রেওয়ায়তে রয়েছে হযরত আসমা বিনতে আবী বকর রাদিয়াল্লাহু আনহার মা কবীলা বিনতে আব্দুল উয্যা হুদায়বিয়ায় সন্ধি হওয়ার পর কাফের অবস্থায় মক্কা মুকাররমা হতে মদিনা মুনাওয়ারায় পৌছেন। তিনি কন্যা আসমার জন্য কিছু উপঢৌকনও সঙ্গে নিয়ে আসেন। কিন্তু হযরত আসমা উক্ত উপঢৌকন গ্রহণ না করে এ প্রসঙ্গে রাসূলে আকরম এর নিকট আরজ করেন। ওহে আল্লাহর হাবীব! আমি তার সাথে কিরূপ ব্যবহার করবো?
জবাবে আল্লাহর রাসূল এরশাদ করলেন صِلِيها অর্থাৎ তার সাথে সদ্ব্যবহার করো।
কোন কোন বর্ণনায় আছে-হযরত আসমা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহার মাতা কবীলা কে সাইয়েদুনা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম পূর্বকালেই তালাক দিয়েছিলেন। উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা সাইয়্যেদুনা ছিদ্দিকে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর অপর স্ত্রী হযরত উম্মে রোমান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর গর্ভজাত ছিলেন। আর তিনি মুসলমান হয়ে যান। [তাফসিরে ইবনে কাছীর ও মাযহারী] উল্লেখ থাকে যে, ভালবাসা এক বিষয় আর ভালো ব্যবহার ও সদাচার করা অন্য বিষয়। মুহাব্বত ও ভালবাসা তো কোন কাফিরদের সাথে কোন অবস্থায় জায়েয নেই। বরং সম্পূর্নরূপে হারাম। তবে যেসব কাফের মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কারে অংশগ্রহণে করেনি, আলোচ্য আয়াতে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার ও ন্যায়বিচার করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ন্যায় ও সুবিচার তো ইসলামের সৌন্দর্য ও অলংকার। সকল সৃষ্টির সাথে এটা জরুরী। এমনকি জীব-জানোয়ারের সাথে ও সুবিচার করা ওয়াজিব। অর্থাৎ তাদের পৃষ্ঠে সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপানো যাবেনা এবং তাদের আহার্য ঘাস, পানি ও বিশ্রামের প্রতি খেয়াল রাখা অপরিহার্য।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا جَآءَكُمُ ٱلْمُؤْمِنَٰتُ الي الاخر
উপরোক্ত আয়াতের মর্মবাণীর ব্যাখ্যায় মুফাসসেরীনে কেরাম উল্লেখ করেছেন-মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে হুকুম দিলেন যে, যেসব মুমিন নারী পবিত্র মক্কা মুয়াজ্জমা থেকে হিজরত করে তোমাদের নিকট আগমন করবে, তোমরা তাদেরকে পরীক্ষা কর, প্রকৃতপ্রস্তাবে তারা ইসলামের প্রতি বিশ^স্ত হয়ে এসেছে, না কি নিজ নিজ স্বামীর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাদের বিবাহ বন্ধন ছিন্ন করার জন্য বেরিয়ে এসেছে, অথবা গোয়েন্দাগিরি করা কিংবা মুনাফেক্বী করতঃ মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়ার জন্য এসেছে। উল্লেখ্য যে, এ পরীক্ষাকরণ মুমিনদের অবগতি ও নিরাপত্তার জন্য। আল্লাহর অবগতির জন্য নয়। তিনি তো সর্বজ্ঞ ও সর্ব বিষয়ে অবহিত। যদি তোমরা যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত হও যে, তারা সত্যিকার মুমিন হয়ে তোমাদের নিকট এসেছে, তবে তাদেরকে কাফেরদের নিকট ফেরত পাঠিয়ো না। কেননা, لَا هُنَّ حِلٌّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ(অর্থাৎ আল্লাহ বলেন)- না তারা তাদের (কাফের স্বামীদের জন্য) হালাল, না তারা (অর্থাৎ কাফের স্বামীরা) এদের জন্য হালাল কারণ, ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথে তাদের পূর্ববর্তী বিবাহ-বন্ধন বাতিল হয়ে গেছে। অতএব, তার উপর ইদ্দত পালন করা ওয়াজিব বা অপরিহার্য নয়। ঈমান আনয়ন করার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া জায়েজ। অবশ্য যদি গর্ভবতী হয় তবে গর্ভস্থ সন্তান প্রসব করা ও রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়া পর্যন্ত যৌন-সঙ্গম করবে না। [খাযায়েনুল ইরফান ও নূরুল ইরফান শরীফ]

মুসলিম ও কাফের-মুশরিকদের বিবাহ
বন্ধন অকাট্টভাবে হারাম-নিষিদ্ধ ঃ
উপরোক্ত আয়াতের মর্মবাণীর আলোকে সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, মুসলমান ও অমুসলমান কাফের-মুশরিকদের পারষ্পরিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া হারাম ও নিষিদ্ধ অকাট্টরূপে। এতে বিন্দুপরিমাণ সংশয়-সন্দেহ পোষন করাও কুফরী। (নাউজুবিল্লাহ) সূরা আল-বাক্বারায় ২২১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামীন আরো স্পষ্টভাবে এরশাদ করেছেন-
وَلَا تَنكِحُوا الْمُشْرِكَاتِ حَتَّىٰ يُؤْمِنَّ ۚ وَلَأَمَةٌ مُّؤْمِنَةٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكَةٍ وَلَوْ أَعْجَبَتْكُمْ ۗ وَلَا تُنكِحُوا الْمُشْرِكِينَ حَتَّىٰ يُؤْمِنُوا ۚ وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ وَلَوْ أَعْجَبَكُمْ ۗ أُولَٰئِكَ يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ ۖ وَاللَّهُ يَدْعُو إِلَى الْجَنَّةِ وَالْمَغْفِرَةِ بِإِذْنِهِ ۖ وَيُبَيِّنُ آيَاتِهِ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ (২২১)
অর্থাৎ (হে মুমিনগন!) আর তোমরা মুশরিক নারীদের বিয়ে করো না, যতক্ষন না তারা ঈমান আনয়ন করে, অবশ্য মুমিন ক্রীতদাসী মুশরেক নারী অপেক্ষা উত্তম, যদিও তাদেরকে তোমাদের পছন্দ হয়। এবং তোমরা (নারীরা) কোন মুশরেকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ো না, যে পর্যন্ত সে ঈমান আনয়ন না করে। আর একজন মুসলমান ক্রীতদাসও একজন মুশরেকের তুলনায় অনেক উত্তম, যদিও তোমরা তাদের প্রতি মোহিত হও। তারা (অর্থাৎ মুশরিকরা) জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে, আর আল্লাহ নিজের হুকুমে জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন। [২২১ নং আয়াত, বাক্বারা] মহান আল্লাহর উপরোক্ত বাণীর আলোকে প্রমাণিত হয় মুসলমান পুরুষের বিয়ে কাফের নারীর সাথে এবং কাফের পুরুষের বিয়ে মুসলমান নারীর সাথে হারাম ও অবৈধ। কারণ, কাফের স্ত্রী-পুরুষ মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। কেননা, বৈবাহিক সম্পর্ক পরষ্পরের ভালোবাসা, নির্ভরশীলতা এবং একাত্মতায় পরষ্পরকে আকর্ষণ করে। তা ব্যতীত এ সম্পর্কে প্রকৃত উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। আর মুশরেকদের সাথে এ জাতীয় সম্পর্কের ফলে ভালোবাসা ও নির্ভরশীলতার অপরিহার্য পরিণাম দাড়ায় যে, তাদের অন্তর কুফর ও শিরকের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি হয় অথবা কমপক্ষে কুফর ও শিরকের প্রতি ঘৃনা তাদের অন্তর থেকে উঠে যায়। এর পরিণামে শেষ পর্যন্ত সেও কুফর ও শেরকের প্রতি জড়িয়ে পড়ে যাব পরিণাম জাহান্নাম। এ জন্যই এরশাদ হয়েছে-এসব লোক জহান্নামের দিকে আহ্বান করে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকল মুমিন নর-নারীকে উপরোক্ত দরছে কোরআনের উপর আমল করে উভয় জাহানে সফলকাম হওয়ার সৌভাগ্য নসীব করুন। আমীন