লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ সর্বোত্তম যিকর

0

‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সর্বোত্তম যিকর-
সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী >

যিক্র মানে স্বরণ করা, মনে করা, উল্লেখ করা, বর্ণনা করা। আর শরীয়তের আলোকে যিক্র বলা হয়, মুখে বা অন্তরে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা এবং প্রশংসা করা। আল্লাহ তাআলার যিক্র এমন এক মজবুত রজ্জু যা সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করে। তাঁর সান্নিধ্য লাভের পথ সুগম করে। মানুষকে উত্তম আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত করে। সরল ও সঠিক পথের উপর অবিচল রাখে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদেরকে দিবা-রাত্রে গোপনে-প্রকাশ্যে যিক্র করার আদেশ দিয়েছেন এবং তিনি তাঁর যিকিরকারীদের প্রশংসা করেছেন ও তাদের জন্য পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন।  আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,
يا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا * وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلً
“হে ঈমানদারগণ বেশী বেশী করে আল্লাহ যিকির কর এবং সকাল সন্ধ্যা তাঁর তাসবীহ পাঠ কর। (সূরা আল-আহযাব, ৪১-৪২) আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,
فَاذْكُرُوْنِيْٓ اَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوْا لِيْ وَلَا تَكْفُرُوْنِ
“অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করব। আর তোমরা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর এবং আমার প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ো না।” [বাক্বারাহ-১৫২] وَالذّٰكِرِيْنَ اللّٰهَ كَثِيْرًا وَّالذّٰكِرٰتِ ۙ اَعَدَّ اللّٰهُ لَهُمْ مَّغْفِرَةً وَّاَجْرًا عَظِيْمًا
“আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণকারী পুরুষ ও নারী: আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও বিরাট পুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। [আহযাব-৩৫]।” আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,
وَاذْكُرْ رَّبَّكَ فِيْ نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَّخِيْفَةً وَّدُوْنَ الْجَــهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْاٰصَالِ وَلَا تَكُنْ مِّنَ الْغٰفِلِيْنَ
“আর আপনি আপনার রব্বকে স্মরণ করুন মনে মনে, মিনতি ও ভীতিসহকারে, অনুচ্চস্বরে; সকালে ও সন্ধ্যায়। আর উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।”[আ’রাফ-২০৫] তিনি আমাদেরকে যেমনিভাবে সর্বাবস্থায় তাঁর যিকির করতে নির্দেশ দিয়েছেন। অনুরূপ বিভিন্ন ইবাদত সম্পন্ন করার পরও তাঁর যিকির করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,
فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلَاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمْ ۚ
“অতঃপর তোমরা যখন সালাত সমাপ্ত কর তখন দন্ডায়মান, উপবিষ্ট ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহর যিকির কর’’। (সূরা আন্ নিসা, ১০৩)  আল্লাহ্ আরো এরশাদ করেন,
فَإِذَا قَضَيْتُم مَّنَاسِكَكُمْ فَاذْكُرُوا اللَّهَ كَذِكْرِكُمْ آبَاءَكُمْ أَوْ أَشَدَّ ذِكْرًا ۗ
‘‘আর যখন তোমরা হজ্জের যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি সমাপ্ত করবে তখন আল্লাহর যিকির করবে, যেমন করে স্মরণ করতে তোমাদের পিতৃপুরুষদেরকে, বরং (আল্লাহকে) এর চেয়েও বেশী স্মরণ করবে’’। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২০০)
বিশেষ করে হজ্জ পালনের সময় তাঁর যিকির করার জন্য বলেন,
فَإِذَا أَفَضْتُم مِّنْ عَرَفَاتٍ فَاذْكُرُوا اللَّهَ عِندَ الْمَشْعَرِ الْحَرَامِ ۖ
“অতঃপর যখন আরাফাত থেকে তোমরা ফিরে আসবে তখন (মুযদালেফায়) মাশ্আরে হারাম এর নিকট আল্লাহ্র যিকির কর। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ১৯৮) তিনি আরো এরশাদ করেন,
وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَّعْلُومَاتٍ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُم مِّن بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ۖ
“এবং তারা যেন নির্দিষ্ট দিনগুলিতে আল্লাহ্ তাদেরকে চতুস্পদ জন্তুর মধ্য থেকে যে সমস্ত রিযক দিয়েছেন তার উপর আল্লাহ্র নাম স্মরণ করে। (সূরা-আল-হাজ্জ, ২৮)
তিনি আরো এরশাদ করেন,  وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَعْدُودَاتٍ “আর এই নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েক দিনে আল্লাহর যিকির কর”। (সূরা আল-বাক্বারাহ, ২০৩)
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الحَيِّ وَالمَيِّتِ.
“যে ব্যক্তি তার রবের যিক্র (স্মরণ) করে, আর যে ব্যক্তি তার রবের যিক্র করে না তারা যেন জীবিত আর মৃত”( ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,
‏”‏أَلاَ أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَأَزْكَاهَا عِنْدَ مَلِيكِكُمْ وَأَرْفَعِهَا فِي دَرَجَاتِكُمْ وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ إِنْفَاقِ الذَّهَبِ وَالْوَرِقِ وَخَيْرٌ لَكُمْ مِنْ أَنْ تَلْقَوْا عَدُوَّكُمْ فَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ وَيَضْرِبُوا أَعْنَاقَكُمْ ‏”‏ ‏.‏ قَالُوا بَلَى ‏.‏ قَالَ ‏”‏ ذِكْرُ اللَّهِ تَعَالَى ‏”
“আমি কি তোমাদেরকে তা জানাবো না আমলের মধ্যে যা সর্বোত্তম, তোমাদের মালিক (আল্লাহ্র) কাছে যা অত্যন্ত পবিত্র, তোমাদের জন্য যা অধিক মর্যাদা বৃদ্ধিকারী, (আল্লাহ্র পথে) সোনা-রূপা ব্যয় করার তুলনায় যা তোমাদের জন্য উত্তম এবং তোমরা তোমাদের শত্রুদের মুখোমুখি হয়ে তাদেরকে হত্যা এবং তারা তোমাদের হত্যা করার চাইতেও অধিকতর শ্রেষ্ঠ?” সাহাবীগণ বললেন, অবশ্যই হ্যাঁ। তিনি বললেন, “আল্লাহ্ তা‘আলার যিক্র”( )। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رضى الله عنه ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَقُولُ اللهُ عز وجل : أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي، وَأَنَا مَعَهُ حِينَ يَذْكُرُنِي، إِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ، ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَإٍ، ذَكَرْتُهُ فِي مَلَإٍ هُمْ خَيْرٌ مِنْهُمْ، وَإِنْ تَقَرَّبَ مِنِّي شِبْرًا، تَقَرَّبْتُ إِلَيْهِ ذِرَاعًا، وَإِنْ تَقَرَّبَ إِلَيَّ ذِرَاعًا، تَقَرَّبْتُ مِنْهُ بَاعًا، وَإِنْ أَتَانِي يَمْشِي أَتَيْتُهُ هَرْوَلَةً. ( )
“আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেরূপ ধারণা করে, আমাকে সে তদ্রূপই পাবে; আর যখন সে আমাকে স্মরণ করে, তখন আমি তার সাথে থাকি। সুতরাং যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে, আমিও আমার মনে তাকে স্মরণ করি। আর যদি সে কোনো সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে এর চাইতে উত্তম সমাবেশে স্মরণ করি। আর সে যদি আমার দিকে এক বিঘত পরিমাণ নিকটবর্তী হয়, তাহলে আমি তার দিকে এক হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হই। সে এক হাত পরিমাণ নিকটবর্তী হলে আমি তার দিকে এক বাহু পরিমাণ নিকটবর্তী হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দ্রুতবেগে যাই।”( )
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন বুসর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি আরয করল,
يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ شَرَائِعَ الإِسْلاَمِ قَدْ كَثُرَتْ عَلَىَّ فَأَخْبِرْنِي بِشَيْءٍ أَتَشَبَّثُ بِهِ.‏ قَالَ:لاَ يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ ‏
ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইসলামের বিধিবিধান আমার জন্য বেশি হয়ে গেছে। কাজেই আপনি আমাকে এমন একটি বিষয়ের খবর দিন, যা আমি শক্ত করে আঁকড়ে ধরব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা জিহ্বা যেনো সর্বক্ষণ আল্লাহ্র যিক্রে সজীব থাকে”( )। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,
مَا مِنْ قَوْمٍ يَقومونَ منْ مَجْلسٍ لاَ يَذكُرُون الله تَعَالَى فِيهِ إِلاَّ قَاموا عَنْ مِثلِ جيفَةِ حِمَارٍ وكانَ لَهُمْ حَسْرَةً
“যদি কোনো একদল লোক এমন কোনো বৈঠক থেকে উঠল, যেখানে তারা আল্লাহ্র নাম স্মরণ করেনি, তবে তারা যেন গাধার লাশের কাছ থেকে উঠে আসল। আর এরূপ মজলিস তাদের জন্য আফসোসের কারণ হবে”।( )
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,
مَا جَلَسَ قَومٌ مَجْلِسًا لَمْ يَذْكرُوا الله تَعَالَى فِيهِ ولَم يُصَّلُّوا عَلَى نَبِيِّهم فِيهِ إلاَّ كانَ عَلَيّهمْ تِرةٌ، فإِنْ شاءَ عَذَّبَهُم، وإنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُم
“যদি কোনো দল কোনো বৈঠকে বসে আল্লাহ্র যিক্র না করে এবং তাদের নবীর ওপর দরূদও পাঠ না করে, তাহলে তাদের সেই বৈঠক তাদের জন্য কমতি ও আফসোসের কারণ হবে। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদেরকে শাস্তি দেবেন, অথবা তিনি চাইলে তাদের ক্ষমা করবেন।”( )
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও এরশাদ করেন,
مَنْ قعَدَ مَقْعَدًا لَمْ يَذْكُرِ الله تَعَالَى فِيهِ كَانَت عَلَيْهِ مِنَ اللهِ ترَة، وَمَن اضطجَعَ مُضْطَجَعًا لا يَذْكرُ الله تَعَالَى فِيهِ كَاَنتْ عَليْه مِنَ اللهِ تِرَةٌ
“যে ব্যক্তি এমন কোনো বৈঠকে (মজলিসে) বসেছে যেখানে সে আল্লাহ্র যিক্র করে নি, তার সে বসাই আল্লাহ্র নিকট থেকে তার জন্য আফসোস ও নৈরাশ্যজনক হবে। আর যে ব্যক্তি এমন কোনো শয়নে শুয়েছে যেখানে সে আল্লাহ্র যিক্র করে নি, তার সে শোয়াই আল্লাহ্র নিকট থেকে তার জন্য আফসোস ও নৈরাশ্যজনক হবে।”( )
যিকরের উপকারিতা
১- ইহকাল ও পরকালে অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতা লাভ: আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
الَّذِينَ آَمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের চিত্ত প্রশান্ত হয় ; জেনে রাখ, আল্লাহর স্মরণেই চিত্ত প্রশান্ত হয়। (সূরা রাদ : ২৮)
২- আল্লাহর যিক্র সবচেয়ে বড় ও সর্বোত্তম ইবাদত: কেননা আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করা হচ্ছে ইবাদতের আসল লক্ষ্য। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,  وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تَصْنَعُونَ আর আল্লাহর স্মরণই তো সর্বশ্রেষ্ঠ। তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন। [সূরা আনকাবুত ৪৫] ৩- আল্লাহর যিক্রকারীই বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন: আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,
إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآَيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ * الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ
আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলী রয়েছে বোধশক্তি সম্পন্ন লোকের জন্য, যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহর স্মরণ করে। [সূরা আলে -ইমরান ১৯০- ১৯১] ৪- আল্লাহর যিক্র সুরক্ষিত দুর্গ: বান্দা এ-দ্বারা শয়তান থেকে রক্ষা পায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, হযরত ইয়াহইয়া বিন যাকারিয়া আলাইহিমাস সালাম ইসরাঈল-তনয়দেরকে বলেছেন,
وَآمُرُكُمْ أَنْ تَذْكُرُوا اللَّهَ فَإِنَّ مَثَلَ ذَلِكَ كَمَثَلِ رَجُلٍ خَرَجَ الْعَدُوُّ فِي أَثَرِهِ سِرَاعًا حَتَّى إِذَا أَتَى عَلَى حِصْنٍ حَصِينٍ فَأَحْرَزَ نَفْسَهُ مِنْهُمْ كَذَلِكَ الْعَبْدُ لاَ يُحْرِزُ نَفْسَهُ مِنَ الشَّيْطَانِ إِلاَّ بِذِكْرِ اللَّهِ ‏”‏
এবং আমি তোমাদেরকে আল্লাহর যিক্রের আদেশ দিচ্ছি, কারণ এর তুলনা এমন এক ব্যক্তির ন্যায় যার পিছনে দুশমন দৌড়ে তাড়া করে ফিরছে, সে সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করে নিজকে রক্ষা করেছে। অনুরূপ, বান্দা আল্লাহর যিক্রের মাধ্যমে শয়তান থেকে সুরক্ষা পায়। ( )
৫- যিক্র মানুষের ইহকাল ও পরকালের মর্যাদা বৃদ্ধি করে : হযরত আবু হুরাইরা বলেন:
كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، يَسِيرُ فِي طَرِيقِ مَكَّةَ فَمَرَّ عَلَى جَبَلٍ يُقَالُ لَهُ جُمْدَانُ ، فَقَالَ: سِيرُوا هَذَا جُمْدَانُ سَبَقَ الْمُفَرِّدُونَ قَالُوا : وَمَا الْمُفَرِّدُونَ ؟ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ : الذَّاكِرُونَ اللَّهَ كَثِيرًا، وَالذَّاكِرَاتُ
মক্কার একটি রাস্তায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাঁটছিলেন। জুমদান নামক পাহাড় অতিক্রম করার সময় বললেন: তোমরা চল, এটা জুমদান। মুফাররাদুন অর্থাৎ একক গুণে গুণান্বিতরা এগিয়ে গেছে তিনি জিজ্ঞেস করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ মুফাররদূন অর্থাৎ একক গুণে গুণান্বিত কারা? জওয়াবে তিনি বললেন: আল্লাহকে বেশি করে স্মরণকারী নারী-পুরুষ। ( )
৬- যিক্রের কারণে ইহকাল ও পরকালে জীবিকা বৃদ্ধি পায়: আল্লাহ তাআলা নূহ আলাইহিস সালামের কথা বিবৃত করে এরশাদ করেন,
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا * يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا * وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا *
বলেছি, তোমাদের প্রতিপালকের ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি তো মহা ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত করবেন। তিনি তোমাদেরকে সমৃদ্ধ করবেন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে এবং তোমাদের জন্য স্থাপন করবেন উদ্যান ও প্রবাহিত করবেন নদী-নালা। [সূরা নূহ-১০-১২] উল্লেখ্য যে, ইস্তিগফার যিক্রের বিশেষ প্রকার হিসেবে বিবেচিত।
لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ এর ফযীলত:
لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ’র রয়েছে মহান ফযীলত, অনেক মর্যাদা ও বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা কারো পক্ষেই অনুসন্ধান করে শেষ করা সম্ভব নয়। কারণ, এ বাক্যটি সর্বোত্তম, সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে মহান। এটি একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য, হাতেগোনা কয়েকটি বর্ণ এবং শব্দের সমারোহ মাত্র, উচ্চারণেও অতি সহজ কিন্তু কিয়ামতের দিন মীযানের পাল্লায় হবে অনেক ভারী। এটাই মজবুত রশি ও তাকওয়ার বাহন, দীনের মহা রুকন ও ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এ বাক্যটির দ্বারা জান্নাত লাভ হয় ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি মিলে। এটি জান্নাতের চাবি, দীনের মূল শিক্ষা, মৌলিক স্তম্ভ ও প্রধান শিরোনাম। যে ব্যক্তি সত্য-সত্যিই কায়মনোবাক্যে এ বাক্যটি পাঠ করবে আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এ বাক্যটির ফযীলত ও মর্যাদা যেভাবে মূল্যায়ন করা হোক, জ্ঞানীরা তা থেকে যত জ্ঞান আহরণ করুক, কারো পক্ষেই তা পূর্ণরূপে আয়ত্ত করা সম্ভব নয়।  আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন,
شَهِدَ ٱللَّهُ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَأُوْلُواْ ٱلۡعِلۡمِ قَآئِمَۢا بِٱلۡقِسۡطِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ
“আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, আর মালায়েকা ও জ্ঞানীগণও (সাক্ষ্য দেন) ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৮] আল্লাহ তা‘আলা এ বাক্যটিকে কুরআনুল কারীমে তায়্যিবাহ বা পবিত্র বলে গুণান্বিত করেছেন। তিনি এরশাদ করেন,
أَلَمۡ تَرَ كَيۡفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلٗا كَلِمَةٗ طَيِّبَةٗ كَشَجَرَةٖ طَيِّبَةٍ أَصۡلُهَا ثَابِتٞ وَفَرۡعُهَا فِي ٱلسَّمَآءِ * تُؤۡتِيٓ أُكُلَهَا كُلَّ حِينِۢ بِإِذۡنِ رَبِّهَاۗ وَيَضۡرِبُ ٱللَّهُ ٱلۡأَمۡثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ يَتَذَكَّرُونَ.
“তুমি কি দেখ না, আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? কালেমা তাইয়্যেবাহ, যা একটি ভালো বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল সুস্থির আর শাখা-প্রশাখা আকাশে। সেটি তার রবের অনুমতিতে সব সময় ফল দান করে, আর আল্লাহ মানুষের জন্য নানা দৃষ্টান্ত প্রদান করেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে”। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৪-২৫] আল্লাহ তা‘আলা এ বাক্যটিকে কুরআনুল কারীমে সুদৃঢ় বাণী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি এরশাদ করেন,
يُثَبِّتُ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ بِٱلۡقَوۡلِ ٱلثَّابِتِ فِي ٱلۡحَيَوٰةِ ٱلدُّنۡيَا وَفِي ٱلۡأٓخِرَةِۖ وَيُضِلُّ ٱللَّهُ ٱلظَّٰلِمِينَۚ وَيَفۡعَلُ ٱللَّهُ مَا يَشَآءُ
“আল্লাহ অবিচল রাখেন ইমানদারদেরকে সুদৃঢ় বাণী দ্বারা দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে। আর আল্লাহ যালিমদের পথভ্রষ্ট করেন এবং আল্লাহ যা ইচ্ছা তা করেন”। [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৭] তাই, ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র ফযীলত কারো পক্ষে গণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়, কারণ তার ওপর নির্ভর করে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা, প্রতিদান ও সাওয়াব, তাই তার সব অর্থ কারো অন্তরে উদয় হওয়া বা কল্পনায় আসা সম্ভব নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
مَنْ قَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَكَفَرَ بِمَا يُعْبَدُ مَنْ دُونِ اللهِ، حَرُمَ مَالُهُ، وَدَمُهُ، وَحِسَابُهُ عَلَى اللهِ
“যে ব্যক্তি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ এর স্বীকৃতি দান করল এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সব উপাস্যকে অস্বীকার করল, তার ধন-সম্পদ ও জীবন নিরাপদ হল এবং তার কৃতকর্মের হিসাব আল্লাহর উপর বর্তাল। ( )
একজন কাফেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বানের জন্য প্রথম এই কালেমার স্বীকৃতি চাওয়া হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন হযরত মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামানে ইসলামের দাওয়াতের জন্য পাঠান তখন তাঁকে বলেন,    إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ، فَادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ
তুমি আহলে কিতাবের নিকট যাচ্ছ, অতএব সর্বপ্রথম তাদেরকে ‘‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’’ এর সাক্ষ্য দান করার জন্য আহবান করবে।( )
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
يَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ شَعِيرَةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ بُرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ، وَيَخْرُجُ مِنَ النَّارِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَفِي قَلْبِهِ وَزْنُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ
“যে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলেছে এবং তার অন্তরে যবের ওজন পরিমাণ কল্যাণ রয়েছে সে জাহান্নাম থেকে বের হবে। জাহান্নাম থেকে সেও বের হবে, যে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলেছে এবং তার অন্তরে গম পরিমাণ কল্যাণ রয়েছে। আবার জাহান্নাম থেকে সেও বের হবে, যে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলেছে এবং তার অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান রয়েছে”।( )
এ কালেমাকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈমানের সর্বোত্তম শাখা বলেছেন। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ شُعْبَةً، أعلاها قَوْلُ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
“ঈমান সত্তরের অধিক শাখা সংবলিত। সর্বোত্তম শাখা হলো লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা, আর তার সর্বনিম্ন শাখা রাস্তা থেকে কষ্ট দূর করা”।( ) অপর আয়াতে তিনি বলেন, فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ “জেনে রাখ যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই”। [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯] হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি আল্ল¬াহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আরয করলাম,
قَالَ أَبُو بَكْرٍ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا نَجَاةُ هَذَا الْأَمْرِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: “مَنْ قَبِلَ مِنِّي الْكَلِمَةَ الَّتِي عَرَضْتُ عَلَى عَمِّي، فَرَدَّهَا عَلَيَّ، فَهِيَ لَهُ نَجَاةٌ”
‘এয়া রাসূলাল্লাহ! এই দ্বীনে মুক্তির বিশেষ উপায়টা কী’। তিনি বললেন, ‘যে আমার আহবানে আমার আনীত ঐ কালেমা (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) কবুল করবে, যা আমি পেশ করেছিলাম আমার চাচা (আবু তালিবের) কাছে (তার অন্তিম শয্যায়) আর তিনি তা কবুল না কওে প্রত্যাখান করেছিলেন, ঐ কালেমাই কবুলকারীর জন্য মুক্তির মূলমন্ত্র। ( )
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে যিকিরের নির্দেশ দিতেন, তার শীর্ষে রয়েছে: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ যিকির। চাচা আবু তালিবের মৃত্যুর সময় তিনি এ কালেমাই পেশ করেছেন, তিনি বলেছেন:
يَا عَمِّ، قُلْ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ كَلِمَةً أَشْهَدُ لَكَ بِهَا عِنْدَ اللَّهِ
“হে আমার চাচা, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ একটি বাক্য বলুন, এটা দিয়ে আমি আল্লাহর সামনে আপনার জন্য সুপারিশ করব”।( )  অপর হাদীসে তিনি বলেন,
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ، عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ، وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ
“আমাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে, আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করব, যতক্ষণ না তারা বলে: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ (আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল) যখন এটা তারা বাস্তবায়ন করবে, আমার থেকে তাদের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ করে নিবে, তবে কালেমার হক ব্যতীত এবং তাদের হিসেব আল্লাহর ওপর”।( )
لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ সর্বোত্তম যিকর:
لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ সর্বোত্তম যিকর। এ যিকির দ্বারা ঈমান তাজা হয় কারণ এতে আল্লাহ তাআলার বন্দেগীর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত হয়। সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি নিবিষ্ট এবং তাঁর মুহাব্বত ও ভালোবাসায় নিমগ্ন থাকার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। সুতরাং যত গভীর ধ্যান ও পরম উপলব্ধির সঙ্গে আমরা বেশী বেশী এই কালিমার যিকির করবো, নিশ্চিতভাবে আমাদের ঈমান সে পরিমাণ তাজা হতে থাকবে, ঈমানের মজবুতি ততই বাড়তে থাকবে ইনশাআল্লাহ। এভাবে এক সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’এর যিকিরই আমাদের সর্বক্ষণের আমল হয়ে যাবে এবং এর দাবী অনুযায়ী জীবন যাপন আমাদের বৈশিষ্ট্যে পরিণত হবে। তাই একে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বোত্তম যিকির হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন,  أَفْضَلُ الذِّكْرِ: لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ، وأَفْضَلَ الدُّعَاءِ: الْحَمْدُ لِلَّهِ “সর্বোত্তম যিকির: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ ও সর্বোত্তম দো‘আ: আল-হামদুলিল্লাহ”।( )
এ কালেমা যে অন্তর থেকে বলবে, কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশ লাভ করে সবচেয়ে বেশি সেই ধন্য হবে। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল, কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভ করে সবচেয়ে বেশি ধন্য কে হবে? তিনি এরশাদ করেন:
لَقَدْ ظَنَنْتُ يَا أَبَا هُرَيْرَةَ، أَنْ لَا يَسْأَلَنِي عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ أَحَدٌ أَوَّلُ مِنْكَ لِمَا رَأَيْتُ مِنْ حِرْصِكَ عَلَى الْحَدِيثِ، أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ
“হে আবু হুরায়রা, আমি ধারণা করেছি, এ হাদীস সম্পর্কে তোমার চেয়ে আগে কেউ আমাকে জিজ্ঞেস করবে না। কারণ, হাদীসের ওপর আমি তোমার আগ্রহ লক্ষ্য করেছি। কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভ করে সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান সে হবে, যে নিজের অন্তর অথবা নফস থেকে খালিসভাবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে”।( )
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
مَا قَالَ عَبْدٌ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ قَطُّ مُخْلِصًا إِلَّا فُتِحَتْ لَهُ أَبْوَابُ السَّمَاءِ حَتَّى تُفْضِيَ إِلَى الْعَرْشِ مَا اجْتَنَبَ الْكَبَائِرَ
“কোন বান্দা যখনি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ বলেছে, তখনি অবশ্যই তার জন্য আসমানের দরজাসমূহ খোলা হয়েছে, যেন তা আরশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়, যাবত সে কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে”।( )
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
‏‏ مَا مِنْ عَبْدٍ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ‏.‏ ثُمَّ مَاتَ عَلَى ذَلِكَ، إِلاَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ ‏
যে কোনো বান্দা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে আর এর উপর অটল থাকে ও এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয় সে অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে। ( )
অপর হাদীসে তিনি বলেন,  مَنْ كَانَ آخِرُ كَلَامِهِ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، دَخَلَ الْجَنَّةَ “যার সর্বশেষ বাক্য হবে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে”।( )
অপর হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
إِنِّي لأَعْلَمُ كَلِمَةً لا يَقُولُهَا عَبْدٌ عِنْدَ مَوْتِهِ إِلا وَجَدَ  رُوحَهُ  لَهَا رَوْحًا
“আমি একটি বাক্য জানি, মৃত্যুর সময় কোনো বান্দা বলবে না, তবে অবশ্যই তার অন্তর সেটার (প্রশান্তি) সুঘ্রাণ পাবে”।( )
হযরত মুয়ায রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,  مِفْتَاح الْجنَّة لَا إِلَه إلاَّ الله  ‘বেহেশতের চাবি হচ্ছে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।’ ( )
যদি আসমান ও জমিনকে এ কালেমার বিপরীতে ওজন করা হয়, তবুও তা নুয়ে পড়বে। যেমন, আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,
أنَّ نُوحًا قَالَ لِابْنِهِ عند موته: آمُرُكَ بِلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، فَإِنَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعَ، وَالْأَرْضِينَ السَّبْعَ، لَوْ وُضِعَتْ فِي كِفَّةٍ، وَوُضِعَتْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ فِي كِفَّةٍ، رَجَحَتْ بِهِنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَلَوْ أَنَّ السَّمَوَاتِ السَّبْعَ كُنَّ حَلْقَةً مُبْهَمَةً، لقَصَمَتْهُنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ
“নূহ আলাহিস সালাম মৃত্যুর সময় স্বীয় সন্তানকে বলেছেন: আমি তোমাকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর নির্দেশ দিচ্ছি। কারণ, যদি সাত আসমান ও সাত জমিন এক পাল্লায় রাখা হয় আর লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহকে অপর পাল্লায় রাখা হয়, তবুও লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ তাদের বিপরীত নুয়ে পড়বে। আর যদি সাত আসমান এক বৃত্তে পরিণত হয় তবুও ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তাকে হালকা করে দিবে।( )
ইবনে হিব্বান এবং আল হাকেম আবু সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
قَالَ مُوسَى يَا رب عَلمنِي شَيْئا أذكرك وأدعوك بِهِ قَالَ يَا مُوسَى قل لَا إِلَه إِلَّا الله قَالَ كل عِبَادك يَقُولُونَ هَذَا قَالَ يَا مُوسَى لَو أَن السَّمَوَات السَّبع وعامرهن غَيْرِي والأرضيين السَّبع فِي كفة وَلَا إِلَه إِلَّا الله فِي كفة مَالَتْ بِهن لَا إِلَه إِلَّا الله
“মূসা ‘আলাইহিস সালাম একদা আল্লাহ তা‘আলার খেদমতে আরয করলেন, হে আমার রব, আমাকে এমন একটি বিষয় শিক্ষা দান করুন যা দ্বারা আমি আপনাকে স্মরণ করব এবং আপনাকে আহ্বান করব। আল্লাহ বললেন, হে মূসা বলো, ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ “ মূসা ‘আলাইহিস সালাম বললেন, এতো আপনার সকল বান্দাই বলে থাকে। আল্লাহ বললেন, হে মূসা, আমি ব্যতীত সপ্তাকাশ ও এর মাঝে অবস্থানকারী সকল কিছু এবং সপ্ত জমীন যদি এক পাল্লায় রাখা হয় আর ” لاَ إِلهَ إِلاَّ اللهُ ” এক পাল্লায় রাখা হয় তা হলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর পাল্লা ভারী হবে”। ( )
হযরত ইতবান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَى النَّارِ مَنْ قَالَ: لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ، يَبْتَغِي بِذَلِكَ وَجْهَ اللَّهِ “নিশ্চয় যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার উদ্দেশ্যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে, আল্লাহ তাকে আগুনের ওপর হারাম করে দিবেন”।( )
এ মহান বাণীর অর্থ জানা ও বুঝা এবং এ মহান বাণীর প্রতি পূর্ণ ইখলাস ও বিশ্বাস প্রদর্শন করা জরুরী:
ইতোপূর্বে আমরা সর্বোচ্চ, সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর কতক ফযীলত সম্পর্কে জেনেছি। আরও জেনেছি যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহর বদৌলতে দুনিয়া ও আখিরাতে অনেক ফযীলত, উপকার ও কল্যাণ হাসিল হয়, তবে মুসলিম হিসেবে প্রত্যেকের জানা উচিৎ যে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুখে উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং তার হক ও ফরযসমূহ আদায় করা এবং তার শর্তসমূহ পূর্ণ করা জরুরি। তথা এ মহান বাণীর অর্থ জানা, এর ভেতর যা সাব্যস্ত করা হয়েছে তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা ও পূর্ণ ইখলাস প্রদর্শন করা জরুরি যা কুরআন ও সুন্নাহয় রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা এরশাদ করেন, فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ  “জেনে রাখ যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই”। [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯] হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে ইমাম মুসলিম আরেকটি হাদীস বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
مَنْ لَقِيتَ مِنْ وَرَاءِ هذا الْحَائِطِ يَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ مُسْتَيْقِنًا بِهَا قَلْبُهُ، فَبَشِّرْهُ بِالْجَنَّةِ
“এ দেয়ালের পশ্চাতে তুমি যাকে পাবে, সে যদি নিজের অন্তর থেকে দৃঢ় বিশ্বাসসহ ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাক্ষ্য প্রদান করে, তাকে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান কর”।( )
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ
“আমার সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান হবে, যে ইখলাসের সাথে অন্তর থেকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে”।( )
হযরত উসমান ইবন আফফান রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، دَخَلَ الْجَنَّةَ “যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র অর্থ জানা অবস্থায় মারা গেল সে জান্নাতে যাবে”।( )
কালেমা’র ক্ষেত্রে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাথে ‘মুহাম্মদুন্ রাসূলুল্লাহ’ অংশটি যুক্ত করা অবশ্যক:
উল্লেখ্য যে, আমরা যখন ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’কে কালেমায়ে তাইয়্যেবা অথবা কালেমায়ে শাহাদাতের অংশ হিসেবে বর্ণনা করব তখন ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র সাথে ‘মুহাম্মদুন্ রাসূলুল্লাহ’ অংশটি যুক্ত করা অবশ্যক, এ অংশটি ছাড়া কালেমা পূর্ণ হবেনা। কুরআনে এ কালিমার দুটি অংশ দুটি আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। যথা: ১ম অংশ: فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللهُ “জেনে রাখ যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই”। [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯] ২য় অংশ: مُّحَمَّدٌ رَّ‌سُولُ اللَّهِ ۚ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ‌ رُ‌حَمَاءُ بَيْنَهُمْ مُّحَمَّدٌ رَّ‌سُولُ اللَّهِ “মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং যারা তাঁর সাথে রয়েছে… (সূরা ফাতহ: ২৯)
কালিমার ২য় অংশে হযরত মুহাম্মদ সাল্লালল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার নবী হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে নবীজীকে পৃথিবীবাসীর হেদায়েতের জন্য প্রেরণ করা এবং কোরআন আল্লাহ তাআলার বাণী হওয়া, ফেরেশতার বিদ্যমানতা, কেয়ামত সংঘটিত হওয়া, মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হওয়া, নেককারের জন্য জান্নাত এবং বদকারের জন্য জাহান্নামের ফয়সালা হওয়া ইত্যাদি যত সংবাদ নবীজী দান করেছেন, সবই ধ্রুব সত্য বলে বিশ্বাস করা। নবীজী আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে অকাট্য ও নিশ্চিত জ্ঞান লাভের পর উম্মতকে তা জানিয়েছেন। এর মাঝে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। এমনিভাবে নবীজী অন্যান্য যে সকল হেদায়েত দান করেছেন, যে সমস্ত হুকুম-আহকাম ও বিধানাবলী বর্ণনা করেছেন, সেগুলো মূলত আল্লাহরই আহকাম ও হেদায়েত। আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে নবীজীর অন্তরে সেগুলো ঢেলে দিয়েছেন।
এ কালিমাটা হলো ইসলামে প্রবেশের একমাত্র দরজা। এর উপর স্থাপিত দ্বীন ও ঈমানের আকাশ-ছোঁয়া মিনার। আজন্ম কাফের-মুশরিকও যদি এ কালিমা গ্রহণ করে এবং বিশ্বাসের সঙ্গে পাঠ করে তাহলে মুহূর্তের মধ্যে সে মুমিন ও মুসলমানরূপে আত্মপ্রকাশ করে; দুনিয়া ও আখেরাতের চির মুক্তি ও নাজাতের অধিকারী হতে পারে।
তবে শর্ত হলো এ কালিমার মাধ্যমে মহান আল্লাহর তাওহীদ এবং প্রিয় নবীর রেসালাতের যে স্বীকৃতি সে দান করলো তাকে তা বুঝতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে এবং মনে প্রাণে মেনে নিতে হবে। কিন্তু সে যদি তাওহীদ ও রেসালাতের মর্ম মোটেই বুঝতে না পারে, শুধু মুখে উচ্চারণ করে, তাহলে আল্লাহ তাআলার নিকট সে মুসলমানরূপে গণ্য হতে পারবে না। এ জন্য কালিমায়ে তাইয়েবার অর্থ ও মর্ম শিখে নেওয়া জরুরি।
যে ব্যক্তি খাঁটি দিলে কালিমার দুই অংশ তথা তাওহীদ ও রেসালাত স্বীকার করবে এবং কাজেকর্মে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটাবে, এমন খোশনসীব বান্দার জন্য বড় সুসংবাদ! হযরত মু‘আয ইবন জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْهَدُ أَنَّ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ صَادِقًا مِنْ قَلْبِهِ، إِلا حَرَّمَهُ اللَّهُ عَلَى النَّارِ
“এমন কেউ যে অন্তরের সততা থেকে সাক্ষ্য দিবে আল্লাহ ছাড়া কোনো মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ তার বান্দা ও রাসূল, অবশ্যই আল্লাহ তার ওপর জাহান্নাম হারাম করে দিবে।”( )
অপর হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، فَإِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ، عَصَمُوا مِنِّي دِمَاءَهُمْ، وَأَمْوَالَهُمْ إِلَّا بِحَقِّهَا، وَحِسَابُهُمْ عَلَى اللَّهِ
“আমাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে যে, আমি মানুষের সাথে যুদ্ধ করব, যতক্ষণ না তারা বলে: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ (আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব মা‘বুদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল) যখন এটা তারা বাস্তবায়ন করবে, আমার থেকে তাদের রক্ত ও সম্পদ নিরাপদ করে নিবে, তবে কালেমার হক ব্যতীত এবং তাদের হিসেব আল্লাহর ওপর”।( )
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، لَا يَلْقَى اللَّهَ بِهِمَا عَبْدٌ غَيْرَ شَاكٍّ فِيهِمَا، إِلَّا دَخَلَ الْجَنَّةَ
“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং আমি তার রাসূল। যে কোনো বান্দা এ দু’টি বিষয় সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা ব্যতীত আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে সে জান্নাতে যাবে”। ( )
إِلَّا اللهُ (ইল্লাল্লাহ)’র যিক্র:
কুরআন ও হাদীসে “ইল্লাল্লাহ” জিকিরের ভিত্তি রয়েছে। কালিমায়ে তাইয়্যিবায় দু’টি অংশ রয়েছে : নফী ও ইছবাত। ‘নফী’ অর্থ না-বোধক অর্থাৎ অন্য কোন মা‘বূদ অস্তিত্বে নেই। এটা বুঝায় لَا إِلَهَ অংশ। আর ‘ইছবাত’ অর্থ হ্যাঁ-বোধক। অর্থাৎ আল্লাহই একমাত্র মা‘বূদ। এটা বুঝায় إِلَّا اللهُ অংশ। এভাবে কালিমায়ে তাইয়্যিবাহ উক্ত দু’টি অংশের সমষ্টি।
মহান আল্লাহর তাওহীদের কথা অন্তরে বিশ্বাস করে সেরূপে মুখে প্রকাশ করার মাধ্যমে ঈমান ও ইয়াকীনকে মজবূত করার জন্য যুগ যুগ ধরে মাশায়িখে কিরাম এ কালিমার যিক্র করেন এবং তাঁদের মুতা‘আল্লিক্বীন মুসলমানগণকে এর তা‘লীম দেন। لَا إِلَهَ অংশের যিক্র দ্বারা অন্য সকল মা‘বূদের ইয়াকীনকে অন্তর থেকে বের করে দেয়া হয় এবং إِلَّا اللهُ অংশের যিক্র দ্বারা মহান আল্লাহর ইয়াকীন অন্তরে বসানো হয় । এ সম্পর্কে নির্দেশনায় হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,  أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ، مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ “আমার সুপারিশ দ্বারা ঐ ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সৌভাগ্যবান হবে, যে ইখলাসের সাথে অন্তর থেকে লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে”।( )
হযরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
مَنْ شَهِدَ اَنْ لَّا اِلهَ اِلَّا اللهُ يُصَدِّقُ قَلْبُه لِسَانَه دَخَلَ مِنْ اَيِّ اّبْوّابِ الْجَنَّةِ شّاءَ
“যে ব্যক্তি এই সাক্ষ্য দিবে যে, অন্য কোন মা‘বূদ অস্তিত্বে নেই–একমাত্র মা‘বূদ আল্লাহ, আর তার অন্তর তার মুখের এ কথাকে সত্যায়ন করবে, সে জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছে প্রবেশ করবে।” ( )
মুহাক্কিক মাশায়িখে কিরাম তাযকিয়ায়ে নফসের জন্য কালিমার নফী ও ইছবাত উভয় অংশের যিক্র করার পরে শুধু কালিমার মূল মর্ম ইছবাত অংশ “ইল্লাল্লাহ”-এর যিক্র করেন এবং মুরীদগণকে করতে সবক দেন। এর উদ্দেশ্য হলো বিশেষভাবে কালিমার ইছবাতের ইয়াকীন অন্তরে বদ্ধমূল করা যা মহান আল্লাহর তাওহীদের মূল কথা। বুখারী শরীফে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা হতে বর্ণিত হয়েছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন হিজরত, জিহাদ ও মক্কা নগরী হারাম এলাকা হওয়ার বিষয়ে হুকুম বর্ণনা করে সেখানে যুদ্ধবিগ্রহ নিষিদ্ধ হওয়া, শিকার করা নিষিদ্ধ হওয়া, পরিত্যাক্ত বস্তু না তোলা, গাছ না কাটা প্রভৃতি বর্ণনা করার পর্যায়ে এটাও বলেন, وَلَا يُخْتَلَى خَلَاهَا “মক্কার তরু-ঘাস উপড়ানো যাবে না।” এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা আরয করলেন, يا رَسولَ اللَّهِ إلَّا الإذْخِرَ فإنَّه لِقَيْنِهِمْ ولِبُيُوتِهِمْ، “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ‘ইযখির’ ব্যতীত। কেননা, এটা মক্কাবাসীদের কর্মকারদের (আগুনের কাজের) জন্য এবং তাদের ঘরবাড়ীর (তৈরীতে ছাদের কাঠের ফাঁকে ব্যবহারের) কাজে অপরিহার্য।” তখন রাসূলুল্লাহ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন إِلَّا الْإِذْخِرَ  “ইযখির ব্যতীত।” ( )
এ হাদীসের শেষাংশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু বলেছেন إِلَّا الْإِذْخِرَ  কিন্তু তাঁর আগের কথার দ্বারা তাঁর বলা নির্ণীত হয়েছে  لَا يُخْتَلَى خَلَاهَا إِلَّا الْإِذْخِرَ
উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’র إِلَّا الْإِذْخِرَ বলার দ্বারা যেমন আগের কথা (কারীনায়ে মাকালিয়্যা)র দ্বারা لَا يُخْتَلَى خَلَاهَا إِلَّا الْإِذْخِرَ সাব্যস্ত হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বাক্যের যিক্র করার পর শুধু إِلَّا اللهُ বলা হলে, তাতে কারীনায়ে মাকালিয়্যার দ্বারা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলাই সাব্যস্ত হয়। সুতরাং এভাবে إِلَّا اللهُ উচ্চারণ করা হলেও তা لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ বলা গণ্য হয়ে সুন্নাহসম্মত যিক্র পরিগণিত হবে।

আসুন, এই কালিমার হাকীকত ও মাহাত্য অন্তরে নিয়ে আমরা তাওহীদ ও রেসালাতের সাক্ষ্য দিই। এই কালিমার দাবী অনুসারে আপন আপন জিন্দেগী পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিই এবং আমরা খাঁটি দিলে ধ্যানের সঙ্গে বেশী বেশী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যিকির করি, যাতে আমরা ঈমান তাজা রাখতে পারি। আমাদের জীবনকে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর ছাঁচে ঢেলে সাজাতে পারি।

টিকা:==============

 – [বুখারী, ফাতহুল বারীসহ ১১/২০৮, নং ৬৪০৭; মুসলিম, ১/৫৩৯, নং ৭৭৯]।
–  [তিরমিযী ৫/৪৫৯, নং ৩৩৭৭; ইবন মাজাহ্ ২/১৬৪৫, নং ৩৭৯০; আরও দেখুন, সহীহ ইবন মাজাহ্ ২/৩১৬; সহীহ তিরমিযী ৩/১৩৯।
– أخرجه البخاري، كتاب التوحيد، باب ذكر النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وروايته عن ربه (৯/ ১৫৭)، رقم: (৭৫৩৬).
– [ বুখারী ৮/১৭১, নং ৭৪০৫; মুসলিম ৪/২০৬১, নং ২৬৭৫। শব্দটি বুখারীর।
– [তিরমিযী ৫/৪৫৮, নং ৩৩৭৫; ইবন মাজাহ্ ২/১২৪৬, নং ৩৭৯৩। দেখুন, সহীহ আত-তিরমিযী, ৩/১৩৯; সহীহ ইবন মাজাহ্ ২/৩১৭।
– [ আবূ দাউদ ৪/২৬৪, নং ৪৮৫৫; আহমদ ২/৩৮৯ নং ১০৬৮০। আরও দেখুন, সহীহুল জামে‘ ৫/১৭৬।
– তিরমিযী, ৫/৪৬১, নং ৩৩৮০। আরও দেখুন, সহীহুত তিরমিযী, ৩/১৪০।
– আবূ দাউদ ৪/২৬৪, নং ৪৮৫৬ ও অন্যান্য। দেখুন, সহীহুল জামে‘ ৫/৩৪২।
– (আহমদ:২৭৯০)
– (মুসলিম:৪৮৩৪)
– মুসলিম:২৩
– (বুখারী: ৪৩৪৭; মুসলিম: ১৯)
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯৩, ৩২৫
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৫
– (মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ২০)
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৮৮৪; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৪
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২
– তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৮৩; ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৮০০; সহীহ আল-জামে‘ (হাদীস নং ১১০৪) ।
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৯
– তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৯০; সহীহ আল-জামে‘ (হাদীস নং ৫৬৪৮) গ্রন্থে আলবানী হাসান বলেছেন।
– (সহীহ বুখারী, হাদীস : ৫৮২৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ২৮৩)
– আহমদ: (৫/২৪৭); আবু দাউদ, হাদীস নং ৩১১৬; ইরওয়াউল গালিল (হাদীস নং ৬৮৭)
– আহমদ: (১/২৮); ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৩৭৯৫)
– (মুসনাদে আহমদ, ৫/২৪২, হাদীস : ২২১০২)
– মুসনাদ: (২/১৭০); সিলসিলাহ সহীহাহ, লিল আলবানী: (১৩৪)
– হাকেম (১/৫২৮); ইবন হিব্বান, হাদীস নং (২৩২৪) মাওয়ারিদ। হাকেম বলেন, হাদিসটি সহীহ
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৯৩৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৩, ২৬৩
– সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩১, ১৫৬
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৯
– সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৬
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১২৮; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২২
– সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৭
– সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৯
– কানযুল উম্মাল, হাদীস নং ২০০
– (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৩৭, ১৮৩৪, মুসলিম-১৩৫৩)
قالَ النبيُّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ يَومَ افْتَتَحَ مَكَّةَ: لا هِجْرَةَ، ولَكِنْ جِهَادٌ ونِيَّةٌ، وإذَا اسْتُنْفِرْتُمْ، فَانْفِرُوا، فإنَّ هذا بَلَدٌ حَرَّمَ اللَّهُ يَومَ خَلَقَ السَّمَوَاتِ والأرْضَ، وهو حَرَامٌ بحُرْمَةِ اللَّهِ إلى يَومِ القِيَامَةِ، وإنَّه لَمْ يَحِلَّ القِتَالُ فيه لأحَدٍ قَبْلِي، ولَمْ يَحِلَّ لي إلَّا سَاعَةً مِن نَهَارٍ، فَهو حَرَامٌ بحُرْمَةِ اللَّهِ إلى يَومِ القِيَامَةِ، لا يُعْضَدُ شَوْكُهُ، ولَا يُنَفَّرُ صَيْدُهُ، ولَا يَلْتَقِطُ لُقَطَتَهُ إلَّا مَن عَرَّفَهَا، ولَا يُخْتَلَى خَلَاهَا، قالَ العَبَّاسُ: يا رَسولَ اللَّهِ إلَّا الإذْخِرَ فإنَّه لِقَيْنِهِمْ ولِبُيُوتِهِمْ، قالَ: قالَ: إلَّا الإذْخِرَ.)البخاري رقم: ১৮৩৪ مسلم رقم: ১৩৫৩ (