রাহনুমা-ই শরীয়ত ও ত্বরীকত হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি

0

বাতিলের বিরুদ্ধে এক আপোষহীন ওলী
 রাহনুমা-ই শরীয়ত ও ত্বরীকত হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি –
মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান >

ইসলামের প্রকৃত আদর্শ সুন্নী মতাদর্শ। এ আদর্শের অনুসারীদেরকেই অদৃশ্য বক্তা বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জান্নাতী বলেছেন। এর বিপরীতে আরো বাহাত্তর ফির্ক্বার অস্তিত্বের কথা যেমন সহীহ হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, তেমনি তাদের প্রকৃতি ও পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর হাবীব জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা দোযখী। এ বাহাত্তর ফির্ক্বার অনেকগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেলেও কয়েকটা ফির্ক¡ার অস্তিত্ব রয়ে গেছে। এ শেষোক্ত গোমরাহ্ ও দোযখী ফির্ক্বাগুলোর মধ্যে কতিপয় ফির্ক্বা নানাভাবে তাগূতী শক্তি দ্বারা মদদপুষ্ট হয়ে শুধু সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে পথহারা করে ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং ইসলামের মূলধারা আহলে সুন্নাতকে পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে নিশ্চিহ্ন কিংবা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে আসছে, অনেক দীর্ঘ সময় থেকে। তথাপি আল্লাহ্ তা‘আলার অশেষ মেহেরবানীতে, এ দোযখী ফির্ক্বাগুলোর বিরুদ্ধে সফল মোকাবেলা করে ইসলামের প্রকৃত আদর্শ আহলে সুন্নাত তথা সুন্নী মতাদর্শকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্য প্রতিটি যুগে যাহেরী ও বাতেনী (রূহানী) শক্তি সমৃদ্ধ সুন্নী পীর-মাশাইখ ও হক্কানী-রাব্বানী ওলামায়ে কেরামও তিনি সৃষ্টি করেছেন। বলা বাহুল্য, বংশগত, জ্ঞানগত, রূহানী ও ত্বরীক্বতগত আভিজাত্য ও অদম্য বেলায়তী ক্ষমতার অধিকারী ওলী-মুর্শিদ কামিল-মুকাম্মিল হিসেবে শাহানশাহে সিরিকোট হযরত আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হির নাম শীর্ষে।

সত্যিকার অর্থে ওলী
আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলকে অকৃত্রিমভাবে ভালবাসেন। আল্লাহর ভালবাসা ও ইশক্বে রসূল পূর্ণাঙ্গভাবে তাঁদের মধ্যে থাকে। তাঁরা নিজেরা যেমন দেহ ও আত্মার দিক দিয়ে একেবারে পরিশুদ্ধ থাকেন, তাঁদের অনেকে আবার পরিপার্শ্বিক মানুষ ও সৃষ্টিকে পরিশুদ্ধ করতে সচেষ্ট থাকেন। সমাজও তাঁদেরকে পীর-মুর্শিদ হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁরাও আল্লাহ্- আল্লাহ্র রসূলের নির্দেশানুসারে মানুষকে সঠিকপথে স্থির রাখার জন্য বায়‘আতের সুন্নাত পালন করান। এ’তে একদিকে তারা আল্লাহর ওলীর সান্নিধ্যের বরকত লাভ করে ধন্য হয়, অন্যদিকে বায়‘আতের সময়ে কৃত ওয়াদা পালনের প্রতি যতœবান হয়। এদিকে পীর-মুর্শিদের মধ্যেও নিম্নলিখিত চারটা পূর্বশর্ত যথাযথভাবে বিরাজ করলে সোনায় সোহাগা হয়: ১. বিশুদ্ধ আক্বীদা, আক্বাইদে আহলে সুন্নাতের ধারক হওয়া, ২. প্রয়োজনীয় দ্বীনী ইলম থাকা, ৩. আমল বিশুদ্ধ থাকা, প্রকাশ্য ফাসিক্ব না হওয়া এবং ৪. বিশুদ্ধ সিলসিলায় খিলাফতপ্রাপ্ত হওয়া, যেই সিলসিলায় কোন বদ আক্বীদা কিংবা বদ আমলের ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ না থাকা ইত্যাদি। [সূত্র: ইরশাদত-ই আ’লা হযরত, আল-ক্বওলুল জামীল (সংক্ষেপিত)]

উক্ত ‘ইশ্কে ইলাহী ও ইশ্কে রসূল’-এর ধরনটুকুও এরূপ যে, ‘আল-ইশ্ক্বু ইয়াহ্রিক্বু মা-সেওয়াল মা’শুক্ব’ (ইশ্ক্ব মা’শূক্ব ব্যতীত অন্য সব কিছুকে জ্বালিয়ে দেয়’)। মোট কথা, আল্লাহ্ ও রাসূলের ভালবাসা ও ইশ্ক্ব ওই ওলীর মধ্যে এমনভাবে জাগরুক থাকে যে, কাউকে আল্লাহর শানে কিংবা রসূলে আকরামের শানে অশোভন কথা বলতে শুনলে কিংবা করতে দেখলে ওই মহান ওলী বিচলিত ও অসহনীয় যন্ত্রণাগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁর বেলায়তী শক্তি দ্বারা তাদের খন্ডন কিংবা তাদের পথ রোধে স্থায়ী বহুমুখী ব্যবস্থা করতে তৎপর হয়ে যান। ফলে, আল্লাহ্ তা‘আলা এবং তাঁর রসূলে আকরামের পক্ষ থেকে তিনি অকল্পনীয়ভাবে সাহায্য প্রাপ্ত  হন।
বলাবাহুল্য, আমাদের প্রাণপ্রিয় মুর্শিদ ওলীই কামিল-মুকাম্মিল হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির ক্ষেত্রেও একজন কামিল ওলীর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর পূর্ণ সাফল্য যথাযথভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে ও হচ্ছে। আলহামদুলিল্লাহ্! আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর মধ্যে বংশীয় আভিজাত্য, অসাধারণ দ্বীনি ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান, জন্ম থেকে খাঁটি সুন্নী মতাদর্শ ধারণ, হযরত চৌহরভীর মত কামিল-মুকাম্মিল মুর্শিদের সন্ধান লাভ ও সান্নিধ্য গ্রহণ, অসাধারণ ও অস্বাভাবিক ধরনের রিয়াযত-মুশাহাদার অনুশীলন এবং আজীবন দ্বীন ও মাযহাবের স্বার্থে বেলায়তী দূরদর্শিতা ও অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা পরিনতি অবলোকন এবং সহীহ ত্বরীক্বতের খাতিরে অদম্য সাহসিকতার সাথে সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেই গেছেন। এ উপমহাদেশের নয় বরং সারা বিশ্ব মুসলিম এ মহান ও বরকতময় যাতের বরকত লাভ করে ধন্য হয়েছে ও হচ্ছে এবং হতে থাকবে। আজ সব বিবেকবান ও কৃতজ্ঞজনের মুখে ঘোষিত হচ্ছে- এ দেশে তথা উপমহাদেশে শাহানশাহে সিরিকোটের শুভ পদার্পণ না ঘটলে ইসলামের সঠিক মতাদর্শ বা সুন্নী মতাদর্শের ইতিহাস ভিন্নভাবে, দুঃখজনকরূপে লিপিবদ্ধ হতো।

উল্লেখ্য, কামিল ঈমানদারগণ হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শানে কারো মুখে অশালীন কথা শুনলে তা বরদাশ্ত করতে পারেন না। যেমন, হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁর মাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তাঁর মা, ইসলাম গ্রহণের পূর্বে, হুযূর-ই আকরামের শানে অশালীন মন্তব্য করে তাঁর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এটা শুনে তিনি মনের অসহনীয় দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে হুযূর-ই আকরামের পবিত্র দরবারে গিয়ে, তাঁর মায়ের হিদায়তের জন্য দো‘আর দরখাস্ত করেছিলেন। হুযূর-ই আকরামও দো’আ করেছিলেন এবং এর বরকতে সাথে সাথে তাঁর মা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। [মিশ্কাত: বাবুল মু’জিযাত] আলহামদুলিল্লাহ্ শাহান শাহে সিরিকোটের মধ্যেও একজন কামিল-মুকাম্মিল ওলী ও মুরশিদের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ছিলো। এসব বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর ফূয়ূয ও বরকতের কিছুটা বর্ণনা করার প্রয়াস পাচ্ছি।

এক. খাঁটি সৈয়্যদ-বংশের আকাশে উদিত উজ্জ্বল চাঁদ
হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ৩৭তম বংশীয় হযরত সৈয়্যদ সদর শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির ৪র্থ পুত্র। আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি উনিশ্ শতকের মাঝামাঝি সময়ে, বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে ১৮৫৭ ইংরেজী সালে পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে হাজরা জিলার সিরিকোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ ইংরেজী সালে মহান ওলী এ পার্থিব জীবন থেকে পর্দা করেন। তিনি রসূলে পাকের ৩৮তম বংশধর। [হালাতে মাশ্ওয়ানী ইত্যাদি]

পারিবারিক ঐতিহ্য  
শাহানশাহে সিরিকোটের পূর্বপুরুষের এক বিখ্যাত মহান সাধক হযরত বান্দা-নাওয়ায গেসূদরায রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি। ইসলামের বাণী প্রচারের নিমিত্তে ভারত থেকে আফগানিস্তানে তাঁর শুভাগমন ঘটে। তাঁরই বংশের সৈয়্যদ গফুর শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি নামের একজন ইসলাম প্রচারক মহান বুযুর্গ পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশের শেতালু সিরিকোটে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর অক্লান্ত শ্রম ও প্রচেষ্টার ফলে এতদঞ্চলে ইসলামের আলোর বিকিরণ ঘটে। এ কারণে তাঁকে ‘ফাতেহে সিরিকোট’ (সিরিকোট বিজয়ী) হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁরই ১৩শ প্রজন্মে বিকশিত হন হযরত সদর শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্। হুযূর ক্বেবলা শাহান শাহে সিরিকোট তাঁরই পবিত্র বংশধর, উত্তরসূরী। তাঁর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্। তাঁরই ঔরসজাত হলেন বর্তমান হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ ও হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ দামাত বরকাতুহুমুল আলিয়া।
[হালাতে মাশ্ওয়ানী, লোকাল গর্ভণম্যান্ট এ্যাক্ট ৩৩ (বরাত ১৫) ১৮৭১ ইংরেজী]

শিক্ষা গ্রহণ
হুযূর ক্বেবলা শাহান শাহে সিরিকোট হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ শৈশবেই পবিত্র ক্বোরআন হিফয (মুখস্থ) করে হাফেয হন। তারপর স্বদেশে ও বিদেশে দ্বীনী শিক্ষার বিভিন্ন সুক্ষাতিসুক্ষ্ম বিষয়ে অসাধারণ পান্ডিত্য অর্জন করেন এবং উচ্চতর ডিগ্রীর লাভ করেন। এসব ডিগ্রীর মধ্যে একটি ১৮৮০ ইংরেজী সালে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ‘ফাযিল’ সনদ অন্যতম। সনদটিতে ১২৯৭ হি. শা’বান মাস উল্লেখ আছে। উল্লেখ্য, স্থানীয় পর্যায়ে ও পারিবারিকভাবে তিনি ইল্মে ক্বিরআত থেকে শুরু করে নাহ্ভ, সরফ, উসূল, ফিক্বাহ্, আক্বাইদ, দর্শন, ইল্মে হাদীস, ইল্মে তাফসীরসহ ধর্ম তথ্যের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় অসাধারণ ব্যুৎপত্তি ও পান্ডিত্য অর্জন করেন। তারপর উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন। আর পরিণত বয়সে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ভান্ডার আহরণ করেন- ওলী-ই কামিল, ইলমে লাদুন্নীর ধারক, খাজা-ই খাজেগান,খলীফা-ই শাহে জীলান হযরত খাজা আবদুর রহমান চৌরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি থেকে, তাঁর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে।

আদর্শ ও বরকতমন্ডিত কর্মজীবন
নবীকুল সরদার হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ বাস্তবায়ন তাঁর স্বভাবজাত। তা তাঁর কর্ম জীবনে অনায়াসে ফুটে ওঠেছে। আল্লামা সিরিকোটি তাঁর সহোদরের  সাথে সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং প্রতিষ্ঠিতও হন। এখানে লক্ষণীয় যে, ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করে প্রচুর অর্থবৈভব আহরণ করে বিলাসবহুল জীবন যাপন করা এ মহান ওলীর মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, বরং পাশাপাশি দ্বীনের আদর্শ প্রচারসহ অন্যান্য দ্বীনী কর্মকান্ডে আত্মনিয়োগ করা তাঁর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। তাই তিনি যেখানেই গিয়েছেন এ মহান ব্রত পালনে তৎপর ছিলেন।
প্রথমে আফ্রিকার দিকে দেখা যাক। তিনি আফ্রিকার ক্যাপটাউন, জাঞ্জিবার ও মোমবাসা শহরে অবস্থানকালে সেখানকার জনগণের মাঝে দ্বীনী দাওয়াত পৌঁছান। এসব অঞ্চলে শিয়া সম্প্রদায়ের দৌরাত্ম্য আগে থেকে বিরাজিত ছিলো। কিন্তু শাহানশাহে সিরিকোট ওই সম্প্রদায়টির ভ্রান্ত মতবাদ হতে সাধারণ মুসলমানদের রক্ষা করে সেখানকার মানুষকে সুন্নী-হানাফী মাযহাবে দীক্ষিত করেন। সেখানকার ইতিহাসের প্রমাণ্য গ্রন্থ হতে জানা যায় যে, তিনিই সেখানে সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন।
[তাযকিরাহ্-ই আকাবিরে আহলে সুন্নাত (পাকিস্তান) কৃত: আল্লামা মুহাম্মদ আবদুল হাকীম শরেফ ক্বাদেরী, লাহোর, মুদ্রণ ও পরিবেশনায় লাহোর ফরীদ বুক স্টল- ২০০০ইংরেজী, পৃষ্ঠা ১৬৯] দ্বিতীয়ত: এর পর ১৯১২ ইংরেজী সালে স্বদেশে (পাকিস্তান) ফিরে আসেন শাহানশাহে সিরিকোটি হযরত সৈয়্যদ হযরত আহমদ শাহ্ সিরিকোটি। এখানে এসে তিনি হযরত আল্লামা আবদুর রহমান চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির হাতে ক্বাদেরিয়া ত্বরীকায় বায়‘আত গ্রহণ করেন। এদিকে আপন পীর মুরশিদের বাড়ির সন্নিকটে বাজারে দোকান খুলে ব্যবসাও করতে থাকেন। একই সাথে সময় সুযোগ পেলেই নিজের পীর মুরশিদের খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। সেখানেও একটি মসজিদের নির্মাণ কাজে সাহায্য করেন। তদ্সঙ্গে আপন পীর-মুরশিদের কৃপাদৃষ্টি অর্জনের চেষ্টা করতেন তিনি। পীরের দরবারের কোন কাজ সমাধাকে ত্বরীক্বতের উত্তম রিয়াযত মনে করতেন। সুতরাং দরবারের জন্য বিশেষ প্রয়োজনীয় কাজ জ্বালানী কাঠ সংগ্রহটি সমাধা করতে তিনি মনস্থির করলেন। আঠার মাইল দূরের সিরিকোট পাহাড় হতে লাকড়ি সংগ্রহ করে নিজ কাঁেধ করে, পায়ে হেঁটে পীরের বাড়িতে নিয়ে আসার খিদমতে তিনি নির্দ্বিধায় আত্মনিয়োগ করেন। নিজের বংশমর্যাদা, ব্যক্তিগত যশখ্যাতি, জ্ঞানগত ও সফল ব্যবসায়ী সুলভ আত্মমর্যাদা- সবই তিনি বিলীন করে দেন। নিজের আমিত্বকে খোদার রাহে বিলীন করার এ যে, এক বিরল দৃষ্টান্ত।
অথচ তাঁর মহান মুর্শিদ তাঁকে এ কঠিনতর কাজটি করতে নির্দেশ দেননি; বরং সঙ্গে সঙ্গে তা করতে এক দিকে মৌখিকভাবে বারণ করলেন, অন্যদিকে তা থেকে বিরত থাকারও একটি অলৌকিক ব্যবস্থা হয়ে গেলো। মাত্র কিছু দিন যেতে না যেতে তাঁর কাঁধে আকস্মিক এক ফোঁড়া উঠে গেলো। আরোগ্য হতে লাগলো দীর্ঘ নয় মাস। ফলে তিনি একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও একাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।
তৃতীয়ত: সুদূর বার্মা সফর ও সেখানে বরকতপূর্ণ অবস্থান। অত:পর পীরের নির্দেশে ১৯২০ ইংরেজী সালে শাহানশাহে সিরিকোট বার্মার উদ্দেশ্যে স্বদেশ ত্যাগ করেন এবং সেখানে প্রায় ষোল বছর অবস্থান করেন। সেখানকার বিভিন্ন মসজিদে ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব পালন করেন এবং সাথে সাথে সাধারণ মুসলমানদের ইসলামের সঠিক রূপরেখার (সুন্নী মতাদর্শ) দিক-নির্দেশনা দান করেন। এভাবে তাঁর অগণিত কারামতও রয়েছে। কলেবর বৃদ্ধি এড়ানোর জন্য এখানে উল্লেখ্য করা গেলো না। তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী গ্রন্থে এগুলোর আরো অনেক কিছু উল্লেখ করা যাবে। ইন্শাআল্লাহ্

খিলাফত লাভ ও কতিপয় করামাত
১৯২৩ ইংরেজী কিংবা তৎপরবর্তী কোন এক সময়ে শাহানশাহে সিরিকোট তাঁর পীর হযরত চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্র খিলাফত ও ইজাযত প্রাপ্ত হন। ফলে তাঁর মধ্যে রূহানী ক্ষমতা বা বেলায়তী শক্তি এমনভাবে স্থান লাভ করলো যে, (রেঙ্গুন) থাকাকালেও তাঁর বহু কারামত প্রকাশ পেয়ে যায়। তন্মধ্যে কয়েকটা নি¤েœ আলোচিত হলো-
এক. অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন একজন ওলী হযরত আবদুল হামিদ, প্রকাশ সুলতানুল আউলিয়া একদিন দেখতে পান যে, মসজিদে শাহানশাহে সিরিকোট একদিন রুকূ’-সাজদাহ্ করেছিলেন, অন্যদিকে মসজিদের মিনারও পার্শ্ববর্তী গাছ-গাছালি তাঁর সাথে রুকূ’-সাজদাহ্ করছে। এমন কারামত দেখে ওই সুলতানুল আউলিয়া হুযূর কেবলা শাহানশাহে সিরিকোটের হাতে বায়’আত গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন।
দুই. তাঁর হাতের বরকতে এক পোয়া (২৫০গ্রাম) পরিমাণ খাদ্যে ১০ থেকে ৫০ জন মানুষ তৃপ্ত হয়ে যেতো। বাঙ্গালী মসজিদে তিনি প্রত্যহ আসরের নামাযের পর তাকরীর করতেন। তখন তাঁর মজলিসে ৪০ থেকে ৫০ জন শ্রোতার সমাগম হতো। মাহফিল শেষে তাঁর তৈরীকৃত ওই পরিমাণ খাদ্য পরিবেশন করা হতো। আর সবাই পরিতৃপ্ত হয়ে যেতো।
তিন. এক সময়ে একাধিক জায়গায় উপস্থিত। উক্ত মসজিদের মুআযযিন বলেন, একদা আমি মাগরিবের সময় মসজিদ পরিষ্কার করে মসজিদ সংলগ্ন হাউজে গেলাম। তখন দেখলাম হুযূর শাহানশাহে সিরিকোট হাম্মানে ওযূ করছেন। ওই সময় আমি মসজিদের দোতলায় গিয়ে দেখি তিনি সেখানে মুসল্লিদের উদ্দেশে তাকরীর করছেন।
চার. ১৯২৮ ইংরেজী সালে, ৩রা শা’বান, বুধবার শাহানশাহে সিরিকোটের প্রথম পুত্র পাকিস্তানের সিরিকোট শরীফে ইন্তেকাল করেন। তখন হুযূর ক্বেবলা বার্মার রেঙ্গুনে বাঙ্গালী মসজিদে ছিলেন। ওই দিন আসরের নামাযের পর হুযূর ক্বেবলা মসজিদ সংশ্লিষ্ট হুজুরা শরীফে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। দীর্ঘক্ষণ যাবৎ হুজুরা শরীফের দরজা বন্ধ ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেছে যে, তাঁকে পাকিস্তানের নিজ বাড়ির সন্নিকস্থ মাঠে ওই সন্তানের জানাযার নামায পড়াতে দেখা গেছে।

কতিপয় বিরল অবদান
এক. আপন মুর্শিদের নির্দেশে শাহানশাহে সিরিকোট হযরত চৌহ্রভী আলায়হির রাহমাহ্র লিখিত বিস্ময়কর বিশাল ‘দরূদ শরীফ গ্রন্থ মজমু‘আহ্-ই সালাওয়াতে রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’-এর মুদ্রণ ও প্রকাশনার কাজ সমাধা করেন। ৩. খণ্ড: ১৪৪০ পৃষ্ঠার এ দুরূদ শরীফ গ্রন্থটি বিগত ১৯৩৩ সালে তাঁরই পূর্ণ তত্বাবধানে প্রথম বারের মতো প্রকাশিত হয় এবং মুসলিম বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
দুই. আপন মুর্শিদের একান্ত ইচ্ছায় ১৯০২ ইংরেজী সালে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ‘দারুল উলূম ইসলামিয়া রহমানিয়া’র উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান দেন। মুর্শিদের ইন্তিকালের পর ৪০ বছর যাবৎ তিনি নিজেই উক্ত মাদ্রাসা পরিচালনা করেন। তখন মাদ্রাসাটির প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। এভাবে তিনি আপন মুর্শিদের অর্পিত যাবতীয় দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।

সাংগঠনিক প্রজ্ঞা
বৃহৎ ও সুদূর প্রসারী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এবং একই মিশনের ও সমমনা জনগণকে সংগঠিত রাখার ক্ষেত্রে সংগঠন-সংস্থার আবশ্যকীয়তা অনস্বীকার্য। সুতরাং শাহান শাহে সিরিকোট বিগত ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বার্মায় প্রতিষ্ঠা করেন- ‘আনজুমানে শূরা-ই রহমানিয়া’। ১৯৩৭ ইংরেজী সনে এদেশের সাংবাদিকতার পথিকৃত চট্টগ্রামের ‘দৈনিক আজাদী’র প্রতিষ্ঠাতা ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেকসহ নিবেদিত প্রাণ পীর-ভাইদের একান্ত অনুরোধে এ মহান ওলীর চট্টগ্রামে শুভাগমন ঘটে। বার্মায় তাঁর গড়া ওই ‘আনজুমান’ পরবর্তীতে এদেশে নবতর সংস্করণে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে এর নাম ‘আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট’। এটা এখন উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ আধ্যাত্মিক সংস্থা। এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে- শতাধিক দ্বীনি মাদ্রাসা ও ত্বরীক্বতের অগনিত খান্ক্বাহ। প্রতি বছর আয়োজিত হচ্ছে বৃহত্তর সুন্নী ঐক্যের প্রতীক ‘জশনে জুলূসে ঈদে মীলাদুন্নবী’ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, পরিচালিত হচ্ছে ‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’, ‘আনজুমান রিসার্চ সেন্টার’ এবং নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে ‘মাসিক তরজুমানে আহলে সুন্নাত’ ইত্যাদি।

উপমহাদেশে দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সূচনা করা
শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড, বিদ্যাই শক্তি। অসাধারণ কারামত সম্পন্ন এ মহান ওলী তাঁর বিভিন্ন অবদানের জন্য একাধারে ‘সীমান্ত পীর’, ‘পেশোয়ারী সাহেব’, ‘সিরিকোটি সাহেব’, ‘আফ্রিকা ওয়ালা’, ‘শাহানশাহে সিরিকোট’, ‘ক্বুত্ববুল আউলিয়া’, ‘আলে রসূল’, ‘আওলাদে রসূল’ ইত্যাদি উপাধি ও খেতাবে তো ভূষিত আছেনই, কিন্তু তাঁর আরেকটি উপাধি সর্বব্যাপী ও কিংবদন্তী তুল্য। তা হচ্ছে ‘বানিয়ে জামেয়া’ (জামেয়ার প্রতিষ্ঠিতা)। তিনি ১৯৫৪ ইংরেজী সালে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বুকে প্রতিষ্ঠা করেন- কিস্তিয়ে ‘নূহ’ ও ‘জান্নাত নিশান’ ‘জামেয়া’ (জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা। এর একমাত্র উদ্দেশ্যেও তাঁর মহান বাণীতে প্রকাশ পায়- ‘দ্বীন কো বাচাও, ইসলাম কো চাচাও, সাচ্চা আলিম তৈয়ার করো।’  সাচ্চা আলিম বলতে বুঝায় সুন্নী মতাদর্শের দক্ষ আলিম। উপমহাদেশে নির্ভেজাল সুন্নী আক্বীদার ইমাম হলেন ইমাম আহমদ রেযা বেরলভী আলায়হির রাহমাহ্। তাই, শাহানশাহে সিরিকোটি এরশাদ করেছিলেন- এ জামেয়ার বুনিয়াদ রাখা হচ্ছে মসলকে আ’লা হযরতের উপর। বলা বাহুল্য, এ মহান ওলীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁর সুযোগ্য ও বেলায়তী শক্তির ধারক ও উত্তরসুরীগণ দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্বীনী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পরম্পরা চালু করেছেন; আর অগণিত খানক্বাহ্ প্রতিষ্ঠিত হয়ে ত্বরীক্বতেরও অভাবনীয় উৎকর্ষ সাধিত হচ্ছে।

জামেয়া প্রতিষ্ঠার পেক্ষাপট
জামেয়া প্রতিষ্ঠার আগে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় আয়োজিত এক বিশাল মাহফিলে শাহানশাহে সিরিকোট স্বয়ং উপস্থিত। তিনি তাঁর তাক্বরীরের শুরুতে দরূদ শরীফ পাঠের খোদায়ী নির্দেশ সম্বলিত আয়াত তিলাওয়াত করলেন। দেখা গেলো আল্লাহর নির্দেশ তো পালন করা হলো না, বরং তাচ্ছিল্য ও বিদ্রুপের ভাব প্রদর্শন করা হলো। আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের অকৃত্রিম আশেক ওলী, ওই এলাকায় নবীর উম্মত বলে দাবীদারের এহেন অধঃপতন দেখে যারপর নেই দুঃখিত হলেন। সুতরাং তখনই তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন- এমন দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করতে হবে যাতে একদিকে দ্বীনের সাচ্চা আলিম তৈরি হয়, অন্যদিকে তারা যেন দ্বীন, ঈমান ও আক্বীদার দুশমনদের হিদায়ত কিংবা দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে পারে। সুতরাং তিনি চট্টগ্রাম শহরে এসে যথোপযুক্ত জায়গা চয়ন করে ‘জামেয়া’ প্রতিষ্ঠা করলেন। ফলশ্রুতিতে, জামেয়া থেকেই যুগে যুগে বহুবিধ ফিৎনার যুগে নির্ভিক, দক্ষ আশেক্বে রসূল ওলামা তৈরী হয়ে আসছে। যারা কোনরূপ বাতিলের সাথে আতাঁত নয়, বরং ইলম ও আদর্শ দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সফল মোকাবেলা করে আসছেন। আর সর্বক্ষেত্রে সুন্নী মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করে যাচ্ছেন। হুযূর ক্বেবলার নির্দেশে জামেয়া পরিচালনা কমিটি ও এ ব্যাপারে ছাত্র-শিক্ষদের সহীহ আমল ও আক্বীদাগত অহমিকার ব্যাপারে সচেতন রয়েছেন। জামেয়া সম্পর্কে হুযূর ক্বেবলা এটাও এরশাদ করে গেছেন জামেয়া কোন দিন অর্থ সংকটে পড়বে না; কারণ এ ব্যাপারে আল্লাহর সাথে আমার কমিটম্যান্ট হয়েছে। সুবহানাল্লাহ্!
এখানে আরো একটি বিষয় সবিশেষ লক্ষণীয় যে, যেই জামেয়া তাঁর বরকতময় হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ওই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি অংশেও যেন তাঁর রূহানী ফয়য ও বরকতে পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। বর্তমান হুযূর ক্বেবলাকে জামেয়াকে সরাসরি সালাম বলতে শোনা গেছে। আর জামেয়া সম্পর্কে শাহানশাহে সিরিকোটের বাণীগুলোতে এর বাস্তবতা ফুটে ওঠে।

ক্বাদেরিয়া ত্বরীকার প্রসার
হানাফী, শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী- এ চার মাযহাবের মধ্যে যেমন হানাফী মাযহাব শ্রেষ্ঠ, কাদেরী, চিশ্তী, নক্বশবন্দী ও মুজাদ্দেদী-এ চার তরীক্বার মধ্যেও কাদেরী ত্বরীক্বা শ্রেষ্ঠতম। কারণ, এটা ওলীকুল শিরমনি বড়পীর হযরত আবদুল ক্বাদের জীলানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর-ই  প্রবর্তিত ত্বরীক্বা।
এ ক্বাদেরিয়া সিলসিলা হুযূর গাউসে পাক হয়ে হুযূর-ই আকরাম পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাই নবী-ই পাকের ফুয়ূয ও বরকত এ সহীহ সিলসিলা তথা শাহানশাহে সিরিকোট ও তাঁর উত্তরসূরী ও খলীফার মাধ্যমে তাঁর প্রতিটি মুরীদের হৃদয়-মনকে আলোকিত ও ফয়যধন্য করে। একারণে শাহানশাহে সিরিকোটের ত্বরীক্বার বায়‘আত গ্রহণের সাথে প্রতিটি নিষ্ঠাবান মুরীদের আত্মিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে অপূর্ব পরিবর্তন তথা উন্নতি দেখা যায়। এমনকি হুযূর ক্বেবলার মাদ্রাসায় মান্নত করলে তা নিঃসন্দেহে পূরণ হয়; বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। মৃত্যু যন্ত্রণার সময়ও হুযূর ক্বেবলার সাহায্য পাওয়া যায়। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে হুযূর ক্বেবলা শাহানশাহে সিরিকোটের হাতে বায়‘আত গ্রহণকে যেমন অগণিত মানুষ সৌভাগ্যের কারণ মনে করতেন, অগনিত মানুষ তাঁর উত্তরসূরীদের সান্নিধ্য লাভ, দো‘আ পাওয়া ও মুরীদ হয়ে সিলসিলা ভুক্ত হওয়াকেও গনিমত মনে করেন। এভাবে এ উপমহাদেশে শ্রেষ্ঠতম ত্বরীক্বা কাদেরিয়া ত্বরীক্বার প্রচার-প্রসার লাভ করে আসছে। এ ত্বরীকার মাধ্যমে অতি বরকতময় খতম খতমে গাউসিয়া, খতমে গেয়ারভী শরীফ, কসীদা-ই গাউসিয়া ইত্যাদির খুব প্রসার ও জনপ্রিয়তা লাভ করে আসছে।
একইভাবে, মসলকে আ’লা হযরতের মাধ্যমে একদিকে সহীহ আহলে সুন্নাতের প্রচার প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে, অন্যদিকে কাদেরিয়া ত্বরীক্বার প্রতিও মানুষের ভক্তি-ভালবাসার বৃদ্ধি পায়। কারণ, আ‘লা হযরত হুযূর শাহানশাহে বাগদাদের অত্যন্ত আশেক ছিলেন। মসলকে আ‘লা হযরতের উপর জামেয়া প্রতিষ্ঠা, ‘মোস্তফা জানে রহমত পেহ্ লাখো সালাম’-এর প্রচলন এদেশে সর্বপ্রথম হুযূর ক্বেবলাই দিয়েছেন বললেও অত্যুক্তি হবে না। আ‘লা হযরতের প্রসিদ্ধ তাফসীর তরজমা-ই ক্বোরআন ‘কান্যুল ঈমান’ হযরত তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্র  দো‘আয় তাঁর রূহানী সন্তানের মাধ্যমে বাংলায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। এভাবে এদেশে আ‘লা হযরতের চর্চাও ব্যাপকভাবে শাহানশাহে সিরিকোটের বংশীয় ও রূহানী সন্তানদের মাধ্যমে চলছে। ফলে মানুষের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সাথে সাথে আক্বীদার দৃঢ়তা, সর্বোপরি ইশক্বের অকৃত্রিম অনুপ্রেরণাও সৃষ্টি হয়ে আসছে। ফলে, এমনকি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও আল্লাহ্ ও আল্লাহর রাসূল এবং আউলিয়া-ই কেরামের শানে বিশ্বের যে কোন প্রান্ত থেকে বেয়াদবীপূর্ণ আচরণ দেখা দিলে শাহানশাহে সিরিকোটের ফয়যধন্যরাই সর্বাধিক মর্মাহত হন এবং প্রতিবাদের ঝড় তোলেন, তখন অন্য কারো মধ্যে এমনটি দেখা যায় না, বরং এক শ্রেণীর গোষ্ঠীকে বাতিলদের সাথে গোপন/প্রকাশ্য আতাঁত কিংবা নিরবতা পালন করতে দেখা যায়।

রাজনৈতিক সচেতনা ও দিক নির্দেশনা
শাহানশাহে সিরিকোট শুধু রসূলে আকরামের বংশীয় ছিলেন না, তিনি ছিলেন অকৃত্রিম আশেক্বে রসূল (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াল্লøামও। তাই তিনি নবীদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী ও ইসলাম বিদ্বেষীদের ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন সিপাহসালার। তাই বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অকুতোভয় সৈনিক। গান্ধী পরিচালিত কংগ্রেসের বিপক্ষে তাঁর ছিলো কঠোর অবস্থান। আ‘লা হযরতের দ্বি-জাতি তত্বের তিনি ছিলেন একান্ত সমর্থক। বলা বাহুল্য, ১৯৪৭ ইংরেজী সালে ভারত বিভক্তির ফলে তখন মুসলমানগণ যে পৃথক রাষ্ট্র পেয়েছিলেন তা থেকেই আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। শাহানশাহে সিরিকোটও তাঁর উত্তরসূরীরা বাংলাদেশ তথা এতদঞ্চলকে ভালবাসেন বলেই বাংলাদেশ সহ এতদঞ্চল তাঁর ত্বরীক্বত ও ফুয়ূয দ্বারা ধন্য হয়েছে। এ দেশের মাটি ও মানুষকে তাদের ভালবাসার প্রমাণাদির অন্ত নেই।

পরিশেষে, শাহানশাহে সিরিকোট একজন কামিল পীর-মুর্শিদ এবং এক অতি উচ্চ পর্যায়ের ওলী। তাঁর ও তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরীদের হাতে বায়‘আত গ্রহণ ক্বোরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ ও ক্বিয়াসের অবিকল বাস্তবায়ন। তাঁদের নির্দেশ ও প্রদর্শিত পথ একেবারে সঠিক পথ, তাদের ত্বরীক্বত ও নিদর্শনগুলোর সাথে সম্পৃক্ত থাকা নিশ্চিতভাবে জান্নাতের পথে অগ্রসর হবার সামিল। আল্লাহ্ তাওফীক দিন।