কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস আবিস্কারক ড: আলমিডা

0

 কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস আবিস্কারক ড: আলমিডা-
অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান >

মানব দেহে সংক্রমণ ঘটাতে অনেক রকম ভাইরাস রয়েছে। ইন্ফ্লুয়েঞ্জা, ম্যালেরিয়া, যক্ষ¥াসহ অনেক ধরনের ভাইরাস জাতীয় সংক্রমণ ব্যাধি মানবদেহে বর্তমান। ১৯১৮-১৯২০ সালের মধ্যে সার্স জাতীয় ভাইরাস বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। লক্ষ লক্ষ লোক মৃত্যু বরণ করেছিল। এ ছাড়াও ম্যালেরিয়া-কলেরা-যক্ষ¥া শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি রোগে প্রতিনিয়ত অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করছে। যদিও ভ্যাকসিন/টিকা, আবিষ্কার করে মহামারী ঠেকানো হয়েছিল বটে সম্পূর্ণ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি এ সকল ভাইরাসের উপস্থিতি। আজকে বিশ্বে মহামারী নোভেল করোনা ভাইরাসের তান্ডব শুরু হয়েছে সে করোনা ভাইরাস আবিষ্কারক বিজ্ঞানীর নাম খুব কম লোকই জানে। তিনি একজন বৃটিশ মহিলা বিজ্ঞানী ড: আলমিডা। ১৬ বছর বয়সে স্কটল্যান্ডের এক বাস চালকের মেয়ে আলমিডা স্কুল ছেড়েছিলেন। ভাইরাস ইমেনেজিংয়ের পথিকৃৎ জুন আলমিডার কাজ নোভেল করোনা ভাইরাস মহামারীর এ সময়ে আবার আলোচনায় এসেছে।
কোভিড-১৯ ভাইরাসের জন্য দায়ী নোভেল করোনা ভাইরাস নামের একটি নতুন ভাইরাস। তবে ১৯৬০ সালে লন্ডনের সেন্ট থমাস হাসপাতালে নিজের ল্যাবরেটরিতে ড: আলমিডা যে ধরনের ভাইরাস শনাক্ত করেছিলেন এটা সে ধরনের একটা ভাইরাস। এই ভাইরোলজিষ্ট (ঠরৎড়ষড়মরংঃ) এর জন্ম ১৯৩০ সালের ০৫ অক্টোবর জুন হার্টে। এবং তিনি বেড়ে উঠেন গ্লাসগোর উত্তর পূর্বে আলেক জান্দ্রাপার্কের কাছাকাছি একটি ফ্ল্যাট বাড়িতে, যেখানে অনেক পরিবারের বসবাস ছিল। সামান্য কিছু লেখাপড়ার পরেই স্কুল ছাড়েন জুন আলমিডা। তবে তিনি রয়েল ইনফাবম্যারিয় হিসটোপ্যাথলজিতে ল্যাবরেটরী টেকনিশিয়ান পদে। পরে পেশাগত উৎকর্ষতার জন্য লন্ডনে চলে যান এবং ১৯৫৪ সালে বিয়ে করে স্বামীকে নিয়ে কানাডার টরেন্টোতে চলে যান। অন্টারিও ক্যান্সার ইন্ষ্টিউটে একটি ইলেকট্রন মাইক্রোসকোপ দিয়ে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন জুন আলমিডা। এন্টিবডি ব্যবহার করে ভাইরাসকে আরো ভালভাবে দেখতে পাওয়ার একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করেন তিনি। যুক্তরাজ্য তাঁর মেধার স্বীকৃতি দিয়ে লন্ডনের সেন্ট থমাস হসপিটাল মেডিকেল স্কুলে কাজ করার জন্য ফিরিয়ে আনেন ১৯৬৪ সালে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী জন বরিসন কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নেন। ড: আলমিডা লন্ডনে প্রত্যাবর্তন করে ড: ডেবিড টেরেলের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করেন। ড: ডেবিড সর্দি-কাশি (কমন কোন্ড) নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তিনি ভলান্টিয়ারদের ওপর নাক পরিষ্কারের সঙ্গে ভাইরাসের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করছিলেন। এই গবেষণায় তাঁর টিম সাধারণ ঠান্ডার সাথে সম্পর্কিত কয়েকটি ভাইরাস খুঁজে পান, তবে সবগুলো পাননি। আবার ভলান্টিয়ারদের মধ্যে ঠান্ডার উপসর্গ ছড়িয়ে দিতে পারলেও ‘সেল কালচারে’  এই ভাইরাস আনতে পারছিলেন না। এরপর তারা ওইসব নমুনা আলমিডার নিকট পাঠান। তখন তিনি নমুনাগুলোতে ভাইরাস পার্টিকেল দেখতে পান। সেগুলোকে তিনি বর্ণনা করেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতো, তবে পুরোপুরি এক নয়। তার শনাক্ত করা এই ভাইরাস প্রথম ম্যান করোনা ভাইরাস হিসেবে পরিচিতি পায়। বিবিসি রেডিওর উইন্টার বলেন। জুন আলমিডার গবেষণা প্রতিবেদনটি একটি পিয়ার রিভিড জার্নাল প্রথমে নাকচ করে দেয়। কারণ হিসেবে তাঁর দেয়া ছবিগুলোকে  ইন্ফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস পার্টিকেলের খারাপ ছবি হিসেবে চিহ্নিত করে। ১৯৬৫ সালে বৃটিশ মেডিকেল জার্নালে নতুন এই আবিস্কারের কথা প্রকাশিত হয় এবং জুন আলমিডার দেয়া ছবিগুলো দুই বছর পর জার্নাল অব জেনারেল ভাইরোলজিতে প্রকাশিত হয়। [বিবিসি অনলাইন] এতো বছর পরে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান শহরে এর প্রথম প্রকোপ শুরু হয় বলে এখন অব্দি বিশ্ববাসীর ধারণা, এ মহামারী কিভাবে মানব দেহে সংক্রমিত হয় তা সম্পূর্ণভাবে জানা যায়নি। তবে প্রাথমিক সূত্র আবিস্কৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক প্রচারিত গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিগুলো: মাস্ক পরিধান, ঘন ঘন হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব (২মিটার) বজায় রাখা, জনাকীর্ণ, জনসমাগম না করা প্রভৃতি কার্যকর ও ফলপ্রসু প্রমাণিত হয়েছে। সংক্রমিত রোগীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকা, আইসোলেশনে থাকা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ ও অন্যান্য নির্দেশনা মেনে চলা এখন পর্যন্ত সর্বোত্তম। এ সকল পরামর্শ সঠিকভাবে পালন করলে কয়েক সপ্তাহ পরে সংক্রমণ হ্রাস পেতে থাকে। জনগণের সুরক্ষা জনগণকেই করতে হবে। অপ্রয়োজনে বা বেড়ানোর জন্য ঘর হতে বের না হওয়া উত্তম। যারা এ পরামর্শ উপেক্ষা করছে তাদের জন্য ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।  আসুন আমরা সকলেই নিজেকে সুরক্ষিত রাখি এবং অপরকে সুরক্ষা দেয়ার চেষ্টা করি।
কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস এখন বৈশ্বিক মহামারী। বিশ্বের ২১৭টা দেশ ও অঞ্চল বলতে গেলে সমগ্র বিশ্ব আক্রান্ত। লক্ষ লক্ষ মানব সন্তানের অকাল মৃত্যু ঘটছে। এ মহামারী রোধ করার জন্য বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশ ভ্যাকসিন/টিকা আবিস্কারের জন্য বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। দু’একটা ঠোঠকা জাতীয় ঔষুধ প্রয়োগ করে ভাইরাসের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। মোটামুটি একটা প্রতিষেধক পেতে হলে আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। এর মধ্যে কত লক্ষ প্রাণ নিঃশেষ হবে তা ধারণাতীত। এ মহামারী দূর্যোগকে সামাল দিতে সরকারি বেসরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে সবাই এগিয়ে এসেছে। সকল দেশপ্রেমিক সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করছে। এমনকি ছিন্নমুল ভিক্ষুক ঘর মেরামত করার জন্য ভিক্ষে করে সঞ্চয়কৃত দশ হাজার টাকা, মুক্তিযোদ্ধার পরিবার সরকার প্রদত্ত ভাতা, চাকুরিজীবিদের বেতনের একটা অংশ, শিশুদের টিফিনের জমাকৃত টাকা, নিজের মূল্যবান সম্পদ বিক্রি করে মানবতার সেবায় ও ত্রাণকাজে অংশ গ্রহণ করছে। এ মহামারী ঠেকানো একা, গোষ্ঠী বা দলের পক্ষে  সম্ভব নয়। সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। এখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশা শ্রেণির কোন ভেদাভেদ নেই। ছোট-বড়, গরীব-দুঃখী,সাদা-কালো, বাদামী কারোরই রক্ষা নেই। করোনা ভাইরাস রেহাই দিচ্ছে না কাউকেই। স্ব-স্ব অবস্থান থেকে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে আরো স্বত:স্ফূর্তভাবে।
পুলিশ, ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই এ প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে গিয়ে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সেবা কাজ করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আরো কয়েক হাজার আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন। করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন কাফন-দাফন না করে হাসপাতাল বারান্দায়, বাড়ির উঠানে ফেলে লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। কেউ যেন কারো নয়। প্রেম-ভালবাসার বন্ধন, ¯স্নেহের বন্ধন আত্মীয়তার বন্ধন সবকিছুই যেন অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। সমগ্র বিশ্ব বিপন্ন, বিবর্ণ। এ যেন রোজ হাশরে/কিয়ামত দিনের মহড়া। আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু ইরশাদ করেন- ‘ওয়া আতিউল্লাহ্ ওয়া আতিউর রসূল।’ আল্লাহ্ ও রসূলের এত্তেবা কর অর্থাৎ আনুগত্য করো। আল্লাহ্র রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যা আদেশ-নির্দেশ দেন সেভাবে জীবনকে পরিচালিত করো। তা না করলে এ রকম মরনঘাতি, মরনব্যধি, দুর্যোগ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় আসতেই থাকবে। এখন যেমন প্রাণভয়ে মৃত প্রিয়জনকে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছি। করোনা আক্রান্ত সন্দেহ হলে দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ হচ্ছে। ঘরবন্ধি সময় পার করতে হচ্ছে, রোজ হাশরেও পিতা-মাতা, পুত্র-কন্যা, প্রিয়তমা স্ত্রী কেউ কারো কাজে আসবে না সবাই উর্দ্বশ্বাসে ছুটবে বলতে হয় ‘ইয়া নফসী, ইয়া নফসী’, এ রকম একটা সময় বিশ্ববাসী পার করছে। এতকিছুর পরেও দেখা যাচ্ছে একশ্রেণির অসাধু লোভী ঔষধ ব্যবসায়ী ও করোনার জন্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অক্সিজেন সিলিন্ডারের মূল্য শতগুণ হাজার গুণ বৃদ্ধি করে ফায়দা লুঠছে। বলতে ইচ্ছে করছে ‘এই জানোয়ার তোরা মানুষ হ।’ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ কার্য পরিচালনা করছে স্ব-উদ্যোগে, আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের একমাত্র অংগ সংগঠন গাউসিয়া কমিটির উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণের সাথে সাথে করোনায় মৃত ব্যক্তিদের দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করে যাচ্ছেন। এটা অত্যন্ত মহৎ কাজ। গাউসিয়া কমিটির ওই সব ভাইদের ও বিভিন্নভাবে যারা এ দুর্যোগকালে দুর্গতদের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে হেফাজত করুন। আমাদের মনে রাখা উচিত- ‘মানুষের জন্য মানুষ’।