প্রশ্ন: আমরা আগে শুনেছি আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মানুষের হক নষ্ট করা বা মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করা, মনে কষ্ট দেয়া ইত্যাদি ছাড়া ইচ্ছা করলে তিনি (আল্লাহ্) সব গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু হক্ব বঞ্চিত ব্যক্তি ক্ষমা না করা পর্যন্ত তার পাওনা বা হক্ব আল্লাহ্ তা‘আলা ক্ষমা করবেন না। কিন্তু গত হজ্ব মোবারক পালন করা এক সাধারণ শিক্ষিত লোকের কাছে শুনলাম, যারা আরাফাত-এর ময়দানে উপস্থিত হয়ে আল্লাহ্র কাছে গুনাহ্ ক্ষমা চাইবে তাদের সব গুনাহ্ ক্ষমা হয়ে যাবে। এমনকি অপরের হক্ব নষ্ট করার গুনাহও আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিবেন। এ সম্পর্কে নাকি হাদীসে বর্ণিত আছে। এ বিষয়ে ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে জানিয়ে উপকৃত করবেন।

0

প্রশ্ন করেছেন-মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ্ কায়সার,
কালিয়াইশ, সাতকানিয়া, চট্টগ্রাম।

প্রশ্ন: আমরা আগে শুনেছি আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন মানুষের হক নষ্ট করা বা মানুষের অর্থ আত্মসাৎ করা, মনে কষ্ট দেয়া ইত্যাদি ছাড়া ইচ্ছা করলে তিনি (আল্লাহ্) সব গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু হক্ব বঞ্চিত ব্যক্তি ক্ষমা না করা পর্যন্ত তার পাওনা বা হক্ব আল্লাহ্ তা‘আলা ক্ষমা করবেন না। কিন্তু গত হজ্ব মোবারক পালন করা এক সাধারণ শিক্ষিত লোকের কাছে শুনলাম, যারা আরাফাত-এর ময়দানে উপস্থিত হয়ে আল্লাহ্র কাছে গুনাহ্ ক্ষমা চাইবে তাদের সব গুনাহ্ ক্ষমা হয়ে যাবে। এমনকি অপরের হক্ব নষ্ট করার গুনাহও আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিবেন। এ সম্পর্কে নাকি হাদীসে বর্ণিত আছে। এ বিষয়ে ক্বোরআন-হাদীসের আলোকে জানিয়ে উপকৃত করবেন।

 উত্তর: হজ্ব ইসলামের মৌলিক স্তম্ভের অন্যতম স্তম্ভ। পবিত্র ক্বোরআনের অসংখ্য আয়াত এবং হাদীসে পাকের অসংখ্য বর্ণনায় বায়তুল্লাহ্র হজ্ব করার গুরুত্ব, তাৎপর্য, ফযীলত, বরকত, মহিমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। যে ব্যক্তি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্ব পালন করবে, সে মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ট হওয়ার দিনের ন্যায় নিস্পাপ হয়ে প্রত্যাবর্তন করবে। এ প্রসঙ্গে হাদীসে পাকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-
عن اَبِىْ هُرَيرَةَ رَضى الله تعالى عنه قال قال رسول الله عليه وسلم مَنْ حَجَّ لِلّه فَلَمْ يَرْفَثْ وَلَمْ يَفْسق رَجَعَ كيَوْمِ وَلَدَتْهُ اُمُّهُ- (متق عليه) অর্থাৎ- সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী সৈয়্যদুনা হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- যে ব্যক্তি কোনরূপ অশ্লীল কর্মকান্ড কিংবা পাপাচারে লিপ্ত হওয়া ব্যতিরেকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্ব পালন করবে সে মাতৃগর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওযার দিনের ন্যায় নিস্পাপ হয়ে হজ্ব শেষে বাড়ী গন্তব্যস্থলে প্রত্যাবর্তন করবে। [সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফ] অপর হাদীসে রয়েছে-
العمرة كفّارة لِمّا بَيْنَهَما والحج المبرور لَيْسَ له جزاء الّا الجنّةُ- (متفق عليه) অর্থাৎ- প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘‘একটি ওমরাহ্ কাফ্ফারা হয়ে যায় (অর্থাৎ আমলনামা থেকে গুনাহ সমূহ মোছন করে দেয়) আরেকটি ওমরাহ পালন করা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে সংঘটিত গুনাহ্ সমূহের। আর আল্লাহর দয়ায় কবুল হওয়া হজ্ব তথা হজ্বে মাবরূরের প্রতিদান জান্নাতই। [সহীহ বুখারী ও মুসলিম শরীফ]

এ ছাড়াও হজ্বের ইহকালীন ও পরকালীন বহু ফজিলত ও সাফল্যের কথা হাদীসে পাকে বর্ণিত আছে। হজ্ব হলো নামায, রোযা, যাকাতের ন্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত তথা হাক্কুল্লাহ্ বা আল্লাহর হক। এসব ইবাদত বান্দা যথাযথভাবে মহব্বতের সাথে আদায় না করলে উক্ত ফজিলত ও নেকী অর্জন করা সম্ভব হবে না। যেগুলো হাক্কুল্লাহ্ বা আল্লাহর হক সেগুলো অনাদায়ের গুনাহ্ আল্লাহ্ তা‘আলা ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন। আবার নাও করতে পারেন। কেননা এগুলো আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত। এ প্রসঙ্গে পবিত্র ক্বোরআনে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা ইরশাদ করেন- إِنَّ اللَّهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالاً بَعِيدًا- অর্থাৎ- নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরিক ও সমকক্ষ করাকে ক্ষমা করবেন না, আর এ ছাড়া অন্যান্য গুনাহ্/পাপসমূহ যাকে ইচ্ছা করেন তিনি ক্ষমা করে দিবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কোন কিছুকে শরিক করবে অবশ্যই সে চরম ভ্রষ্টতায় পথভ্রষ্ট হবে। [সূরা নিসা: আয়াত-১১৬]

আর হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক বা অধিকার যেমন বান্দার পাওনা, কর্জ ও যাবতীয় লেনদেন, কাউকে জুলুম করা, গালি-গালাজ করা বা অন্যের সম্পদ যা নিজের জিম্মায় রেখে দিয়েছে, অপর ব্যক্তির সাথে সুন্দর আচরণ না করা, কষ্ট দেয়া, অন্যের সম্পদ হরণ বা আত্মসাৎ করা ইত্যাদি বান্দার হক। এসব হক বান্দার সাথে সম্পৃক্ত- যা বান্দা ক্ষমা/মাফ না করলে জিম্মায় থেকে যাবে। করুণাময় আল্লাহ্ তা’আলা মাফ করেন না। সুতরাং হজ্ব করার পূর্বে এসব বান্দার হক্বও জিম্মা হতে মুক্ত হওয়া জরুরি। আর সহীহ বিশুদ্ধ অন্তরে মিনা-আরফা-মুযদালাফায়, আল্লাহর ঘরে এবং প্রিয়নবীর দরবারে খালিস নিয়তে তাওবা করলে সকল বান্দার সকল গুনাহ আল্লাহ্ তা’আলা ক্ষমা করে দিবেন।

অর্থাৎ- বান্দার হক্ব আদায় করার পর বা বান্দা হতে মাফ নেয়ার পর হজ্বের সময় উক্ত পবিত্র মর্যাদাবান স্থানসমূহে খালিস নিয়তে তাওবা করলে আল্লাহ্ তা’আলা হাজী সাহেবানকে নিস্পাপ করে দেন। অথবা হজ্বের উসিলায় উপরোক্ত বরকতমন্ডিত স্থানসমূহের বরকতে উক্ত বান্দাদের হৃদয় বা তার আওলাদের কলবে (যাদের হক্ব হাজীর জিম্মায় অবশিষ্ট আছে) পরম করুণাময় আল্লাহ্ তা’আলা দয়া ঢেলে দেন যার কারণে তারা উক্ত বান্দাকে মাফ করে দেন। তখন আল্লাহ্ তা’আলাও ওই বান্দার (হাজী সাহেবানদের সকল গুনাহ্ কবিরা-ছগিরা জানা-অজানা, আল্লাহর হক্ব ও বান্দার হক্ব সব মাফ করে দেন। এটাই হাদীসের বিশুদ্ধ মর্মার্থ । [ওমদাতুলকারী শরহে সহীহ বুখারী: কৃত ইমাম বদরুদ্দীন আইনি হানাফী (রাহ.) ইত্যাদি]