প্রশ্ন: মি’রাজ শরীফের অর্থ কি? প্রিনবীর মি’রাজ শরীফ রাতে হলো কেন? এর পেছনে কারণ বা রহস্য কি? বিস্তারিত জানানোর বিশেষ অনুরোধ রইল।

0

প্রশ্ন করেছেন সায়মা আলম (রাফি)-
কদলপুর আইডিয়াল হাই স্কুল, রাউজান।

প্রশ্ন: মি’রাজ শরীফের অর্থ কি? প্রিনবীর মি’রাজ শরীফ রাতে হলো কেন? এর পেছনে কারণ বা রহস্য কি? বিস্তারিত জানানোর বিশেষ অনুরোধ রইল।

উত্তর: মি’রাজ আরবী শব্দ, আভিধানিক অর্থ উর্ধ্বগমন বা উপরের দিকে উঠা বা ভ্রমণ করার সিঁড়ি। আল্লাহ্ তা’আলা তাঁর প্রিয় মাহবুব রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামাকে স্ব-শরীরে ও জাগ্রত অবস্থায় বিশেষ শান-মান সহকারে স্বীয় দয়া ও মহিমায় উর্ধ্ব জগৎ ও আধ্যাত্মিক জগৎ সমূহ আরশ-কুরসি, লাওহ-কলম ইত্যাদি ভ্রমণ করানো এবং আপন দিদারে ধন্য করাকে শরীয়তের পরিভাষায় মি’রাজুন্নবী (সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বলা হয়। উম্মুল মু’মেনীন খাদিজাতুল কুবরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা এবং প্রিয় চাচা খাজা আবু তালেবের ওফাতের পর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামার বেদনাহত হৃদয়ে প্রশান্তি দান এবং সর্বোপরি ‘রাব্বুল আলামীনের’ সাথে ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাৎ প্রদানের জন্য নবীয়ে দো’জাঁহা হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামাকে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন উর্ধ্বাকাশে মি’রাজ দান করেছেন। যা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অন্যতম মু’জিযা। এমন সৌভাগ্য আর কোন নবী-রসূল এবং কোন নূরানী ফেরেশতার নসীব হয়নি। তাই স্ব-শরীরে মি’রাজ প্রিয় নবী সরকারে দো’আলম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শান-মান ও অন্যন্য এক শ্রেষ্ঠত্বের বৈশিষ্ট্য। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামাকে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে সরাসরি সে দীদার ও সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন-ثُمَّ دَنَا فَتَدَلّى وكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى-(سورة النجم- ৮-৯৯)
অর্থাৎ- অতঃপর ঐ জ্যোতি অর্থাৎ- (হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মি’রাজ রজনীতে আল্লাহর নিকটবর্তী হলেন, তারপর নূরে এলাহীর জলওয়া স্বীয় মাহবুবের দিকে খুব বেশি নিকটে আসলো অতঃপর ঐ জ্যোতি ও এ মাহবুবের মধ্যে তথা আল্লাহ্ এবং রাসূলের মাঝে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল বরং তদপেক্ষাও কম। অর্থাৎ মি’রাজ রজনীতে আল্লাহ্ তা‘আলা প্রিয় রাসূলকে এমন কাছ হতে দিদার দান করেছেন যার চেয়ে আর নিকট হতে পারে না। [সূরা নজম: আয়াত-৮-৯] এখানে অন্য ব্যাখ্যাও রয়েছে তবে এটা বেশি শক্তিশালী। [তাফসসিরে নুরুল ইরফান: সূরা নজম, কৃত- মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী ও খাযাইনুল ইরফান কৃত- সদরুল আফাজিল সৈয়্যদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী রাহ.]

মহান আল্লাহ্র দরবারে প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মহা সম্মান ও নৈকট্য এবং মি’রাজ রজনীতে স্ব-চক্ষে মাহবুবে খোদা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দর্শন লাভের বর্ণনা ক্বোরআনে পাকের উপরোক্ত আয়াতে করিমায় বর্ণিত হয়েছে। দিদার ও নির্জনতার জন্য রাত, দিনের চেয়ে অনেক উত্তম। তদুপরি আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন প্রথম আসমানে তজল্লি দান করেন রাত্রে যা হাদীসে পাক দ্বারা প্রমাণিত। রিয়াজত ও সাধনার জন্য নবী-অলি-গাউস-কুতুব-আবদাল রাতকে বেছে নিয়েছেন। স্বয়ং মহান আল্লাহ্ রুকু-সাজদায় রাত-যাপনকারী আল্লাহ্র প্রিয় বন্ধুদের প্রশংসা করেছেন ক্বোরআন মজীদে।

সর্বপ্রথম আল-ক্বোরআনের মহান পবিত্র বাণী পৃথিবীতে সরকারে দু’আলম রাহমাতুল্লিল আলামীনের নিকট কদর রজনীতে অবতীর্ণ হয়েছে। অনেক নবী-রাসূলগণের উপর আল্লাহ্ তা’আলা প্রথম অহি নাজিল করেছেন রাত্রে। আরো অনেক কারণও উদ্দেশ্য নিহিত আছে। এসব কারণে আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু প্রিয় নবীর অন্যতম মহান মু’জিযা পবিত্র মি’রাজ শরীফ সংঘটিত করেছেন রাত্রের কিছু অংশে। পবিত্র মি’রাজ শরীফের রহস্যময় রজনীতে মক্কা শরীফ হতে মসজিদুল আকসা বায়তুল মুকাদ্দাস হয়ে আসমানী জগত-উর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ করে বেহশত দোযখ, সিদরাতুল মুনতাহা, আরশ-কুরসী, উর্ধ্ব জগতের নিদর্শন সমূহ ইত্যাদি প্রদক্ষিণ করে আরশে আজিমের উপর লা-মকানে মহান আল্লাহর দিদারে ধন্য হয়ে পুনরায় পবিত্র মক্কায় ফিরে এসেছেন- জাগ্রতাবস্থায় রাসূলে পাক সাহেবে লাওলাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। যা আর কোন নবী-রসূল, ফেরেশতা, মানব-দানব এক কথায় সৃষ্টিকুলের কারো ভাগ্যে নসীব হয়নি। তদপুরি মি’রাজ শরীফে রাসূলে আকরম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উর্ধ্বজগত ভ্রমণ করে স্বীয় উম্মতের জ্ঞানী বিজ্ঞানীদের জন্য মহাকাশ, শূন্য-আকাশ, গ্রহ-তারা-নক্ষত্র জগতসমূহ তথা উর্ধ্ব জগতের অনেক কিছু নিয়ে গবেষণা করার ও ভ্রমণ করার দুয়ার উন্মুক্ত করেছেন। যদিও মি’রাজ শরীফের মত এত বিশাল সফর একেবারে রাতের স্বল্প সময়ে জাগ্রতাবস্থায় বেহেশতী বোরাক আর রফরফের মাধ্যমে কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি। কেয়ামত পর্যন্ত সম্ভব হবে না। তদুপুরি উর্ধ্বজগতের অনেক অনেক রহস্যময় নিদর্শনাদি প্রত্যক্ষভাবে দেখানোর জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের উর্ধ্বাকাশে মি’রাজ শরীফ সংঘঠিত হয়েছে। যার দরুণ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মি’রাজ সংক্রান্ত হাদীস শরীফের মাধ্যমে উর্ধ্বজগতের অনেক গুঢ়-রহস্য ও নিদর্শনাদির জ্ঞান আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়েছে। তাই কোন নবী-রাসূলের উম্মত উর্ধ্বজগত নিয়ে এত বেশী গবেষণা করার সুযোগ পায়নি যতবেশী গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ নবীর উম্মতের যমানায়। মূলত: রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মি’রাজ শরীফের অলৌকিক ঘটনার প্রেক্ষিতে উম্মতে মুহাম্মদীর উপর উর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ ও গবেষণার দুয়ার খুলে গিয়েছে। সুতরাং জ্ঞান-বিজ্ঞানের মহান উৎস হল পবিত্র মি’রাজুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। রাসূলে পাকের মি’রাজ নিয়ে মুসলিম জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা যতবেশী গবেষণায় এগিয়ে আসবে ততবেশী উর্ধ্বজগত ও উর্ধ্বাকাশের রহস্যাদি উম্মুক্ত হবে। মুসলিম নর-নারী ক্বোরআন-হাদীস, শরীয়ত-তরিকত, হাকিকত-মারিফাতের সঠিক জ্ঞান অর্জনে সক্ষম হবেন। ক্বোরআন-সুন্নাহর এসব সুক্ষè বিষয় সমূহে চিন্তা-ভাবনা ও সঠিকভাবে গবেষণা করা বর্তমান সময়ের মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একান্ত অপরিহার্য। উল্লেখ্য যে, মি’রাজুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামাকে সঠিক ভাবে জানতে হবে বুঝতে হবে নতুবা বিভ্রান্ত হয়ে ঈমান হারা হওয়ার আশঙ্কাও আছে। মি’রাজ শরীফকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে ও বুঝতে পারলে প্রিয়নবীর অসাধারণ শান-মান ও আল্লাহ্ তা’আলার মহান কুদরতের মাহাত্ম বুঝতে ও অনুধাবন করতে পারবে। পবিত্র মি’রাজকে যথাযথ বুঝার ও চিরন্তন সত্য হিসেবে বিশ্বাস করার ফলে সৈয়্যদুনা আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সিদ্দিকে আকবর হয়েছেন আর মি’রাজের গুরুত্ব ও মাহাত্ম না বুঝার কারণে এবং বেআদবীর দরুণ আবু জাহেল, আবু লাহাব গংরা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়েছে।
[খাযায়েনুল ইরফান, নুরুল ইরফান ও ইমাম ইসমাঈল হক্কীর রচিত তাফসিরে রুহুল বয়ান, আল্লামা গোলাম রাসূল সাঈদী রচিত সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ নেয়ামুল বারী: ২য় খন্ড, ৬১ পৃষ্ঠা ইত্যাদি]