ইলমের গুরুত্ব ও আলিমের মর্যাাদা

0

ইলমের গুরুত্ব ও আলিমের মর্যাাদা-

মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান >

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে মানুষকে আল্লাহ তায়ালা বিভিন্ন গুণাবলী দান করেছেন। সমূদয় গুণাবলী থেকে শ্রেষ্ঠ একটি গুণ হলো ইলম বা জ্ঞান চর্চা করা। ইলম অর্থ জ্ঞান, বিদ্যা, অবগত হওয়া, বিজ্ঞতা ইত্যাদি। এটি এমন এক শক্তি যা দ্বারা কল্যাণ ও অকল্যাণের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। ব্যাপক অর্থে কোনো কিছুকে তথ্য সহকারে অনুধাবন করা বা, কোনো বস্তুর প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করা। ইসলামি পরিভাষায় ইলম এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনি রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ইলম ব্যক্তিসত্তার অত্যাবশ্যকীয় একটি গুণ যা ভাল মন্দের বিবেচনা শক্তিকে অত্যাবশ্যক করে, যাতে অদৃশ্যমান কার্যাবলীর মাঝে ক্ষতির সম্ভাবনা না থাকে । ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, ইলম এমন একটি জ্যোতি যা আল্লাহ তায়ালা কলবের মধ্যে স্থাপন করেন।

ব্যাপক অর্থে যা মানুষকে আল্লাহ তায়ালার পরিচয় শেখায়, আল্লাহর প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যথার্থ পরিচয় ও সম্মানবোধ সৃষ্টি করে, খোদাভীতির শক্তি জোগায়, সর্বোপরি মানবজীবনের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয় সহ যাবতীয় জীবনোপকরণের ভিত্তি যার উপর প্রতিষ্ঠিত তাই হলো ইলম। আল্লাহর প্রিয় রসুল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক আনীত জীবন ব্যবস্থার খুঁটি-নাটি বিষয় সর্ম্পকে জানা এবং এগুলো আমলের মাধ্যমে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করতে ইলম একটি অত্যাবশাকীয় অনুষঙ্গ। মানুষ শিশুকাল থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে থাকে। মানুষ জীবনের বিস্তীর্ণ পথ চলতে গিয়ে নানা ভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মানুষ স্ব স্ব অবস্থান থেকে উত্তোরণের পথ খুঁজে থাকে। নিজেকে নানা ভাবে প্রশ্ন করে। উক্ত প্রশ্ন ও উত্তর খোঁজা-খুজি করে বা জীবন জিজ্ঞাসার যে জবাব পায় তাও ইলমের অর্ন্তভূক্ত।

ইলমের উপাদান হলো তিনটি। প্রথমটি হলো তত্ত্বগত যা মানুষ আত্মা ও অনুভূতি থেকে অর্জন করে। এর কোনো বয়সসীমা নেই। দ্বিতীয়টি হলো তথ্যগত উপাদান। ধর্মীয় ও জাতীয় জীবনে সংঘটিত বিভিন্ন বিষয় থেকে যা অর্জিত হয়। মানুষের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে উক্ত বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূণ। তৃতীয়টি হলো, মানুষ তার ব্যবহারিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রাপ্ত শিক্ষাকে অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের জীবন গঠন করে থাকে।

হযরত সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুকে ইলমের শ্রেষ্ঠত্ব সর্ম্পকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি প্রশ্নকারীকে বলেন, তুমি কি কুরআন মজিদের এই বাণীটি শুননি, যাতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- জেনে রাখ, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই। এবং হে মাহবুব আপনার খাস লোকদের এবং সাধারণ মুসলমান, পুরুষ ও মুসলমান নর-নারীদের পাপরাশির ক্ষমা প্রার্থনা করুন। [সূরা মুহাম্মদ-১৯]

এখানে জেনে রাখুন এর অর্থ হলো দৃঢ় ও অটল থাকা, অথবা তদনুযায়ী আমল করা। কেননা কোনো কিছু সর্ম্পকে আমল করার জন্য সে বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। ফলে অর্জিত বিষয়টি মনের মধ্যে দৃঢ় ভাবে স্থাপিত হয়।
মানুষ আনুষ্ঠানিক, অনানুষ্ঠানিক, ও উপানুষ্ঠানিকভাবে ইলম অর্জন করতে পারে। ইলম যখন কোনো মানুষের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে তখন তাকে ‘‘কাসাবি” বলা হয়। আবার কখনো সরাসরি আল্লাহর নিকট থেকে অর্জিত হয়। একে বলা হয় ‘‘ইলমে লাদুনী” ইলমে লাদুনী সর্ম্পকে আল্লাহ তায়ালা বলেন- অতঃপর তারা আমার বান্দাদের মধ্যে এমন একজনের সাক্ষাত পেলেন, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে রহমত দান করেছিলাম ও আমার পক্ষ থেকে দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান। [সূরা আল কাহাফ-৬৫] হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন- ইলম দুই প্রকার। প্রথম প্রকার হলো অন্তরের জ্ঞান, তা হলো উপকারী বিদ্যা। অপরটি মুখের বিদ্যা, তা আদম সন্তানের বিরুদ্ধে আল্লাহর হুজ্জত। এখানে মুখের বিদ্যা বলে ঐ ধরণের লোক দেখানো জ্ঞান বুঝিয়েছেন যা মানব সমাজের জন্য ক্ষতিকর। যে ইলম মানুষকে খুশি করার জন্য বা কারো উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য অর্জন করা হয়, ঐ ইলম তার বিপক্ষে কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দান করবে। ইসলাম হলো পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হলো ইসলামের শিক্ষা ও বিধানমতো জীবন যাপন করা। তাই ইসলামী জীবন অতিবাহিত করার জন্য যে পরিমাণ ইলম জ্ঞানের প্রয়োজন হয় সে পরিামাণ ইলম অর্জন করা ফরজ।
ইলমের মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো কলম ও লিখন; যদিও বা ইলম দর্শন ও শ্রবণেন্দ্রীয়ের মাধ্যমেও অর্জিত হয়। আল্লাহ তায়ালা এ সর্ম্পকে পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত পাচঁটি আয়াতে বলেন– পড়–ন! আপনার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন, যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে রক্তপিন্ড থেকে। পড়–ন! এবং আপনার প্রতিপালক তো মহিমান্বিত। যিনি কলম দ্বারা শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না। [সূরা আলাক, ১-৫]

মহান আল্লাহ তাআলা হলেন সকল প্রকার জ্ঞানের উৎস, তিনিই তাঁর প্রিয় রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর মাধ্যমে এ জ্ঞান মানুষকে দান করেছেন। এজন্য যিনি জ্ঞানের অধিকারি হবেন তাকে আল্লাহ তাআলা প্রভূত কল্যাণ দান করে থাকেন। হযরত মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ কমনা করেন, তাকে ইসলামের সুষ্ঠু জ্ঞান দান করেন। আর আমি একজন বন্টনকারি (জ্ঞান) আর আল্লাহই তা দান করেন। (বুখারি ও মুসলিম)। ইলম অর্জনের মধ্যে মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের প্রভূত কল্যাণ রয়েছে। যারা কুরআন সুন্নাহর ইলমকে আকঁড়ে ধরেছে তারা দুনিয়াতে সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করার পাশাপাশি আখিরাতেও উচ্চ মর্যাদার আসন অর্জন করলেন।

আদিকাল থেকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে মানবজাতিকে হেদায়াতের জন্য দুুটি বিষয় নির্ধারিত করে রেখেছেন। একটি হলো আসমানি কিতাব দ্বিতীয়টি হলো নবী-রাসূলগণ। যাতে মানুষ হেদায়াত লাভ করতে পারে। সুতরাং হেদায়াত লাভ করতে হলে আসমানি কিতাব তথা আল-কুরআন এবং যার উপর কুরআন নাযিল হয়েছে ঐ নবিকে চিনতে হবে। তার জীবনাদর্শ পর্যালোচনা করতে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন- তিনিই উম্মী লোকদের মধ্যে তাদেরই মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াত সমূহ, তাদের পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। [সূরা জুমুআহ-২]

ইলম চর্চার ফযিলত সম্পর্কে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। হযরত মুআজ ইবনে জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, তোমরা ইলম শিক্ষা কর। কেননা ইলম শিক্ষা করা বিনয়তুল্য, অন্বেষণ করা ইবাদত তুল্য, চর্চা করা তাসবিহতুল্য, অনুসন্ধান করা জিহাদ তুল্য এবং যে জানেনা তাকে শিক্ষা দেওয়া সদকাস্বরূপ। উপযুক্ত পাত্রে তা খরচ করা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম। এটি হালাল-হারাম পার্থক্যের নিদর্শন। [দায়লামি-২২৩৭]

প্রিয় নবির সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণ জ্ঞান চর্চার মজলিসে বসাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন এবং আলিমদের সোহবতে থাকতে ভালোবাসতেন। প্রিয় নবির সাহাবি হযরত মুআজ ইবনে জাবাল রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এর ইনতিকালের সময় ঘনিয়ে আসলে তিনি কাঁদতে থাকেন। তাকে কাঁদার কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, আমি মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না। বরং রোজার কারণে গ্রীষ্মের দুপুরের তৃষ্ণা, শীতের রাতের নফল নামাজ এবং ইলমের মজলিসে হাজির হয়ে আলেমদের সোহবত হারানোর জন্য আমি কাঁদছি।
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন- লোকেরা বলে, আবু হুরায়রা বেশি বেশি হাদিস বর্ণনা করে, যদি কুরআনের দু’খানা আয়াত অবর্তীণ না হত, তা হলে আমি বেশি হাদিস বর্ণনা করতাম না। অতঃপর তিনি সূরা বাকারার ১৫৯ ও ১৬০ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করেন। তিনি আরো বলেন যে, অবস্থা এরূপ ছিল যে, আমাদের মুহাজির ভাইগণ বেচা কেনায় ব্যস্ত থাকতেন। আর আনসার ভাইগণ সর্বদা ক্ষেত খামারের কাজে ব্যস্ত থাকেন। আর আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আত্মতৃপ্তি সহকারে সর্বদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সাথে থাকতেন। তিনি এমন স্থানে উপস্থিত হতেন, যেখানে অন্যরা উপস্থিত হতে পারতেন না। এবং তিনি এমন হাদিস মুখস্ত করেছেন যা অন্যদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। [বুখারি:১১৮]

আল্লাহ তাআলা বলেন- তোমাদের মধ্যে যারা ইমানদার এবং যারা জ্ঞানপ্রাপ্ত আল্লাহ তাআলা তাদের মর্যাদা উচ্চ করে দেবেন। আল্লাহ খবর রাখেন সে সম্পর্কে যা কিছু তোমরা কর। [সূরা মুজাদালাহ : ১১] আমাদের নবি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছিলেন উম্মতের জন্য প্রকৃত শিক্ষাদাতা। তিনি সর্বদা জ্ঞান চর্চাকে উৎসাহ দিতেন এবং কোথাও দ্বীনী ইলমের চর্চা হলে তিনি নিজেই সেখানে বসে যেতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বীয় মসজিদে অবস্থানরত দুটি মজলিসের নিকট দিয়ে গেলেন। তিনি বললেন, উভয় মজলিসই উত্তম। (একটি মজলিসের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন) এসব লোক আল্লাহর নিকট দোয়া প্রার্থনাকারী এবং তাঁর দিকে আকৃষ্ট। আল্লাহ তাআলা চাইলে তাদেরকে দান করবেন আর চাইলে দান করবে না। আর অপর মজলিসের লোকজন হলো তারা ফিক্বহ বা দ্বীনী ইলম অর্জনের জন্য এবং অজ্ঞদেরকে শিক্ষাদানের জন্য ব্যস্ত রয়েছে। সুতরাং তারা শ্রেষ্ঠ। আর আমি তো শিক্ষাদাতা হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি। অতঃপর তিনি তাদের মধ্যে বসে গেলেন। [মুসনাদে দারেমী]

ইলম দ্বারা মানুষের সুকোমল বৃত্তিগুলো বিকশিত হয়, আল্লাহর সৃষ্টি রহস্য সর্ম্পকে অবগত হওয়া যায়। মানব সমাজে তার অনন্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি নির্বোধ ব্যক্তি নিন্দনীয় হিসেবে বিবেচিত হয়। এজন্য ইলমকে আলোর সাথে এবং অজ্ঞানতাকে অন্ধকারের সাথে তুলনা করা হয়েছে। হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরজ এবং অপাত্রে ইলম স্থাপনকারী যেন শুকরের গলায় জহরত, মুক্তা ও স্বর্ণ স্থাপনকারী। [ইবনে মাজাহ] দৈনন্দিন জীবনে একজন মানুষের জীবন পরিচালনা করার জন্য যতটুকু জ্ঞান না থাকলে বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ততটুকু ইলম অর্জন করা ফরজে আইন। যেমন, আল্লাহ তায়ালার পরিচয় ও তার একত্ববাদের জ্ঞান, রিসালাত, ফরজ ইবাদত হিসেবে সালাত, যাকাত, ইসলামী শরিয়তের আহকাম সম্পর্কিত পরিভাষা তথা, ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিষয়ের ইলম অর্জন করা ফরজে আইন। এগুলো ব্যতীত তাফসির, ফিকহ, ফরায়েজ, তাসাউফ ইত্যাদির জ্ঞান অর্জন করা ফরযে কিফায়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন- তাদের প্রত্যেক দলের একটি অংশ বের হয় না কেন, যাতে তারা দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে এবং তাদের সম্প্রদায়কে সতর্ক করতে পারে, যখন তারা তাদের নিকট ফিরে আসবে। [সূরা আত তাওবা-১২২]

আল্লাহ তাআলা মানুষকে ইবাতদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষ বিভিন্ন উপায়ে আল্লাহর ইবাদত করে থাকে। কিন্তু ইলম অর্জন করা বা ইলম শিক্ষা করা অনেক ইবাদতের চেয়ে অধিক সাওয়াব ও মর্যাদার অধিকারী করে। হযরত আবু উমামা বাহেলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, একদা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর নিকট দুই ব্যক্তি সর্ম্পকে আলোচনা করা হল। তাদের একজন আবেদ বা ইবাদতকারী আর অপর জন আলিম বা জ্ঞানী। জিজ্ঞাসা করা হলো এ দুই জনের মধ্যে কার মর্যাদা বেশি? উত্তরে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন, আবিদ বা ইবাদতকারীর উপর আলেম বা জ্ঞানীর মর্যাদা তেমনি যেমনিভাবে আমার মর্যাদা তোমাদের এক ব্যক্তির উপর। অতঃপর নবী-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা তার ফেরেশতাকুল এবং আসমান জমিনের অধিবাসিরা এমনকি পিপিলিকাসহ তাদের গর্তে এবং সমুদ্রের মৎসকূল তাদের জন্য দোয়া করে, যারা মানুষকে ভালো কথা শিক্ষা দিয়ে থাকেন। [তিরমিযী]

কুরআনের জ্ঞানে জ্ঞানীদেরকে আল্লাহ তায়ালা পরকালে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দিবেন। সেখানে তাদের বিশেষ পোশাক পরিধান করানো হবে। হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্র্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- কুরআন মজিদ কিয়ামতের দিন হাজির হয়ে বলবে, হে আমার প্রতিপালক এই লোককে (কুরআনের বাহক বা জ্ঞানী) তাকে অলংকার পরিয়ে দিন। অতঃপর তাকে সম্মান ও মর্যাদার মুকুট পরিধান করানো হবে। কুরআন আবার বলবে, হে আামর প্রতিপালক তাকে মর্যাদার পোশাক পরিয়ে দিন। অতঃপর তাকে মর্যাদার পোশাক পরিধান করানো হবে। কুরআন পুনরায় বলবে, হে আমার প্রতিপালক তার প্রতি সন্তুষ্ট হোন। আল্লাহ তায়ালা তার উপর সন্তুষ্ট হবেন। তাকে বলা হবে, তুমি এক এক আয়াত পাঠ করতে থাক। এভাবে প্রতিটি আয়াতের মাধ্যমে তার এক একটি মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। [তিরমিযি-২৯১৫]

মানুষের কাছে ইলম বা জ্ঞানের প্রতিক্রিয়া হয় দীর্ঘ মেয়াদি আর আমলের প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে স্বল্পমেয়াদী। আর মানুষের নফসের তাড়না ও ষড়রিপুর দমনের আমল অপেক্ষা ইলম বা জ্ঞান অত্যন্ত কার্যকর।

হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা আমার নিকট ওহি পাঠিয়েছেন, তিনি বলেছেন- যে ব্যক্তি ইলম বা জ্ঞান অন্বেষণের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করবে তার জন্য আমি জান্নাতের পথ সহজ করে দেব। আর আমি যে ব্যক্তির দুই চক্ষু ছিনিয়ে নিয়েছি তাকে আমি তার বিনিময়ে জান্নাত দান করব। বস্তুত ইবাদত অধিক হওয়ার চাইতে দ্বীনি ইলম অধিক হওয়া শ্রেয়। আর দ্বীনের মূল হল সন্দেহ সংশয় থেকে বেঁচে থাকা।
বস্তুত মানুষের মানবিয় গুণাবলীর বিকাশ, সুশৃংখল জীবন যাপন, সুন্দর চরিত্রের অনুশীলন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে ইলম বা জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য। যার ফলশ্রুতিতে যিনি জ্ঞান চর্চা করেন তার মর্যাদাও অনেক বেড়ে যায়। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন- যে ব্যক্তি বড়দের সম্মান করে না, ছোটদের স্নেহ করে না এবং আলেম বা জ্ঞানীদের মর্যাদা বোঝে না, সে আমার উম্মত নয়। [মুসনাদ-ই-ইমাম আহমদ] হযরত আবু মুসা আশআরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- নিশ্চয় বৃদ্ধ মুসলিমকে সম্মান করা, কুরআনের ধারক বাহক ও ন্যায়পরায়ণ শাসকের প্রতি সম্মান দেখানো মহান আল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের অন্তর্ভুক্ত। [আবু দাউদ: ৪৮৪৩] উপরোক্ত হাদিসে“কুরআনের ধারক বাহক” বলে কাদেরকে বুঝানো হয়েছে এ প্রসঙ্গে মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যাকারক মোল্লা আলী কারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, এরা হলেন কুরআনের হাফেজ এবং কুরআনের বিধিবিধান সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান অর্জনকারী বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ আলেম। এ কারণেই প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এদেরকে বিশেষভাবে সম্মান প্রদর্শন করতে বলেছেন।
হযরত আবু দারদা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি বিদ্যাজর্নের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করেছে, আল্লাহ তাআলা তার দ্বারা তাকে বেহশতের পথ সমূহ হতে একটি পথে পৌছিয়ে দেন এবং ফেরেশতাগণ দ্বীনি ইলম অন্বেষণকারীদের সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ডানা সমূহ বিছিয়ে দেন।
রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আলিমগণের ফযিলত বেইলম আবেদ বা সাধকদের উপর তেমন, যেমন পূর্ণ চন্দ্রের ফযিলত অন্যান্য তারকারাজির উপর। নিশ্চয় আলিমগণ হলেন নবীগণের ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকারী। নিশ্চয় নবিগণ কোনো দিনার দেরহাম রেখে যাননি বরং তাঁরা ইলম বা জ্ঞানকে রেখে গেছেন। সুতারাং যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জন করেছে সে অঢেল সম্পদ অর্জন করেছে। [তিরমিযি, আবু দাউদ] হাদিসের পরিভাষায় ইলম বা জ্ঞান হল্ আলো স্বরূপ। এ আলো মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে। মানুষ দুনিয়াতে যত সম্পদ অর্জন করে থাকে তার মধ্যে জ্ঞান হলো সর্বোত্তম সম্পদ। কারণ দুনিয়ার বাহ্যিক সম্পদ দিয়ে অন্তর আলোকিত হয় না। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞাসা করা হলো দুনিয়ার মাল সম্পদ উত্তম নাকি ইলম উত্তম।
তিনি উত্তর দিলেন- ইলম উত্তম। জিজ্ঞাসা করা হলো ইলম যে উত্তম তার প্রমাণ কী? হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
ক্স জ্ঞান হলো নবী রাসুলদের রেখে যাওয়া সম্পদ। আর মাল হলো ফেরআউন, হামান, ও কারুণের রেখে যাওয়া সম্পদ।
ক্স জ্ঞান বিতরণ করলে বৃদ্ধি পায়, আর সম্পদ বিতরণ করলে কমে যায়।
ক্স ইলম দ্বারা অন্তর আলোকিত হয় আর সম্পদ দ্বারা অন্তর অন্ধকার হয়ে যায়।
ক্স জ্ঞান চুরি হওয়ার ভয় নেই,অথচ সম্পদের কোনো নিরাপত্তা নেই।
ক্স হাশরের ময়দানে ইলমের কোনো হিসাব নেওয়া হবে না অথচ সম্পদের হিসাব অবশ্যই দিতে হবে।
ক্স জ্ঞান মানুষকে রক্ষা করে অথচ সম্পদ মানুষকে রক্ষা করতে পারে না।
ক্স জ্ঞানীর সম্মান বৃদ্ধি পেতে থাকে অথচ সম্পদশালীর লাঞ্চনা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন- যদি কোনো ব্যক্তি সকাল বা দ্বিপ্রহরের পূর্বে মসজিদে গমন করে এবং এর একমাত্র উদ্দেশ্য হয় কোনো ভালো কিছু শিক্ষা করা অথবা শিক্ষা দেওয়া, তবে সেই ব্যক্তি একটি পরিপূর্ণ হজের সাওয়াব লাভ করবে। [মুনযিরী, আত-তারগীব] অনুরূপ আলিম বা জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে খারাপ আচরণ করা জঘন্য অপরাধ। এ ধরণের হীন কাজের কারণে মানুষ আল্লাহর কাছে ঘৃণিত হয়। আল্লাহর ক্রোধেও পতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
হাফিজ ইবনে আসাক্বির রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, জেনে রেখো! ওলামায়ে কেরামের গোশত বিষাক্ত। তাদের ভুল ক্রটির পর্দা কেউ ছিন্ন করতে চাইলে আল্লাহ তার পরিণতি কী করে থাকেন, তা সবাই জানে। যে ব্যক্তি ওলামায়ে কেরামের (হক পন্থি) সমালোচনায় নিজের মুখ খুলবে, আল্লাহ তাকে এমন মুসিবতে ফেলবেন, তার নিজের মৃত্যুর আগেই তার অন্তর মরে যাবে।
[তাবায়িনু কাযিবিল মুফতারি আলা আবিল হাসান আল আশআরি পৃষ্ঠা :২৯-৩০] ইমাম আবদুল্লাহ ইবনে মোবারক রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, আলিমদের মাংস খুবই বিষাক্ত। যে তার ঘ্রাণ নেয় সে অসুস্থ হয়ে যায়। আর যে ভক্ষণ করে সে মরে যায়। [আল মুয়িদ ফি আদাবিল মুফিদ ওয়াল মুসতাফিদ পৃষ্ঠা: ৭১]

প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবাগণ কুরআন শরীফের নিয়মিত তালিম নিতেন। এমনি তারা দশটি আয়াত শিখে তা নিজেদের আমলে পরিণত না করে পরবর্তী দশটি আয়াত শিখার জন্য অগ্রসর হতেন না। তাই সাহাবীগণ নবী করীমের কাছে ইলম ও আমল উভয়টি শিখতেন। এমনকি জ্ঞানর্জন ও তদনুযায়ী আমল করে তা অনাগত কাল ধরে প্রবহমান থাকার জন্য তারা মানুষের কাছে সেই জ্ঞান পৌছিয়ে দিতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা পবিত্র কুরআন শিখেছি, পবিত্র কুরআন সর্ম্পকে জ্ঞান অর্জন করেছি এবং পবিত্র কুরআনের উপর আমল করাও শিখেছি। তিনি আরো বলেন, সেই আল্লাহর শপথ, যিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। আল্লাহর কিতাবের এমন কোনো আয়াত নেই, যার সর্ম্পকে আমার এই জ্ঞান নেই যে, আয়াতটি কার সর্ম্পকে এবং কোথায় নাযিল হয়েছে। আমি যদি জানতে পারি যে, পবিত্র কুরআন সর্ম্পকে আমার চেয়ে কেউ অধিকতর জ্ঞান রাখেন এবং তার নিকট গমন করা যদি সম্ভব হয়, তবে আমি অবশ্যই তার নিকট গমন করব। জ্ঞান মানুষের হৃদয়ের দরজা খুলে দেয়। এ কারণে একজন জ্ঞানী মানুষের হৃদয়কে পৃথিবীর চেয়েও বেশি প্রশস্ত বলা হয়েছে। শুধু জাগতিক জ্ঞান দিয়ে এ চাহিদা মিটে না; বরং মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া ইলম বা জ্ঞানকে বুকে ধারণ করে জীবন পরিচালনা করলে ঐ ব্যক্তির হৃদয় আকাশের চাইতেও বড়। সকল আত্মা মরে গেলেও ঐ আত্মা অমর। তারাই হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চরিত্রের মানুষ। আল্লাহ তাআলা বলেন- আল্লাহ যার বক্ষ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন, অতঃপর সে তার পালনকর্তার পক্ষ থেকে আগত আলোর মাঝে রয়েছে। (সে কি তার সমান, যে এরূপ নয়)। যাদের অন্তর আল্লাহর স্মরণের ব্যাপারে কঠোর, তাদের জন্য দুর্ভোগ, তারা সুস্পষ্ট গোমরাহীতে রয়েছে। [সূরা জুমার-২২]

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর প্রিয় নবীকে বক্ষ উম্মোচনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলাম। প্রিয় নবি উত্তরে বললেন, ঈমানের নূর মানুষের অন্তরে প্রবেশ করলে অন্তর প্রশস্ত হয়ে যায়। ফলে আল্লাহর বিধি বিধান হৃদয়ঙ্গম করা এবং সে অনুযায়ী আমল করা তার পক্ষে সহজ হয়।