বিশ্ব আতঙ্ক করোনা ভাইরাস

0

বিশ্ব আতঙ্ক করোনা ভাইরাস-

অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান>

ইবোলা, ডিজিস এক্স, সার্স ও মার্স, জিকা, গুটীবসন্ত, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো আতঙ্ক সৃষ্টিকারি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে মারাত্মক ভাইরাস’র নাম হলো ‘করোনা ভাইরাস’, চীনের হুবেহ প্রদেশ উহান হতে এ ভাইরাস’র উৎপত্তি এবং এখান হতেই এশিয়া ইউরোপ, আমেরিকা মহাদেশে দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ক্রমান্বয়ে চীনে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বিশ্বকে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে এর বিস্তার দ্রুতগতিতে ছড়াচ্ছে। কাজেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানানো হয়। ইতোমধ্যে এ ভাইরাস থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিংগাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং, নেপাল, মালয়েশিয়া যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। চীন থেকে আগত যাত্রীদের বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সকল দেশই কোয়ারাইনটাইনে রাখছে। কমপক্ষে ১৪দিন এভাবে রাখা হচ্ছে। যে হারে চীনের মৃতের সংখ্যা বাড়ছে তাতে চীন সরকার হিমশিম খাচ্ছে এমনকি ‘মাস্ক’ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছেনা এখন। বিশ্ব বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে, চীনের সাথে সকল দেশই যাতায়াত সীমিত বা বন্ধ করছে। আকাশ, স্থল, সমুদ্রপথে যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, পরীক্ষা করে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের উৎস হতে পারে বাদুর ও সাপ। বেজিংয়ের চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্স এমনই মনে করছে, সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান শহর থেকে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাস দ্রুততম সময়ে সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে না পারলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হতে পারে। এ সংক্রমক রোগের লক্ষণ ধরা পড়ে ১২/১৪দিন পর। আর উপসর্গ বা লক্ষণ প্রকাশ হবার আগে থেকেই জীবানু তার ভিতরে প্রবেশ করার কারণে তিনি ছোঁয়াচে হয়ে যান। প্রথম পর্যায়ে তিনি একজন সুস্থ মানুষ হিসেবে সমাজে বিচরণ করতে পারেন, সাধারণত নিঃশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। তাদের হাঁচি কাশিতে অজস্র জীবানু বের হয়। সুস্থ মানুষ নিঃশ্বাসে বা ভেজা চোখের মাধ্যমে সংক্রমিত হতে পারে। হাতে বা আঙ্গুলে জীবানু এ রোগ ছড়াতে পারে দ্রুতগতিতে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সারাদিনে ২০/৩০ বার তার হাত বা আঙ্গুল মুখে চোখে নাকে লাগায় প্রতি ঘন্টায়। সুতরাং জাগ্রত অবস্থায় ১৮ ঘন্টায় ৩৬০ বার মুখমন্ডলে চোখে বা নাকে হাত লাগায়।

এটা মূলত: এমন একটি ভাইরাস যাকে আমরা বলতে পারি ‘হিউম্যান টু হিউম্যান ট্রান্সমিশন’ এটা খুবই উদ্বেগজনক একটা পরিস্থিতি। চীনের মতো একটি জনবহুল দেশে এ ভাইরাস ক্রমশ: ছড়িয়ে পড়লে কি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তা অনুমান করতেও ভয় লাগে। স্ক্যানার মেশিন কপালের কাছে লাগালেই গাণিতিক অক্ষরে স্পষ্টভাবে দেখা যাবে, যা ভাইরাসের প্রথম উপসর্গ জ্বর।

চীনের ওই মেগাসিঠিতে গত বছরের ডিসেম্বর ২০১৯ এইকঋ ভাইরাসের উপস্থিতি ধরা পড়ে দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হন। সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করায় গত ২৩ জানুয়ারী (২০২০) অবরুদ্ধ ঘোষণা করে উহানের এক কোটি ৮০ লাখ মানুষের চলাচল। রাজার মাথার মুকুট বা ক্রাউনের সঙ্গে ভাইরাসটির সাথে চেহারার নাকি মিল অনেক। আর সে ক্রাউন থেকেই করোনা ভাইরাসের নামকরণ। পৃথিবীব্যাপী যে সর্দি-কাশি প্রথমবারের মতো তান্ডব সৃষ্টি করেছিল তার নাম স্পেনীশ ‘ফ্লু’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে প্রায় ৫০কোটি মানুষ এ ‘ফ্লু’তে আক্রান্ত হয়। যা ছিল বিশ্বের সে সময়কার জনসংখ্যার ৩৩ ভাগ। এ ‘ফ্লু’তে মারা যায় দুই থেকে দশ কোটি মানুষ। এরপরও দফায় দফায় ভাইরাসজনিত বিশ্বব্যাপী ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যান্ডোমিকে বিপর্যস্ত হয়েছে মানবজাতি। ১৯৫৭-৫৮ সালে এশিয়ান ফ্লু, ১৯৬৭-৬৮ সালে হংকং ফ্লু, ১৯৭৭-৭৮’র রাশিয়ান ফ্লূ, যার ২০০৯’র ফ্লু প্যান্ডোমিক এ সবের অন্যতম। এসব প্যান্ডোমিকে আক্রান্ত হয়েছিলেন একেবারে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার তিনশতাংশ মানুষ আর মারা যায় দশ লাখ থেকে এক কোটি। করোনা ভাইরাসের সঙ্গে মানুষের পরিচয় ১৯৬০ সালে ভাইরাসটির আবিস্কারের পর। হালের যে সার্স আর মার্স, এ দু’টি কিন্তু করোনা ভাইরাসেরই মিউটেশনের ফল। বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও সার্স আর মার্স পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়েনি বলে প্যান্ডোমিকের খেতাব পায়নি ঠিকই, কিন্তু এ দু’টি হার্ডব্রেকে মৃত্যুর হার তুলনায় অনেক বেশি। সার্স আর মার্সের এ হারটা প্রায় ৪০ শতাংশ’র কাছাকাছি ছিল। করোনা ভাইরাসের সঙ্গে পশু-পাখির সম্পর্কটা অত্যন্ত নিবিড়। করোনা ভাইরাস বাদুড় থেকে ছড়িয়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। সার্কভুক্ত চীনারা ঠিকমতো রান্না না করে কাঁচা বাদুড় খেতে গিয়েই ঝামেলাটা বাধিয়েছে। প্রথম যখন করোনা ভাইরাস আইসোলেশন করা হয় তা তখন পাওয়া যায় মুরগিতে। এবারের উহান করোনা ভাইরাস ছড়ানোর জন্য বাদুড় ছাড়াও সাপ থেকে শুরু করে গৃহপালিত কুকুর বিড়ালকেও শনাক্ত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ চীন থেকে কয়েকশ বাঙ্গালীকে ফিরিয়ে এনে কোয়ারাইনটাই। চীন এখন কাউকে চীন ত্যাগ করতে দিচ্ছেনা কারণ বিশ্বে এটা সংক্রমন হতে পারে দ্রুত। বেইজিং’র পাকিস্তান দূতাবাস থেকে প্রবাসী পাকিস্তানীদের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে যে জীবন মৃত্যু যেহেতু স্রষ্টার হাতে, আর এ ব্যাপারে মানুষের কিছু করার সুযোগও নেই, কাজেই পাকিস্তান সরকার চীন থেকে কাউকে ফেরত আনবে না।

করোনা ভাইরাসের লড়াইয়ে ৭২ বিলিয়ন ইউয়ান বা ১০.২৬ বিলিনয় ডলার ঘোষণা করেছে চীন। এতেই বোঝা যায় চীন কতবড় বিপর্যয়ের সম্মুখীন। আজ (১৮-০২-২০২০) পর্যন্ত চীনে দেড় হাজারের অধিক মৃত্যু হয়েছে এবং আরো ৭০ সহস্রাধিক এ ভাইরাসে আক্রান্ত হবার সরকারি খবর রয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বকে সতর্ক করে দিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ চীনের অধীনে রয়েছে। দীর্ঘ সময় যদি এ ভাইরাসের আক্রমণ অব্যাহত থাকে তাহলে অনুন্নত, উন্নয়নশীল দেশসমূহের সমূহ ক্ষতি হবে। চীনে অনেক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানী বাণিজ্যে ধ্বস নামার অপেক্ষায়। বাংলাদেশের বাণিজ্যের এক বৃহৎ অংশ চীনের সাথে চলে আসছে। শিল্পের কাঁচামালের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ চীন থেকে আমদানি করা হয়। এর ভলিয়্যুম প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার। তাছাড়া পদ্মা সেতু, ট্যানেল, বিদ্যুৎ কেন্দ্র’র মতো অনেক মেগা প্রকল্পে চীনের ঋণ ও কারিগরী সহায়তা রয়েছে। চীনা শ্রমিক প্রকৌশলীরা ছুটিতে যাওয়ার পর ফিরতে পারছেনা, বাংলাদেশ’র জন্য সামনে মহাসংকটকাল অপেক্ষা করছে। উন্নয়ন কর্মকান্ড, শিল্পের উৎপাদন যদি বাধাগ্রস্থ হয় তাহলে আমাদের জিডিপি বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা হ্রাস পাবে। পক্ষান্তরে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি অন্যান্য দেশ হতে আনতে গেলে চড়ামূল্য দিতে হবে। সমগ্র এশিয়ায় চীনের দূর্যোগের প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে। এটা হবে এক ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা অবক্ষয়। ফেব্রুয়ারি (২০২০) মাসের মধ্যে করোনা ভাইরাস কট্রোল করা না গেলে বিশ্ব বাণিজ্যে ধ্বস নামতে বাধ্য। চীন দাবি করছে তারা করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিস্কার করতে সক্ষম হবে অতিসত্বর। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানী, রাশিয়াসহ বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহে ইতিমধ্যে গবেষণা শুরু হয়ে গেছে। অতি স্বল্পসময়ে প্রতিষেধক তৈরী করা যাবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞদের ধারণা। আমরাই ভাইরাসজনিত দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ হবো বেশি।

শুধু মাস্ক পড়লেই নিরাপদ নয়। দুষণ থেকে বাঁচতে হবে। পানি ও বায়ূ দূষণ উভয়েই মারাত্মক। ভেজা চোখের মাধ্যমে এ ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। সাবধানতা অবলম্বন করুন এবং অপরকেও এ ব্যাপারে সাহায্য করুন। মানুষ যখন সৃষ্টিকর্তার আদেশ অমান্য করে পথ চলতে শুরু করে তখন বিভিন্নভাবে বিভিন্ন নামে দুর্যোগ নেমে আসবে। এটাই সত্য। আসুন আমরা সবাই স্রষ্টাকে স্মরণ করি, পাপমোচনে আন্তরিক হই।
চীনের জিনজিয়াং উইঘুর এর দশ লক্ষ তুর্কিভার্ষি বন্দী মুসলিমদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ উদাসীন, এদের জন্য প্রতিরোধমূলক কোন ব্যবস্থাই চীন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেনি। কর্তৃপক্ষ বলছে উইঘুর মুসলিমদের করোনাভাইরাস’র আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা নেই। আল্লাহর অশেষ রহমত বাংলাদেশে এখনো করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়া যায়নি।