এ চাঁদ এ মাস- মাহে রজব

0

এ চাঁদ এ মাস- মাহে রজব

সম্মানিত মাসসমূহের অন্যতম মাহে রজব- আল্লাহর মাস বলে আখ্যায়িত। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব থেকেই এ মাসটি সম্মানিত মাস হিসেবে সুবিদিত। এ মাসে চরম কলহপ্রিয় আরবগণও তাদের যুদ্ধ-বিগ্রহ ঝগড়া-বিবাদ বন্ধ রাখতো। ইসলামে এ মাসকে আল্লাহর রহমতের মাসরূপে গণ্য করে এবং যুদ্ধ বিগ্রহ হারাম ঘোষণা করে। এ মাস আল্লাহর রহমত করুণা ও অনুগ্রহ অর্জনের মাস। মহিমান্বিত মি’রাজ, রাগায়িব ও ইস্তিফতাহ’র মহাসুযোগ লাভ করার রাতসমূহে ইবাদত বন্দেগী করে, আল্লাহর তা‘আলার নৈকট্য অর্জনের এ মাসে আমাদের ব্যক্তিক, মাসাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে পবিত্রতার প্রতিফলন ঘটানো একান্ত বাঞ্ছনীয়।

হযরত মূসা ইবনে ইমরান রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি হযরত আনাস বিন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র নিকট শুনেছি, প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘বেহেশতে রজব নামে একটি ঝর্ণা প্রবহমান রয়েছে, এর পানি দুধ হতে সাদা মধু হতেও মিষ্টি। কোন ব্যক্তি রজব মাসে অন্তত একটি রোযা রাখলেও আল্লাহ্ পাক উক্ত ঝর্ণার পানি তাকে পান করাবেন।’

প্রিয় নবী আরো এরশাদ করেছেন যে, ‘বেহেশতে এমন একটি প্রাসাদ আছে, যেখানে শুধু রজব মাসে রোযা পালনকারীরাই প্রবেশ করতে পারবে। তারা ব্যতীত আর কেউ সেখানে প্রবেশ করতে পারবে না।
প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রজব মাসের প্রথম দিন রোযা রাখে সে যেন সারা বৎসর রোযা রাখল। তিনি আরো এরশাদ করেন, রজব মাসের প্রথম দিনে রোযা পালনকারীর ৬০ বৎসরের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

রেসালায়ে হাশরিয়ায় বর্ণিত আছে, একদিন আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম কবরস্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দেখলেন একটি কবরবাসীর উপর আযাব হচ্ছে এবং সেই কবরবাসী কাঁদছে এবং বলছে ইয়া রসূলাল্লাহ্! আমাকে দোযখের আগুনে জ্বালানো হচ্ছে এবং আমার কাফন আগুনের হয়ে গেছে। আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ঐ কবরবাসীকে বললেন, ‘তুমি যদি রজব মাসে কমপক্ষে একটি রোযাও রাখতে তাহলে তোমার উপর এ আযাব হত না। পরে আল্লাহর রসূল ১০০ বার সূরা ইখলাস পড়ে উক্ত কবরবাসীর উপর বখ্শে দিলেন। মেহেরবান আল্লাহ তা’আলা উক্ত কবরবাসীর কবর আযাব এবং সকল গুনাহ্ মাফ করে দিলেন। রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম রজব মাসের অনেক ফজীলত সম্পর্কে এরশাদ করেন, এ মাসের প্রথম রাত্রি বৎসরের পাঁচটি পবিত্র রাত্রির অন্যতম। এই রাত্রিতে নফল নামায এবং নফল ইবাদত করা অতি উত্তম আমল। এ রাতে আল্লাহর দরবারে যা দু’আ করা হয় তা-ই কবুল হয়।

এ মাসের কতিপয় আমল
হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর বর্ণনা মতে, রজব মাসের চাঁদ দর্শন করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম দু’হাত মোবারক তুলে দিয়ে দোয়া করতেন- আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রজাবাওঁ ওয়া শাবানা ওয়া বাল্লিগনা রমদ্বানা।
অর্থাৎ হে আল্লাহ্! রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতমণ্ডিত করুন আর আমাদেরকে রমযান মাস নসীব করুন।
এ মাসের সর্বপ্রথম শুক্রবার (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) ইবাদত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ রাতকে লাইলাতুর রাগায়িব বলা হয়। দুই রাকাত করে ১২ রাকাত নফল নামায আদায় করবেন এরাতে। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে ৩বার সূরা ক্বদর (ইন্না আনযালনাহু ফি..) ও ১২ বার সূরা ইখলাস পাঠ করবেন। অতঃপর নামায সমাপ্ত করে ৭০ বার পড়বেন- আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন্ নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলা আলিহী ওয়াসাল্লাম।
অতঃপর সাজদায় গিয়ে ৭০ বার পাঠ করবেন- সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়াররূহ।
অতঃপর মাথা তুলে বসে, আরো ৭বার উক্ত দোয়া পাঠ করবেন এবং আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করবেন।
এ মাসের ১৫ তারিখের রজনীতে লাইলাতুল ইস্তিফতাহ্ বলা হয়। কিতাবে বর্ণিত হয়েছে- এ রাতে যেন স্রষ্টার করুণা প্রত্যাশীরা বিশেষভাবে নফল ইবাদতে অতিবাহিত করে। বিশেষত যে ব্যক্তি এ রাতের সূরা ফাতিহার সাথে ৩ বার সূরা ইখলাস দ্বারা ২রাকাত বিশিষ্ট ৭০ রাকাত নামায আদায় করে তার জন্য অপরিসীম সওয়াব প্রদানের আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
লায়লাতুল মিরাজ তথা রজবের ২৬ তারিখ দিনগত ২৭তম রজনীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য অশেষ। এ রাতে হযরত রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মহান রাব্বুল আলামীন স্বীয় দিদার দানের উদ্দেশ্যে উর্ধালোকে নিয়ে গিয়েছিলেন। এ রাতে ইবাদতের অপরিসীম ফজিলত রয়েছে। বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে- যে ব্যক্তি এ রাতে ১২ রাকাত নফল নামায আদায় পূর্বক ১০০বার করে দোয়ায়ে ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ্) কালিমায়ে তামজীদ ও দরূদ শরীফ পাঠ করে নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ তার সমস্ত প্রার্থনা কবুল করবেন। হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি এ রাতে ইবাদত করে পরদিন রোজা রাখে তাঁর আমলনামায় ১০০ বৎসর ইবাদতের সওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে।

এ মাসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
হযরত মুসা আলায়হিস্ সালাম এর সাথে আল্লাহ্ তা’আলা কালাম (কথোপকথন) পূর্বক তাঁকে ধন্য করেন এ মাসের ১৫ তারিখ এবং হযরত ইদ্রিস আলায়হিস্ সালামকে বেহেশতে উঠিয়ে নেয়ার তারিখও ১৫ রজব। ২৮ রজব হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নবুয়ত প্রকাশ হয়। ১ রজব হযরত নূহ আলায়হিস্ সালাম আল্লাহ্র নির্দেশে কিশতীতে আরোহন করেছিলেন।
এ মাসে কয়েকজন বুযুর্গের জন্ম ও ওফাত
জন্ম: ১৩ রজব: হযরত আলী র্কারামাল্লাহু ওয়াজহাহু।
ওফাত:
০১.রজব: ইমাম শাফিয়ী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু।
০২.রজব: ইমাম মূসা কাজেম ও আল্লামা নক্বী আলী খান।
০৬. রজব: খাজা মঈনুদ্দীন চিশ্তী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি।
১২.রজব: আল্লামা গাযী আযীযুল হক শেরে বাংলা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি।
১৫.রজব: হযরত ইমাম জাফর সাদেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু।
২২.রজব: মুআবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু।
২৭.রজব: হযরত ইমাম আবু ইয়ূসূফ ও জুনাইদ বাগদাদী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি।

আগামী চাঁদ আগামী মাস: মাহে শাবান
শাবান মাসের প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতের চার রাকাত নফল নামায আদায়ের জন্য হাদীস শরীফে উৎসাহিত করে বলা হয়েছে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস ৩০ বার করে আদায় পূর্বক যে এ নামায আদায় করবে তাকে একটি হজ্ব ও উমরাহ’র সওয়াব দান করা হবে। অপর হাদীসে বর্ণিত- যে ব্যক্তি শাবান মাসে তিন হাজার বার দরূদ শরীফ পাঠ করবে তার জন্য কিয়ামত দিবসে রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সুপারিশ অবধারিত। এ মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত শবে বরাত বা ভাগ্য বণ্টনের রাত হিসেবে সুবিদিত।

হযরত শেখ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, অধিকাংশ ইমামের মতানুযায়ী এ রাতে সৃষ্টির মহান কার্যাদি আরম্ভ হয়ে শবে কদরে তা সমাধা হয়। এ রাতে লিপিবদ্ধ করা হয় মানুষের হায়াত ও রিযিক এবং যারা মাফ চায় তাদের ক্ষমা করা হয়। এ রাতে আল্লাহ্ তা‘আলা ঘোষণা করেন, তোমাদের মধ্যে এমন কে আছো- যে আমার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কে আছ রিযিক প্রার্থী? তাকে রিযিকে প্রাচুর্য দান করব। কেউ কি আছ বিপদগ্রস্ত যা হতে মুক্তি প্রার্থী? আমি তাকে বিপদ হতে নাজাত দান করব। যে কোন চাহিদাই আজ পূর্ণ করব। [ইবনে মাজাহ্ শরীফ] হাদীস শরীফে তাই বলা হয়েছে যে, এ রাতে ইবাদত বন্দেগীতে নিদ্রাহীন অতিবাহিত করে পরদিন রোজা পালন করার জন্য। অপর এক হাদীসে বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি এ রাতে ইবাদতের নিয়তে গোসল করে তার জন্য প্রত্যেক পানির বিন্দুতে সাতশ রাকাত নফল নামাযের সওয়াব লিখা হবে। গোসলের পর দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল অজুর নামায পড়বেন প্রতি রাকাতে একবার আয়াতুল কুরছি ও তিনবার সূরা ইখলাস দ্বারা। এপর সূরা ফাতিহার সাথে একবার সূরা কদর ও পঁচিশবার সূরা ইখলাস দ্বারা আট রাকাত নামায আদায় করবেন। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার সাথে সূরা কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক ও নাস এ চারটি সূরা এবং একবার আয়াতুল কুরসী ও লাক্বাদ জাআকুম রাসূলুম মিন আনফুসিকুম….. (শেষ পর্যন্ত) দ্বারা আদায় করে সালাম ফিরানোর পর যে দোয়া করবেন তাই কবুল হবে।

যাদুকর, মুশরিক, কৃপণ, মাতা-পিতাকে কষ্ট প্রদানকারী, গণক, মদ্যপায়ী, ব্যাভিচারী, অপর মুসলমানের প্রতি শুত্র“তা পোষণকারী, সুদখোর ও ঘুষখোর এবং যারা পাপ হতে তাওবা করেনা তাদের দোয়া কবুল হবে না। আল্লামা আবুল কাশেম আফফার রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেন- আমি একদিন স্বপ্নে নবীনন্দিনী হযরত ফাতেমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা-এর সাক্ষাত লাভ করি। তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম- আপনার রূহের প্রতি কিরূপ আমলের সাওয়াব বখশিশ করলে আপনি অধিক আনন্দিত হন? তিনি বললেন, হে আবুল কাশেম! শাবান মাসে আট রাকাত নামায প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস পাঠে আদায় করত আমার রূহের প্রতি সাওয়াব বখশিশ করলে আমি অত্যন্ত খুশী হই এবং তাঁর জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ না করা পর্যন্ত আমি জান্নাতে প্রবেশ করব না।