আনজুমানের জশনে জুলুস ৪৬ বছরের বর্ণাঢ্য পথযাত্রা -রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রত্যাশা -দৈনিক আযাদী

0

আনজুমানের জশনে জুলুস ৪৬ বছরের বর্ণাঢ্য পথযাত্রা

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রত্যাশা

কাশেম শাহ

‘নূর নবী এসেছে, নূর নিয়ে এসেছে
তাই বলে আজ কূল কায়েনাত খুশির ঢেউয়ে মেতেছে।
আসসালাতু আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসুলাল্লাহ
আসসালাতু আসসালামু আলাইকা ইয়া হাবিবাল্লাহ’
নাতে রাসুলের (দ) এমন মনকাড়া কথা আর সুরের আবহ নগরজুড়ে। আগামীকাল ১২ রবিউল আউয়াল, পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ)। বিশ্বমানবতার মুক্তির দিশারী রহমাতুল্লিল আলামিন সাইয়েদুল মুরসালিন খাতামুন্নাবিয়ীন তাজেদারে মদীনা জগতকুল শিরোমণি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলা আলিহী ওয়া সাল্লামের জন্মদিবস। নজরুলের ভাষায়- তিনি আলোর মিনার নূর মদিনার জান্নাতি বুলবুল/তিনি যষ্টি মুকুল বৃষ্টি বকুল বৃষ্টি ভেজা ফুল/নিখিলের চির সুন্দর সৃষ্টি মুহাম্মদ রাসুল…।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয় নানা কর্মসূচি।
এসব কর্মসূচির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, বর্ণাঢ্য আয়োজন জশনে জুলুস, যেটি আজ থেকে ৪৬ বছর আগে ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, কাদেরিয়া তরিকার প্রাণপুরুষ হযরতুল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রা)। আরবী বছরের হিসাব অনুযায়ী এবার সে জশনে জুলুসের ৪৮তম আয়োজন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
প্রস্তুতি সম্পন্ন, এবার অপেক্ষা : জশনে জুলুসের আয়োজক সংস্থা আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট গতকাল জানিয়েছেন, এবারের জশ্‌নে জুলুসকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর সড়ক ও ভবনসমূহে এ উপলক্ষে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। জুলুসের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য কয়েক হাজার নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক এবং নিরাপত্তা কর্মী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জুলুস শুরু হবে সকাল ৮ টায় চট্টগ্রাম জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন আলমগীর খানকাহ্‌ শরিফ হতে। জুলুসে নেতৃত্ব দিবেন আওলাদে রাসূল, রাহনুমায়ে শরীয়ত ও ত্বরিকত আল্ল্ল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্‌ (মাদ্দাজিল্লুহুল আলী) এবং এতে অংশগ্রহণ করবেন শাহাজাদা আল্ল্ল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ কাসেম শাহ্‌ (মাজিআ) ও শাহাজাদা আল্ল্ল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ হামিদ শাহ্‌ (মাজিআ)। জুলুসটি চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ সড়কসমূহ প্রদক্ষিণ করে পূণরায় জামেয়া ময়দানে ফিরে এসে মাহফিলের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে।
যেভাবে শুরু জশনে জুলুস : ১৯৭৪ সনে প্রথমবারের মত হুজুর গাউসে জামান আওলাদে রাসুল (দ.) আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রা) এর নির্দেশে নগরীর বলুয়ারদীঘি খানকায়ে কাদেরিয়া সৈয়দিয়া তৈয়বিয়া থেকে এ জশনে জুলুস বের হয়। সে জুলুসে নেতৃতত্ব দেন তাঁরই (আল্লামা তৈয়ব শাহ) খলিফা আলহাজ নূর মোহাম্মদ আল কাদেরী। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সন থেকে ১৯৮৬ সন পর্যন্ত জুলুসে নেতৃত্ব দেন আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ (রা.)। ১৯৮৬ সনে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তরিকতের খেদমত আঞ্জাম দেওয়া, জুলুসে নেতৃত্ব দেওয়াসহ সমস্ত কিছুর দায়িত্ব পান তাঁরই বড় সাহেবজাদা আওলাদে রাসুল হযরতুল আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মাজিআ)। মাঝখানে দুই বছর ছাড়া ১৯৮৭ থেকে এ পর্যন্ত জুলুসে তিনিই নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ বছরও তাঁরই ছদারতে ঢাকার পর চট্টগ্রামে জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত হবে।
এবার যে পথে জুলুস : গতবারের চেয়ে এবার কিছুটা বেড়েছে জুলুসের পরিধি। জুলুস ষোলশহর আলমগীর খানকাহ থেকে শুরু হয়ে বিবিরহাট-মুরাদপুর, মির্জাপুল-পাঁচলাইশ-চকবাজার-প্যারেড কর্নার হয়ে চন্দনপুরা-দেওয়ান বাজার-আন্দরকিল্লা-চেরাগি পাহাড়-জামাল খান হয়ে আসকার দীঘি-কাজির দেউড়ি-আলমাস-ওয়াসা হয়ে জিইসি-দুই নম্বর গেট পুনরায় মুরাদপুর হয়ে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদরাসা ময়দানে গিয়ে শেষ হবে। ইতিমধ্যে আনজুমান ট্রাস্ট থেকে মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলার গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান নির্ধারণ করে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে।
সোয়া লাখ মানুষের জন্য তাবারুক : জশেন জুলসে এবার ৬০ লাখ লোকের সমাগম হবে বলে আশা করছে এর আয়োজক সংস্থা। কিন্তু অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে সবার পক্ষেই জুলুসের মূল কেন্দ্র জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়ায় প্রবেশ করা সম্ভব হয় না। তবে যারা যাবেন তাদের জন্য মাদরাসা সংলগ্ন ৫ মহল্লায়, নাজির পাড়া, হাদু মাঝির পাড়া, মোহাম্মদ পুর, খতিবের হাটসহ আশেপাশের সব এলাকায় সাড়ে ৪শ ডেক বিরিয়ানি রান্না করা হচ্ছে। এতে প্রায় সোয়া লাখ লোকের তাবারুকের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানালেন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, জুলুসে আগত মেহমানদের জন্য মাদরাসা সংলগ্ন সব ভবনের নিচে, ছাদে নামাজের ব্যবস্থা থাকবে, সমস্ত অলিগলি ছাড়িয়ে বাসাবাড়িতেও মুসল্লীরা নামাজ আদায় করতে পারবেন। থাকবে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও অযুখানার ব্যবস্থা।
চাই রাষ্ট্রীয় মর্যাদা-স্বীকৃতি : ১২ রবিউল আউয়ালের এই জশ্‌নে জুলুস বর্তমানে চট্টগ্রাম’র ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে। চট্টগ্রাম’র মানুষ পুরো বছর এই দিনটি উদ্‌যাপনের জন্য যেন অপেক্ষায় থাকে এবং যে যার যার মত করে এতে বিভিন্ন রকম সহযোগিতা দিয়ে আসছে বহুবছর ধরে। চট্টগ্রাম’র এই জশ্‌নে জুলুস অদূর ভবিষ্যতে জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত হয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে গণ্য হবে বলে আনজুমান ট্রাস্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। তাঁরা, সকলকে দেশের প্রচলিত আইন, শান্তি-শৃক্সখলা এবং আনজুমান নির্দেশনা মেনে আগামীকালের জশ্‌নে জুলুসে যোগদান করতে আহবান জানিয়েছেন।
আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের সেক্রেটারি জেনারেল আলহাজ মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এ দিনটি অত্যন্ত মর্যাদার, আনন্দের। যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হওয়ায়, ইন্টারনেটের কল্যাণে আজ সারাবিশ্বে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে নানা আয়োজন আমরা অবলোকন করতে পারছি। হুজুর আল্লামা তৈয়ব শাহ (রা) আজ থেকে ৪৪ বছর আগে যে দূরর্দশী চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তা আজ সারাদেশে, গ্রামে গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায় এক অভূতপূর্ব আন্দোলন তৈরি করেছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতাদর্শ ধারণ ও লালন করেন এমন সব দরবার এবং তাঁদের অনুসারীগণ রাসুল প্রেম ও ভালোবাসার বহিপ্রকাশ হিসেবে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উদযাপন করেন। তাই এ জুলুসের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এখন সময়ের দাবি।
গেয়ারভী শরীফ সম্পন্ন, আজ দাওয়াতে খায়র মাহফিল : জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ) উপলক্ষে আজ শনিবার বিকেল ৩টা হতে রাত ৯ টা পর্যন্ত, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়াস্থ জুলুসের ময়দানে দাওয়াতে খায়র মাহফিল আয়োজন করেছে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ। রাহনুমায়ে শরিয়ত ও ত্বরিকত, আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্‌ (মাজিআ) এতে প্রধান অতিথি থাকবেন। এতে গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের দাওয়াতে খায়র বিষয়ক মুয়াল্লিম মৌলানা এমরান কাদেরীর পরিচালনায় শরিয়তের জরুরি মাসয়ালা সমূহের বয়ান এবং ব্যবহারিক শিক্ষা দেবেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নির্ধারিত মুয়াল্লিমগণ। বক্তব্য রাখবেন শেরে মিল্লাত, মুফতি ওবাইদুল হক নঈমী, জামেয়ার অধ্যক্ষ মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অসিয়র রহমান, উপাধ্যক্ষ মৌলানা ড. লিয়াকত আলি, শেখুল হাদিস আল্লামা হাফেজ সোলায়মান আনসারী, আল্লামা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান, অধ্যাপক মৌলানা সৈয়দ জালালুদ্দিন আল আজহারী প্রমুখ। এতে অংশগ্রহণ করে মুসলমান হিসেবে জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মাসায়েল শিখতে সকল মুসলমানদের অনুরোধ জানিয়েছেন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আলহাজ পেয়ার মোহাম্মদ কমিশনার ও মহাসচিব শাহজাদ ইবনে দিদার। এদিকে গতকাল বিকেলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এসে পেঁৗঁছেছেন আল্লামা তাহের শাহ (মাজিআ) ও তাঁর দুই সাহেবজাদা। পরে তারা মাসিক গেয়ারভি শরীফে অংশ নেন।