ইসলামে বিচার ব্যবস্থা

0

ইসলামে বিচার ব্যবস্থা-
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি >

عن بريدة رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم القضاة ثلثة واحد فى الجنة واثنان فى النار فامّا اللذى فى الجنة فرجل عرف الحق فقضى به ورجل عرف الحق فجار فى الحكم فهو فى النار ورجل قضى للناس على جهل فهو فى النار – (رواه ابو داود ابن ماجة مشكوة صفحه۳٢٤)

অনুবাদ: হযরত বুরায়দা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, বিচারক তিন প্রকার: এক প্রকার বিচারক জান্নাতী আর দুই শ্রেণির বিচারক জাহান্নামী হবে। জান্নাতী বিচারক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যিনি মূল সত্যটি জেনে সে মুতাবিক রায় দিয়েছেন, আর যে বিচারক সত্য জানা সত্ত্বেও আদেশ দানের ক্ষেত্রে অন্যায়ের আশ্রয় গ্রহণ করে সে হবে জান্নামী। আর যে ব্যক্তি অজ্ঞতা অবস্থায় বিচারককার্য সম্পন্ন করে সেও জাহান্নামী হবে। [আবু দাঊদ, ইবনে মাজাহ, মিশকাত: পৃষ্ঠা ৩২৪]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
ন্যায় পরায়ণতা মুমীনের অন্যতম মহথ গুণ, আদল তথা ন্যায় বিচার অর্থ হলো ব্যক্তি তার ন্যায্য অধিকার লাভ করা এবং কোন প্রকার কমবেশী না করে অন্যজনের অধিকার যথারীতি প্রদান করা। মুজতাহিদ ইমামগণের মতানুসারে প্রত্যেক বস্তু তার যথাযোগ্য স্থানে স্থাপন করার নাম সুবিচার। আলোচ্য হাদীস শরীফে ইসলামের দৃষ্টিতে সুবিচার এর উত্তম প্রতিদান ও অন্যায় অবিচারের করুন পরিণতি তথা জাহান্নামী হওয়ার বিষয়ে আলোকপাত হয়েছে।
পরিতাপের বিষয় বর্তমান আরব বিশ্বসহ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ন্যায়-নীতি ও ইসলামী বিচার ব্যবস্থা আজ চরমভাবে ভূলন্ঠিত। আজ নামমাত্র মুসলমান আছে ইসলামী আদর্শ নেই। মুমীন আছে ঈমানী দাবী বাস্তবায়নের প্রতি চরম উদাসীন। ইসলামী বিচার ব্যবস্থার গৌরবময় সোনালী অতীতের কালজয়ী ইতিহাস আজ বিলুপ্তির পথে অগ্রসরমান।
পবিত্র ক্বোরআনের আলোকে ইসলামী বিচার ব্যবস্থা
মহান আল্লাহ্ তা‘আলা ইসলামে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার বিধান প্রসঙ্গে এরশাদ করেছেন- إِنَّ اللّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤدُّواْ الأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُم بَيْنَ النَّاسِ أَن تَحْكُمُواْ بِالْعَدْلِ إِنَّ اللّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُم بِهِ إِنَّ اللّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا- (سورة النساء- ايت ۵۸) অর্থ: নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা তোমাদের আদেশ করেন যে, তোমরা যেন প্রাপকের হাতে তাদের প্রাপ্য পৌঁছে দাও। আর যখন তোমরা মানুষের মধ্যে কোন বিচার কার্য মীমাংসা করবে তখন ন্যায় ও ইনসাফ ভিত্তিক বিচার মীমাংসা করবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে সদুপদেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছু শুনেন এবং সব কিছু জানেন। [সূরা আন-নিসা: আয়াত ৫৮] আল্লাহ্ তা‘আলা আরো এরশাদ করেছেন- اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ-
অর্থ: তোমরা সুবিচার করো! কারণ এটিই তাকাওয়ার অধিক নিটকবর্তী। নিশ্চয় আল্লাহ্ তোমাদের যাবতীয় কাজের খবর রাখেন। [সূরা মা-ইদাহ্: আয়াত-৮]

বিচারক নিয়োগে ধার্মিকতাকে গুরুত্ব দিতে হবে
ইসলামী অনুশাসনের প্রতি প্রদ্ধাশীল খোদাভীরু আদর্শবান নির্লোভ নির্মোহ যোগ্যতম ব্যক্তিকে বিচারক নিয়োগ করা হলে জনগণ সুবিচার পাবে। সমাজে ন্যায়-নীতি প্রতিষ্ঠা পাবে। দুর্নীতি, স্বজন প্রীতি, অন্যায়, অনাচার-অবিচার, জুলুম-নির্যাতনের অবসান ঘটবে। সমাজের নিস্পেষিত অবহেলিত অসহায় মানুষেরা তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে।
পক্ষান্তরে অসথ, অযোগ্য, লোভী ব্যক্তি বিচারকের পদ মর্যাদায় আসীন হলে সমাজ ও রাষ্ট্রে দুর্নীতি, সুদ-ঘুষ, অবৈধ লেনদেন বৃদ্ধি পাবে। অপরাধ প্রবণতার শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত হবে। জনগণ প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- من تولى من امر المسلمين شًئيا فاستعمل عليهم رجلا ومو يعلم ان بينهم من هو اولى بذالك واعلم منه بكتاب الله وسنة رسوله فقد هان الله ورسوله وجماعة المسلمين- (رواه الطبرانى)
অর্থ: মুসলমানদের কোন বিষয়ের দায়িত্ব ও শাসনভার যার উপর অর্পিত হয়। তিনি যদি ক্বোরআন-সুন্নাহ্ সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী মানুষকে কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দান না করে অন্যজনকে কর্মকর্তা পদে নিয়োগ করে সে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) ও মুসলিম সমাজের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করলো। [তাবরানী শরীফ]

ন্যায় বিচারক আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে
কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ কঠিন মুহূর্তে ন্যায়-নীতির সাথে দায়িত্ব পালনকারী হকদারকে তার ন্যায্য হক প্রদানের ব্যাপারে দায়িত্ব পালনকারী শাসক ও বিচারকরা কিয়ামতের কঠিন পরিস্থিতিতে আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান পাবে। এরশাদ হয়েছে-
عن عائشة رضى الله عنها عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال اتدرون من السابقون الى ظل الله عزوجل يوم القيامة قالوا الله ورسوله اعلم قال اللذين اذا اعطوا الحق قبلوه واذا سئلوه بذلوه وحكموللناس كحكمهم لائفسهم- (موطا امام مالك)
অর্থ: উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা কি জান! কিয়ামত দিবসে সর্বাগ্রে আল্লাহ্ জাল্লাশানুহুর আরশের ছায়ায় কোন লোকেরা স্থান পাবে- সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা হলো সে সব বিচারক যাদের উপর দায়িত্ব অর্পিত হলে তা গ্রহণ করে যখন তাদের কাছে ন্যায্য হক চাওয়া হয় তখন তা দিয়ে দেয়। মানুষের উপর অনুরূপ শাসন করে যেরূপ শাসন নিজের উপর করে থাকে। [মুআত্তা ইমাম মালিক রাহ.]

প্রতিপক্ষের বক্তব্য না শুনে রায় দেওয়া যাবে না
বিচারক পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কিংবা প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে বা বাদী-বিবাদী কোন পক্ষের কাছে প্রভাবিত হয়ে কারো ভয়ভীতি বা হুমকীর সম্মুখীন হয়ে মামলার রায় প্রদান করবে না। অস্থিরতা, দুঃশ্চিন্তায় ক্রোধান্বিত অবস্থায় বিচারকার্য পরিচালনা করবেন না। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে-
عن على رضى الله عنه بعثنى رسول الله صلى الله عليه وسلم الى اليمن قاضيًا فقلت يا رسول الله ترسلنى وانا حديث السن ولاعلم لى باالقضاء فقال ان الله سيهدى قلبك ويثبت لسانك اذا تقاضى اليك رجلان فلا تقضى فلاول حتى تسمع كلام الاخر فانه احرى ان يتبين لك القضاء قال فما شككت فى قضاء بعد- (مشكوة – صفحه -۳٢٤)
অর্থ: হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমাকে ইয়ামেনের বিচারক নিযুক্ত করে পাঠালেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি আমাকে প্রেরণ করেছেন অথচ আমি অল্প বয়সী ও বিচার কার্য সম্পাদনে অনভিজ্ঞ, নবীজি এরশাদ করেছেন, আল্লাহ্ শীঘ্রই তোমার অন্তরকে সথ পথের আলো দ্বারা উদ্ভাসিত করবেন। এবং তোমার জবানকেও হকের ব্যাপারে অবিচল রাখবেন, তোমার কাছে যখন বাদী-বিবাদী কোন মোকাদ্দমা নিয়ে উপস্থিত হবে, তখন তুমি প্রতিপক্ষের বক্তব্য না শুনে রায় দিবে না। প্রতিপক্ষের বক্তব্য শুনার দ্বারা মোকাদ্দমার সঠিক রায় প্রদানে তুমি সাহায্য প্রাপ্ত হবে। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের এ দু‘আর পর আর কোন মোকাদ্দমায় আমি সন্দেহে পতিত হইনি। [তিরমিযী শরীফ, মিশকাত শরীফ: পৃষ্ঠা ৩২৫]

ইসলামে বিচার ব্যবস্থা সকলের জন্য সমানভাবে প্রাযোজ্য। ইসলামী বিচার ব্যবস্থা, ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, রাজা-প্রজা, সবল-দুর্বল সকলের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। খলীফাতুল মুসলেমীন হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র খিলাফতকালে আপন পুত্র আবু শাহমাকে মদ্যপানের অভিযোগে অপরাধী সাব্যস্ত হলে তার উপর শরয়ী দন্ডবিধি প্রয়োগ করেন।
হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, কোরাইশরা একবার মাখযুমী গোত্রের এক মেয়ে চুরি করলে তাকে ক্ষমা করার জন্য হযরত উসামা বিন যায়েদ প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের দরবারে সুপারিশ পেশ করল। একথা শুনে নবীজি এরশাদ করলেন-
اتشفع فى حدّ من حدود الله ثم قام فاختطب ثم قال انما اهلك اللذى قبلكم انهم كانوا اذا سرق فيهم الشريف تركوه واذا سرق فيهم الضعيف اقاموا عليه الحد وايم الله لو ان فاطمة بنت محمد سرقت لقطعت يدها- (رواه البخارى- جلد٢- صفحه ۱۰۰۳)
অর্থ: (নবীজি এরশাদ করেন) আল্লাহর বিধানের ব্যাপারে সুপারিশ করছ! অতঃপর নবীজি দাঁড়ালেন, সকলের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতির লোকেরা এ জন্যেইতো ধ্বংস হয়ে গেছে যখন তাদের অভিজাত বংশের কোন লোক চুরি করত তখন তারা তাকে ক্ষমা করে দিত। আর যখন কোন দুর্বল লোক চুরি করত- তখন তার উপর শাস্তি প্রয়োগ করত। আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মদ তনয়া ফাতিমাও চুরি করে তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।[বোখারী শরীফ: ২-খন্ড, পৃষ্ঠা ১০০৩]

ইসলামে নিরপেক্ষ বিচারপতি
ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় নিরপেক্ষতার উজ্জ্বল নমুনা ইতিহাসে সোনালী অক্ষরে অক্ষয় হয়ে থাকবে। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর একটি লৌহ বর্ম ছিল এক ইহুদি লৌহ বর্মটি চুরি করেছিল- একদিন হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ইহুদির কাছে লৌহ বর্মটি দেখতে পেলে বর্মটি ফেরত চাইলেন। ইহুদি তা ফেরত দিতে অসম্মতি জানালে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তার লৌহ বর্মটি ফেরত পাওয়ার জন্য সাধারণ নাগরিকের ন্যায় আদালতে বিচার প্রার্থী হলেন। বিচারক খলিফার নিকট তাঁর দাবীর সমর্থনে স্বাক্ষী পেশ করার জন্য বললেন, তিনি তদীয় পুত্র হযরত হাসান (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু) এবং স্বীয় ক্রীতদাসকে স্বাক্ষী হিসেবে পেশ করলেন। ইসলামী বিচার ব্যবস্থায় নিরপেক্ষ বিচার নীতির মাপকাঠিতে পিতার অনুকূলে পুত্রের স্বাক্ষী গ্রহণীয় নয়। বর্মটি প্রকৃত পক্ষে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু-এর হওয়ার পরও বিচারক ইহুদির পক্ষে রায় প্রদান করলো।
নিরপেক্ষ বিচারের এমন নজির বিহীন দৃষ্টান্ত দেখে ইহুদি মুগ্ধ হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করলো। বর্মটির মালিক যে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ইহুদি তা অকপটে স্বীকার করলেন এবং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে বর্মটি ফেরত দিলেন। [মাবসুত, ইসলামী হুকুমত: পৃষ্ঠা-৫২৭] মহান আল্লাহ্ আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলামী বিচার ব্যবস্থা ও ইসলামী অনুশাসন বাস্তবায়ন করার তাওফিক নসীব করুন। আ-মী-ন।

লেখক- অধ্যক্ষ, মাদ্রাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাজিল, হালিশহর, চট্টগ্রাম।