শানে রিসালত: রসূল-ই আকরামের আনুগত্যের গুরুত্ব অপরিসীম

0

শানে রিসালত-
মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান >

রসূল-ই আকরামের আনুগত্যের গুরুত্ব অপরিসীম
রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্যের গুরুত্ব এ থেকে সবিশেষ প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা ক্বোরআন-ই করীমে আপন আনুগত্যের সাথে সাথে রসূল-ই আকরামের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন এবং মুসলমানদেরকে তাদের পারস্পরিক মতবিরোধের মীমাংসার জন্য আল্লাহ্ ও রসূল-ই আক্রামের শরণাপন্ন হবার নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন- এরশাদ হচ্ছে-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ ۖ فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ
তরজমাঃ হে ঈমানদারগণ! নির্দেশ মান্য করো আল্লাহর, নির্দেশ মান্য করো রসূলের আর তাদেরই, যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতভেদ ঘটে, তবে সেটাকে আল্লাহ্ ও রসূলের সম্মুখে রুজূ’ করো! [সূরা নিসা: আয়াত-৫৯, কানযুল ঈমান] এ আয়াতের শানে নুযূল বা অবতীর্ণ হবার প্রেক্ষাপট এ যে, হুযূর সাইয়্যেদে আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম একটি সৈন্যদলকে জিহাদের জন্য পাঠালেন। ওই সেনাদলের প্রধান (অর্থাৎ সেনাপতি) ছিলেন হযরত খালেদ ইবনে ওয়ালীদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসির রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও ওই সেনাবাহিনীতে ছিলেন। যখন কাফিরদের শহরের নিকটে সৈন্য বাহিনীটা পৌঁছালো, তখন কাফিরগণ ভয়ে পালিয়ে গেলো; এক ব্যক্তি ব্যতীত। সে গোপনে হযরত আম্মারের তাঁবুতে আসলো এবং নিরাপত্তা নিয়ে নিলো। ভোরে হযরত খালিদ তাকে গ্রেফতার করে নিলেন এবং তার মাল-সামগ্রীকে গণীমতের মাল সাব্যস্ত করে নিলেন। হযরত আম্মার বললেন, ‘‘আমি তাকে নিরাপত্তা দিয়েছি।’’ তখন হযরত খালিদ বললেন, ‘‘আমি সেনাধ্যক্ষ। তুমি আমাকে জিজ্ঞাসা না করে নিরাপত্তা কেন দিলে? আমি তা মানিনা।’’ মোটকথা, তিনি হযরত আম্মারের কথা মানলেন না।
যখন এ সেনাবাহিনী মদীনা তৈয়্যবায় হাযির হলো, তখন এ মামলা নবী-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র দরবারে পেশ করা হলো। হুযূর-ই আক্রাম আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম হযরত আম্মারের নিরাপত্তা প্রদানকে বহাল রাখলেন এবং কয়েদীকে ছেড়ে দিলেন। আর নির্দেশ দিলেন যেন ভবিষ্যতে কেউ সেনাধ্যক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে কাউকে নিরাপত্তা না দেন। এতদ্ভিত্তিতে হযরত আম্মার হযরত খালিদকে কিছুটা তিরস্কার করলেন। তদুত্তরে হযরত খালিদ বললেন, ‘‘যদি এ পবিত্র ইজলাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা অপরিহার্য না হতো, তবে আমি এ গোলাম (ক্রীতদাস, আম্মার)কে এর উপযুক্ত জবাব দিতাম।’’ (হযরত আম্মার হাশিম ইবনে মুগীরার ক্রীতদাস ছিলেন)। হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এরশাদ করলেন, ‘‘হে খালিদ! আম্মারের সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি রয়েছে এবং তার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি রয়েছে।’’ হযরত খালিদ হযরত আম্মারের নিকট ক্ষমা চাইলেন। মামলা খতম হলো। এ প্রসঙ্গে এ আয়াত শরীফ নাযিল হয়েছে।
এখানে লক্ষণীয় হচ্ছে- উল্লিখিত আয়াত শরীফে তিন সত্তার আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- আল্লাহ্, রসূল এবং উলিল আমর; কিন্তু ‘আত্বী-‘ঊ (اَطِيْعُوْا) আদেশ সূচক শব্দ আনা হয়েছে দু’বার; তিনবারও আনা হয়নি, একবারও আনা হয়নি। এর কারণ হচ্ছে- আল্লাহ্ ও রসূলের আনুগত্য এবং উলিল আমরের আনুগত্যের মধ্যে দু’ ধরনের পার্থক্য রয়েছে-১. খোদা তা‘আলা ও রসূল-ই আকরামের আনুগত্য হচ্ছে মূল উদ্দেশ্য (مقصود بالذات)। কারণ আল্লাহ্ ও রসূল হলেন স্বাধীন বা মূল হুকুমদাতা। আল্লাহ্ ও রসূল যা বলেন তা-ই কানূন। যদি হুযূর-ই আক্রামের কোন হুকুম বাহ্যিকভাবে ক্বোরআনের অনুরূপ নয় বলে মনে হয়, তবে বলা হবে-এ হুকুম দ্বারা ক্বোরআনের হুকুমটি মানসূখ; অথবা ওই হুকুম দ্বারা ক্বোরআনে বর্ণিত বিষয়টিকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে; আর ওটাকে ‘নাসিখ’ বলে ধরে নেওয়া হবে অথবা বুঝতে হবে যে, পূর্ববর্তী বিধানের মেয়াদকাল এ পর্যন্ত। পরবর্তী সময়ের জন্য হাদীস শরীফে বর্ণিত বিধান। ইসলামের বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে নাসিখ-মানসূখের বিষয়টি স্বীকৃত। ‘উসূল’ শাস্ত্র দ্রষ্টব্য।
যেমন-সাজদাহ্ই তাহিয়্যাহ্ (তা’যীমী সাজদাহ)’র বৈধতার প্রমাণ ক্বোরআনে পাওয়া যায়; কিন্তু হাদীস শরীফে তা অবৈধ তথা হারাম সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর বিশেষীকরণের উদাহরণ হচ্ছে হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর জন্য হযরত ফাতিমা যাহরার জীবদ্দশায় দ্বিতীয় বিবাহ্ হারাম করে দেওয়া হয়েছে। হযরত আবূ খোযায়মাহ্ আনসারীর সাক্ষ্যকে দু’জন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান সাব্যস্ত করা হয়েছে। সুতরাং ওই ক্বোরআনী কানুন থেকে তাঁরা বাইরে।
কিন্তু ‘উলিল আমর’-এর ব্যতিক্রম। তাঁদের আনুগত্য এজন্য করা হয় যে, তাঁরা আল্লাহ্ ও রসূলের আনুগত্য করেন। যদি তাঁদের হুকুম শরীয়তের অনুরূপ হয়, তাহলে গ্রহণযোগ্য, অন্যথায় গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহর আনুগত্য করার মধ্যে রসূলের আনুগত্যের কথা স্মরণ রাখা হয়। আর রসূলের আনুগত্যের মধ্যে খোদা তা‘আলার আনুগত্যের কথা এসে যায়। ফরয ইবাদতের মধ্যে দুরূদ শরীফ পড়া হয় এবং সুন্নাতগুলোর মধ্যে ক্বোরআন মজীদ তিলাওয়াত করা হয়।
আর ‘উলিল আমর’ হলেন মুজতাহিদ ইমামগণ অথবা ইসলামী বাদশাহ্ অথবা হাকিম (শাসক/বিচারক) বা খলীফা অথবা মাতাপিতা অথবা পীর-মাশাইখ অথবা শরীয়তের আলিমগণ। অর্থাৎ ‘উলিল আমর’-এর ‘আমর’ মানে হুকূমত (শাসনকার্য), আর ‘উলী’ মানে অধিকারী। সুতরাং ‘উলিল আমর’ ইসলামী খলীফা, বাদশাহ্, শাসক ইত্যাদি অথবা ‘আমর’ মানে ‘নির্দেশ’। তখন ‘উলিল আমর’ মানে হবে ‘আলিমগণ’। কারণ, শরীয়ত অনুসারে কারো আনুগত্যের বিধান ও নিয়ম-কানূন আলিমদের থেকে শেখা বা পাওয়া যায়। এভাবেও বলা যায়- সবার নির্দেশদাতা হলেন বাদশাহ্ আর বাদশাহর হাকেম (নির্দেশদাতা) হলেন শরীয়তের দক্ষ আলিম। এমনকি চিকিৎসকও স্বয়ং বাদশাহর নির্দেশদাতা হন। তিনি তাঁকে যা প্রয়োজন মনে করেন খাওয়ার অনুমতি দেন, যা অনুপযুক্ত মনে করেন তা খেতে বারণ করেন। এ জন্য দুনিয়া সৃষ্টির ইতিহাসে, প্রথম দিকে, আল্লাহর পক্ষ থেকে খলীফা (প্রতিনিধি) হবার উপযুক্ত ছিলেন হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম, যিনি ইলম সম্পন্ন ছিলেন; ফেরেশতারা হননি, যাঁরা আবিদ (ইবাদতপরায়ণ) ছিলেন; বরং ইবাদতপরায়ণ ফেরেশতাদেরকে ইলম সম্পন্ন (হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম)-এর সামনে মাথা নত করতে হয়েছিলো। এ জন্য কথিত আছে- ‘আবিদের জন্য মসজিদ, আলিমের জন্য তখতে খিলাফত। কারণ, ইলমের মধ্যে রয়েছে ‘হুকুমত’ (শাসনক্ষমতা)।’
প্রসঙ্গতঃ লক্ষণীয় যে, আয়াতাংশ (اولى الامر) (উলিল আমর) থেকে ‘তাক্বলীদ’ (মাযহাবের কোন ইমামের অনুসরণ) ওয়াজিব হবার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়। আহকাম বা বিধানাবলী তিন প্রকারেরঃ ১. সুস্পষ্টভাবে ক্বোরআন মজীদ থেকে প্রমাণিত বিধানাবলী, ২. সুস্পষ্টভাবে হাদীস শরীফ থেকে প্রমাণিত বিধানাবলী এবং ৩. ওইসব বিধান, যেগুলো এ দু’-এর কোনটাতে সুস্পষ্টভাবে পাওয়া যায় না। প্রথমোক্তটার উদাহরণ- নামায, রোযা ও যাকাত ইত্যাদি। দ্বিতীয়টার উদাহরণ-যেমন স্বর্ণ-রৌপ্যের ব্যবহার পুরুষদের জন্য হারাম (নিষিদ্ধ) হওয়া অথবা কুকুর ও গাধার গোশত হারাম হওয়া ইত্যাদি আর তৃতীয়টার উদাহরণ স্ত্রীর পায়ুতে সঙ্গম করা হারাম হওয়ার বিধান; এটাতো হায়য বা ঋতু¯্রাবের সময় স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করার নিষেধ থেকে প্রমাণিত (অনুমিত)। এ তিন প্রকারের বিধানের জন্য তিন আনুগত্যের উপযোগীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। বাকী রইলো ইজতিহাদী নয় এমন মাসআলাগুলো। এ গুলোতে আল্লাহ ও রসূলের সরাসরি আনুগত্য করতে হবে আর ইজতিহাদী মাসআলাগুলোতে মুজতাহিদ ইমামগণের আনুগত্য করতে হবে। অর্থাৎ তাঁদের মাধ্যমেই আল্লাহর রসূলের আনুগত্য করা হয়।
এ কারণে কোন মুজতাহিদ নন এমন গাউস, ক্বুত্বব, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির এবং ফক্বীহ্ প্রমুখও ‘গায়র মুক্বাল্লিদ’ হননি। আলিম তথা মুজতাহিদ ইমামগণের উপমা বৃষ্টির পানির মতো। অর্থাৎ বাগানের ফুল, ফল, ঘাস ও বৃক্ষ ইত্যাদি এসবই পানির বরকতেই সৃষ্ট। এভাবে ইসলামরূপী বাগানে গাউস, ক্বুত্বব, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির প্রমুখ সেটার ফলমূলের মতো। তাঁরা ইলম সম্পন্নদের মাধ্যমেই এ মর্যাদাপ্রাপ্ত হন। হাদীস শরীফে আলিমগণকে ইলমে নুবূয়তের পুকুর (জলাধার) বলা হয়েছে। সুতরাং আলিমগণ হলেন ওই ইলমের মতো পুকুরের। ডেপুটি কমিশনার, ডাক্তার, কালেক্টর প্রমুখও তাদের ওস্তাদের কারণেই এমনটি হতে পেরেছেন। যদি ওস্তাদ না হতেন, তবে তাঁদের কেউ এমন হতেন না।
বাকী রইলো আয়াতাংশ ‘ফাইন তানা-যা, যা’তুম ফী-শায়ইন’। (অর্থাৎ যদি তোমাদের মধ্যে কোন বিষয়ে মতবিরোধ হয় তবে…)। এখানে মীমাংসা নেওয়ার জন্য শুধু দু’ সত্তা অর্থাৎ আল্লাহ্ ও রসূলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে ‘গায়র মুক্বাল্লিদ’গণ (লা-মাযহাবীরা) দলীল গ্রহণ করে। তারা বলে, ‘‘মুসলমানদেরকে পারস্পরিক বিরোধ মীমাংসা করার জন্য শুধু ক্বোরআন ও হাদীসের দিকে রুজূ’ করতে হবে; ফক্বীহ্গণ কিংবা ইলমে ফিক্বহ্ থেকে সমাধান বের করা এ আয়াতের পরিপন্থী।’’ এর জবাবে বলা হয়-
১. فَاِنْ تَنَازَعْتُمْ দ্বারা বুঝানো হয়েছে- ‘তোমরা ও শাসকগণ’। অর্থাৎ যদি তোমরা ও শাসকগণ কোন বিষয়ে মতবিরোধে জড়িয়ে পড়, তবে ওই শাসক বা বিচারকগণ মীমাংসা করতে পারবেন না। কারণ, এখন তাঁরাও (শাসক/বিচারকগণ) হলেন- বিবাদী। এমতাবস্থায় তোমাদের বিরোধ মীমাংসা করবেন- আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল।
২. যদি ‘উলুল আমর’ মানে ‘আলিমগণ হন, তাহলে মর্মার্থ দাঁড়াবে, যদি তোমরা ও আলিমগণের মধ্যে কোন মাসআলায় বিরোধ করো, তাহলে মুজতাহিদদের দিকে রুজূ’ করো, তখন তাঁরা ক্বোরআন ও হাদীস শরীফ থেকে মাসাইল অনুমান করে তোমাদের বিরোধ মীমাংসা করবেন। কারণ, মুজতাহিদের দিকে রুজূ’ করা মহান আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূল-ই আকরামের দিকে রুজূ’ করার নামান্তর। কেননা, মুজতাহিদদের ক্বিয়াস ক্বোরআন-হাদীসেরই প্রকাশস্থল। যেমন, এ মর্মে ঝগড়া হলো যে, স্ত্রীর পায়ুপথে সঙ্গম করা জায়েয কিনা? তখন ক্বোরআনের দিকে রুজূ’ করো অর্থাৎ মুজতাহিদদের ক্বিয়াসকে বিচারক সাব্যস্থ করো। তখন জবাব আসবে, স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করা তার ঋতু¯্রাব চলাকালে না-পাকীর কারণে হারাম। সুতরাং নাপাকী তো এটাও। তাই এটাও হারাম। সুতরাং এটাই হলো আল্লাহর দিকে রুজূ’ করা। এটাকেই ক্বিয়াস বলা হয়।
৩. আর যদি এ অর্থ গ্রহণ করা হয় যে, বিরোধ হলেই তখন খোদা ও রসূলকে বিচারক মানতে হবে, অন্য কাউকে না। তখন তো নি¤œলিখিত আপত্তিগুলো সামনে এসে যাবে-
ক. ক্বোরআন বলেছে-فَاتَّبِعُوْا حَكَمًا مِنْ اَهْلِه وَحَكَمًا مِّنْ اَهْلِهَا  অর্থাৎ স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ হলে একজন বিচারক স্বামীর পক্ষ থেকে পাঠাও, আরেকজন বিচারক পাঠাও স্ত্রীর পক্ষ থেকে। [সূরা নিসা: আয়াত-৩৫] এখানে একেকজন মানুষকে মীমাংসাকারী বানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্য আয়াতে এরশাদ হয়েছে-
وَلَوْ رَدُّوهُ إِلَى الرَّسُولِ وَإِلَى أُولِي الأَمْرِ مِنْهُمْ
لَعَلِمَهُ الَّذِينَ يَسْتَنبِطُونَهُ مِنْهُمْ
তরজমা: আর যদি সে ক্ষেত্রে তারা (সেটা প্রচার না করে) রসূল এবং নিজেদের ক্ষমতা সম্পন্ন লোকদের গোচরে আনতো, তবে নিশ্চয় তাদের নিকট থেকে সেটার বাস্তবতা জানতে পারতো, যারা পরবর্তীতে (তথ্য অনুসন্ধানের জন্য) প্রচেষ্টা চালায়। [সুরা নিসা: আয়াত-৮৩, কানযুল ঈমান] এখানে জ্ঞানীদের নিকট ফিরে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যকার বিরোধ মীমাংসার জন্য সালিসকার এবং তথ্য অনুসন্ধানের জন্য আলিমদেরকে ক্বোরআনই চয়ন করেছে। এটাও কি হারাম?
তাছাড়া, আহলে হাদীস তথা লা-মাযহাবীরা এটাও বলে বেড়ায় যে, হাদীসে কি নেই, যা ফিক্বহে তালাশ করতে হবে? হাদীস ও ক্বোরআন কি যথেষ্ট নয়? তাছাড়া, এক দ্বীনকে চার মাযহাব বানানো বিভক্তিকরণ নয়? এমনটি করা তো আল্লাহর বাণী هذَا صِرَاطِىْ مُسْتَقِيْمًا (এ-ই আমার সরল-সোজা পথ)-এর পরিপন্থী। তাই সবার আহলে হাদীস হয়ে যাওয়া উচিৎ। (না‘ঊযুবিল্লাহ্) কিন্তু এসব ক’টি আপত্তি অহেতুক, অনর্থক, বাজে কাজ। তাও কয়েকটা কারণে-
প্রথমতঃ এজন্য যে, হাদীস শরীফেও বর্ণিত হয়েছে, হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করেছেন, ‘‘আমার হাদীসকে কিতাবুল্লাহ্ (ক্বোরআন)-এর সামনে পেশ করো! যাকে সেটার অনুরূপ পাও, তা গ্রহণ করো।’’ আহলে ক্বোরআনও এ হাদীস শরীফ পেশ করে আহলে হাদীসের মতো আপত্তি করে। আমরা (হক্বপন্থীরা) বলছি, এ প্রসঙ্গে তোমরা যা জবাব দেবে আমাদের জবাবও তা-ই হবে। তাছাড়া, এ পর্যন্ত হাজারো ইমাম ও ওলামা গত হয়েছেন, কারো তো এ কথা বলায় দুঃসাহস হয়নি যে, মাযহাবের ইমামগণের কথা ক্বোরআন ও হাদীসের বিপরীত প্রমাণিত হয়েছে! বরং আল্লাহর বড় ওলী, মুফাস্সির ও মুহাদ্দিসগণ তাক্বলীদ (মাযহাবের অনুসরণ) করে এসেছেন। এমনকি বিরুদ্ধবাদীরাও তাঁদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে আসছেন। মাযহাবের এক ইমাম অন্য ইমামের প্রতি অগাধ ভক্তি ও ভালবাসা পোষণ করেছেন। ইমাম শাফে‘ঈ তাঁর বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে ইমাম-ই আ’যমের মাযার শরীফে গিয়ে দো‘আ করেছেন, সেখানে হানাফী মাযহাবানুসারে নামায পড়েছেন। ইমাম রাযী সব সময় তাঁর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকতেন। এখন তোমরা তোমাদের জ্ঞানশূন্যতার কারণে ইমামের কথাকে ক্বোরআন বিরোধী মনে করে বসেছো। সমস্ত হাদীস তো তোমাদের সামনে নেই। বস্তুতঃ ইমামের কোন কথাই এমন পাওয়া যাবে না, যার সমর্থনে কোন হাদীস পাওয়া যাবে না।
আর দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নের জবাব এ যে, এ কথা চাকড়ালভী নামের ভ্রান্ত সম্প্রদায় বলে বেড়ায়। তারা বলে, ‘ক্বোরআন একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ, এতদ্সত্ত্বেও হাদীসের প্রয়োজন কি?’ এক কবি তাদের ওই জঘন্য কথা এ পংক্তিতে লিখেছেন-
هوتےهوۓكبر ياكى گفتار ـ مت مان نبى كے ا قوال وكردار
অর্থাৎ মহান আল্লাহর বাণী থাকাবস্থায় নবীর কথা ও কর্ম মানবে না। [না‘ঊযুবিল্লাহ্!)
তাদের খন্ডনে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে-হাদীস হলো ক্বোরআনের তাফসীর বা ব্যাখ্যা। অনুরূপ এখানে বলবো, ফিক্বহ্ হচ্ছে ক্বোরআন ও হাদীসের তাফসীর অথবা এ ক্বোরআন ও হাদীসরূপী সমুদ্র থেকে বের করে আনা মুক্তা।
আর চতুর্থ আপত্তির জবাব হচ্ছে- এ চার মাযহাব, দ্বীনকে চারটি ভাগে বিভক্ত করা নয়; বরং এর উদ্দেশ্য হে আহলে হাদীস! চারটি রাস্তা অথবা এক সমুদ্রের চারটি নহর। তাছাড়া, স্থলের দিকে তোমাদেরও পঞ্চম মাযহাব হলো কেন? তোমাদের সানাঈ ও গযনভী জমা‘আত এবং সেগুলোর ধূলি-জুতার অবস্থা কি? সঠিক পথের সন্ধান করো!
মোটকথা, রসূল-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে যে হুকুম আমাদের নিকট পৌঁছেছে তার আনুগত্য করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। পবিত্র ক্বোরআন ও রসূল-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমেই পাওয়া গেছে।  আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান- রসূল-ই আক্রাম যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করো, তিনি যা করতে বারণ করেছেন তো থেকে বেঁচে থাকো। [সূরা হাশর: আয়াত-৭]