যমযম: মহান আল্লাহর কুদরতী নিদর্শন

0

যমযম: মহান আল্লাহ্র কুদরতী নিদর্শন-
মাওলানা মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান হাবিবী >
যমযম কূপের উৎপত্তি
হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম তাঁর ১/২ বছরের ছোট শিশু ইসমাঈলসহ সিরিয়ায় অবস্থান করছিলেন। তখন তিনি মক্কায় আল্লাহর ঘর কা’বার স্থান সম্পর্কে জানার নির্দেশ পান। নির্দেশ দেয়া হয়, আপনি সেই স্থানকে পাক-পবিত্র করে তাওয়াফ ও নামায দ্বারা আবাদ করবেন। ওই আদেশের প্রেক্ষিতে হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম বোরাক নিয়ে আসেন এবং হযরত ইব্রাহীম ও হযরত হাজারাকে নিয়ে রওয়ানা হন। পথে কোন জনপদ দেখলেই হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞেস করতেন, এখানেই কি আমাদের অবস্থানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে? হযরত জিব্রাঈল বলতেন, না; আপনার গন্তব্য আরো সামনে। অবশেষে তাঁরা মক্কায় আসলেন। এখানে কাঁটাযুক্ত বন-জঙ্গল আর বাবলা গাছ ছাড়া কিছুই ছিল না। এই ভুখন্ডের আশে-পাশে কিছু জনবসতি ছিল। তারা ছিল আমালিক সম্প্রদায়ের লোক। আল্লাহর ঘরটি তখন টিলার আকারে বিদ্যমান ছিল। ওইখানে পৌঁছে হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের কি এখানেই বসবাস করতে হবে? হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, হ্যাঁ। হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম শিশুপুত্র ও স্ত্রী হাজারা সহ এখানে অবতরণ করেন। কা’বা শরীফের কাছে একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে তাতে ইসমাঈল আলায়হিস্ সালামকে রেখে যান। [তাফসীরে ইবনে কাসীর]
আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্যই হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম হযরত হাজারা ও হযরত ইসমাঈলকে মক্কায় রেখে যান। তিনি তাদের উপর জুলুম করেননি এবং কোন কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা প্রদর্শন করেননি। শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা’আলার আদেশ পালন করেছেন।
এ বিষয়ে একটি হাদীস শরীফ বিস্তারিত পেশ করছি: হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম নির্বাসন দেয়ার জন্য হযরত ইসমাঈল (শিশুপুত্র) ও হযরত হাজারাকে নিয়ে বের হলেন। পথে হাজারা আলায়হিস্ সালাম শিশুপুত্র ইসমাঈলকে দুধ পান করাতেন। শেষ পর্যন্ত হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম তাঁদের উভয়কে নিয়ে কা’বা ঘরের কাছে উপস্থিত হলেন এবং মসজিদে হারামের উচুঁ দিকে যমযম কূপের উপর এক বড় গাছের নিচে তাঁদেরকে রাখলেন তখন মক্কায় কোন লোকজন ছিল না এবং পানিও ছিল না। তিনি তাঁদেরকে সেখানেই রেখে গেলেন এবং একটি থলের মধ্যে কিছু খেজুর আর একটি মশকে অল্প পানি দিয়ে গেলেন। এরপর হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম নিজ অবস্থানের দিকে ফিরে চললেন। হযরত হাজারা তাঁর পিছু পিছু ছুটে আসলেন এবং কাদা নামক স্থানে পৌঁছে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, হে ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম! কোথায় চলে যাচ্ছেন? আমাদেরকে এমন এক ময়দানে রেখে যাচ্ছেন, যেখানে না আছে কোন সাহায্যকারী, আর না আছে (পানাহারের) কোন বস্তু। তিনি বার বার বলতে লাগলেন, হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম সে দিকে ফিরেও তাকালেন না। তখন হাজারা তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ্ কি আপনাকে এই নির্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন? তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ। জবাব শুনে হযরত হাজারা বললেন, তাহলে (ঠিক আছে) আল্লাহ্ আমাদেরকে ধ্বংস করবেন না। তারপর তিনি ফিরে আসলেন। হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম পেছনে না তাকিয়ে সামনের দিকে চলতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালাম যখন গিরি পথের বাঁকে এসে পৌঁছলেন এবং স্ত্রী-পুত্র তাঁকে আর দেখতে পাচ্ছিল না, তখন তিনি কা’বা শরীফের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং দু’হাত তুলে এই দোআ করলেন-
رَبَّنَا اَنِّى اَسْكَنْتُ مِنْ ذُرِّيَّتِىْ بِوَادٍ غَيْرِ ذِىْ زَرْعٍ عِنْدَ بَيْتِكَ الْمُحَرَّمِ- رَبَّنَا لِيُقِيْمُوْا الصَّلَاةَ فَاجْعَلْ اَفْئِدَةً مِنَ النَّاسِ تَهْوِىْ اِلَيْهِمْ وَارْزُقُهُمْ مِنَ الثَّمَرَاتِ لَعَلَّهُمْ يَشْكُرُوْنَ-(ابراهيم-৩৭)
অনুবাদ: হে আমাদের প্রভু! তোমার পবিত্র ঘরের কাছে এমন এক উপত্যকায় আমার সন্তান ও পরিবারের বসতি স্থাপন করেছি যা কৃষির অনুপযোগী। হে রব! উদ্দেশ্য এই, নামায কায়েম করবে। অতএব, তুমি অন্যসব লোকদের মনকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করে দাও এবং প্রচুর ফলফলাদি দিয়ে তাদের রিযকের ব্যবস্থা করে দাও। যাতে করে তারা (তোমার নেআমতের) শুকরিয়া আদায় করতে পারে। [সূরা ইব্রাহীম: আয়াত-৩৭]
তারপর ইসমাঈলের মা ইসমাঈলকে দুধ পান করাতেন আর নিজে মশক থেকে পানি পান করতেন। (ওই পানি পান করার সাথে সাথে শিশু পুত্রের জন্য তাঁর স্তনে জোয়ার চলে আসত)। অবশেষে মশকের পানি শেষ হয়ে গেল। তখন নিজেও পিপাসায় কাতর হলেন এবং বুকের দুধ শুকিয়ে যাওয়ায় তাঁর শিশু পুত্রটিও পিপাসায় ছটফট করতে লাগলো। তিনি দেখতে লাগলেন যে, পিপাসায় শিশুর বুক ধড়ফড় করছে। শিশু পুত্রের এই করুণ অবস্থার দিকে তাকানো তাঁর সহ্য হচ্ছে না। তিনি সরে পড়লেন এবং সাফা পাহাড়কেই একমাত্র নিকটতম পাহাড় হিসেবে পেলেন। তারপর তিনি এর উপর উঠলেন এবং ময়দানের দিকে মুখ করলেন। এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখলেন, কাউকে দেখা যায় কিনা। কিন্তু না; তিনি কাউকে দেখলেন না। তখন সাফা পাহাড় থেকে তাড়াতাড়ি নেমে পড়লেন। যখন তিনি নিচে ময়দানে নামলেন তখন আপন জামা এক দিকে তুলে একজন ক্লান্ত ব্যক্তির মত দৌঁড়ে চললেন। তারপর উপত্যকা উপত্যকা অতিক্রম করে মারওয়া পাহাড়ে আসলেন এবং উপরে উঠলেন। অতঃপর চতুর্দিকে দেখলেন, কাউকে দেখা যায় কিনা। এভাবে তিনি পাহাড় দু’টির মধ্যে সাত বার দৌঁড়াদৌঁড়ি করলেন।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বর্ণনা করেন, নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, এজন্যই (হজ্বের সময়) মানুষ এই পাহাড় দু’টির মধ্যে সাত বার সাঈ করে (জোরে হাঁটে) এবং এটা হজ্বের একটা অঙ্গ।
তারপর তিনি যখন শেষবার মারওয়া পাহাড়ের উপর উঠলেন, তখন একটি আওয়াজ শুনলেন। তিনি নিজে নিজে বললেন, একটু অপেক্ষা করি। তিনি মনোযোগের সাথে ওই আওয়াজের দিকে কান দিলেন। আবারো আওয়াজ শুনলেন। হাজারা বললেন, তোমার আওয়াজ শুনিয়েছো। যদি তোমার কাছে কোন সাহায্যকারী থাকে, তাহলে আমাকে সাহায্য কর। হঠাৎ তিনি যমযমের জায়গায় একজন ফেরেশতাকে (হযরত জিব্রাঈল আ.) দেখতে পেলেন। সেই ফেরেশতা আপন পায়ের গোড়ালী দ্বারা আঘাত করলেন কিংবা আপনা ডানা দ্বারা আঘাত করলেন। ফলে আঘাতের স্থান থেকে পানি উপচে উঠতে লাগলো। হযরত হাজারা আলায়হিস্ সালাম এর চতুর্পাশে আপন হাতে বাঁধ দিয়ে তাকে কূপের আকার দান করলেন এবং অঞ্জলি ভরে তাঁর মশকটিতে পানি ভরতে লাগলেন। তিনি পানি ভরার পরে পানি উথলে উঠতে লাগলো। নবীজি ফরমান, আল্লাহ্! তুমি ইসমাঈলের মাকে রহম কর। যদি তিনি যমযমকে বাঁধ না দিয়ে ওভাবে ছেড়ে দিতেন তাহলে যমযম কূপ না হয়ে একটি প্রবাহমান ঝর্ণা ধরায় পরিণত হতো। [বুখারী শরীফ: কিতাবুল আম্বিয়া]
যমযম পানির বৈশিষ্ট্য
ইমাম বদরুদ্দীন বিন সাহেব মিসরী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি যমযমের পানিকে অন্য পানির সাথে তুলনামূলক ওজন করে দেখেছেন যে, যমযমের পানি অন্য পানির চাইতে এক চতুর্থাংশ বেশি ভারী। তারপর তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলনা করে বলেন, এটি অন্য যে কোন পানির চেয়ে সেরা এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও তিনি এটাকে অন্য সকল পানির চাইতে সর্বশ্রেষ্ঠ দেখতে পেয়েছেন।
যেসব যুক্তির কারণে যমযমের পানির নিজস্ব স্বকীয়তা রয়েছে তা নি¤েœ পেশ করা হলো-
১. আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে মক্কায় উষর মরুভূমিতে আল্লাহ্ তা’আলার হুকুমে হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম হযরত ইসমাঈল আলায়হিস্ সালাম-এর জন্য কূপটি বের করেন।
২. এটি কা’বা শরীফ এবং মহান নিদর্শন সাফা-মারওয়ার দিক থেকে উৎসারিত।
৩. রাসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরত করার পর মক্কা থেকে যমযমের পানি মদিনায় পাঠানোর জন্য বলেছেন।
৪. নবীজি এই পানি পান করার জন্য উৎসাহিত করেছেন।
৫. যমযমের পানি খাদ্য, পানীয়, চিকিৎসা এবং অন্য যে কোন নিয়তে পান করবে, তা পূরণ হবে মর্মে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
৬. হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম যমযমের পানি দিয়ে হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সিনা মোবারক চিরে ধৌত করেছেন।
৭. বহু সংখ্যক নবী-রাসূল, নেক বান্দাগণ এই পানি পান করেছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত অগণিত মানুষ এই পানি করবে।
৮. যমযমের পানির রং অন্য সব পানির মত হলেও এর স্বাদ অন্য যে কোন পানির চাইতে ভিন্ন। এ ছাড়াও এ পানিতে অগণিত কল্যাণ বিদ্যমান। [সাকারুল জযীরাহ]
যমযম পানির উপকারিতা
হযরত ওয়াহাব বিন মোনাব্বিহ্ রাহমাতুল্লøাহ আলায়হি যমযম সম্পর্কে বলেন, আল্লাহ্র কসম! এটি উত্তম কল্যাণ কর, নেককারদের পানীয়, ক্ষুধা নিবৃত্তি এবং রোগের চিকিৎসা হিসেবে আল্লাহ্র কিতাবে লিখিত আছে।
[আখবারে মক্কা: আল্লামা আযরাকী] হযরত মুজাহিদ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেন, যমযমের পানি যে যে নিয়তে পান করবে, তার সেই নিয়ত পূরণ হবে, তুমি যদি রোগ মুক্তির জন্য পান কর, তাহলে আল্লাহ্ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। তুমি যদি পিপাসা মিটানোর জন্য পান কর, তাহলে আল্লাহ্ তোমার পিপাসা দূর করবেন। তুমি যদি ক্ষুধা দূর করার জন্য পান কর, তাহলে আল্লাহ্ তোমার ক্ষুধা দূর করে তৃপ্তি দান করবেন। এটি হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম-এর পায়ের গোড়ালীর আঘাতে হযরত ইসমাঈল আলায়হিস্ সালাম-এর পানীয় হিসেবে তৈরি হয়েছে।
হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যমযমের পানি যে যে নিয়তে পান করবে তার সেই নিয়ত পূর্ণ হবে। [ইবনে মাযাহ শরীফ] হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা নেক লোকদের নামাযের স্থানে নামায আদায় কর এবং দ্বীনদার লোকদের পানীয় পান কর।
صَلُّوا فِى مُصَلَّى الْاَخْيَارِ وَاشْرَبُوْا مِنْ شَرَابِ الْاَبْرَارِ-
তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, নেক্কারদের মোসাল্লা এবং দ্বীনদারের পানীয় বলতে কি বুঝায়? তিনি জবাব দেন, নেক্কারদের মোসাল্লা হচ্ছে মীযাবের নিচে নামায পড়া এবং দ্বীনদারের পানীয় হচ্ছে যমযমের পানি। [আখবারে মক্কা: আল্লামা আযরাকী] হযরত আনাস বিন মালেক রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বুক চিরে কলব মোবারক বের করে এনে সোনার প্লেটে রাখেন। তারপর যমযমের পানি দিয়ে ধুয়ে তা যথা স্থানে রেখে দেন। ওই সময় নবীজি মাঠের মধ্যে তার অন্য খেলার সাথীদের সাথে ছিলেন। এ বিষয়ে হাফেজ ইরাকী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি বলেছেন, যমযমের পানি দিয়ে নবীজির বক্ষদেশ ধোয়ার উদ্দেশ্য ছিল, তিনি যেন আসমান-জমিন এবং বেহেশত-দোযখ দেখার মতে শক্তি লাভ করেন। কেননা, যমযমের পানির অন্যতম উপকারিতা হচ্ছে তা অন্তরকে শক্তিশালী করে এবং ভয় দূর করে।[আখবারে মক্কা: আল্লামা আযরাকী] হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
خَيْرُ مَاءٍ عَلى وَجْهِ الْاَرْضِ مَاءُ زَمْزَمَ-
যমযমের পানির অন্যতম উপকারে হচ্ছে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের নির্দেশে যমযমের পানি দ্বারা জ্বর দূর হয়েছে। নাসাঈ শরীফে যহরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে এই হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। দাহ্হাক বিন মোযাহিম রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু বলেন, মাথা ব্যাথার সময় যমযমের পানি পান করলে মাথা ব্যাথা দূর হয়। এবং যমযমের দিকে তাকালে দৃষ্টি শক্তি প্রখর হয়। [আখবারে মক্কা, আল্লামা আরযাকী] ইমাম ফাকেহী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি হুযূর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে এক মুরসাল রেওয়ায়তে বলেন, মাকহুল বলেছেন,
اَلنَّظْرُ فِىْ زَمْزَمَ عِبَادَةٌ وَهِىَ تَحُطُّ الْخَطَايَا-
অর্থাৎ- যমযমের প্রতি নজর করা এবাদত। এর ফলে গোনাহ মাফ হয়।
হযরত জাবের রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কা’বা শরীফে সাত চক্কর তাওয়াফ করবে, মকামে ইব্রাহীমের পেছনে দু’রাকাত নামায পড়বে এবং যমযমের কূপের পানি পান করবে; তার গোনাহ যত বেশিই হোক না কেন তা মাফ হয়ে যাবে।
[আলজামে আললতিফ] হাকিম তিরমিযী বলেন, যমযমের পানি থেকে উপকার পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করে নিয়তের গভীরতা ও পরিপক্কতার উপর। খালেস নিয়তে ওই পানি ব্যবহার করলে তার উপকার অবশ্যম্ভাবী। [আখবারে মক্কা: আরযাকী]
নবীজির যমযমের পানি পান
তাউস বর্ণনা করেন যে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে দিনে এবং রাতে তাওয়াফে ইফাদা করেন। তিনি তাঁর উটের উপর সাওযার হয়ে তাওয়াফ করেন। তারপর যমযমের কাছে এসে বলেন, আমাকে এক বালতি পানি তুলে দাও। তিনি নিজে পানি পান করলেন এবং গড়গড়া সহকারে কুলি করলেন। তারপর বালতির অবশিষ্ট পানি কূপে ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন। [আখবারে মক্কা: আল্লামা আরযাকী] হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী-এ দোজাঁহা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাওয়াফে ইফাদা শেষে এক বালতি যমযমের পানি তোলার আদেশ দেন। তিনি সেই পানি পান করেন এবং অযু করেন এরপর বলেন, হে বনি আবদুল মোত্তালিব! তোমরা পানি তোল, তোমরা পানি না তুললে অন্যরা তোমাদেরকে ঐ কাজ থেকে বঞ্চিত করবে। [আখবারে মক্কা: আল্লামা আরযাকী]
যমযমের পানি পান করার আদব
হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজির জন্য এক বালতি যমযমের পানি তুলতে এবং তাঁকে তা দাঁড়িয়ে পান করতে দেখেছি।
হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলে মাকবুল সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘বিসমিল্লাহ্’ বলে বালতি ধরেন এবং অনেক্ষণ যাবত পানি পান করেন। তারপর মস্তক মোবারক উপরের দিকে তুলে ‘আলহামদুলিল্লাহ্’ বলেন। এইভাবে তিনি তিনবার পানি পান করেন।
ইমাম তকীফাসী বলেন, যমযমের পানি পান করার মুস্তাহাব পদ্ধতি হচ্ছে- পানি পানকারী কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে আল্লাহ্কে স্মরণ করবে। তিনবার শ্বাস নেবে, পেট ভরে পানি পান করবে, পান শেষে আলহামদুলিল্লাহ্ বলবে এবং পানি পান করার সময় হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু যে দোআ পড়েছিলেন, সে দোআ পাঠ করবে। ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু পানি পান করার সময় নি¤েœর দোআটি পাঠ করতেন।
اَللهُمَّ اِنِّى اَسْئَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا وَاسِعًا وَشِفَاءً-
অর্থ: হে আল্লাহ্! আমি তোমার কাছে কল্যাণকর জ্ঞান, প্রশস্ত রিযিক এবং সকল প্রকার রোগ থেকে আরোগ্য লাভের প্রার্থনা করি।
জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, ডান হাতে গ্লাস নিয়ে কিবলামুখী হয়ে বিসমিল্লাহ্র সাথে মাসনুন দোআ পড়ে দাঁড়িয়ে যমযমের পানি পান করতে হবে। তিন শ্বাসে পানি পান করবে এবং শেষে আল্লাহ্ তা’আলার হামদ তথা প্রশংসা করবে। [আখবারে মক্কা: আল্লামা আরযাকী]
শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •