দরসে কোরআন-অধ্যক্ষ হাফেয কাজী আবদুল আলীম রিজভী

0

দরসে কোরআন
অধ্যক্ষ হাফেয কাজী আবদুল আলীম রিজভী
আল্লাহর নামে আরম্ভ যিনি পরম করুণাময়, দয়ালু

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
اِذَا جَاءَكَ الْمُنَافِقُونَ قَالُوا نَشْهَدُ إِنَّكَ لَرَسُولُ اللهِ وَاللهُ يَعْلَمُ إِنَّكَ لَرَسُولُه وَاللهُ يَشْهَدُ إِنَّ الْمُنَافِقِينَ لَكَاذِبُونَ- اتَّخَذُوا أَيْمَانَهُمْ جُنَّةً فَصَدُّوا عَنْ سَبِيلِ اللهِ إِنَّهُمْ سَاءَ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ- ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ آمَنُوا ثُمَّ كَفَرُوا فَطُبِعَ عَلَى قُلُوبِهِمْ فَهُمْ لَا يَفْقَهُونَ- وَإِذَا رَأَيْتَهُمْ تُعْجِبُكَ أَجْسَامُهُمْ وَإِنْ يَقُولُوا تَسْمَعْ لِقَوْلِهِمْ كَأَنَّهُمْ خُشُبٌ مُسَنَّدَةٌ يَحْسَبُونَ كُلَّ صَيْحَةٍ عَلَيْهِمْ هُمُ الْعَدُوَّ فَاحْذَرْهُمْ قَاتَلَهُمُ اللهُ أَنّى يُؤْفَكُونَ- وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُولُ اللهِ لَوَّوْا رُءُوْسَهُمْ وَرَأَيْتَهُمْ يَصُدُّونَ وَهُمْ مُسْتَكْبِرُونَ-

তরজমাঃ (মহান আল্লাহ্ এরশাদ করেছেন) যখন মোনাফিকরা আপনার সম্মুখে আসে তখন বলে, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল।’ এবং আল্লাহ জানেন যে, নিশ্চয় আপনি তাঁর রাসূল। আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় মোনাফিকগণ মিথ্যাবাদী। তারা তাদের শপথসমূহকে ঢাল স্থির করে নিয়েছে। অতঃপর তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। নিশ্চয় তারা অত্যন্ত মন্দ কাজ করে। এটা এজন্য যে, তারা (মুখে) ঈমান আনয়ন করেছে অতঃপর (অন্তরের দিক দিয়ে) কাফির হয়েছে। ফলে তাদের অন্তরে মোহর করে দেয়া হয়েছে। সুতরাং (এখন) তারা কিছুই বুঝে না। (ওহে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আপনি যখন তাদেরকে দেখেন, তখন তাদের দেহাবয়ব আপনার কাছে প্রীতিকর মনে হবে। আর যখন তারা কথা বলে, তবে আপনি তাদের কথা শ্রবণ করুন। (তখন মনে হবে) যেন তারা প্রাচীরে ঠেকানো কাঠের স্তম্ভ। তারা শত্রু। অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন। ধ্বংস করুন আল্লাহ তাদেরকে! তারা কোথায় বিভ্রান্ত হচ্ছে? আর যখন তাদেরকে বলা হয়; তোমরা এসো, আল্লাহর রাসূল তোমাদের ক্ষমার জন্য প্রার্থনা করবেন। তখন তারা নিজেদের মাথা ঘুরিয়ে নেয় এবং আপনি তাদেরকে দেখবেন যে, তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। [১-৫ নং আয়াত, সূরা আল মুনাফিকুন]

আনুষঙ্গিক আলোচনাঃ সূরা আল মুনাফিকুন
পবিত্র কুরআনে কারীমের বর্ণনা দ্বারা সুস্পষ্টরূপে প্রমাণিত হয় যে, মানবজাতি তিন শ্রেণিতে বিভক্ত। যথা: প্রথমতঃ প্রকৃত ও খালিছ মুমিন। যারা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় সকল কর্মকান্ডে মুমিন-মুসলিম হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয়তঃ কাফির-মুশরিক। যারা প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বাবস্থায় সকলের নিকট কাফির-মুশরিক হিসেবে প্রসিদ্ধ। এ বিষয়ে তাদের মধ্যে কোনরূপ অস্পষ্টতা কিংবা লুকোচুরি নেই। তৃতীয়তঃ মুনাফিক। যারা প্রকাশ্যে মুসলিম হিসেবে পরিচয় দান করে নিজেদেরকে, আবার গোপনে কাফের-মুশরিকদের সাথে বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক রাখে এবং তাদেরকে ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে উত্তেজিত ও প্ররোচিত করে। অর্থাৎ মুনাফিকদের জবান ও অন্তঃকরণ এক ও অভিন্ন নয়। বরং একটা অন্যটার বিপরীত। যেমন, কুরআনে কারীমের সর্ববৃহৎ সূরা আল-বাকারার শুরুতে মহান আল্লাহ উপরোক্ত তিন শ্রেণির লোকদের পরিচয় ও পরিণতির সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছেন। প্রারম্ভিক পরপর চার আয়াতে মুমিনগণের প্রকৃত স্বরূপ, গুণাবলী বর্ণনা করে সুসংবাদ দিয়েছেন। মহান আল্লাহর দরবারে তাঁরাই একমাত্র হেদায়াত প্রাপÍ ও সফলকাম। এর পরবর্তী দুই আয়াতে কাফেরদের স্বরূপ উন্মোচন করে এরশাদ করেছেন, ‘তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী মহা আযাব। এরপর ধারাবাহিক তের আয়াত নাযিল করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সবচেয়ে ঘৃণ্য, অভিশপ্ত ও ধিককৃত মুনাফিকদের প্রকৃত পরিচয় উন্মোচন করেছেন।
অতঃপর মহান আল্লাহ সূরা মুমিনূন, সূরা কাফিরূন এবং সূরা আল মুনাফিকূন নামে স্বতন্ত্র ও দীর্ঘ সূরা অবতীর্ণ করে উপরোক্ত তিন শ্রেণি তথা প্রকৃত ও খালিছ মুমিন, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যে সর্বাবস্থায় কাফির এং মুনাফিকদের আক্বিদা-বিশ^াস আমল-আখলাক এবং ইহ ও পরকালে তাদের পরিণাম-পরিণতি সম্পর্কে খোলাছা করে বর্ণনা দিয়েছেন। যাতে মুমিগণ নিজেদের ঈমান-আক্বিদা সম্পর্কে খুব ওয়াকিফহাল হওয়ার পাশাপাশি অপর দুই শ্রেণি সম্পর্কে সর্বক্ষণ সতর্কতা অবলম্বন করে। কোন অবস্থায় ঈমানদার যেন বেঈমান দ্বারা প্রতারিত না হয়।

الخ وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا يَسْتَغْفِرْ لَكُمْ رَسُولُ اللَّهِ
শানে নুযুল
উপরোক্ত আয়াতের শানে নুযুল বর্ণনায় তাফসীর শাস্ত্র বিশারদগণ উল্লেখ করেছেন, মুরায়সী’র যুদ্ধ থেকে অবসর গ্রহণের পর যখন রাসূলে কারীম রাউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুরায়সী’ নামক কুপের মাথায় (স্থান বিশেষ) এসে পৌছলেন, তখন সেখানে এ ঘটনা ঘটেছিল যে, সাইয়্যেদুনা হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুর মজদুর হযরত জাহজাহ গিফারী রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু ও আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সুলূল-এর বন্ধু সিনান ইবনে দুরার জুহানীর মধ্যে সংঘর্ষ হলো। এতে হযরত জাহজাহ মুহাজিরগণকে এবং সিনান আনসারদের আহ্বান করলো সাহায্যার্থে। তখন মুনাফিক সরদার ইবনে উবাই রাসূলে কারীম রাউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শানে জঘন্য বেয়াদবীপূর্ণ ও ভিত্তিহীন বকাবকি করে বললো “মদীনা তৈয়্যেবায় পৌছে আমাদের মধ্য থেকে সম্মানিতরা লাঞ্ছিত লোকদেরকে বহিস্কার করবে”। আর স্বীয় গোত্রের লোকদেরকে বলতে লাগলো, “যদি তোমরা তাদেরকে তোমাদের উচ্ছিষ্ট খাবার না দাও, তাহলে এরা তোমাদের ঘাড়ের উপর চড়ে বসবে। এখন তাদের জন্য কিছুই খরচ করো না, যাতে তারা মদিনা তৈয়্যবাহ থেকে পালিয়ে যায়”। তার এ অশালীন কথা শুনে সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ ইবনে আরকাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু সহ্য করতে পারলেন না। তিনি ইবনে উবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘‘আল্লাহরই কসম। তুই-ই লাঞ্চিত লোক, স্বীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী। আর রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শির মোবারকে মে‘রাজের মুকুট শোভা পাচ্ছে। মহান আল্লাহ তাঁকে সম্মান ও শক্তি দান করেছেন।’’ ইবনে উবাই বলতে লাগলো, ‘‘চুপ করো। আমি তো হাসি-ঠাট্টা করে এ কথাগুলো বলেছিলাম।’’
সাইয়্যেদুনা হযরত যায়দ ইবনে আরকাম রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে খবর পৌছিয়ে দিলেন। সাইয়্যেদুনা হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এহেন মন্তব্য শুনে ইবনে উবাইকে হত্যা করার অনুমতি চাইলেন নবির দরবারে। আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তায়ালা আনহুকে বারণ করে বলেন, লোকেরা বলাবলি করবে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন সঙ্গী-সহচরকে হত্যা করেন।
আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে উবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, “তুমি কি ঐ সব কথা বলেছ?” সে অস্বীকার করলো, আর শপথ করে বলল, ‘‘আমি কিছুই বলিনি।’’ তার সাক্ষী, যে ঐ মজলিশে উপস্থিত ছিল সে আরজ করতে লাগল “ইবনে উবাই বৃদ্ধ লোক সে যা বলছে সত্যই বলছে, যায়দ ইবনে আরকামের হয়ত ধোঁকা হয়ে গেছে,কথাও হয়ত স্মরণ নেই”। অতঃপর যখন উপরোক্ত আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হলো এবং ইবনে উবাই এর মিথ্যাবাদিতা প্রকাশ পেলো, তখন তাকে বলা হলো- “যা! রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে আবেদন কর। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোর জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত কামনা করবেন”। তখন সে ঘাড় ফিরিয়ে নিল। আর বলতে লাগলো তোমরা বলছো ঈমান আনো। ঈমান আনলাম। তোমরা বলেছো, যাকাত দাও, আমি যাকাত দিলাম। এখন শুধু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাজদা করাটাই বাকী রইল। এর জবাবে এ আয়াত শরীফ অবতীর্ণ হয়েছে। [তাফসীরে খাযায়েনুল ইরফান] অন্য রেওয়ায়াতে উল্লেখিত আছে যে, রাসূলে কারীম রাউফুর রাহীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন পবিত্র মদীনার নিকটবর্তী “আক্বিক্ব” উপত্যকায় পৌছেন, তখন মুনাফিক সরদার এর খালিছ মুমিন পুত্র হযরত আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সম্মুখে অগ্রসর হন এবং খুঁজতে খুঁজতে পিতা ইবনে উবাইয়ের কাছে পৌছে তার উষ্ট্রীকে বসিয়ে দেন। তিনি উষ্ট্রীর হাটুতে পা রেখে পিতাকে বললেন ; আল্লাহর কসম তুমি মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না যে পর্যন্ত সম্মানিতরা লাঞ্ছিত লোকদেরকে বহিস্কৃত করবে”। একথার ব্যাখ্যা না কর। এই বাক্যে সম্মানিত কে ? রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না, তুমি? পুত্র পিতার পথ রূদ্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল এবং যারা এ পথ অতিক্রম করছিল তারা পুত্র আব্দুল্লাহ রা. কে তিরস্কার করছিল যে, পিতার সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করছ কেন? অবশেষে যখন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উষ্ট্রী তাদের কাছে আসল তখন তিনি ব্যাপার জিজ্ঞাসা করলেন। উপস্থিত লোকেরা বলল: হযরত আব্দুল্লাহ রা. এই বলে তার পিতার পথ রূদ্ধ করে রেখেছে যে, আল্লাহর হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনুমতি না দেওয়া পর্যন্ত তুমি মদীনায় প্রবেশ করতে পারবে না। আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লক্ষ্য করলেন যে, মুনাফিক ইবনে উবাই বেগতিক হয়ে পুত্রের কাছে বলে যাচ্ছে, ‘‘আমিতো ছেলেপিলে ও নারীদের চাইতেও অধিক লাঞ্চিত। একথা শুনে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুত্র আব্দুল্লাহ রা.কে বললেন তার পথ ছেড়ে দাও, তাকে মদীনায় যেতে দাও। [তাফসীরে মাযহারী শরীফ]

هُمُ الْعَدُوُّ فَاحْذَرْهُمْ
উদ্ধৃত আল্লাহর বাণী “তারা শত্রু। অতএব তাদের সম্পর্কে সতর্ক হোন”। এর ব্যাখ্যায় মুফাসসেরীনে কেরাম উল্লেখ করেছেন এখানে ‘তারা শত্রু’, বলে মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। পবিত্র মদীনা মুনাওয়ারায় মুনাফিক সরদার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই বাহ্যিকভাবে সুঠাম দেহি, উজ্জ্বল বর্ণের, সুন্দর চেহারা সম্পন্ন এবং ভাল বক্তা ছিল। আর সঙ্গী সাথী যারা ছিল তারাও প্রায়ই তার মতো ছিল। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র মজলিশে যখন এসব লোক হাজির হতো, তখন শ্রুতিমধুর কথাবার্তা রচনা করে বলতো, যা শ্রোতাদের শুনতে ভাল লাগত। আলোচ্য আয়াতাংশের মাধ্যমে মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে সতর্ক করলেন যে, এরা তোমাদের শত্রু। তাদের মনের অবস্থা প্রকাশ্য অবস্থার অনুরূপ নয়। বরং যা মুখে বলে অন্তরে তার বিপরীতটাই বিশ^াস রাখে। তাই তাদের বিষয়ে তোমরা সর্বাবস্থায় সতর্ক থেকো। মহান আল্লাহ সকলকে আমল করার তাওফিক নসীব করুন। আমিন।