সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার নতুন জীবন দান-১০

0

সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার নতুন জীবন দান
ড: মুহম্মদ এনামুল হক, রচনাবলীর ১১৭ পৃষ্ঠায়, ‘বঙ্গে সূফী প্রভাব’ অংশে কাদেরিয়া ত্বরিকা সম্পর্কে মন্তব্য করা হয় যে, পশ্চিম বঙ্গের রাজধানী মুর্শিদাবাদে বাগদাদ হতে হযরত সৈয়্যদ শাহ্ কামিস এসে ইসলাম প্রচার করেন, বাংলায় তাঁর বহু ভক্ত ও খলিফা ছিলেন। তিনি ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ওফাত বরণ করেন। এরপর, তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন শাহ্ সৈয়্যদ আবদুর রাজ্জাক নামক তাঁর খলিফা। এরপর, বাংলায় কাদেরিয়া ত্বরিকার মূলধারার অন্য কোন প্রতিনিধিত্বের তথ্য জানা যায়না [মোহাম্মদ আবু তালেব, ইসলামী শিক্ষার উন্নয়নে বৃহত্তর চট্টগ্রামের সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের অবদান ১৯০০–২০০০, শীর্ষক গবেষণা পত্র]

উপরোক্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে, আমরা ধরে নিতে পারি যে, ১৫৮৪ ‘র শাহ্ কামিস (রাহ.)’র পর খলিফা শাহ্ আবদুর রাজ্জাক (রাহ.) যদি আরও একশ বছরও বেঁচে থাকেন, তবুও বলতে পারি যে, কাদেরিয়া ত্বরিকার মূলধারা, বা এর কোন বড় ধরনের প্রভাব দীর্ঘ আড়াইশ বছর (১৬৮৫–১৯৩৫) দৃশ্যমান হয়নি। আর, এ বিশ্বশ্রেষ্ঠ কাদেরিয়া ত্বরিকার মূলধারা আজ বাংলাদেশে বলা যায় প্রধান সূফি ধারা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে- যা শাহানশাহে সিরিকোট’র এক ঐতিহাসিক অবদান।
উল্লেখ্য, সিরিকোটি হুজুর রেঙ্গুন হতে কাদেরিয়া ত্বরিকার মশাল হাতে চট্টগ্রামে আসা -যাওয়া শুরু করেন ১৯৩৫-১৯৩৬ সনের দিকে। [সাজরা শরিফ]

আর, ১৯৪২ হতে, পুরোদমে শুরু হয় তাঁর বাংলাদেশ মিশন, যা ১৯৫৮ পর্যন্ত তাঁর প্রত্যক্ষ সফরের মাধ্যমে, এবং পরবর্তিতে তাঁর শাহ্জাদা, মাতৃগর্ভের অলী হিসেবে খ্যাত, গাউসে জামান, আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ হুজুর (১৯৬১-১৯৮৬) এবং তাঁর বড় নাতি রাহনুমায়ে শরিয়ত ও ত্বরিকত, আল্লামা তাহের শাহ্ (১৯৮৬-বর্তমান)’র হাতে ধারাবাহিক উপযুক্ত পরিচর্যার মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে এই সিলসিলার মুরিদ-ভক্ত এবং অনুসারি সংখ্যা কল্পনাতীত, যারা আজ মাঠে-ময়দানে, শরিয়ত-ত্বরিকত, তথা সুন্নিয়তের জাগরণে প্রধান ধারার কর্মি হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত, আলহামদুলিল্লাহ্। বাংলাদেশের ইসলামী সংস্কৃতির শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সংস্কার জশনে জুলুসে ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) এ সিলসিলারই পরবর্তী সাজ্জাদানশীন গাউসে জামান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ্ (রাহ.)’র দান। বর্তমান সাজ্জাদানশীন আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ (মু.জি.আ.)’র হাতে এ জশনে জুলুস বর্তমানে ৪০ লাখ মানুষের গণজোয়ারে রূপ নিয়েছে। যা সুন্নিয়ত ও কাদেরিয়া তরিকার বর্তমান জাগরণকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গাউসুল আযম জিলানি (রাদ্বি.)’র শ্রেষ্ঠ কাদেরিয়া ত্বরিকা তাঁর বিভিন্ন খলিফা, এবং বংশীয় সাজ্জাদানশীনদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপি বিকশিত হয়। বড়পীরের সবচেয়ে প্রিয় শাহজাদা ছিলেন শাহ্ আবদুর রাজ্জাক, যিনি বাগদাদে একজন শীর্ষ আলেমে দ্বীন হিসেবে খ্যাত ছিলেন। সেই শাহ্জাদা আবদুর রাজ্জাক, এবং বাগদাদের প্রধান বিচারপতি বড়পীরের নাতি খাজা আবু সালেহ নসর (রাহ.)’র মাধ্যমে যে ধারা প্রবাহিত হয়, তাই মূল বা প্রধান ধারা, এমনকি শ্রেষ্ঠ ধারা বলা যায়। আর এই কাদেরিয়া সিলসিলাহর এই মূল ধারায় কয়েক শতাব্দির শ্রেষ্ঠ কামেল সাজ্জাদানশীন ছিলেন খাজা চৌহরভী (রাহ.) যাকে খলিফায়ে শাহে জীলান লক্ববে অভিহিত করা হয়। সেই গাওসে দাঁওরা, খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রাহ.)’রই সাজ্জাদানশীন প্রধান খলিফা হবার সৌভাগ্য লাভ হয় হযরত সিরিকোটি (রাহ.)’র। শুধু তাই নয়, হযরত খাজা চৌহরভী (রাহ.), সিরিকোটি হুজুরকে এ বলে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে বলেন যে, অলি আল্লাহদের প্রধান আধ্যাত্মিক আসন ‘গাউসে জামান’ পদটি কাদেরিয়া ত্বরিকায় থাকবে, যদি এর দায়িত্ব আওলাদে রাসুল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থাকেন। আর, এই রহস্যময় উক্তিটি ছিল হুজুর সিরিকোটি এবং তাঁর অব্যাবহিত কয়েকজন আওলাদে পাকের হাতে এ মোবারক দায়িত্ব থাকবার সুসংবাদ। আর, শত বছর আগেকার এ উক্তির তাৎপর্য এখন দিনের আলোর মতই সুস্পষ্ট। আজ কাদেরিয়া সিলসিলাহর সিরিকোটিয়া ধারার হাতেই দ্বীনের নেতৃত্ব অব্যাহত আছে, আলহামদুলিল্লাহ্। তাই সিরিকোটি (রাহ.) এ অঞ্চলে একাধারে কাদেরিয়া ত্বরিকার মূলধারার এবং ইসলামের মূলধারা সুন্নিয়তের নতুন জীবনদাতা মহান সংস্কারক অলি আল্লাহ্।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •