শাহানশাহ্-এ সিরিকোট বিশ্বব্যাপি সুন্নিয়তের জাগরণে তাঁর অবদান -২

0

শাহানশাহ্-এ সিরিকোট বিশ্বব্যাপি সুন্নিয়তের জাগরণে তাঁর অবদান -২

মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার >

খ. ইসলামের মূলধারা ‘সুন্নিয়ত’
কোরআন-সুন্নাহ্, ইজমা-কিয়াস এবং মাজহাব ও সূফিবাদের সুসামঞ্জস্যপূর্ণ বিশ্বাস ও আমলই মূলত সুন্নিয়ত। এটাই ইসলামের মূলধারা। এ আক্বিদা-আমলের মুসলমানরাই সুন্নি মুসলমান। সুন্নি মুসলমানরা বিশ্বাস করে যে, শুধু শরিয়তের অনুসরণ সফলতার জন্য যথেষ্ট নয়, দরকার তাসাওফের পথ ত্বরিকতও। আবার শরিয়ত বাদ রেখে শুধু ত্বরিকত-মারেফাত চর্চা সুন্নিয়তে গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লেখ্য, এমন সুসামঞ্জস্যপূর্ণ অবিতর্কিত আদর্শের অনুসারী সফল পুরুষগণের মধ্যে হযরত গাউসুল আযম জিলানী, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি, শেহাবুদ্দিন ওমর সোহরাওয়ার্দী, বাহাউদ্দিন নক্সবন্দী, মুজাদ্দিদ আল ফেসানি (রাহ.)’র পথ ও মত কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, নক্সবন্দীয়া ইত্যাদি নামে পরিচিত। উক্ত মূল ত্বরিকত দর্শনের অনুসরণে এবং সিলসিলাহ্ পরম্পরায় পরবর্তিতে আরো কিছু ত্বরিকত দর্শন আত্মপ্রকাশ করলেও প্রথমোক্ত চারটিই বিশ্বব্যাপি বহুলভাবে সমাদৃত ও পরিচিত। উল্লেখ্য, ত্বরিকত সমূহের উক্ত মূলধারার অপর নামও কিন্তু সুন্নিয়ত। যদিও এসব ধারার অনুসারী দাবিদারদের মধ্যে ইদানিং কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিয়া ও ওহাবী মতবাদের আক্বিদা-আমল ও আচরণ লক্ষ্যণীয়। এরপরও, সহজভাবে আমরা সুন্নি বলতে বুঝব কোরআন-সুন্নাহ্, ইজমা-কিয়াস, মাজহাব-ত্বরিকতে বিশ্বাসী ও অনুসারী বৃহত্তর ইসলামি জনগোষ্ঠীকে। এরাই, হাদিস শরীফে নির্দেশিত একমাত্র নাজাতপ্রাপ্ত দল ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত’। যাদের পরিচয় হল ‘‘মা আনা আ’লাইহি ওয়া আসহা-বি।’’ [আল হাদিস]

গ.বিশ্বব্যাপি সুন্নিয়ত প্রচারে শাহানশাহ্ এ সিরিকোটের কর্মযজ্ঞ
হযরত সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আনুষ্ঠানিকতার ইতি টানবার পর থেকেই নিজেকে দ্বীনের কাজে নিয়োজিত করে দ্বীনি শিক্ষাকে কাজে লাগাতে শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অবদান এ প্রবন্ধের শিরোনামের প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনায় সংক্ষেপে তুলে ধরলামঃ

দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলাম প্রচার
১৮৮০-১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে, তিনি প্রথমে আপন মাশওয়ানি সৈয়্যদ ‘বংশের এক তাপসী নারীর সাথে পারিবারিক ঐতিহ্যানুযায়ী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, এরপরই কোন এক সময়ে ইসলাম প্রচারের ব্রত নিয়ে পূর্বপুরুষ আহলে বাইত (রাদ্বি.)গণের পথ ধরে দক্ষিণ আফ্রিকায় ছুটে যান ইসলাম প্রচারের কাজে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্যাপটাউন, মোম্বাসা ও জাঞ্জিবারের বিভিন্ন জনপদে তাঁর হাতে অসংখ্য স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। Dr Ibrahim M Mahdi,, মাহাদি লিখিত A short history of Islam in South Africa গ্রন্থের স্বীকৃতি অনুযায়ী এ সব অঞ্চলের ইসলাম প্রচারকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সফলকাম প্রচারক হলেন সৈয়্যদ আহমদ পেশওয়ারী নামক একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী। উল্লেখ্য, পাকিস্তান অর্জনের আগেকার ঐ সময়ে সিরিকোটি হুজুর ভারতীয় হিসেবেই পরিচিত হবার কথা। আর তিনি ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি সুন্নতি পেশা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে আফ্রিকার একজন শীর্ষ ব্যবসায়ী হিসেবেও গন্য হতেন। পরবর্তিতে, ১৯১১ সনে, তাঁর নিজের অর্জিত অর্থে আফ্রিকার প্রথম জামে মসজিদটি তাঁর হাতেই নির্মিত হয়। [Dr.Ibrahim M Mahdi, প্রাগুক্ত] পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রামাণ্য গ্রন্থেও সিরিকোটি হুজুরের আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারের তথ্য পাওয়া যায়।
[প্রফেসর ড. মাসউদ আহমদের ইফতিতাহিয়্যা, মুফতী আবদুল কাইয়্যুম হাযরাভী, আল্লামা আবদুল হাকীম শরফ কাদেরী, আল্লামা সৈয়দ আমির শাহ্ গীলানী, ড. মমতাজ আহমদ ছদিদীসহ বিভিন্ন স্কলারদের কিতাব]

বিশেষত, তাঁর বড় নাতি, দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরিফের বর্তমান সাজ্জাদানশীন হযরত, আল্লামা সৈয়্যদ মুহম্মদ তাহের শাহ্ মাদ্দাজিল্লুহুল আলিও একবার অধম প্রবন্ধকারের জিজ্ঞেসে বলেছিলেন যে, দক্ষিণ আফ্রিকার ঐ জামে মসজিদের দেখভাল করার দায়িত্ব অদ্যাবধি তাঁর নানার বংশের আত্মীয়দের হাতে রয়েছে। সিরিকোটি হুজুরের সহদোর ভাই সৈয়্যদ মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ্ ১৯১১ সালে স্বপরিবারে উক্ত মসজিদসহ দ্বীনী মিশনের দায়িত্ব পালনের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকায় হিজরত করেন।
[অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান, সুন্নিয়তের নবদিগন্ত উন্মোচনকারী পথিকৃত, হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রহ. তরজুমান যিলক্বদ সংখ্যা ১৪৩৯ হিজরী] উল্লেখ্য, হুজুর কেবলা তাহের শাহ্ ‘র দাদা সিরিকোটি শাহ্ এবং নানাজি সৈয়দ ইউসুফ শাহ্ সম্পর্কে আপন ভাই হন। সৈয়্যদ বংশের পবিত্র রক্তধারার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে তাঁদের সব আত্মীয়তা নিজেদের মধ্যেই এ পর্যন্ত হয়ে আসছে।