বিয়ে ও এর অনাচার রোধে আলেমদের দায়িত্ব

0

বিয়ে ও এর অনাচার রোধে আলেমদের দায়িত্ব -জামেউল আখতার আশরাফী,

আলহামদুলিল্লাহ্, যিনি বিয়ের মাধ্যমে মানব জীবনের পরিপূর্ণতার ব্যবস্থা দিয়েছেন। লাখো দরূদ ও সালাম ওই নবীজীর প্রতি যিনি বিয়েকে নিজের সুন্নাত ও তরীকা ঘোষণা করেছেন।
বিয়ে ধর্ম অনুমোদিত একটি সামাজিক চুক্তি। এর মাধ্যমে একজন নারী ও একজন পুরুষ একটা সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নতুন জীবনের পথ চলা শুরু করে। এ বন্ধনকে সবাই পবিত্র ও তাৎপর্যময় জ্ঞান করে। সভ্যতার ক্রমবিকাশে বিয়ের ভূমিকা নিঃসন্দেহে অপরিসীম; কিন্তু বিয়ে নিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হয়েও আমাদের বাংলাদেশে যেসব অনাচার ও ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে তা যেন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। বিয়ের পবিত্রতা, গুরুত্ব ও উদ্দেশ্য ম্লান হয়ে গিয়ে লোভ-লালসা, বেহায়পনা আর কন্যা পক্ষীয়দের অসহায়ত্বের সকরুণ কান্নায় এটা এক বিকৃত সামাজিক ব্যবস্থায় পরিণত হতে চলেছে। বরপক্ষের যৌতুক দাবি, বরযাত্রীদের আপ্যায়ন আবদার এবং আকদোত্তর তথাকথিত বিয়ে অনুষ্ঠানকে ঘিরে হাজার রকমের বায়না ও রসম রেওয়াজের চাপে কন্যা পক্ষীয়রা কন্যা সন্তানকে জাহেলী যুগের মত বোঝা মনে করতে বাধ্য হচ্ছে। বিয়ের মূল বাধ্যবাধকতা হচ্ছে আক্দ অনুষ্ঠান এবং কাজীর দফতরে বিয়ের নিবন্ধন। একটা ধর্মের অন্যটি দেশীয় আইনের বাধ্যবাধকতা। এর বাইরে এ বিয়েকে কেন্দ্র করে কত রকমের সামাজিক রেওয়াজ ও রীতি প্রচলিত হয়েছে তা স্থান ও এলাকা এবং অবস্থান ভেদে অগণিত বলা যায়।
বিয়ের মাধ্যমে আমাদের সমাজের রীতি মোতাবেক কন্যা সন্তান পুত্রগৃহে নিবাসী হয় এবং নিজ পরিবার, ঘর ও পরিচিত পরিমন্ডল ত্যাগ করে স্বামীগৃহে চলে এসে স্থায়ী হয় আজীবনের জন্য বা আকদের অধীন যতদিন থাকে ততদিনের জন্য। এ জন্য তাকে যে গুরুত্ব ও মর্যাদা দেয়া দরকার, সমাজে তার ছিটেফোটাও দেখা যায় না। একজন নারী তার সব অতীতকে এক মুহূর্তে ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিলীন করে দিয়ে যা পায় তা মোটেও সুখকর বলা যায় না। অনেক সময় তাকে জীবন দিয়েই এ ত্যাগের প্রায়শ্চিত্য করতে হয়। স্বামীগৃহে নারীর এ অসহায় অবস্থা মুসলিম সমাজে কিভাবে মেনে নেয়া হয় তা বোধগম্য নয়। একজন মুসলমান নামাজি, রোজাদার, হজ্বকারী ও দানশীল হয়েও ঘরের বধুর প্রতি এ অত্যাচার ও নিপীড়ন কিভাবে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক থাকতে পারে তাও বুঝে আসেনা। বধুর পিতা বা পক্ষীয়রা বরযাত্রীদের ভালভাবে আপ্যায়ন করে সন্তুষ্ট করতে না পারা, চাহিদা মোতাবেক যৌতুক দিয়ে খুশী করতে ব্যর্থ হওয়া, পুত্র পক্ষের কন্যা, জামাই, বন্ধুবান্ধব প্রভৃতিকে উপযুক্ত সম্মান দিয়ে দায়িত্ব আদা না করা তথা যত ত্রুটি-বিচ্যুতি সবগুলোর জন্য দায় চাপানো হয় জীবনের অতীত অধ্যায় ত্যাগ করে স্বামীগৃহে সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে আগত কন্যার উপর। এ অমানবিকতার কী নাম হওয়া উচিত জানিনা; কিন্তু এগুলো আমাদের সমাজেরই বাস্তবচিত্র। বিয়ের আগে বা পরে কন্যা পক্ষকে কত রকমের ঝক্কি ঝামেলা ও রসম রেওয়াজ আয়োজন করতে হয় তাও গুণে শেষ করার নয়। সংক্ষেপে বললে বলা যায় যে, বিয়েকে কেন্দ্র করে যত প্রকার কালচার সংযুক্ত হয়েছে তাকে কোনমতেই সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তি বলা যায় না বরং এগুলো অনাচারেরই শামিল। কারণ বিয়ে হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘সুন্নাত’ কাজ। যত সহজ ও বাধাহীনভাবে করা যায় ততই মঙ্গল; কিন্তু সামাজিকভাবে প্রচলিত হাজারো রসম-রেওয়াজের বাধ্যবাধকতায় এ বিয়ে একটা ব্যয়বহুল ঝামেলার ব্যাপারে পরিণত হয়ে পড়েছে। ফলে বাধাগ্রস্ত ও কষ্টসাধ্য হচ্ছে তা। আর এর পরিণাম হলো বিবাহযোগ্য নর-নারীর বিয়ে না করার বাধ্যতামূলক প্রবণতা এবং এতে বিবাহ্-বহির্ভূত বেহায়াপনা ও ব্যভিচারও সমাজে বেড়ে যায়।
মুসলিম দেশের ও মুসলিম সমাজের মধ্যে এরূপ হওয়াটা কোনমতেই মেনে নেয়া যায় না। এজন্য যৌতুকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে, আইন হচ্ছে, আন্দোলনও হচ্ছে; কিন্তু এর অন্যান্য দিকগুলোও আলোচনায় আসা প্রয়োজন। যৌতুকের সাথে সাথে আনুষ্ঠানাকিতা ও রসম রেওয়াজের নামে যা হচ্ছে তাও বন্ধ করা প্রয়োজন।
স্থান ও অঞ্চলভেদে কিছুটা প্রভেদ থাকলেও অধুনা বিয়ের যেসব আনুষ্ঠানিকতা দেখা যায় তন্মধ্যে এনগেজম্যান্ট অনুষ্ঠান, গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান, আকদ অনুষ্ঠান ও সর্বশেষ বিয়ে অনুষ্ঠান। এগুলোর মধ্যে আকদের অনুষ্ঠান ব্যতিরেকে বাকিগুলোর সবই সামাজিক প্রতিপত্তি, অবস্থান ও বড়লোকি প্রদর্শনের ক্ষেত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। এখন আবার অনেকে এসব অনুষ্ঠানে নাচ-গানের জমকালো আয়োজনও করে থাকে। ছেলে-মেয়েদের উদ্দামতা আর শরীয়তবিরোধী এসব কর্মকান্ড বিয়ের আনন্দ-উৎসবরূপে পরিগণিত হচ্ছে। সবাই করছে তাই কেউ না করলে সমাজে তার প্রেস্টিজ ক্ষুন্ন হয়ে বলে ধারণা বিদ্যমান। এসবের কুপ্রভাব সম্পর্কে বলার অপেক্ষা রাখে না। এর পরিবর্তন অত্যাবশ্যক।
বিয়ের পরই শেষ হয় না অনুষ্ঠানের। কন্যাপক্ষ ও বরপক্ষের মধ্যে কত রকমের দেয়া-নেয়া, খাওয়া-দাওয়া, যাওয়া-আসা! বিয়ের পর সন্তান হলে তাতেও সামাজিক কত রকমের রসম আর দেনা পাওনার রীতি। রমজান হলে ইফতার সামগ্রী প্রেরণ, ঈদের উপঢৌকন, কোরবানীর ঈদে মেয়ের পক্ষ হতে কোরবানীর পশু দেয়াসহ কত কিসিমের নিয়ম আর রীতির বাহুডোরে এ দেশের মুসলিম সমাজের এ বিয়ে নামক ব্যবস্থাটি বাঁধা তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এসব কি সহনীয়? এতকিছু রসম ও সামাজিক রীতি-নীতি কেন? আনন্দ আর সৌখিনতার ফলশ্রুতিতে ধর্ম ও সমাজে তার প্রভাবগুলো কি চোখে পড়ার মত নয়?
আগে এসব আনুষ্ঠানিকতার পরিধি ও পরিসর স্বল্প থাকায় পূর্বেকার আলেম-ওলামাগণ এর প্রতি দৃষ্টিপাত করার প্রয়োজন হয়নি। অধুনা এর পরিধি, ব্যাপ্তি আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে আলেম সমাজের পক্ষ থেকে বিয়ের যৌতুক ও বিভিন্ন রসম রেওয়াজ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত সময়োপযোগী নিঃসন্দেহে। তবে এ প্রয়াস এবং আলেমদের এ ভূমিকা অত্যন্ত সীমিত। এটাকে আরো ব্যাপক করতে হবে। শুধু যৌতুক নয়, অপ্রয়োজনীয় এবং কন্যা পক্ষের উপর চাপ সৃষ্টিকারী সকল রসম রেওয়াজের বিষয়েও সোচ্চার ভূমিকা ও জোরালো অবস্থান গ্রহণ করতে হবে আলেম সমাজকে। ধর্মের সমর্থনের অজুহাতে লোভোর জাহাজে চড়তে উদ্যতদের থামাতে ধর্মের নকীব তথা আলেমদেরই এর বিরুদ্ধে রূখে দাঁড়াতে হবে।
আক্দ পড়ানোর সময় একজন আলেম যদি বরপক্ষীয়দের কাছ হতে যৌতুক ও বিভিন্ন রসমের বিরুদ্ধে অঙ্গীকার গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিয়ে না পড়ান তাহলে অতি সহসা এটা প্রশমিত হতে পারে বলে বিশ্বাস করা যায়। ওয়াজে, নসিহতে উপদেশে আলেমগণ যদি এটাকে অন্যায় আখ্যায়িত করেন এবং অনাচার হিসেবে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারেন, তাহলে অবশ্যই এর অবসান হতে বাধ্য। শীর্ষস্থানীয় আলেমগণের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ঘোষণা আসলে তা অতি দ্রুত সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হবার আশা করা যায়। বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখার জন্য আকুল আবেদন রইলো সম্মানিত আলেম সমাজের কাছে।
একটি আদি সুন্নাতকে সহজ ও স্বাভাবিক করার জন্য লোভ আর আনন্দের সকল প্রথা, রসম ও রেওয়াজের বিরুদ্ধে আলেম ওলামার দায়িত্বশীল ভূমিকা সময়ের একান্ত দাবী মাত্র। এটা অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •