কুরআন ও হাদিসের আলোকে মহামন্বিত লায়লাতুল কদরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

0

কুরআন ও হাদিসের আলোকে মহামন্বিত
লায়লাতুল কদরের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মাওলানা মুহাম্মদ বোরহান উদ্দীন

আরবি হিজরী বছরের নবম মাস হলো রমজান। অন্যান্য মাসের চেয়ে এ মাসের গুরুত্ব ও ফযিলত অত্যধিক। কেননা এ মাস কুরআন নাজিলের মাস, এ মাস লাইলাতুল কদরের মাস, রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের পবিত্র মাস। শয়তানকে শিকলাবদ্ধ করার ফলে একাগ্রচিত্তে ইবাদত বন্দেগী করার মাস। সারা বছর যে কয়টি ফযিলতমন্ডিত রজনী রয়েছে পবিত্র ‘লাইলাতুল ক্বদর’ এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আর ক্বদর শব্দের অর্থ হলো নির্ধারণ বা পরিমাপ। যে রাতে মহান আল্লাহ্ পাক সৃষ্টিজীবের পূর্ণ এক বছরের ভাগ্য নির্ধারণ, প্রত্যেক প্রাণীর আহার,পানাহার, রিজিকসহ সর্বপ্রকার কাজ-কর্ম নির্ধারণ ও কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট ফেরেশতা তাদেরকে তালিকা বিতরণ করেন বলেই এ রাতকে لیلة القدر বা পরিমাপ নির্ধারণী রাত বলা হয়। যেমন পবিত্র কালামে পাকে ইরশাদ হচ্ছে- تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ অর্থাৎ এতে ফিরিশতাগণ ও জিব্রাইল অবতীর্ণ হয়ে থাকে স্বীয় রবের আদেশে, প্রত্যেক কাজের জন্য। [কান্যুল ঈমান] মহান আল্লাহ্ তা‘আলা এ রাতের মহিমা, ফজিলত ও সংজ্ঞা বা পরিচয় প্রদান করে বলেছেন, لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ অর্থাৎ ‘লাইলাতুল ক্বদর ওই রজনী, যে রজনী হাজার মাস তথা ৮৩ বছর ৪ মাসের চেয়েও অধিক উত্তম।’ পবিত্র মাহে রমজানে মহান এ রজনী নিহিত থাকলেও কোন রজনীতে নিহিত তা কোরআন ও হাদিসে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা নেই। তবে মাহে রমজানের শেষ দশ দিনের কোন এক বিজোড় রাতই ক্বদর রাত্রি। এ ব্যাপারে হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ক্বদর রাত্রি রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে। অন্যত্র এরশাদ করেন- ‘তোমরা রমযানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতে শবে ক্বদর তালাশ কর। [বুখারী শরীফ] তিরমিযী শরীফে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহুতা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, তোমরা সেটাকে অর্থাৎ শবে ক্বদরকে রমযানের নয় রাত বাকি থাকতে, অথবা রমযানের সাত রাত অবশিষ্ট থাকতে, অথবা পাঁচ বা তিন রাত অবশিষ্ট থাকতে অথবা রমযানের শেষ রাতে (অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ রমযান রাতে) খোঁজ কর। [তিরমিযী] হযরত সূফিয়ান সওরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মতে, শবে ক্বদর নির্ধারিত কোন তারিখে নয় বরং রমযানের শেষ দশকের রজনীগুলোতে হতে থাকে। হযরত ইমাম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলায়হি, ইমাম আহমদ রহমাতুল্লাহি আলায়হি, হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর মতে ‘পবিত্র রমযানের ২৭ তারিখ রজনীতেই লাইলাতুল ক্বদর। অধিকাংশ মুসলিম মনীষী এ রজনীকেই মহিমান্বিত (ক্বদর) রজনীরূপে নির্বাচন করেছেন। যুক্তিস্বরূপ, তাঁরা বলেছেন, সূরা ক্বদরে মহান আল্লাহ্ তা‘আলা ‘লাইলাতুল ক্বদর’ শব্দটি তিন বার উল্লেখ করেছেন। আর ‘লাইলাতুল ক্বদর’ শব্দদ্বয় লিখতে সর্বমোট ৯টি হরফের সংযোজন প্রয়োজন। আর ৯কে তিন দ্বারা গুণ করলে (৩ী৯) গুণফল দাঁড়ায় সর্বমোট ২৭ (সাতাশ) এ। সুতরাং ২৭ তারিখের রাতই হবে ‘লাইলাতুল ক্বদর’। তাছাড়া এ সূরায় ত্রিশটা শব্দ (পদ) রয়েছে। তন্মধ্যে (ওই রাত নির্দেশক সর্বনাম) ‘ ھى ’ হচ্ছে ২৭তম পদ। ‘ ھى ’ মানে পূর্ণ ক্বদর রাত্রি, অর্থাৎ মাগরিব হতে ফজর পর্যন্ত।

শবে কদরের ফযিলত
প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ্ তা‘আলা শবে ক্বদর দ্বারা অন্যান্য রাতের সৌন্দর্য দান করেছেন। কেননা, এ রাতই সর্ব শ্রেষ্ঠ রাত। অন্যত্র এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যদি তোমাদের কবরসমূহ আলোকিত পেতে চাও, তবে শবে কদরে জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাক।’ আল্লামা ইবনে জারীর তাবারী রহমাতুল্লাহি আলায়হি বর্ণনা করেছেন, এ রাতের যে কোন আমল হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এ রাতে ইবাদত করা ত্রিশ হাজার দিন ও ত্রিশ হাজার রাত ইবাদতের সমতুল্য। [নুযহাতুল মাযালিছ, পৃ. ১৬৬] বুখারী শরীফে সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় রমযান শরীফের রোযা পালন করে আল্লাহ্ তা‘আলা তার পূর্ববর্তী যাবতীয় (ছগীরা) গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন এবং যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সাওয়াবের আশায় লায়লাতুল ক্বদরের রাত জেগে ইবাদতে মশগুল থাকে তারও পূর্ববর্তী সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দেবেন।

যারা এ রাতে ক্ষমার অযোগ্য
এমন কতেক বান্দা রয়েছে যাদের অপরাধ এ মহিমান্বিত রজনীতে ক্ষমার অযোগ্য ঘোষণা হবে। যাদের উপর মহান প্রভুর দয়ার পরশ পড়বে না। তারা হলো ১. অনিষ্টকারী যাদুকর ও গণক, ২. মাতা-পিতার প্রতি অবাধ্য সন্তান, ৩. যার অন্তর হিংসা-বিদ্বেষ ও কৃপণতায় পরিপূর্ণ, ৪.ব্যভিচারী, ৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিনড়বকারী ব্যক্তি, ৬. চোগলখোর/পরনিন্দাকারী এবং ৭. বান্দার হক আত্মসাৎকারী।

লাইলাতুল ক্বদরের আমল
হযরত ইসমাইল হক্কী রহমাতুল্লাহি আলায়হি তাফসীরে রুহুল বয়ানে উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি ক্বদর রজনীতে বিশুদ্ধ অন্তকরণে নফল নামায আদায় করবে আল্লাহ্ তা‘আলা তার সমস্ত গুনাহ্ মাফ করে দিবেন। নফল নামায যে কোন নিয়মেই পড়া যায়। তবে ‘নুজহাতুল মাযালিস’ নামক কিতাবে যে পদ্ধতি দেয়া হয়েছে, তা হলো প্রতি রাকাতে সুরা ফাতিহার পর সূলা তাকাসুর ১ বার এবং সূরা ইখলাস এগার বার করে পড়বেন। তাহলে আল্লাহ্ তা‘আলা তার মৃত্যুর সাকারাত সহজ করে দেবেন। অধিকন্তু কবরের আযাব থেকেও মুক্তি দেবেন এবং নূরেরএমন চারটি স্তম্ভ দান করবেন যে, প্রতিটি স্তম্ভের ১০০০ মহল হবে। আর যে দো‘আটি পড়বেন তা হলো হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যদি আমি লাইলাতুল ক্বদর রজনী পেতে সক্ষম হই, তবে কি পড়ব?’ জবাবে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করলেন ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুওভুন, তুহিব্বুল ‘আফ্ভা ফা’ফু ‘আন্না’। অর্থাৎ হে আল্লাহ্ আপনিতো ক্ষমাকারী, আপনি ক্ষমা পছন্দ করেন। সুতরাং আমাকেও ক্ষমা করুন।
[তিরমিযী শরীফ, মসনদে আহমদ] তাছাড়া, আমাদের দেশে শবে ক্বদরেও কমপক্ষে বার রাক্‘আত নামায একাকী কিংবা জামা‘আত সহকারে পড়ার নিয়ম আছে। তা এভাবে যে, দু’ রাক্‘আতের ছয় নিয়্যতে এ নামায পড়া হয়। প্রত্যেক দু’ রাক্‘আতের প্রথম রাক্‘আতে সুরা ফাতিহার পর ‘সূরা ক্বদর’ এবং দ্বিতীয় রাক্‘আত তিনবার ‘সূরা ইখলাস,’ (সূরা ক্বদর মুখস্থ না থাকলে উভয় রাক্‘আতে তিনবার সূরা ইখ্লাস) পড়া হয়। এটাও বরকতময়। অতএব, মহান আল্লাহ্ পাক লায়লাতুল ক্বদর বা মহিমান্বিত রজনীর সমুদয় ফয়েজ বরকত ও ফজীলত আমাদের প্রত্যেককে দান করুক। আমীন।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •