আল কোরআন : সংকলন ও সংরক্ষণ

0

আল কোরআন : সংকলন ও সংরক্ষণ

কাশেম শাহ

মহান রাব্বুল আলামীন যে সমস্ত মাস ও দিনকে মহিমান্বিত ঘোষণা করেছেন, তাঁর মধ্যে মাহে রমজান অন্যতম। রমজান মাসকে মহিমান্বিত, মর্যাদাপূর্ণ করার কারণ এত বেশি যে, তা লিখে কিংবা বর্ণনা করে শেষ করা সম্ভব নয়। পুরো মাসের প্রতিটা মুহূর্ত তো মর্যাদাবানই, তার ওপর এ মাসের ভেতরেই রয়েছে লাইলাতুল কদরের মতো হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত্রি। রয়েছে জুমাতুল বিদা, ইতিকাফ, বদর দিবসের মতো মহান রাব্বুল আলামীনের নিকটবর্তী হওয়ার, নব চেতনায় উজ্জীবীত হওয়ার মতো দিন, ইবাদত। আরো আরো অনেক বিষয়, এ মাসকে বাকি এগার মাসের চেয়ে অনেক বেশি মাহাত্ম্যপূর্ণ করে তুলেছে। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এ মাসকে, তা হচ্ছে আল কোরআন। এ মাসেই যে নাযিল হয়েছে ঐশী গ্রন্থ, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পঠিত, বেশি বিক্রিত, বেশি সমাদৃত গ্রন্থ কোরআনুল কারীম।
মানুষের ইহলৌকিক কল্যাণ ও পারলৌকিক মুক্তির দিগদর্শণ হিসেবে মুসলিম উম্মাহর জন্য শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত আল্লাহর বাণী পবিত্র ‘আল-কোরআন’। আল কোরআন বিশ্বের বিস্ময়কর গ্রন্থ। এটি সর্বাধিক প্রশংসিত মহা প্রজ্ঞাময় রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ নবী বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর অবতীর্ণ হয়েছে। বিশ্বজনীন এ গ্রন্থের আবেদন ও উপযোগিতা সব যুগে এবং সব স্থানেই কার্যকর রয়েছে। কোরআনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এ গ্রন্থ দুইবার নাজিল হয়েছে। প্রথমে একবার পুরো কোরআনের আয়াত প্রথম আসমানে ‘বাইতুল ইজ্জতে’ নাজিল হয়েছে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে বিভিন্ন ঘটনা উপলক্ষে, যুগ-জিজ্ঞাসার জবাবে নাজিল হয়েছে। কুদরতি নিয়মে হাজারো বছর ধরে অত্যন্ত বিস্ময়কর প্রক্রিয়ায় এ গ্রন্থকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। লিখে রাখার পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে, হৃদয় থেকে হৃদয়ে একে ধারণ করা হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোরআনের লাখো হাফেজ বা মুখস্থকারী রয়েছেন। মানব ইতিহাসে আর কোনো গ্রন্থের এত হাফেজ নেই। আল কোরআন মানবজাতির সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও মুক্তির দিশারি বা পথপ্রদর্শক। পবিত্র কোরআনকে সর্বকালের, সর্বদেশের, সর্বলোকের জীবনবিধান ও মুক্তির সনদ হিসেবে আল্লাহ তাআলা ওহীর মাধ্যমে নাজিল করেছেন।
হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা হতে বর্ণিত আছে, প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর উপর ওহী নাজিলের সূচনা হয়েছিল স্বপ্নের মাধ্যমে। তিনি স্বপ্নে যা দেখতেন তা দিনের আলোর মতো তাঁর জীবনে প্রতিভাত হতো। হযরত জিবরাইল আলায়হিস্ সালাম-এর মাধ্যমে ওহী প্রাপ্তির আগে আস্তে আস্তে তিনি নির্জনতা প্রিয় হয়ে ওঠেন, হেরা গুহায় নিভৃতে আল্লাহ তাআলার ধ্যানে তিনি মশগুল হয়ে পড়েন এবং বিশাল সৃষ্টি ও তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর চিন্তা ভাবনা করতে থাকেন।
বিষ্ময়কর এ গ্রন্থের যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি বিষ্ময়কর, তা হচ্ছে এর সংকলন ও সংরক্ষণ। বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ গ্রন্থ অবিকল, অবিকৃতভাবে পৃথিবীর হাজারো ভাষাভাষীর কাছে টিকে আছে। বিভিন্ন গ্রন্থ পর্যালোচনা করে, সাহাবীদের জীবনীতে কিংবা হাদিসের বর্ণনায় ওঠে এসেছে সে গৌরবময় সংকলন ও সংরক্ষণের ইতিহাস। খলিফায়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামগণ পবিত্র এ ধর্মীয় গ্রন্থ সংকলন ও সংরক্ষণে যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, যে সত্যবাদীতার, সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তা ইসলামের ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে থাকবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম থেকে শুরু করে হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়কালে ধাপে ধাপে সংরক্ষিত, সংকলিত হয়েছে মহান এ গ্রন্থ।

রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম -এর যুগে কোরআন সংরক্ষণ ও সংকলন
কোরআনুল করিমের সব আয়াত একসঙ্গে নাজিল হয়নি; বিভিন্ন আয়াত বিশেষ প্রয়োজনীয়তা ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অবতীর্ণ হয়েছে; বিভিন্ন ঘটনা প্রসঙ্গে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা যখন অবহিত করতে চেয়েছেন তখন সে অংশটুকুই নাযিল করেছেন। তাই রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে শুরু থেকেই গ্রন্থ আকারে একে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। আসমানি গ্রন্থগুলোর মধ্যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনকে এ বিশেষত্ব দান করেছেন যে কলম-কাগজের চেয়েও একে অগণিতসংখ্যক হাফেজের স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করেছেন। মুসলিম শরিফে এসেছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-কে বলেছেন, ‘আমি আপনার ওপর এমন কিতাব অবতীর্ণ করব, যাকে পানি ধুয়ে নিতে পারবে না।’ প্রথম দিকে লেখার চেয়েও কোরআন মুখস্থ করার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায়ই সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় অংশ হাফেজে কোরআন হয়েছেন। অগণিত সাহাবির গোটা কোরআন মুখস্থ ছিল। মুখে মুখে, হৃদয়ে হৃদয়ে ছিল কোরআনের তেলাওয়াত, সংরক্ষণ।
আরবদের দুনিয়াজুড়ে খ্যাত বিস্ময়কর স্মৃতির ওপর ভর করে কোরআন সংরক্ষণের পাশাপাশি রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম লিখিতভাবে কোরআন সংকলন, সংরক্ষণ ও একত্রীকরণের ব্যবস্থা করে গেছেন। ওহির ইলম লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি চল্লিশজন ‘কাতেবে ওহি’ বা ওহি লেখক নিযুক্ত করেছেন। সে সময় কাগজ ছাড়াও পাথর, চামড়া, খেজুরের ডাল, বাঁশের টুকরা, গাছের পাতা এবং চতুষ্পদ জন্তুর হাড্ডির ওপর কোরআন লিখে রাখা হতো। এভাবেই রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর তত্ত্বাবধানে কোরআনের একটি কপি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল, যদিও তা পুস্তিকারূপে ও গ্রন্থিত আকারে ছিল না।

হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর যুগে কোরআন সংকলন
যেহেতু রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন বস্তুর ওপর কোরআন সংরক্ষিত ছিল, তাই হজরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নিজ খেলাফতের সময় বিক্ষিপ্ত অংশগুলো একত্র করে সংরক্ষণের প্রতি মনোযোগী হয়েছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা এসেছে সহিহ বুখারি শরিফে। হজরত জায়েদ ইবনে সাবেত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘ইমামার যুদ্ধের পরপরই হজরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি সেখানে গিয়ে দেখি ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আমাকে বললেন-ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এসে আমাকে বলেছেন, ‘ইমামার যুদ্ধে কোরআনে হাফেজদের একটি বড় অংশ শহীদ হয়ে গেছে। আর এভাবেই যদি বিভিন্ন স্থানে কোরআনের হাফেজরা শহীদ হতে থাকেন, তাহলে আমার আশঙ্কা হয়, কোরআনের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাবে। তাই আমার অভিমত হলো, আপনি চাইলে কোরআন সংকলনের নির্দেশ দিতে পারেন।’ আমি তাঁকে বললাম, ‘যে কাজ রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম করেননি, সেই কাজ আমি কিভাবে করব?’ জবাবে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, ‘আল্লাহর কসম, এ কাজ উত্তমই উত্তম। এরপর ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বারবার আমাকে একই কথা বলতে লাগলেন। একপর্যায়ে এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা আমার অন্তর খুলে দিলেন। এখন ওমরের অভিমত যা, আমার অভিমতও তা-ই।’ এরপর আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আমাকে বললেন, ‘তুমি বিচক্ষণ যুবক, তোমার ব্যাপারে আমাদের কোনো খারাপ ধারণা নেই। রাসুল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় তুমি ওহি লেখার কাজ করতে। তাই তুমিই কোরআনের আয়াতগুলো অনুসন্ধান করে সেগুলো একত্র করো।’ জায়েদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘আল্লাহর কসম, তাঁরা যদি আমাকে সস্থান থেকে কোনো পাহাড় সরানোর আদেশ দিতেন, তাহলে তা আমার কাছে এত কঠিন মনে হতো না, যতটা কঠিন মনে হয়েছে কোরআন সংকলনের দায়িত্ব পালনের নির্দেশটি।’
হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর পরামর্শক্রমে হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হযরত যায়েদ বিন সাবিতকে প্রধান করে কুরআন সংকলনের জন্য একটি কমিটি গঠন করলেন। হযরত যায়েদ বিন সাবিতের নেতৃত্বে এই কমিটি কুরআনকে কাগজে, চামড়ায়, পাতায় ও পাথরে সংরক্ষিত অংশ সংগ্রহ করে হাফেজে কুরআনদের সাথে মিলিয়ে সুবিন্যাস্ত করে কুরআন সংকলনের একটি পান্ডুলিপি তৈরি করে খলিফার নিকট সোপর্দ করেন। এটি ‘মাসহাফে সিদ্দিকী’ নামে পরিচিত। হযরত আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এর ইন্তিকালের পর হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সময় এটি হযরত হাফসা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নিকট সংরক্ষিত ছিল।

হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু-এর যুগে কোরআন সংকলন
হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এর সময় মুসলমানেরা অসংখ্য রাজ্য দখল করে। প্রতিটি রাজ্যের আলাদা আলাদা ভাষা ছিল। বিভিন্ন রাজ্যের লোকেরা কুরআনকে বিভিন্ন ভাষায় তেলাওয়াত করতে লাগল এবং এতে কুরআনের আয়াত ও অর্থের অনেক তারতম্য সৃষ্টি হল। হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর ইস্তিকালের পর হযরত উসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু খলিফা নির্বাচিত হন। তিনি বিষয়টি বুঝতে পেরে হযরত হাফসা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এর নিকট থেকে সংরক্ষিত কপিটি সংগ্রহ করে হযরত যায়িদ বিন সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু কে রাসূলের সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র ভাষায় অনেক গুলি কপি করে প্রত্যেক প্রদেশে একটি করে কপি পাঠিয়ে দেন এবং পূর্বের কপিগুলো সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলেন। তার দায়িত্বে যেহেতু কুরআন সংকলিত হয়েছে তাই তাকে জামিউল কুরআন বলা হয়। আজ পর্যন্ত এই কপি প্রচলিত আছে।
পৃথিবীতে মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কারের পূর্বে আল-কুরআন হাতেই লিখা হতো। কুরআনের হস্তলিপিকারগণ যে অনন্য সাধনার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, ইতিহাসে এর অন্য কোন নযির নেই। মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কারের পর সর্বপ্রথম জার্মানির হামবুর্গ শহরে হিজরী ১১১৩ সনে আল-কুরআন মুদ্রিত হয়। মুদ্রিত সেই আল-কুরআনের একটি কপি মিশরের দারুল কুতুবে এখনো সংরক্ষিত আছে। কিন্তু মুসলিম জাহানে সে সমস্ত মুদ্রিত কপি গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়নি। মুসলিমদের মধ্যে সর্বপ্রথম মাওলায়ে উসমান কতৃক রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে ১৭৮৭ খৃষ্টাব্দে আল-কুরআন মুদ্রিত হয়। ১৮২৮ খৃষ্টাব্দে ইরানের তেহরানে লিথু মুদ্রণযন্ত্রে আল-কুরআনের আর একটি কপিমুদ্রিত হয়। এরপর সারা দুনিয়ায় মুদ্রিত কুরআন ছড়িয়ে পড়ে। আর এখন পৃথিবীর প্রায় সবদেশেই, সব ভাষায়ই অনুদিত হয় আল কোরআন। তবে, পঠিত হয় আরবী ভাষাতেই।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •