আল কুরআন ও রমযান : আল্লাহ্ তা‘আলার শ্রেষ্ঠ দান

0

আল কুরআন ও রমযান : আল্লাহ্ তা‘আলার শ্রেষ্ঠ দান

মাওলানা মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান হাবিবী

আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীন মাহে রমযানে সত্যের দিশারী এবং হেদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে কুরআনুল করিমকে আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করেন। আরবী ভাষায় কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার কারণও উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ্ বলেন,
فَاِنَّمَا يَسَّرۡنٰهُ بِلِسَانِكَ لَعَلَّهُمۡ يَتَذَكَّرُوۡنَ‏ ﴿۵۸﴾
তরজমা: ‘হে রসূল! আমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।’
[সূরা দোখান: আয়াত-৫৮] اِنَّا جَعَلۡنٰهُ قُرۡءٰنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُوۡنَ‌ۚ‏ ﴿۳﴾
তরজমা: ‘আমি (সুস্পষ্ট কিতাব) অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায় কুরআনরূপে, যাতে তোমরা বুঝতে পার।
[সূরা জুখরুফ: আয়াত-৩] ‘হে হাবীব! আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি আরবী ভাষায়, যাতে আপনি সতর্ক করতে পারেন মক্কা ও এর পার্শ্ববর্তী জনগণকে।’ [সূরা শূরা: আয়াত-৭] ‘আমি যদি আজমী ভাষায় (অর্থাৎ আরবী ছাড়া অন্য যে কোন ভাষায়) কুরআন অবতীর্ণ করতাম, তারা অবশ্যই বলতো; এর আয়াতগুলো বিশদভাবে বিবৃত হয়নি কেন? কী আশ্চর্য যে, এর ভাষা আজমী অথচ রসূল আরবীয়।
[সূরা হামিম সাজদা: আয়াত-৪৪] আরবী ভাষা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামের মাতৃভাষা। নিজের মাতৃভাষায় ভাবের আদান-প্রদান যতটা সাবলীল ও স্বাভাবিক হয় অন্য ভাষায় তা হয় না। একজন লেখা-পড়া না জানা ব্যক্তির পক্ষেও নিজের মাতৃভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা হয় না। মাতৃভাষা আল্লাহ্ তা‘আলার সেরা দান।
স্থানীয়ভাবে, নিজস্ব নিয়মে প্রাকৃতিক অবয়বে গঠিত ধ্বনি ও শব্দমালার মাধ্যমে মানুষ ভাবের আদান-প্রদান করে। এলাকা বিশেষে নিজেদের মধ্যে সংহতি ও সহমর্মিতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে নিজস্ব ভাষা অন্যতম অবলম্বন হিসেবে কাজ করে। তাইতো প্রিয়নবীর মাতৃভাষায় আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআন মজিদ অবতীর্ণ করেন।

আল কুরআন ও মাহে রমযান পারস্পরিক সূত্রে গাঁথা
আল্লাহ্ পাক মাহে রমযানের অত্যন্ত ফযিলতপূর্ণ ভাগ্য রজনী লায়লাতুল ক্বদরে এ মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাযিল করেন। কালামুল্লাহ্ শরীফে ইরশাদ হচ্ছে- ‘নিশ্চয়ই! আমি একে (কুরআন মজিদ) লায়লাতুল ক্বদরে নাযিল করেছি। লায়তুল কদর সম্বন্ধে আপনি কি জানেন? লায়লাতুল কদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’। [সূরা ক্বদর: ১-৩] রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, প্রতি রমযানে জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম আমাকে দু’বার করে কুরআন মজিদ তেলাওয়াত করে শুনাতেন। [বুখারী শরীফ] সাধারণত কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করলে প্রতিটি হরফ তথা অক্ষরের বিনিময়ে আল্লাহ্ তা‘আলা দশটি করে নেকী প্রদান করেন; কিন্তু মাহে রমযানে একবার খতম আদায় করলে নবীজির ঘোষণা মোতাবেক সত্তরটি খতমের নেকী বা সওয়াব প্রদান করা হয়। কেননা, মাহে রমযান কুরআন নাযিলের মাস। নি¤েœ কুরআন মজিদ তেলাওয়াত ও মাহে রমজানের কিছু গুরুত্ব পেশ করার প্রয়াস পাচ্ছি

কুরআন মজিদ তেলাওয়াতের গুরুত্ব
কুরআন মজিদ হলো মহান আল্লাহর ঐশী বাণী। আল্লাহ্ পাক রাব্বুল আলামীন মানব সমাজকে সত্য, সুন্দর ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করার জন্য এ আসমানি কিতাব নাযিল করেন। কুরআন তেলাওয়াত মু’মিন-মুসলমানদের সব সময়ের আমল্ এ কিতাব পৃথিবীর সর্বাধিক পঠিত গ্রন্থ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নাযিল হওয়া কিতাব কুরআনুল করীম; যা তাঁর দীর্ঘ তেইশ বছরে নাযিল হয়েছে। কুরআন শব্দটি ‘কারউন’ থেকে এসেছে। এর অর্থ দু’টিঃ ১. জমা বা একত্রিত করা। এর তাৎপর্য হলো এ কিতাবে অতীতের সব আসমানি কিতাবের মূল শিক্ষা একত্রিত হয়েছে। এর মধ্যে পৃথিবীর প্রলয় দিন অবধি মানবজাতির প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং হেদায়াত রয়েছে। ২. বারবার পাঠ করা বা পঠিত গ্রন্থ। এ কিতাবটি কোটি কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত তেলাওয়াত বা পাঠ করে চলেছে। এমন কোন মুহূর্ত নেই যখন কোথাও না কোথাও এর তেলাওয়াত চলছে না। এত অধিক পঠিত কিতাব দুনিয়ায় দ্বিতীয়টি নেই। [আল ইতকান ফি উলুমিল কুরআন] আল কুরআন সৃষ্টি জগতের ¯্রষ্টা আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ‘কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে। [সূরা জুমার: আয়াত-১] আল কুরআন পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী। ‘আর আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও এর উপর তদারককারী হিসেবে।’ [সূরা মায়েদা: আয়াত-৪৮] কুরআনুল করীম লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ। এরশাদ হচ্ছে, ‘বরং এটা মহান কুরআন, লওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ।’ [সূরা বুরুজ: আয়াত- ২১-২২] কুরআন মজিদের আরেকটি মর্যাদা হলো, এটি একটি চ্যালেঞ্জময় গ্রন্থ। কুরআন নিয়ে আল্লাহ্ তা‘আলা চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করে বলেন, ‘হে হাবিব! আপনি বলুন, যদি মানব ও জ্বিন এ কুরআনের মতো কিছু রচনার জন্য জড়ো হয় এবং তারা পরস্পরের সাহায্যকারীও হয়; তবু তারা কখনো এর মতো একটি কুরআন রচনা করে আনতে পারবে না।’
[সূরা বনি ইসরাঈল: আয়াত-৮৮] কুরআনের সংরক্ষণকারী স্বয়ং আল্লাহ্। আল্লাহ্ পাক বলেন, ‘এ জিকির (কুরআন) আমিই অবতীর্ণ করেছি, আর আমি নিজেই এর হেফাজতকারী।’ [সূরা হিজর: আয়াত-৯] কুরআনুল করিম বিশ্ব মানবতার জন্য এক অফুরন্ত নেআমত। আল্লাহ্ তা‘আলার অপার মেহেরবাণী যে, তিনি আমাদের উপর কুরআন নাযিল করেছেন। কালামুল্লাহ্ শরীফে এরশাদ হয়েছে, ‘বড়ই মেহেরবান তিনি (আল্লাহ্) যিনি মাহবুবকে কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন। [সূরা আর রহমান: আয়াত-১-২] কুরআন মজিদ অপবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করা সম্পূর্ণ নিষেধ। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয় এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক গোপন কিতাবে, যারা পাক-পবিত্র, তারা ছাড়া অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না। এটা সৃষ্টিকুলের প্রভুর পক্ষ থেকে এসেছে। [সূরা ওয়াকিয়াহ্: আয়াত-৭৭-৮০] কুরআন মজিদ পাঠের প্রয়োজন কেন? এটি বারবার তেলাওয়াতের প্রয়োজন এ জন্য যে, যাতে মানুষ তার ¯্রষ্টার নির্দেশনাবলী সম্পর্কে অভিহিত হতে পারে এবং সদা সর্বদা স্মরণ রাখতে পারে। আল্লাহ্ তাঁর প্রিয় হাবিব সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ মহা ঐশীগ্রন্থ কুরআনুল করীম নাযিল করেছেন। মানবজাতির পথ প্রদর্শক ও উপদেশ দানের জন্য অবতীর্ণ এ কুরআন মজিদকে তেলাওয়াত করা ও এর উপর আমল করা প্রতিটি মু’মিন নর-নারীর উপর আবশ্যক।
আল-কুরআন মু’মিনদের সত্য অন্বেষণের সুযোগ দেয়, মিথ্যাকে পরিত্যাগের তাগিদ দেয়, হুযূর আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কুরআন তেলাওয়াতের তাগিদ দিয়ে এরশাদ করেন, কেয়ামতের দিন কুরআন তার পাঠকদের জন্য শাফাআতকারীর ভূমিকা পালন করবে। [সহীহ্ মুসলিম শরীফ] হযরত ওসমান ইবনে আফফান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শিখায়।’ [সহীহ্ বুখারী শরীফ] হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘সর্বশ্রেষ্ঠ বাণী হলো আল্লাহর বাণী, আর সর্বশ্রেষ্ঠ পথ হলো নবীজির দেখানো আলোকিত পথ।’ [সহীহ্ বুখারী শরীফ] কুরআনের প্রতিটি হরফ অধ্যয়ন করলে নেকী লাভ করা যায়। হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি হরফ পাঠ করল, এতে সে দশটি নেকীর অধিকারী হলো। তিনি আরো ফরমান, আমি বলছি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ। [তিরমিযী শরীফ] কুরআনুল করীম পাঠকারীর পিতা-মাতাকে কিয়ামতের দিন হাশরের মাঠে নূরের তাজ পড়ানো হবে। হযরত মুআজ আল জুহানী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সরকারে দো আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআন পড়ে এবং বাস্তব জীবনে তার চর্চা করে, কিয়ামত দিবসে তার পিতা-মাতাকে এমন একটি নূরের টুপি পরানো হবে, যার নূর দুনিয়ার সূর্যের আলোর চেয়ে অধিক হবে। [আবূ দাঊদ শরীফ] কুরআন তেলাওয়াত ঈমানদারের সব সময়ের আমল। তবে রমযান মাসে এর গুরুত্ব আরো অধিক। কেননা এ মাসেই কুরআন নাযিল হয়েছে। আল্লাহ্ বলেন, ‘রমযান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে। [সূরা বাক্বারা: আয়াত-১৮৫] সাহাবা-ই কেরাম, তাবে‘ঈন ও বুযুর্গানে দ্বীন সবাই রমযান মাস কুরআন তেলাওয়াতের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁদের অনেকে দৈনিক এক খতম পর্যন্ত কুরআন তেলাওয়াত করতেন। অনেকে তো দৈনিক দুই খতমও পড়তেন বলে বর্ণিত হয়েছে।
উম্মুল মু’মেনীন হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মালেকে কওনাইন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কুরআনের জ্ঞানী হবে, কিয়ামতের দিন সে সম্মানিত ফেরেশতাদের সাথে থাকবে। আর যে কুরআন শেখার চেষ্টা করবে; কিন্তু শিখতে শিখতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে অর্থাৎ শেখার জন্য চেষ্টা করে, তার জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।’ [সহীহ্ বুখারী শরীফ]

ইতিহাস স্বাক্ষী, আমরা জানি, হযরত ওমর ফারুক রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নবীজিকে হত্যা করার জন্য রওয়ানা হয়েছিলেন। পথিমধ্যে বোনের কাছে কুরআন শরীফ তেলাওয়াত শুনেছেন এবং অর্থটাও বুঝেছেন। ঘটনা বর্ণনা করা আমার উদ্দেশ্য নয় বরং আমার বলার উদ্দেশ্য হলো; আবু জাহল নিজের হাতে যে কাজ করতে পারেনি। সে কাজ আদায়ের জন্য সে ঘোষণা করলো, যে ব্যক্তি রাসূলকে হত্যা করতে পারবে, তাকে দু’শত উট পুরস্কার দেয়া হবে। কোন কাফের নবীজিকে হত্যায় রাজি হয়নি। কিন্তু ওমর বললেন, আমি হত্যা করবো। হত্যা করতে যাওয়ার পথে বোনের মুখে কুরআন তেলাওয়াত শুনে তার দিলের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে যায়। আর সাথে সাথে খোলা তরবারি নিয়েই মুসলমান হওয়ার জন্য নবীজির নূরানী দরবারের দিকে রওয়ান দিলেন। সুবহানাল্লাহ! এটাই হচ্ছে কুরআনুল করীমের তা’সীর।

কুরআনুল করীমের পরশে এসে কট্টর মানুষগুলো বড় বড় সাহাবী এবং ইসলামের অতন্দ্র প্রহরীতে পরিণত হয়েছেন। পবিত্র কোরআনে মানুষের জীবনের চলার পথের দিশা দেয়া হয়েছে। মানব জীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক জীবন কেমন হবে কুরআন মজিদে তার বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। এ মহাগ্রন্থ আমাদের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণের পথ বাতলিয়ে দিয়েছে।
তাই কুরআন বেশি বেশি তেলাওয়াত, হিফজ ও গভীর ধ্যানের মাধ্যমে তা শ্রবণ করা আর গভীরভাবে চিন্তা ও গবেষণা করা আমাদের একান্ত কর্তব্য। পবিত্র এ মাসে একজন মু’মিনের জন্য অন্যান্য নফল ইবাদতের সাথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বাধিক নেকীর আমল হলো কুরআনুল করীম তেলাওয়াত।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে কুরআন মজিদ তেলাওয়াত ও অনুধাবন করে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন।

রমযানুল মোবারকের তাৎপর্য
পবিত্র মাহে রমযানুল মোবারকের রোযা ইসলামের পাঁচটি রোকনের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ রোকন। মাহে রমযান সিয়াম সাধনার মাস। যার রয়েছে অসংখ্য-অগণিত ফযিলত। এ ফযিলত অর্জনের জন্য মু’মিন নর-নারীকে আগে থেকেই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। আমরা দুনিযাবী কোন কাজ সম্পাদনের পূর্বে নানা ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করে থাকি। যার পূর্ব প্রস্তুতি ভাল হয়, তার কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রেও ভাল ফলাফল আসে। আর যার পূর্ব প্রস্তুতি কম থাকে বা একেবারে থাকে না, তার কাজ পূর্ণরূপে সাধিত হবে না অথবা ফলাফল তার বিপক্ষেও যেতে পারে। এমনটি হওয়া স্বাভাবিক। যেহেতু মাহে রমজানের রোযার ফযিলত অপরিসীম, সেহেতু তার পূর্ব প্রস্তুতিও হতে হবে একেবারে উত্তম প্রক্রিয়ায়। যার সম্পর্ক ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে। প্রকৃত সাধনার মাধ্যমে একটি জাতির ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন হয়। তারা উন্নতির সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছতে সক্ষম হয়। আর পরকালে অনন্ত-অনাবিল শান্তির ঠিকানা অর্জন করার আশা করা যায়। সমস্ত প্রেম-ভালবাসা, মায়া মমতা, সহযোগিতা, সহনশীলতা, সহমর্মিতা, সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ববোধ, তাকওয়া বা খোদাভীতি ও আল্লাহ্ প্রেম সৃষ্ঠির ক্ষেত্রে রোযা বা সিয়াম সাধনা আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে এক বে-মেছাল নি’মাত।

আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআন মজিদে এরশাদ করেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর; যেনো তোমরা খোদাভীরুতা অর্জন করতে পারো। [সূরা বাক্বারা: আয়াত-১৮৩] প্রকৃতপক্ষে মাহে রমজানে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয়, অন্তরে রহমতের ঝরণা ধারা প্রবাহিত হয়। মানুষের মাঝে সত্যিকারের বিবেকবোধ ও মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত হয়। পরস্পরের মাঝে মায়া মমতা ও সহানুভূতি তৈরি হয়। পশুত্ব স্বভাব বিলুপ্ত হতে থাকে। সিয়াম সাধনার ব্যাপারে আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে পূর্ববর্তী লোকদের রোযার উদাহরণ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আলোচ্য আয়াতের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, রোযা শুধুমাত্র আমাদের উপর ফরয হয়নি; বরং পূর্ববর্তীদের উপরও ফরয ছিল। উদ্দেশ্য হলো, যাতে করে রোযা রাখার বিধানটি আমাদের সহজ মনে হয় এবং এটি নতুন কোন বিধান নয়, সেটিও পরিস্কার হয়ে যায়।

আয়াতের শেষাংশে রোযার ফযিলত উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাকওয়া বা পরহেযগারির শক্তি অর্জন করার ক্ষেত্রে সিয়াম সাধনার ভূমিকা অপরিসীম। আর আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই খোদাভীরুতা অর্জিত হয়।
মুসলিম শরীফের এক হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘মানুষের ভিতরে একটি ক্ষুদ্রতম গোশতের টুকরা আছে, যদি এ ক্ষুদ্রতম টুকরাটি ঠিক থাকে, তাহলে পুরো শরীর ঠিক থাকে। আর এ ক্ষুদ্রতম টুকরা যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। এ ক্ষুদ্রতম টুকরাটির নাম হল কলব বা অন্তর। অতএব, এ কলব পরিশুদ্ধ হলে মু’মিনের জীবন সফলকাম হয়। রোযার গুরুত্বের উপর কয়েকটি হাদীস শরীফ পেশ করছিঃ
হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে আকরাম নুরে মুজাচ্ছাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আদম সন্তানের প্রত্যেক পুণ্য আমলের বিনিময় দশগুণ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ বলেন; কিন্তু রোযার বিনিময় অর্থাৎ এটা (রমযান) আমার জন্য আর আমিই এর বিনিময় দান করবো।
রোজাদার তার আহার ও প্রবৃত্তি আমার জন্যই বর্জন করে। রোযাদারের জন্য দু’টি আনন্দ। একটি হচ্ছে ইফতারের সময় আর অপরটি হচ্ছে স্বীয় প্রভুর সাথে সাক্ষাতের সময় এবং রোযাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশক আম্বরের চেয়ে সুগন্ধ। আর রোযা হলো ঢাল স্বরূপ। অতঃপর তোমাদের কেউ যদি রোযার দিনে এসে উপনীত হয়, সে যেন কোন অশালীন কথা না বলে এবং অযথা কথাবার্তঅ দ্বারা উচ্চস্বরে আওয়াজ না করে। তার সাথে কেউ যদি গালমন্দ বা বিবাদে লিপ্ত হয়, সে যেন বলে আমি রোযাদার। [সহীহ্ বুখারী ও মুসলিম শরীফ]

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, অপর হাদিসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যখন মাহে রমযানুল মোবারকের আগমন হয়, তখন আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। অন্য বর্ণনায় জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের জিঞ্জিরাবদ্ধ করা হয়। অন্য এক বর্ণনা মতে রহমতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় অর্থাৎ মাহে রমজানুল মোবারক মু’মিন মুসলমানদেরকে পার্থিব দোষ-ত্রুটি, পাপ পংকিলতা থেকে পবিত্র করে, মহান রবের দয়া ও বরকত লাভের যোগ্য করে তুলে। রমযান শরীফের রোযা এতই গুরুত্ব যে, এ মাসের একটি রোযা যুগ যুগ ধরে রোযা রাখার চেয়ে উত্তম। সারা বছর রোযা রাখলেও এ মাসের একটি রোযার সমান হবে না। শুধু তাই নয়; রযমানুল মোবারকের আগমন ও এ মাসকে স্বাগত জানানোর জন্য মহান আল্লাহ্ ফেরেশতাদের মাধ্যমে সারা বছর ধরে জান্নাতকে সাজাতে থাকেন। অতএব, বুঝা গেল, রোযা মুসলিম মিল্লাতের জন্য কতটা গুরুত্ববহ। মুসলিম সমাজের আত্মিক উৎকর্ষতা সাধনের পাশাপাশি, পারস্পরিক সহনশীলতা, সামাজিক শুদ্ধতা অর্জনে এবং দুনিয়াবী লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ পরিহার করে আত্মসংযম ও খোদাভীতি অর্জনে রোযার বিশাল গুরুত্ব ও অবদান অনস্বীকার্য।
আল্লাহ্ পাক আমাদের সকলকে মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও রমযানুল মোবারকের রোযার অনুশীলনের মাধ্যমে ইহজগত ও পরজগতের সমূহ কল্যাণ অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •