ইসলামে নারীর অধিকার

0

ইসলামে নারীর অধিকার
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

عَنْ حكيم بن معاوية رضى الله عنه عن ابيه قال قلت يا رسول الله صلى الله عليه وسلم ما حق زوجة احدنا عليه؟ قال اَنْ تُطْعِمْهَا اذا طَعْمِتَ وتكسُوْهَا اذا اكتسيت ولاتضربَ الوجهَ ولاتُقَبّحْ ولاتهجر الّا فى البيت- (رواه ابو داؤد رقم الحديث ২১৪২)
অনুবাদ: হযরত হাকিম ইবনে মুয়াবিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! স্বামীর উপর স্ত্রীর কি অধিকার রয়েছে? তিনি বললেন, নবীজি এরশাদ করেন, যখন তুমি খাবে তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন যে মানের কাপড় পরিধান করবে তাকেও সে মানের কাপড় পরিধান করাবে। তার মুখে আঘাত করবে না। তাকে মন্দ বলবে না, গৃহে রাগের বশবর্তী হয়ে তার সাথে সম্পর্ক ছেদ করবে না। [আবু দাঊদ শরীফ: হাদীস নং ২১৪২]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
বর্ণিত হাদীস শরীফে প্রিয়তমা সহধর্মিনী স্ত্রীর অধিকারের কথা ব্যক্ত হয়েছে। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যেখানে নারী জাতির মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রাক ইসলামী যুগে নারীরা ছিলো সমাজে নিগৃহীত ও চরমভাবে অবহেলিত। ইসলামই তাদেরকে মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। ইসলাম কখনো মা হিসেবে তাদেরকে সম্মানিত করেছে যেমন- নবীজি এরশাদ করেছেন-
ان الله حرم عليكم عقوق الامهات ومنع وهات وواد البنات- অর্থ: আল্লাহ্ তা‘আলা মাতাদের নাফরমানী, তাদের অধিকার বঞ্চিত করা ধন-সম্পদ লুন্ঠন করে সঞ্চিত করা এবং কন্যা সন্তানদের জীবন্ত প্রোথিত করাকে তোমাদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন।
[বুখারী শরীফ: ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৮৮৪]

ইসলাম কখনো কন্যা হিসেবে নারী জাতিকে তাদের উত্তম প্রতিপালন, সুশিক্ষা, শিষ্টাচারিতা ও উত্তমরূপে পাত্রস্থ করার নির্দেশ দিয়ে তাঁদের প্রতি সুবিচার করেছে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
من عال ثلاث بنات فادبهن وزوجهن واحسن اليهن فله الجنة- (رواه ابو داؤد)
অর্থ: যে ব্যক্তি তিনটি কন্যা সন্তান প্রতিপালন করেছে তাদেরকে নৈতিকতা তথা শিষ্টাচারিতা শিক্ষা দিয়েছে তাদের বিবাহের ব্যবস্থা করেছে, তাদের প্রতি সদয় আচরণ করেছে, তার জন্য রয়েছে জান্নাত। [আবু দাউদ শরীফ: ৪র্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৮]

ইসলাম কখনো স্ত্রী হিসেবে তাদের যথার্থ মর্যাদা-সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছে। তাদের প্রতি যেন কোন প্রকার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অযতœ-অবহেলা, অবজ্ঞা না হয় সেদিকে সতর্কতা আরোপ করা হয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্বের ঐতিহাসিক ভাষণে নারী জাতির মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে যুগান্তকারী নির্দেশনা ব্যক্ত করেছে, তা মুসলিম জাতির আদর্শ পরিবার গঠনে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। নবীজি এরশাদ করেছেন-
فاتقوا الله فى النساء فانكم اخذتموهن بامان الله واستحللتم فروجهُنَّ بكلمة الله ولهذ عليكم رزقهن وكسوتهنّ بالمعروف- (رواه مسلم صف ৩৯৭)
অর্থ: স্ত্রীদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। কেননা, আল্লাহর উপর ভরসা করেই তোমরা তাদেরকে গ্রহণ করেছ। আর আল্লাহ্র কলেমা দ্বারাই তোমরা তাদের লজ্জাস্থানকে হালাল করেছো, তোমাদের উপর তাদের অধিকার হলো, তোমরা উত্তমরূপে তাদের ভরণ পোষণ ও পোষাকের সুবন্দোবস্ত করবে। [সহীহ মুসলিম শরীফ: কিতাবুল হজ্ব, পৃষ্ঠা ৩৯৭]

স্ত্রীর অধিকার প্রসঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো এরশাদ করেছেন-
الا واستوصوا باالنساء خيرًا فان هن عوان عندكم- الا ان لكم على نسائكم حقا ولنسائكم عليكم حقا- الا وحقهنّ عليكم ان تحسنوا اليهنّ فى كسوتهنّ وطعامهنّ-
‘‘হে মানবমন্ডলী! তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার করার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে। কেননা তারা তোমাদের সহযোগী। মনে রেখো! স্ত্রীদের উপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তোমাদের উপরও স্ত্রীদের তেমন অধিকার রয়েছে। সাবধান! তোমাদের উপর তাদের অধিকার হলো, তোমরা উত্তমরূপে তাদের ভরণ পোষণ ও খোরাকের ব্যবস্থা করবে। [তিরমিযী শরীফ: ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২২০]

স্ত্রীদের সাথে নবীজির ব্যবহার
নবীজির পারিবারিক জীবনাদর্শ অনুসরণে রয়েছে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ। নৈতিকতার অবক্ষয়ের এ ক্রান্তিকালে নবীজির আদর্শ অনুসরণ করলেই পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
আল্লামা জালাল উদ্দীন সুয়ূতী আল্ জামিউস সগীর ৩য় খন্ডে বর্ণনা করেন-
كان رسول الله صلى الله عليه وسلم اذا خلا بنسائه الين واكرم الناس وضحاكا تبسما-
অর্থ: নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন নিজ গৃহে স্ত্রীগণের কাছে যেতেন তখন তাদের সাথে ন¤্র এবং ভদ্র ব্যবহার করতেন এবং তাদের সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। [জামিউস্ সগীর: ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা ১৩১]

সর্বোত্তম হওয়ার স্বীকৃতি
উত্তম চরিত্রই মানব জীবনের মুকুট স্বরূপ, আদর্শবান চরিত্রবান মানুষরা সর্বত্রই প্রশংসিত। পারিবারিক জীবনে চরিত্রবান হিসেবে যিনি পরিগণিত তিনি সর্বোত্তম মানুষ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
اكمل المؤمنين ايمانًا احسنهم خلقا وخياركم خياركم لنساءكم-
অর্থ: পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী মুমীন তারাই যারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী। তোমাদের মধ্যে তারাই সর্বোত্তম মানুষ যারা তাদের স্ত্রীদের নিকট সর্বোত্তম হিসেবে স্বীকৃত। [তিরমিযী শরীফ: ১ম খন্ড, পৃৃষ্ঠা ২১৯]

নারীর পরামর্শ গ্রহণ
ইসলাম নারীদের থেকে পারিবারিক ও সামাজিক ব্যাপারেও মতামত ও পরামর্শ গ্রহণকে গুরুত্ব দিয়েছে। পরিবার ও সমাজের কল্যাণে তাদের কল্যাণধর্মী মতামত ও পরামর্শ গ্রহণে ইসলাম উৎসাহ্ প্রদান করেছে। হযরত হাসান বসরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নবীজির কর্ম পদ্ধতি প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন-كان النبى صلى الله عليه وسلم يتشير حتى النساء فيشرن عليه بما يأخذ به-
‘‘প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নারীদের সাথেও পরামর্শ করতেন। কোন কোন সময় তারা এমন পরামর্শ দিতেন যা তিনি গ্রহণ করতেন। [ইবনে কুতাইবা, উয়ুনুল আখবার, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৭]

স্বামী স্ত্রী একে অপরের ভূষণ
মহান আল্লাহ্ মহান গ্রন্থ আল ক্বোরআনে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে পরিপূরক বলেছেন। এরশাদ হয়েছে- هنّ لباس لكم وانتم لباس لهنّ- অর্থ: স্ত্রীরা তোমাদের ভূষণ আর তোমরা তাদের ভূষণ। [সূরা বাক্বারা: আয়াত-১৮৭]

বর্ণিত আয়াতের তাৎপর্য হলো স্বামী-স্ত্রী একের উপর অন্যের সমান অধিকার রয়েছে। মানবীয় সকল অধিকারে নারী ও পুরুষ সমান। উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম আবুস সাউদ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি উল্লেখ করেন-
جعل كل من الرجل والمرأة لباس للاخر لاعتنا قهما واشتمال كل منهما على الاخر بالليل اولان كلامنهما يستر حال صاحبه ويمنعه من الفجور-
অর্থ: স্বামী স্ত্রী পরস্পরকে পোষাকরূপে গন্য করা হয়েছে রজনীতে পারস্পরিক নিকটতম অবস্থান ও নিবিড় সম্পর্কের জন্য এরূপ মনে করা হয়। এ ছাড়াও একে অপরের অবস্থা গোপন রাখেন এবং একে অপরকে পাপাচার হতে বিরত রাখে।
[তাফসীরে আবিস্ সাউদ: ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২০১]

ইবাদত বন্দেগীতে পারস্পরিক সহযোগিতা
ইসলাম নারী-পুরুষ সকলের জন্য নামায, রোযা, হজ্ব সহ বিভিন্ন প্রকার ইবাদত অপরিহার্য করেছে। এক্ষেত্রে আল্লাহর ইবাদতে যেন কোন পক্ষের অবহেলা, শৈথিল্যতা না আসে, যেমন কেউ ইবাদত বিমূখ না হয়। আল্লাহ্ ও তদীয় রাসূলের জীবনাদর্শ অনুসরণ চর্চা ও অনুশীলনে যেন কোন প্রকার অলসতা, অবহেলা সৃষ্টি না হয় এক্ষেত্রে একে অপরকে সাহায্য করবে। ইসলামী আদর্শ ভিত্তিক পরিবার গঠনে উভয়ে যৌথভাবে সক্রীয় ভূমিকা পালন করবে। এ প্রসঙ্গে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- رحم الله رجلا قام من الليل فصلى وايقظ امرأته فان ابت نضح فى وجها الماء ورحم الله امرأة من الليل فصلت وايقظت زوجها فان ابى قضت فى وجهه الماء-
‘‘আল্লাহ্ সেই পুরুষকে রহমত করবেন, যে রাত্রি বেলা জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করে এবং তার স্ত্রীকেও জাগিয়ে তোলেন। স্ত্রী নিদ্রা ত্যাগ না করলে তার মূখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আর আল্লাহ্ সেই স্ত্রীকে রহমত দান করবেন, যে রাত্রি জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করে এবং তার স্বামীকে জাগিয়ে তোলে। স্বামী যদি উঠতে না চায় তাহলে তার মূখে পানি ছিটিয়ে দেয়।
[ইবনে মাযাহ্ শরীফ: ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা- ৪২৪]

পরিশেষে বলতে চাই, ইসলাম সর্বক্ষেত্রে নারী জাতির মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে আজকের নারী জাতি মা-বোনেরা ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে নারী মুক্তির নামে বিজাতীয় সভ্যতা ও অপসংস্কৃতির দিকে ঝুকে পড়েছে। আল্লাহ্ আমাদেরকে হিদায়ত নসীব করুন- আ-মী-ন।

শেয়ার
  • 204
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    204
    Shares