চট্টগ্রামস্থ ফতেয়াবাদে দাওয়াতে খায়র ইজতিমা সম্পন্ন

0

চট্টগ্রামস্থ ফতেয়াবাদে দাওয়াতে খায়র ইজতিমা সম্পন্ন

ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার তাগিদ

হাটহাজারীর ফতেয়াবাদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দুনিয়া ও আখেরাতের শান্তি লাভের আশায় আল্লাহ তায়ালার দরবারে অশ্রুসিক্ত নয়নে দুই হাত তুলে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আমিন ধ্বনিতে মুখরিত মোনাজাতের মধ্য দিয়ে গতকাল শুক্রবার বাদে এশা দাওয়াতে খায়র ইজতেমা শেষ হয়েছে। মোনাজাতে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, সংহতি, কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি, অগ্রগতি, ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তি এবং বিশুদ্ধ আকিদা চর্চাসহ আমলি জিন্দেগি অর্জনের তৌফিক কামনা করা হয়। আঞ্জুমান রিসার্চ সেন্টারের মহাপরিচালক পবিত্র কোরআনের বাংলা অনুবাদক, লেখক-গবেষক আল্লামা এম এ মান্নানের পরিচালনায় মোনাজাতে জীবনের সব পাপ-তাপ থেকে মুক্তি, আত্মশুদ্ধি ও গুণাহ মাফের জন্য রাব্বুল আলামিনের দরবারে রহমত প্রার্থনা করা হয়।

সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া ইজতেমায় যিকির, কোরআন ও হাদীসের তাফসির, জুমার বয়ান ও নামায আদায়, বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় ইসলামী মাসায়ালা-মাসায়েল হাতে-কলমে শিক্ষাদানসহ নির্ধারিত আটটি বিষয়ের উপর বয়ান করা হয়। জুমার বয়ানে বলা হয় বর্তমানে অবাধ ইন্টারনেট সুবিধা, বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও ধর্মীয় অপব্যাখার কারণে তরুণ প্রজন্ম মাদক, জঙ্গিবাদসহ নানা অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে। বয়ানে, দেশ ও মাজহাব-মিল্লাতের স্বার্থে সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে ।

জীবনগ্রাসী মাদক, জঙ্গিবাদ ও অপসংস্কৃতির কবল থেকে রক্ষায় ইসলামী ভাবাদর্শে উজ্জ্বীবিত করার আহবান জানানো হয়। বয়ানে আরো বলা হয়, বিশুদ্ধ আকিদা চর্চা ও আমলের পবিত্রতা মানুষকে ইনসানে কামেল তথা পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত করে। কোরআন-সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অনুসরণের মাধ্যমে আকিদার বিশুদ্ধতা যেমন নিশ্চিত হয় ঠিক তেমনি মাজহাবের ইমামদের দেখানো পথে বিশ্বাস ও কর্মের মাধ্যমে আমলের পবিত্রতা অর্জিত হয়।

মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিতেই দাওয়াতে খায়র ইজতিমার প্রচলন বলে বয়ানে উল্লেখ করা হয়। দাওয়াতে খায়র ইজতিমায় দেশের শীর্ষস্থানীয় মুয়াল্লিমগণ বর্তমান ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয় রোধে এবং পারিবারিক বন্ধন অটুট রাখতে ব্যক্তিজীবনে খোদাভীতি অর্জন ও ইসলামী অনুশাসন মেনে চলার উপর জোর দেন। তাঁরা বলেন, আল্লাহর ভয় না থাকলে মানুষ যেকোন অন্যায় জুলুম অনাচার করতে পারে।

আজ মাদকের যে ভয়াবহতা এবং জঙ্গিবাদের পেছনে মূলত খোদাভীতি এবং ইসলামের সঠিক আকিদা ও চিন্তাধারার অভাব। তাই ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে সঠিক ইসলামী অনুশীলন জরুরি। বিশেষত তাকওয়া ছাড়া, শুধু লোক দেখানো ধর্মকর্ম পালনকারীরা কখনো কল্যাণকর হতে পারেনা, তাই দরকার ইখলাস ও নিয়তের বিশুদ্ধতাসহ ইসলামের সঠিক অনুশীলন। দাওয়াতে খায়র ইজতিমা পরিচালনা পরিষদের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত ইজতিমার সার্বিক পরিচালনা, জুমার খেতাবত ও আখেরি মোনাজাত করেন আল্লামা এম এ মান্নান।

দাওয়াতে খায়রের কেন্দ্রীয় মুয়াল্লিম মৌলানা ইমরান হোসাইন, ইজতেমা কমিটির সচিব মৌলানা সালামত আলী ও মৌলানা আবদুল মালেকের যৌথ সঞ্চালনায় ইজতেমায় বিশেষ অতিথি ছিলেন আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আলহাজ মোহাম্মদ মহসীন, আলহাজ আনোয়ার হোসেন, আলহাজ মোহাম্মদ সিরাজুল হক, আলহাজ মুহাম্মদ শামসুদ্দীন ও আলহাজ গিয়াস উদ্দিন শাকের। নির্ধারিত বিষয়ে তালিম দেন অধ্যক্ষ মুফতি সৈয়দ অসিয়র রহমান, উপাধ্যক্ষ ড. মুহাম্মদ লিয়াকত আলী, শাইখুল হাদিস আল্লামা সোলায়মান আনসারী, মুফতি মাওলানা আবদুল ওয়াজেদ, মাওলানা কাজী মঈনুদ্দিন আশরাফি, উপাধ্যক্ষ মাওলানা জুলফিকার আলি, উপাধ্যক্ষ মাওলানা আবুল কাসেম ফজলুল হক, অধ্যাপক সৈয়দ জালালুদ্দিন আল আজহারী।

আকাইদের গুরুত্ব নিয়ে ছোবাহানিয়া আলীয়া কামিল মাদরাসার শায়খুল হাদীস আল্লামা কাযী মঈনুদ্দীন আশরাফী বলেন, ঈমান ও আকাইদই হচ্ছে ইসলামী জিন্দেগির মূল বিষয়। কেননা যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর তাওহীদ বা একত্ববাদে বিশ্বাসী নয় এবং নূরে মুজাসসাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়্যাত ও রিসালতের উপর যার ঈমান নেই তার নামায, রোযা, হজ, যাকাত কোনো ইবাদতই গ্রহণযোগ্য নয়। ইবাদত পালন ও কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে বিশুদ্ধ ঈমান ও আকিদা। জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার মুহাদ্দিস আল্লামা সোলাইমান আনসারী হাদীসের তাৎপর্য বর্ণনায় বলেন, ইসলামী জীবন বিধান, তত্ত্ব ও তথ্যগতভাবে দুটি মৌলিক বুনিয়াদের উপর স্থাপিত। একটি পবিত্র কুরআন, অপরটি রাসূলের সুন্নাহ বা হাদীস।

আল্লাহর বাণী আল-কুরআন ইসলামের একটি কাঠামো উপস্থাপন করে আর রাসূলের হাদীস সেই কাঠামোর উপর একটি পূর্ণাঙ্গ ইমারত গড়ে তোলে। তাই ইসলামী জীবন বিধানে পবিত্র কুরআনের পরই রাসূলের হাদীসের স্থান। হাদীসেই ইসলামী জীবন-বিধানের বিস্তৃত রূপরেখার প্রতিফলন ঘটেছে। এ কারণে পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ও মর্ম উপলব্ধি এবং সে অনুযায়ী ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠনের জন্য হাদীসের বিকল্প আর কিছুই হতে পারেনা।

জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার প্রধান ফকীহ মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ বলেন, মুসলমান মাত্রই ইসলামী শরীয়তের সকল বিধি-বিধান পালন করতে হবে। এটা প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ। কোরআন হাদীসের সঠিক মর্ম উদঘাটন করা বা শরীয়তের সকল বিধান বুঝে নেয়া সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। কোরআন হাদীসকে সঠিকভাবে জানার জন্য ইসলামের বিধি-বিধানকে পরিষ্কারভাবে জানার জন্য ইলমে শরীয়ত ও ইলমে তাসাউফে অগাধ পা-িত্যের আধিকারী মুজতাহিদ আলেমের দ্বারস্থ হতে হবে। মুজতাহিদ উলামায়ে কেরামের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ট হচ্ছেন চার মাজহাবের চার ইমাম। অর্থাৎ শরীয়তের বিধানাবলীকে সঠিকভাবে উপলব্দি করার জন্য চার মাজহাবের যেকোন ইমামকে অনুসরণ করতেই হবে। মাযহাব অনুসরণের বিষয়টি কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হওয়ার পরও যারা মাজহাব নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সাধারণ মুসলমানদের ঈমানহারা করতে চান তাদের ব্যাপারে তিনি সতর্কতা অবলম্বনেরও পরামর্শ দেন।

মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা আবুল কাশেম মুহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, নামাজের শুরুতে তাকবিরে তাহরিমার সময় কান পর্যন্ত হাত উঠানো সুন্নাত। তাকবিরে তাহরিমা ব্যতীত নামাযের মধ্যে অন্যসময় রফে’ ইয়াদাইন বা হাত উঠানো কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী। পবিত্রতা অর্জনের গুরুত্ব সম্পর্কে ছোবাহানিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মাওলানা জুলফিকার আলী বলেন, ইসলাম আমাদের যেসব বিষয়ে মৌলিক শিক্ষা দান করেছে তার অন্যতম হলো পবিত্রতা। পবিত্রতা দুই প্রকার। এক প্রকার হলো শারীরিক তথা বাহ্যিক পবিত্রতা। ধুলাবালি, ময়লা-আবর্জনা ইত্যাদি থেকে শরীরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। দ্বিতীয় প্রকার হলো নিজের অন্তরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। অন্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার অর্থ হলো লোভ-লালসা, রিয়া, অহংকার, মিথ্যা, গীবত, ক্রোধ, হিংসা, বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, শত্রুতা ইত্যাদি থেকে নিজের অন্তরকে পরিপূর্ণ পরিষ্কার রাখা। বাহ্যিক ও আত্মিক পবিত্রকরণের ওপর দুনিয়া এবং আখেরাতের সফলতা নির্ভর করে। তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের বাহ্যিক ও আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের তাগিদ দেন।

সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার মাওলানা জালাল উদ্দীন আজহারী বলেন, মুসলমানদের কল্যাণের পথে আহবান করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। ইজতিমায় নিয়মিত বয়ানের পাশাপাশি মুসল্লীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার অধ্যক্ষ মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ অছিয়র রহমান। এছাড়াও মুসল্লিদের অযু-গোসলের সঠিক নিয়ম, মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন-দাফনের নিয়ম শিক্ষা দেন দাওয়াতে খায়র ইজতিমার মুয়াল্লিমগণ। দাওয়াতে খায়র ইজতিমায় লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সাথে আরো অংশগ্রহণ করেন আঞ্জুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট ও গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কমর উদ্দীন সবুর, মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক, আলহাজ এম এ হামিদ, শাহজাদ ইবনে দিদার, মোছাহেব উদ্দীন বখতিয়ার, মাহবুব খান, মাহবুব ইলাহি সিকদার, আবুল মনসুর, তসকির আহমদ, এডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, মাহবুবুল আলম, সাদেক হোসেন পাপ্পু, এটিএম নাসির উদ্দিন, মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, মাওলানা এয়াসিন হায়দারী, ইজতেমা কমিটির আহ্বায়ক হারুন সওদাগর, যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ দেলোয়ার হোসেন, অর্থসচিব মৌলানা সৈয়দ নুরুল আনোয়ার প্রমুখ।

 

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •