জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী: একটি পর্যালোচনা

0

জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী: একটি পর্যালোচনা-
অধ্যাপক কাজী সামশুর রহমান >

১২ই রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী, ২১ নভেম্বর ২০১৮ ইংরেজী অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.) অতীতের সকল রেকর্ড অতিক্রম করেছে। ধারণাতীত নবী প্রেমিকের উপস্থিতিতে দেশে-বিদেশে নবী প্রেমিক মুসলিম মিল্লাতের মনে এক অবিস্মরণীয় উদ্দীপনা সঞ্চারিত হয়েছে। নব দিগন্তের এক যুগান্তকারী ধারা উম্মোচিত হয়েছে। আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় ও আনজুমান ট্রাস্ট’র একমাত্র অংগ সংগঠন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’র ভাইদের নিরলস প্রচেষ্টায় প্রিয়নবী ও আওলাদে রসূল হুযূর ক্বিবলার প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও গভীর ভালোবাসা, জুলুছ-এর গুরুত্ব উপলব্ধি, আত্মোৎসর্গীকৃত মনোভাবের কারণে স্মরণকালের বৃহত্তম জশনে জুলুছ সুশৃংখলভাবে উৎসাহ্ উদ্দীপনার সাথে উদযাপিত হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী জনগণ ও মিডিয়া প্রতিনিধিদের ধারণা অনুযায়ী কম/বেশী ৫০ লক্ষ নবী প্রেমিকদের সমাগম হয়েছে এ জুলুছে। এ এক অভূপূর্ব দৃশ্য এ জুলুছ বিশ্বের বৃহত্তম ও শ্রেষ্ঠতম। গাউসিয়া কমিটির ভাইদের ও ‘আনজুমান সিকিউরিটি ফোর্স’-এর তত্ত্বাবধানে মহানগরীর সড়ক আইল্যান্ড সমূহ, গোলচত্বর সমূহ, উড়াল সেতুর দু’পাশের আলোকসজ্জা নগরীতে এক দৃষ্টি নন্দন আবহ সৃষ্টি করে। মানুষ অবাক বিস্ময়ে এর সাধুবাদ জানিয়েছে, সুকুমার সৌন্দর্যের বাতাবরণ যে দেখেছে সেই আনন্দাপ্লুত হয়েছে। অনুপ্রাণিত হয়েছে, অন্তরের সুকুমার বৃত্তিগুলো নবী প্রেমে উদ্ভাসিত হযেছে। জুলুছের আকার, শৃঙ্খলা ও গভীর আবেদন বিচার করলে জাতিসংঘের ইউনেসকো (টহবংপড় ঐবৎরঃধমব)’র বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত হবার দাবী রাখে নিঃসন্দেহে এবং গিনিসবুকে স্থান পাওয়ার যোগ্য দাবীদার। কতৃপক্ষ এ ব্যাপারে অনুসন্ধ্যিৎসু দৃষ্টি নিয়ে এগোবে আশা করি।
প্রিয় নবীর শুভাগমনের সময় হতে আসমান-জমিন, লৌহ-কলম, ফেরেশতাকুল, মানবকুল কেউ বাদ পড়েনি। জাহেলিয়াতের প্রভাবে এ জুলুছ যা শরীয়ত সম্মত ও সুন্নতি পন্থায় উদযাপিত হওয়া সত্ত্বেও কিছুকাল স্থগিত থাকে। ফিৎনা-ফ্যাসাদের কবলে পড়ে মহাখুশীর এ দিনের সকল বৈধ কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হয়। ইসলাম ধর্মের মূল ধারাবাহিকতা যখনই বিঘিœত বা বাধাগ্রস্থ হয়েছে তখনই কোন না কোন যুগ সংস্কারক জমানার মুজাদ্দিদ মর্দে মুমিন’র আবির্ভাব ঘটেছে যুগে যুগে। আল্লাহ্ জাল্লাশানুহুর মনোনীত দ্বীন ধর্ম ও সরওয়ারে কায়েনাত রাহমাতুল্লিল আলামীন হুযূর মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত ধর্ম ‘ইসলাম’র বিকৃতিকারী ও অবমাননাকারীদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। ইসলাম’র শাশ্বতবাণী ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব পরিবেশ পুনঃ স্থাপিত হয়েছে। মূলধারা হতে বিচ্যূত গোত্র সমূহ পুনঃএকত্রীত হয় ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে। একটা রাজপথের যেমন বহু শাখা রাস্তা আছে, তেমনি ইসলামের মূলধারাকে সজীব রাখা ও বেগবান করার কিছু পন্থা রয়েছে। তবে এসব পন্থাসমূহ হবে শরীয়ত সম্মত এবং কোনভাবেই সাংঘর্ষিক হবে না। মূল ধর্মের ধারাবাহিকতাকে অক্ষুন্ন রাখতে ও মানুষের মনকে আকৃষ্ট করার প্রয়োজনে অনেক লুপ্ত সুন্নত ও নফল ইবাদতের পদ্ধতির পুনরার্বিভাব ঘটানো হয়। যাতে করে মানুষের হৃদয়-মন আল্লাহ্ রাসূলের (দ.) প্রতি উদ্বেলিত হয়ে উঠে। এ সকল যুগান্তকারী সৃষ্টির রূপকার হচ্ছেন জমানার মুজাদ্দিদগণ (সংস্কারক)।
ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি যেমন খতমে ক্বোরআন ও অন্যান্য খতমসমূহ, খানা-পিনার আয়োজন, মিলাদ মাহফিল, আলোচনা অনুষ্ঠান প্রচলিত বিধান। জশনে জুলুছ সম্পর্কে ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক, মুফতি ওলামা মশায়েখ’র অজানা ছিল। এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা প্রচলিত কোন কারণ রিসার্চ এর বিষয় নয়। ওটা সম্পূর্ণ আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার মাধ্যমে লাভ করার বিষয়। আবার সকল আধ্যাত্মিক সাধকের কাছে এর উৎস জানা থাকে না। এটা শুধু জমানার শতাব্দীর মুজাদ্দিদ’র কাজ। ইনিই নুতনভাবে পুরাতন লুপ্ত সুন্নতকে দৃষ্টিগোচর বা দৃশ্যমান করতে পারেন।
বাংলাদেশ’র আলেম- ওলামা- ফকীহ্- মুফতিগণের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ হলেও গত কয়েক শতাব্দী যাবৎ ‘জুলুছ’র ব্যাপারে কোন রকম চিন্তা-চেতনা ছিল অনুপস্থিত।
প্রিয়নবী এবং ওলীবুজর্গগণের প্রতি অশালীন অমার্জনীয় ও অগ্রহণযোগ্য কার্যক্রম’র প্রাদুর্ভাব ঘটলে পঞ্চদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ আওলাদে রাসূল (৩৯ তম) গাউসে জমান হযরতুল আল্লামা আলহাজ্ব হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি’র মন-প্রাণ বেদনা-কাতর হয়ে উঠে। তিনি অনুধাবন করলেন যে, অতীতের গৌরবান্বিত বুদ্ধিদীপ্ত মুসলিম সমাজের বিপরীতে এক শয়তানী পরিবেশ সৃষ্টি হতে চলেছে; এখনিই এর বিরুদ্ধে বিকল্প ¯্রােতধারা সৃষ্টি করতে না পারলে মুসলমান সমাজকে অবশ্যম্ভাবী পতন থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। তাই তিনি কালবিলম্ব না করে ১৯৭৪ সালে আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট কতৃপক্ষকে জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপন করার নির্দেশ দিলেন। শুধু তা নয়, এর রূপরেখা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিও জানিয়ে দিলেন। নির্দেশিত পন্থায় আনজুমান ট্রাস্ট’র সহ-সভাপতি ও দরবারে আলিয়া কাদেরিয়ার খলীফা আলহাজ্ব নূর মুহাম্মদ সওদাগর আলকাদেরীর নেতৃত্বে খানকায়ে কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া (বলুয়ার দিঘীর পাড়) হতে (বর্ণাঢ্যমিছিল) সারিবদ্ধভাবে আনজুমান ও বাংলাদেশের পতাকা হাতে নারায়ে তকবির- আল্লাহু আকবর, নারায়ে রেসালত- ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (দ.), নারায়ে গাউস ইয়া গাউসুল আযম দস্তগীর, শাহেনশাহে ছিরিকোট স্লোগান ও হাম্দ-না’ত পরিবেশন করতে করতে চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। মাহফিলে জশ্নে জুলুছের গুরুত্ব, প্রিয়নবীর শান-মান, একজন মানুষের প্রয়োজনীয় সবকিছুরই নির্দেশনা পাওয়া গেছে রাহমাতুল্লিল আলামীনের মাধ্যমেই। আলেম ওলামা বিভিন্ন শ্রেণি পেশাজীবিদের সারগর্ভ আলোচনা শেষে মিলাদ-কিয়াম ও দো’আ-মুনাজাতের মাধ্যমে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘটে।
১৯৭৪ সালের ছোট্ট পরিসরের কলেবর বৃদ্ধি হতে হতে এখন মহাসাগরের বিস্তৃতি ঘটেছে। লক্ষ লক্ষ আবাল-বৃদ্ধ-শিশু-কিশোরদের দৃপ্ত মিছিলে হাম্দ-না’ত’র গগন বিদারি আওয়াজ আল্লাহ্-রাসূলের (দ.) প্রেমে বিভোর হয়ে মাইলের পর মাইল পথ পরিক্রম করছে। নেই কোন ক্লান্তি, অবসাদ, ক্লেশ। নেই বিরুদ্ধ আচরণ, সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে নেতৃত্বদানকারী হুযূর ক্বিবলা আওলাদে রাসূলের (দ.) পশ্চাতে দ্রুতলয়ে।
নিজ অর্থব্যয়ে, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দূরদূরান্ত থেকে বিভিন্ন যানবাহনে করে ষোলশহর আলমগীর খানকায়ে কাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়ায় এসে নবীপ্রেমিক আল্লাহ্র বান্দাগণ হাজির হন ফজরের নামাযান্তে। লক্ষ লক্ষ লোকের অবস্থান এখানকার ধারণ ক্ষমতার বহুগুণ বেশী হবার কারণে সমগ্র নগরব্যাপী মিছিলকারীরা বিভিন্ন স্থানে ও পথের ধারে হুযূর ক্বিবলার গাড়ির অপেক্ষায় থাকেন।
এতো উৎসাহ উদ্দীপনা বর্ণিল সাজে সজ্জিত কাপড়-চোপড় পরিধান করে ১২ রবিউল আউয়াল’র জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপনের জন্য যে ব্যাকুলতা মানুষের মাঝে দেখা যায় তা যেমন অচিন্তনীয়, তেমনি অবিস্মরণীয়।
সে দিন মানুষের মধ্যে জজবা ও ঐকতানের সকল শাখা প্রশাখা যেন করুনা সিঞ্চিত হয়ে রাহমাতুল্লিল আলামীনের কুল-কিনারাবিহীন মহাসাগরে গিয়ে একই ¯্রােতধারায় মিলিত হয়। এক অনির্বচনীয় আনন্দে মতোয়ারা হয়ে যান নবীপ্রেমিক পথিককুল। নেই কোন ভেদাভেদ, নেই কোন বৈষম্য, পরহিংসা বা পরশ্রীকাতরতা, সকলেরই লক্ষ্য ও গন্তব্য মুর্শিদের সন্তুষ্টির (অনুসরণ-অনুকরণের) মাধ্যমে আল্লাহ্-রাসূলের রেজামন্দি হাসিল এবং পার্থিব কোন লোভ মোহ্ এখানে বিভ্রান্তি ঘটাতে পারে না।
নবীপ্রেমে উজ্জীবিত উদ্বেলিত, উচ্ছ্বসিত সুশৃঙ্খল বিনয়ী মানুষগুলোর মধ্যে যে ইসলামী মূল্যবোধের জাগরণ ঘটে তা যদি ভবিষ্যতেও সুদৃঢ় থাকে সে লক্ষ্যে এখন হতে আমাদের কাজ করতে হবে। একদিনের অনাবিল আনন্দ, সুখস্মৃতি উদ্যম উৎসাহকে সামনে রেখে এর একটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিন্যাস প্রয়োজন। সারা বছর ব্যাপী এর আবেদন যেন আমাদের নিকট হতে হারিয়ে না যায় সেদিকে দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। গাউসে জমান আওলাদে রসূল হযরতুল আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহ্ িআলায়হি জমানার মুজাদ্দিদ যেহেতু, জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.) প্রবর্তক বাস্তবায়নকারী সেহেতু এর কলেবর জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেতে থাকবে। কেননা এই কর্মসূচি রাহমাতুিল্লল আলামীনের রূহানীভাবে অনুমোদিত ও সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার মহান মুর্শিদগণের নেগাহে করমে পুষ্ঠ এবং আওলাদে রসূলের নেতৃত্বে চলমান বিধায় এর কোন স্থিতাবস্থা হতে পারে না। দ্রুতগতিতে ক্রমবর্ধমান হারে এর পরিধির বিস্তৃতি ঘটবে আমরা চাই বা না চাই, ইনশাআল্লাহ্।
আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট ও গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ-এর ওপর এক মহান ও গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে মুর্শিদ ক্বিবলার পক্ষ হতে। এ গুরুদায়িত্ব পালনে শিথিলতা, কার্পণ্যতা প্রদর্শন বা বিশ্রাম নেয়ার কোন সুযোগ নেই। কেননা এর নেতৃত্বে আওলাদে রাসূল (দ.)’র সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতা সহকারে মুর্শিদের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে এগিয়ে গেলে সুন্নী জনতার জয় সুনিশ্চিত, এর অন্যথা বা ব্যত্যয় ঘটলে পরিণতি জাহান্নাম, একথা সকলেরই মনে রাখা উচিত।
এদিনের ভ্রাতৃত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ¯েœহ মমতা পূর্ণ সম্ভাষণ, পরমত সহিষ্ণুতা ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকেই মোরা পরের তরে’ নবীপ্রেমের যাত্রী মোরা পরস্পরের মধ্যে ঘটাবোনা বিচ্ছেদ, এই যদি হয় মোদের প্রতীজ্ঞা তাহলেই আমরা সফলকাম। ১৯৭৬-১৯৮৬ পর্যন্ত হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি এবং ১৯৮৭ সাল হতে গাউসে জমান আওলাদে রসূল (দ.) আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের (মু.জি.আ.)-এর ছদারত করে আসছেন। হুযূরের অসুস্থতার কারণে এবার শাহ্জাদা সৈয়্যদ মুহাম্মদ হামেদ শাহ্ (মু.জি.আ.) ২০১৮ সালে ছদারত করেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আধ্যাত্মিকভাবে ১০/১২ কিলোমিটার দীর্ঘ জুলুছ নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত হয় বিধায় কোন রকমের প্রতিকুলতা ব্যতীত নির্বিঘেœ সম্পন্ন হয়।
জুলুছ দেখে মনে হয় লক্ষ লক্ষ ফিরিশতা জুলুছ করতে মর্ত্যে নেমে এসেছেন। ¯িœগ্ধ সুরভিত পরিবেশে এক নৈসর্গিক আবহ বিরাজ করে, ঐক্য সংহতি, ভ্রাতৃত্ব বোধের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। উৎসবমুখর পরিবেশ, সুশৃঙ্খল পদচারণা, স্লোগানের ঐকতান সব কিছু প্রত্যক্ষ করে এ আস্থার উদ্ভব হয় যে, কোন অদৃশ্য সুতোর টানে সবকিছু নিয়ম মাফিক চলমান। এ প্রসঙ্গে জশনে জুলুছের উদ্ভাবক ও প্রবর্তক আওলাদে রাসূল গাউসে জমান সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ১৯৮৫ সালের জুলুছে চকবাজার ওয়ালী বেগ খাঁ মসজিদ সংলগ্ন গোল চত্বরে মরহুম অধ্যক্ষ আল্লামা মুহাম্মদ জালাল উদ্দীন আলকাদেরী ছাহেবকে ডেকে বলেন, মাওলানা ছাহেব ইয়ে সাচ্ছ বাত হ্যায়, ইয়ে জুলুছমে তামাম মাশায়েখ হযরাত হাজির হ্যায়, ¯্রফে ইয়ে নেহী বলকে খোদ রসূল করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মওজুদ হোঁ। জিস রাস্তা হোকে ইয়ে জুলুছ চলতা রাহা, ও রাস্তা ভী ফের জুলুছ দেখনে কি লিয়ে ইন্তেজার করতা হ্যাঁ, কব ইয়ে জুলুছ ফের আয়েগা। সুবহানাল্লাহ্!
ঈদ-এ মিলাদুন্নবী বহু মুসলিম দেশে সরকারিভাবে উদ্যাপিত হয়, জুলুছও বের হয় অনেক দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে। কিন্তু চট্টগ্রাম (বাংলাদেশÑ)’র জশনে জুলুছ যেমন ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী, তেমনি অভূপূর্ব ও বিস্ময়কর। বাংলাদেশসহ বিশ্ব মুসলিমদের জন্য এ জুলুছ ঐক্য ও সংহতির প্রতীক হিসেবে গণ্য করা যায়। এই একটা ইস্যুকে (জুলুছ) সামনে রেখে যার যার অবস্থান থেকে যদি মুসলিম বিশ্ব এগিয়ে আসে তাহলে মুসলমানদের দুর্দিন কেটে যাবে; সূর্যোদয়ের সোনালী কিরণ আবার আমাদের করায়ত্ম হবে। প্রিয় হাবীব রাহমাতুল্লিল আলামীনের সাহায্য আমাদের জন্য অবধারিত যদি না আমরা নবী বিদ্বেষী হই। আল্লাহ্ আমাদের হেদায়েত করুন। নবী পাকের পবিত্র কদমে পাক রইলো আমাদের কোটি কোটিগুণ অগুনিত সালাম। আস্সালাতু আস্সালামু আলায়কা ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আস্সালাতু আস্সালামু আলায়কা ইয়া হাবীবাল্লাহ্, আস্সালাতু আস্সালামু আলায়কা ইয়া রাহমাতুল্লিল আলামীন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহ স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশশন, সিডিএ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ সকল স্তরের সহযোগীতার জন্য সকলকে আনজুমান ট্রাস্ট’র পক্ষ থেকে আন্তরিক অভিনন্দন ও মোবারকবাদ জানাচ্ছি। স্কুল, কলেজে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.) উদযাপন করা বাধ্যতামূলক ঘোষণা করায় বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ ও মোবারক জানাই।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিকট আমাদের আবেদন আগামী ১২ রবিউল আউয়াল (২০১৯ সাল) তারিখে অনেক মুসলিম দেশের মত বাংলাদেশেও রাষ্ট্রীয়ভাবে জশনে জুলুছ ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.) উদ্যাপন করা হোক। আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সকলের খেদমতকে কবুল করুন, নাজাতের উসিলা করুন- আ-মী-ন।
জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.)’র বৈশিষ্ট্য সমূহ
১. সকল সৃষ্টির প্রাণ, আল্লাহ্ জাল্লাশানুহুর জাতি নূর হতে সৃষ্ট নূরে মুহাম্মদীর আধার, বিশ্ব মানবতার মুক্তিদূত, ¯্রষ্টার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশংসাকারী, ইমামুল আম্বিয়া আখেরী নবী; সমগ্র সৃষ্টিজগতের রহমত এবং জীবন-জীবিকা, ব্যক্তি, পরিবার/সংসার, সমাজ, রাষ্ট্র, যুদ্ধ, সন্ধি, বিচার ব্যবস্থাসহ মানব সমাজের প্রয়োজনীয় সকল বিষয়ের পথ নির্দেশক (আল্লাহর নির্দেশিত পথে), আক্বা মাওলা তাজেদারে মদীনা হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শুভ বেলাদত শরীফকে উপলক্ষ করে এ জুলুছ প্রবর্তন করা হয়েছে।
২. একজন আওলাদে রসূল (৩৯তম) জমানার মুজাদ্দিদ গাউসে জমান রাহনুমায়ে শরীয়ত ও তরীক্বত হাদিয়ে দ্বীনোমিল্লাত মুর্শিদে বরহক সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার মাশায়েখ হযরতুল আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হি-এর প্রবর্তক (১৯৭৪ সালে প্রবর্তিত)।
৩. ১২ রবিউল আউয়াল (৯ রবিউল আউয়াল ঢাকায়) চট্টগ্রামে জশনে জুলুছে ঈদ-এ মিলাদুন্নবী (দ.)এর কার্যক্রম শুরু হয়; এবং এ জুলুছের নেতৃত্ব দেন সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়ার মাশায়েখ হযরাত আওলাদে রাসূল গাউসে জমান হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ (মু.জি.আ.); (১৯৮৭ সাল হতে)।
৪. জুলুছে অংশগ্রহণকারীরা নবসাজে সজ্জিত হয়ে ঈদের আমেজ নিয়ে নিজ ব্যয়ে স্ব-ইচ্ছায় স্বত:স্ফূর্তভাবে অংশ গ্রহণ করেন;
৫. জুলুছ অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া শুরু হয় অন্যূন ৩/৪ মাস পূর্ব হতে; দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রায় প্রতিটি জেলা উপজেলা ইউনিয়ন পর্যায়ে ১২ রবিউল আউয়ালের পূর্বে (০১-১২ রবিউল আউয়াল) স্থানীয় গাউসিয়া কমিটি স্বউদ্যোগে জুলুছ বের করে;
৬. লক্ষ লক্ষ আলেমে দ্বীন, মাশায়েখ, হাফেজ, মুফতি, মুহাদ্দিস এ জুলুছে অংশগ্রহণ করেন বিধায় এর যৌক্তিকতা গ্রহণযোগ্যতা ও ইসলামী ঐক্যের সুদূর বন্ধন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।
৭. জুলুছের প্রবর্তনের সময় অনেক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, দরবার এর বিরোধীতা করে এবং ব্যঙ্গ করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর যৌক্তিকতা গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে গেলে বিরুদ্ধবাদীরা ক্রমশঃ জশনে জুলুছের ধারাবাহিকতায় নিজেরা বিলীন হয়ে যায়, এর দ্বারা জামানার মুজাদ্দিদ গাউসে জমান আওলাদে রসূল সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির গৃহীত পদক্ষেপ যথাযথ শরীয়ত সম্মত ও নবীপ্রেমিকের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সত্য প্রমাণিত হয়।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •