হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা

0

হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান
একটি তাত্ত্বিক পর্যালোচনা –

ড. মুহাম্মদ খলিলুর রহমান >

উপস্থাপনা
পরীক্ষা নিরীক্ষা, যাচাই-বাছাই, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা পদ্ধতিতে কোনো বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে লব্দ সুশৃংখল ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জ্ঞান এবং এ জ্ঞানের বাস্তবতার নাম বিজ্ঞান। বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। জলে-স্থলে, অন্তরীক্ষে, আকাশে-বাতাসে বিজ্ঞানের জয়-জয়কার রব। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা পথে নব নব সংযোজনের ফলে বিজ্ঞান আরো সজীব, সতেজ হয়ে উঠছে। এগিয়ে যাচ্ছে দূর্বার গতিতে, হয়ে উঠেছে সুদূর প্রয়াসী। সৃষ্ট বস্তুর কার্যকারিতা জীবন্ত ও বাস্তব রূপ ধারণ করে ভেসে উঠছে জগদ্বাসীর সামনে। বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্দ বিষয়বস্তু আলোচনা করলে দেখা যায়, তারা যে বস্তুটি নিয়ে গবেষণা করে সারা বিশ্বকে ঋণী করেছেন, সেটা হল আল্লাহ্ প্রদত্ত; যেটাকে তারা প্রকৃতি প্রদত্ত বলে দাম্ভিকতার সাথে বলে বেড়ায়। উপরন্তু, বস্তুর মৌলিক উপাদান, কার্যকারীতা, পারিপার্শ্বিকতা, তত্ত্ব ও তথ্য ইত্যাদি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকের চুল-ছেড়া বিশ্লেষণ, গবেষণা, চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে বস্তুর গোপন ও অন্তর্নিহিত কার্যকারিতাকে উপস্থাপন করতে সফল হলেই বিজ্ঞানী নামে আখ্যায়িত করা হয়। পাশাপাশি ক্বোরআন-সুন্নাহ্র আলোকে অভূতপূর্ব বিজ্ঞান সাধনাই হচ্ছে এই চমকপ্রদ, অনন্যসাধারণ সাফল্যের একমাত্র কারণ। তাই পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীরা আজ বলতে বাধ্য ‘‘অষ ছঁৎ’ধহ রং ঃযব ংড়ঁৎপব ড়ভ ধষষ ংপরবহপব’’ বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক গধঁৎরপপ ইঁপরধষষব নিঃসঙ্কোচে স্বীকার করেছেন যে, ক্বোরআন শরীফে এমন একটিও তথ্য নেই যা বিজ্ঞান-বিরুদ্ধ। তার ভাষায়- ঞযব ছঁৎ’ধহ ফড়বংহড়ঃ পড়হঃধরহ ধ ংরহমষব ংপরবহঃরভরপ ংঃধঃবসবহঃ ঃযধঃ রং রহধপপঁৎধঃব.
প্রসঙ্গত বলতে হয়, যে জাতি ক্বোরআন বিশ্বাস করে দৃঢ়ভাবে, যে জাতি রসূলের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে তার পথপরিক্রমা নির্দ্ধারণ করে, সে জাতিতে এহেন সাফল্যে বিস্ময় বা সন্দেহের কোন অবকাশ থাকতে পারে না। কারণ পবিত্র আল ক্বোরআন হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ, বিজ্ঞান সমৃদ্ধ গ্রন্থ যার রচয়িতা হচ্ছেন- সর্বজ্ঞানের আধার মহান আহকামুল হাকিমীন। আর যার উপর এ গ্রন্থটি অবতীর্ণ হয় তিনি হচ্ছেন- পৃথিবীর সর্বকালের সর্ব যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। মানব সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সকল জ্ঞানই তাঁকে দেয়া হয়েছে। তাই স্বাস্থ্য বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কীয় তার পবিত্র অনন্য বাণী, পরামর্শ দিক নির্দেশনা ও কর্ম-কৌশলগুলো স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের একটা অতুলনীয় রতœভান্ডার হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকবে।

আল্ ক্বোরআন ও চিকিৎসা বিজ্ঞান
ইতোপূর্বে বলা হয়েছে মহাগ্রন্থ আল ক্বোরআন হল- জ্ঞান-বিজ্ঞানের অন্যতম আধার। বিজ্ঞানের তথ্যানুসারে মহিমান্বিত আল ক্বোরআনের আয়াত সমূহের মধ্যে প্রায় ৭০০টি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও তথ্য সমৃদ্ধ।
জার্মান পন্ডিত উৎ. কধৎষ ঙঢ়রঃুম-এর গবেষণা মতে আল ক্বোরআনের ১১৪টি সুরার মধ্যে ৯৭টি সূরার মোট ৩৫৫টি আয়াতে স্বাস্থ্য তথা চিকিৎসা বিজ্ঞান সমৃদ্ধ তথ্য রয়েছে। তিনি তার বিখ্যাত উরব গবফরংরহ রহ কড়ৎধহ গ্রন্থে এ সকল আয়াতের বিবৃত চিকিৎসা বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও সূত্র সম্বন্ধে বিশদভাবে আলোকপাত করেছেন। তার মতে আল ক্বোরআনের চিকিৎসা সম্বন্ধনীয় অনুজ্ঞানকে তিনভাগে ভাগ করা যায়।

১. চিকিৎসা (গবফরংরহ): এর মধ্যে আছে-
ক. জীব রহস্য তথা ভ্রুণ, গর্ভধারণ, গর্ভাবস্থা, শিশু পরিচর্যা, শৈশবাবস্থা, আয়ূষ্কাল ইত্যাদির আলোচনা-পর্যালোচনা।
খ. শরীর বিজ্ঞান বা অঙ্গব্যবচ্ছেদ বিদ্যা (অহধঃড়সু). শরীর বৃত্ত (চযুংরড়ষড়মু)।
গ. নিদান শাস্ত্র বা ব্যাধি নির্ণয়কারী শাস্ত্র (চধঃযড়ষড়মু), রোগের কারণ তত্ত্ব (ঊঃরড়ষড়মু), মনোবিদ্যা (চংুপযড়ষড়মু), মনোরোগ-নিদান শাস্ত্র (চংুপযড়-চধঃযড়ষড়মু)।
ঘ. সাধারণ চিকিৎসা ও বিশেষ চিকিৎসা।
ঙ. মৃত্যু ও পুনর্জীবন।
২. স্বাস্থ্যবিদ্যা (ঐুমরবহব): এর মধ্যে আছে
ক. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি তথা পোষাক, বিশ্রাম, পুষ্টি, পানীয়, শরীরের যতœ ইত্যাদি।
খ. সমাজগত স্বাস্থ্যবিধি তথা ঘরবাড়ী, পরিবেশ ও সংক্রামক ব্যাধি।
গ. আকস্মিক দুর্ঘটনা: মহাদুর্ঘটনা, মহামারী।
৩. স্বাস্থ্যবিধান : (এবংধহফযবরঃংমবংবঃুব)-এর মধ্যে রয়েছে
ক. শারীরিক পুষ্টিবিধান, মদ, মাংস ইত্যাদি।
খ. যৌনবিধান তথা সুষ্ঠ ও অসুষ্ঠ যৌনক্রিয়া।
গ. আনুষ্ঠানিক বিধিবিধান তথা ত্বকচ্ছেদ, রোযা-সংযম, উযু, গোসল, পীড়া, ক্লান্তি ও বিনোদন ইত্যাদি।
ঘ. সামাজিক বিধিবিধান তথা হত্যা, প্রতিশোধ, অভিভাকত্ব।
উক্ত ক্বোরআনুল কারীমের বিভিন্ন সূরার ১০৫টি আয়াতে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে। আয়াত সমূহে চিকিৎসা বিজ্ঞানের যে সমস্ত বিষয়ে প্রধানত: আলাকপাত করা হয়েছে তা হল-
ক. জন্মরহস্য, খ. স্বাস্থ্যবিধি, গ. রোগ-ব্যাধি, ঘ. রোগ-ব্যাধির কারণ, ঙ. ঔষধ ও প্রতিষেধক, চ. শল্য বিদ্যা, ছ. মৃত্যু ও পুনর্জীবন।

হাদীসশাস্ত্র ও চিকিৎসা বিজ্ঞান
আল্ ক্বোরআনের পাশাপাশি হাদীস শাস্ত্রে ও রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসাধারণ বাণী রেখে গিয়েছেন যা বুদ্ধিমান সম্প্রদায়কে মৌলিক গবেষণার দিকনির্দেশনা দান করে, যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তী বংশধর তাদের গবেষণা দূর্বার গতিতে বেগবান করতে পারে। এর মধ্যে চিকিৎসা বিজ্ঞান একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আমাদের প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম শারীরিক রোগ-ব্যাধি, স্বাস্থ্য ও তার চিকিৎসা এবং প্রতিষেধক সম্বন্ধে যে সকল অমূল্য বাণী ও বাস্তব কর্মপদ্ধতি রেখে গিয়েছেন পরবর্তী মুহাদ্দিস বা হাদীস গবেষকগণ কিতাবুততিব্ব (كتاب الطب) বা চিকিৎসা বিদ্যা অধ্যায় শিরোনামের অধীনে হাদীস গ্রন্থে সংকলিত করেছেন। এ অধ্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সংকলিত হাদীস সমূহকে একত্র করলে তার সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় চারশতাধিক। আল্লামা ইবনুল কায়্যিম তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘‘যাদুল মা’আদ ফী হাদয়ি খাইরিল ইবাদ’’ গ্রন্থে উপরোক্ত অধ্যায়ে প্রায় ৩০০ হাদীস উল্লেখ করেছেন। সাম্প্রতিককালে এ ‘তিব্বে নবভী’ তথা নবীজির চিকিৎসা পদ্ধতির উপর বেশ কয়েকটি কিতাব সংকলিত হয়েছে। এ সমস্ত গ্রন্থে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট হাদীস সমূহকে যথাযথ বিশ্লেষণ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে রাসূল করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর অতুলনীয় প্রজ্ঞা ও নিয়ম-দর্শন প্রমাণ করা হয়েছে।

সুস্বাস্থ্য সম্পর্কে রাসূল (দ.)-এর দিক নির্দেশনা
মূলত: স্বাস্থ্য দয়াময় আল্লাহ্ পাকের দেয়া একটি বিশেষ ও বিশাল নি’মাত। আল্লাহর দেয়া এ নি’মাতের কৃতজ্ঞতা পোষণ করা প্রতিটি মানুষের অপরিহার্য কর্তব্য। আল্লাহ্ পাকের বিধান হল এই যে, কোন নি’মাতের প্রতি অমর্যাদা ও অবজ্ঞা প্রদর্শন শুধু এ নি’মাত ছিনিয়ে নেয়ারই কারণ হয় না, বরং নি’মাতের অকৃতজ্ঞতাও অস্বীকার আল্লাহ্র গজব ও শাস্তি নিজ হাতে ডেকে আনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন আল্লাহ্ পাক বলেন-
لَئِنْ شَكَرْتُمْ لازِيْدَنَّكُمْ وَلئِنْ كَفَرْتُمْ اِنَّ عَذَابِىْ لَشَدِيْد-
‘‘তোমরা যদি আমার নি’মাতের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর আমি তা অবশ্যই বৃদ্ধি করব আর যদি তার নাফরমানি কর নিশ্চয় আমার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর। সুতরাং স্বীয় স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ্য রাখা এবং স্বাস্থ্য রক্ষার মৌলিক নীতিমালা সমূহ মেনে চলা প্রতিটি মুসলমানের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। স্বাস্থ্য যে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ নি’মাত এ ব্যাপারে নবীজির ভাষ্য হচ্ছে-
الصحة والفراغ نعمتان من نعم الله عزوجل مغبون فيها كثير من الناس-
‘‘স্বাস্থ্য স্বাচ্ছন্দ্য মহান রাব্বুল আলামীনের নি’মাত সমুহের মধ্যে দু’টি বিশেষ নি’মাত। অধিকাংশ লোক এ দুটো নি’মাতের ব্যাপারে ক্ষতি এ ধোঁকায় পতিত হয়েছে।
সহীহ বোখারীর রেওয়ায়েত হল-
نعمتان مغبون فيهما كثير من الناس الصحة والفراغ-
‘‘দু’টো নি’মাত রয়েছে যা সম্পর্কে অধিকাংশ লোক ধোঁকাগ্রস্থ হয়েছে। একটি স্বাস্থ্য অন্যটি স্বচ্ছলতা।
নবীজি (দ.) অন্যত্র বলেন-
أن الناس لم يعطون شيئا افضل من العفو والعافية-
‘‘নিশ্চয় মানুষকে স্বাস্থ্য ও সুস্থতার চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন নি’মাত দান করা হয়নি।’’
উপরোক্ত হাদীসগুলোর আলোকে বুঝা যায় স্বাস্থ্য আল্লাহ্ পাকের শ্রেষ্ঠ নি’মাত হওয়ায় নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বাস্থ্য, সুস্থতা, স্বাস্থ্যের সহায়ক ও উপকারী বস্তুনিচয় এবং যে সকল বিষয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছেন তা স্বাস্থ্য অটুট রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরী।

সুস্বাস্থ্যের জন্য আল্লাহর কাছে দো’আ প্রার্থনা
সুস্বাস্থ্যের জন্য স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যেমনি আল্লাহ্র কাছে দো’আ প্রার্থনা করতেন তেমনি সাহাবীদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহ্ উদ্দীপনা যোগাতেন। তিনি দো’আ করতেন এভাবে-
اللهم انى اسئلك العافية فى الدنيا والاخرَة-
‘‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের সুস্থতা ও কল্যাণ কামনা করছি।’’ আরো একটি দো’আ হল-
اللهم انى اسئلك صحة فى ايمان وايمانا فى حسن خلق ونجاحا يتبعه فلاحا ورحمة منك وعافية وَمَغْفِرَةً مِنْكَ وَرِضْوانا-
‘‘হে আল্লাহ্! আমি আপনার নিকট ঈমানের সাথে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা প্রার্থনা করি এবং মুক্তি প্রার্থনা করি যদ্দরুন কামিয়াবী ও সফলতা অর্জিত হয়। আপনার রহমত প্রার্থনা করি এবং আপনার নিকট স্বাস্থ্য, সুস্থ্যতা, শান্তি, নিরাপত্তা, ক্ষমা ও সন্তুষ্টি প্রার্থনা করি।’’ অন্যত্র আছে, একদা এক বদরী সাহাবী (বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী) রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ নামাযান্তে কিসের দো’আ করব? রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন-
سَلِ الله العَافِيَةَ-
‘‘আল্লাহর নিকট স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য প্রার্থনা কর।
سَلِ الله العَافِيَةَ فِى الدُّنْيَا والاخِرَةِ-
‘‘তুমি আল্লাহর কাছে পার্থিব ও পরকালীন শান্তি, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সুস্থতার জন্য দো’আ কর।’’
يا عَبَّاسُ يَا عَمّ رَسُوْلِ اللهِ سَلِ اللهَ العَافِيَةِ فِى الدُنْيَا وَالاَخِرَةِ-
‘‘হে আব্বাস! হে আল্লাহর রাসূলের চাচা, আপনি আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও সুস্থতা প্রার্থনা করুন।’’
উপরোক্ত হাদীসগুলোর আলোকে বলা যায় আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বাস্থ্য সম্পর্কে কতই না সচেতন ছিলেন।

রোগ-ব্যাধি সম্পর্কে নবীজির দৃষ্টিভঙ্গি
পরীক্ষা মূলত: বান্দাহর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ (চধৎঃ ধহফ ঢ়ধৎপবষ)। সর্বপ্রকার উন্নতি ও সমৃদ্ধির জন্যই মানুষকে বিশেষ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। কোন সফলতাই পরীক্ষা ছাড়া অর্জিত হয় না। এ দৃষ্টিতে আমরা বলতে পারি, রোগ-ব্যাধি আল্লাহ্ পাকের আযাব নয়, বরং তাঁর রহমত ও করুণা প্রাপ্তির ওসীলা বা মাধ্যম এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি-সমৃদ্ধির একটি বিশেষ উপায় বা পরীক্ষা। যেমন আল্ ক্বোরআনের ভাষ্য হচ্ছে-
ولنبلونكم بشئ من الخوف والجوع ونقص من الاموال والانفس والثمرات وبشر الصابرين-
‘‘আমি তোমাদের ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন (স্বাস্থ্য) ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা অবশ্যই পরীক্ষা করব। তুমি শুভ সংবাদ দাও ধৈর্যশীলগণকে।’’ নবীজি বলেন-
من يريد الله خيرا يصب منه-
‘‘আল্লাহ্ যাকে কল্যাণ দান করতে চান, তাকে বিপদে বা পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেন।’’
সাধারণ মানুষের ধারণা রোগ-বালাই গুনাহর কারণে হয়। তা আদৌ সঠিক নয়, বরং রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রোগ দর্শনের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রোগ-ব্যাধি গুনাহের কারণে নয়; বরং গুনাহের কাফ্ফারা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
لاتسبها فانها تنفى الذنوب كما تنفى النار خبث الحديد-
‘‘তোমরা জ্বরকে গালি দিওনা, কেননা তা গুনাহকে এমনভাবে মুছে দেয়, যেভাবে আগুন লোহার ঘরিচা পরিষ্কার করে দেয়।
অন্যত্র বর্ণিত আছে-
عن يحيى بن سعيد ان رجلا جاء الموت فى زمان رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال رجل هنياله- مات ولم يبتل بمرض فقال رسول الله ما ويحك ومايدريك لو ان الله ابتلا بمرض يكفربه من سيئاته-
‘‘ইয়াহযা বিন সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এক ব্যক্তি মারা গেল, তখন অপর এক ব্যক্তি বলল, বাহ! কী চমৎকার মৃত্যু বরণ করল! কোন রকম রোগে আক্রান্তও হল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন- তুমি তা কি বলছ? তুমি কি জান আল্লাহ্ পাক যদি তাকে কোন রোগে আক্রান্ত করতেন, তবে তার গুনাহর কাফ্ফারা হয়ে যেত।
ما من امرء مومن ولامؤمنة يمرض الاجعله الله كفارة لما مضى-
‘‘মুমিন পুরুষ কিংবা নারী মাত্রই কোন রোগাক্রান্ত হলে আল্লাহ্ উক্ত রোগীকে তার পূর্বের গোনাহ্ মাফের একটি ওসীলা বানিয়ে দেন।’’
মূলকথা রোগ ব্যাধি মানুষের মধ্যে অনুতাপ, কোমলতা, বিনয়, বশ্যতা, আল্লাহ্ ভীতি এবং পরকালের স্মরণকে তেজোদীপ্ত করে। এতে ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার মানসিকতা সৃজন হয়। রোগাক্রান্ত ব্যক্তি রোগের কারণে আল্লাহ্র প্রতি আরো বেশি নিবিষ্ট হয়। এভাবে সে দো’আ কবুলের সোপান অর্জন করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তুমি যখন কোন রোগীর নিকট যাও, তখন তাকে তোমার জন্য দো’আ করতে বল, কেননা, তার দো’আ ফেরেশতাদের দো’আতুল্য।’’ যেমন হাদীসটি হচ্ছে-
اذا دخلت على مريض فمره ان يدعوا لك فاذا دعاه كدعاء الملائكة-
‘‘বাস্তব জীবনে নবীজি রোগীর প্রতি ছিলেন দরদবিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি পীড়িত ও অসুস্থ মানুষের সেবা-শুশ্রƒষা করাকে মানুষের প্রতি মানুষের কর্তব্য ও মানবাধিকার বলে ঘোষণা করেছেন।
রোগের প্রতিকার ও চিকিৎসা সম্পর্কে রাসূল (দ.)’র বাস্তব পদেক্ষপ
রোগ-ব্যাধিতে তার প্রতিকার ব্যবস্থা, সুষ্ঠ চিকিৎসার ব্যবস্থা, দক্ষ-প্রাজ্ঞ-অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ ও ব্যবস্থাপত্র যথাযথ অনুসরণ করা- সবই রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত হিসেবে পরিগণিত। তা মূলত: তাওয়াক্কুলের পিবরীত নয়। হাফেজ ইবনুল কায়্যিম হতে বর্ণিত, ‘‘একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম লোকদের বলেন, ডাক্তার ডেকে আন। একথা শ্রবণ করা মাত্রই উপস্থিত জনগণ বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আপনিও কি একথা বলেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ মহান আল্লাহ্ এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি, যার ঔষধ পাঠাননি।’’ যেমন হাদীসটি হচ্ছে-
قال لكل داء دواء فاذا أصيب دواء الداء برأ باذن الله عزوجل-
‘‘তাই বলা যায় কোন রোগই দূরারোগ্য নয়। প্রত্যেক রোগেরই ঔষধ রয়েছে।’’ হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেছেন-
ما انزل الله من داء الا انزل له شفاء-
‘‘আল্লাহ্ তা‘আলা এমন কোন রোগ সৃষ্টি করেননি, যার প্রতিষেধক তিনি পাঠাননি।’’
তবে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য পূর্বশর্ত হর আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি দক্ষ-অভিজ্ঞ ডাক্তারের চিকিৎসা নেয়া। কোন হাতুড়ে ডাক্তার কর্তৃক চিকিৎসা সেবা একেবারেই বাঞ্চনীয় নয়, কারণ হাতুড়ে ও অনভিজ্ঞ ডাক্তার অধিকাংশ সময় রোগীকে এমন সব ঔষধ দিয়ে থাকে, যা কোন একটি রোগকে দূর করে কিন্তু সাথে সাথে অন্য কোন মারাত্মক রোগের সৃষ্টি করে। হাদীসে আছে-
دع الدواء ما احتمل جسدك الداء-
‘‘ঐ সকল ঔষধ বর্জন কর যা দ্বারা সুস্থ শরীর অসুস্থ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’’ তাই অদক্ষ চিকিৎসক দিয়ে কোন ক্রমেই চিকিৎসা সেবা নেয়া যাবে না। এবং যার যথাযথ চিকিৎসা সম্পর্কীয় জ্ঞান নেই তাকেও চিকিৎসা সেবা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
من طبب ولم يعلم منه الطب قبل ذالك فهو ضامن-
‘‘যদি এমন কোন ব্যক্তি চিকিৎসা করে যার চিকিৎসা বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, এমতাবস্থায় (যদি রোগীর ক্ষতি হয়) রোগীর সমস্ত দায়দায়িত্ব- উক্ত চিকিৎসকের উপর বর্তাবে।’’
রোগীর প্রতি মানসিক যতœ, সদাচরণ ও রোগীর দেখার আদব-কায়দা
এমন দক্ষ ও খোদাভীরু চিকিৎসকের অন্যতম দায়িত্ব হল রোগীকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল করা। তা কিভাবে করা যাবে এ ব্যাপারে নবীজি সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা স্বরূপ রোগীর প্রতি সদাচরণ, রোগী দেখার বিশেষ পদ্ধতি, রোগীর কাছে অবস্থান এবং রোগীকে শান্ত¦না প্রদান অগ্রাধিকার দিতেন। রোগীর প্রতি সদাচরণ সম্পর্কে বলা যায়- ‘‘একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে বলেন, তুমি যখন কোন রুগ্ন ব্যক্তিকে দেখতে যাও, তখন তার সামনে তার দীর্ঘ জীবন সম্পর্কে আশাবাদ প্রকাশ করবে। এটা অবশ্যই তাকদীরকে পরিবর্তন করতে পারে না; তবে এতে রোগীর মন অবশ্যই চাঙ্গা হায়।’’ যেমন হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে-
اذا دخلتم على المريض فنفسوا له فى الاجل فان ذالك لايرد شيئا وهو يطيب بنفس المريض-
নবীজির অভ্যাস ছিল, তিনি যখন কোন রোগী দেখতে যেতেন, তখন তাকে বলতেন- لابأس طهور انشاء الله ‘‘চিন্তার কোন কারণ নেই, ইনশাআল্লাহ্ সুস্থ হবে।’’
রোগীর মনকে আশ্বস্ত করার জন্য রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম রোগীর সাথে দেখা-সাক্ষাতের বিশেষ বিশেষ আচরণ অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। যেমন রোগীর নিকট বসা, রোগীর কপাল ও হাতে হাত রাখা, তার কুশলাদি জিজ্ঞেস করা, তাকে শান্তনা ও ধৈর্য ধারণে উৎসাহ্ দেয়া, তার জন্য দো’আ করা, তার জন্য উচ্চ মর্তবার কথা বলে দো’আ চাওয়া, দীর্ঘ সময় তার নিকট বসে তাকে বিরক্ত না করা ইত্যাদি।’’

রাসূল (দ.)-এর অনুসরণকৃত স্বাস্থ্য বিধিমালা
‘‘চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ পঁৎব’’- রোগের প্রতিকারের চেয়ে রোগের প্রতিরোধই উত্তম ব্যবস্থা- এই ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত স্বাস্থ্য বিধির মূলকথা। উদ্দেশ্যে তাঁর প্রবর্তিত স্বাস্থ্যবিধি ছিল অতীব বাস্তবধর্মী, বিজ্ঞান সম্মত, সুদূর প্রসারী ও ফলপ্রসূ। গভীর অভিজ্ঞতা ও পর্যালোচনা-পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয় এভাবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রবর্তিত সাবধানতা অবলম্বন মানুষকে রোগমুক্ত ও সুখ সমৃদ্ধ জীবন-যাপনে অধিকতর সুফল দিয়েছে। নবীজির আমলে প্রবর্তিত স্বাস্থ্যবিধির উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নমুনা নি¤েœ প্রদত্ত হল-

১. ব্যক্তিগত পবিত্রতা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা
পবিত্রতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মধ্যে আছে দশটি নীতিমালা যেগুলোকে স্বভাব বা প্রকৃতিগত সুন্নাত অর্থাৎ দ্বীনে হানিফের অংশ বলা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
عشر من الفطرة قص الشارب واعفاء اللحية والسواك والاستنشاك بالماء وقص الاظفار وغسل البراجم ونصف الابط وحلق العانة وانعقاص الماء يعنى الاستنجاء بالماء والمضمضة-
‘‘১. গোঁফ ছাটা, ২. দাড়ি লম্বা করা, ৩. মিসওয়াক করা, ৪. নাকে পানি দেয়া, ৫. নখ কাটা, ৬. আঙ্গুলের জোড়াগুলো ধৌত করা, ৭. বগলের পশম উপড়ে ফেলা, ৮. নাভীর নীচের পশম পরিষ্কার করা, ৯. এস্তেনজা করা, ১০. কুলি করা।’’

২. পরিবেশগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা
১. মানববসতীকে সর্বপ্রকার দূষণমুক্ত রাখা, মলমূত্র ত্যাগের পর ময়লাগুলো ভূগর্ভস্থ রাখার ব্যবস্থা করা, মানববসতী ও চলাচলের পথ থেকে দূরে মল-মূত্র ত্যাগ ও ময়লা আবর্জনা ফেলা, ঘর-বাড়ী পরিচ্ছন্ন রাখা ইত্যাদি।
২.দূষণমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সুনিশ্চিতের লক্ষ্যে নবীজি বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়নের প্রতিও জোর তাগীদ দিয়েছেন। চলাচলের পথ হতে কষ্টদায়ক বস্তু ও ময়লা-আবর্জনা দূরীভূত করাকে নবীজি ঈমানী দায়িত্ব বলে ঘোষণা করেছেন। ৩. নিয়মিত ও নিয়ন্ত্রিত খাবার গ্রহণ। ৪. পরিমিত বিশ্রাম ও নিদ্রা। ৫. পরিমিত পরিশ্রম ও নিয়মিত শরীর চর্চা। ৬. স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করা। ৭. পানপাত্রে ও খাবারে নিঃশ্বাস ত্যাগ থেকে বিরত থাকা। ৮. পঁচা ও বাসি খাবার পরিত্যাগ করা। ৯. নোংরা ও হারাম খাদ্যবস্তু বর্জন। ১০. রুচি সম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য গ্রহণ। ১১. মদ ও নেশাজাতীয় বস্তু বর্জন। ১২. সমকামিতা, বহুগামিতা, ঋতু¯্রাবাবস্থায় স্ত্রীগমনে নিষেধাজ্ঞা। ১৩. খাদ্য ও পানীয় ঢেকে রাখার প্রতি গুরুত্বারোপ। যেমন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষ্য হচ্ছে-
غطوا الأناء اوكو السقاء واغلقو الابواب واطفئو السراج-
‘‘তোমরা বরতন ঢেকে রাখবে, পান পাত্রের মুখ বন্ধ করবে, দরজার অর্গল বন্ধ করবে এবং ঘুমানোর পূর্বে চেরাগ নিভিয়ে দেবে।’’

নবীজি (দ.)’র প্রস্তাবিত রোগ নিরাময় ব্যবস্থা
বিভিন্ন হাদীস ও সীরাত গ্রন্থ সমূহে নবীজির রোগ নিরাময় ব্যবস্থা হিসেবে ৫টি পদ্ধতির প্রয়োগবিধি উল্লেখ পাওয়া যায়।
১. হাজামাত (حجامت)
রক্তমোক্ষণপদ্ধতি। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে ইরশাদ করেন-
اذا كان فى شئ مما تدوايتم به خيرا فالحجامة-
‘‘তোমরা যে পদ্ধতি চিকিৎসা করে থাক, রক্তমোক্ষণ তার মধ্যে অধিক ফলপ্রসূ।’’
বর্তমানে এ পদ্ধতি কিছু পরিবর্তিত হযে চীনা পদ্ধতিতে আকু পাংচার চিকিৎসা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। পাকিস্তানেও এ পদ্ধতিতে বহুল প্রচলিত। এ ছাড়া বর্তমানে আমেরিকান হাসপাতাল সমূহে এ ব্যাপারে ব্যাপক গবেষণা কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন, শিংগা বা রক্তমোক্ষণের জন্য চন্দ্রমাসের ১৭, ১৯ এবং ২১ তারিখকে উত্তম বলেছেন। তবে বুধবার শিংগা লাগানো অনুপযোগী বলেছেন। নবীজি পাগল, কুষ্টরোগী, মৃগীরোগের চিকিৎসায় এর ব্যবহার করতেন। হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘‘শিংগা লাগালে জ্ঞান বৃদ্ধি পায় ও স্মৃতিশক্তি প্রখর হয়।’’ হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, ‘‘হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম শিংগা লাগানোর ফলে দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং পিঠ হাল্কা হয়।’’
অন্যত্র নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
وهى تزيد فى العقل وتزيد فى الحفظ-
‘‘শিংগা মানুষের বুদ্ধি ও মুখস্থ শক্তি বৃদ্ধি করে।’’
বিভিন্ন হাদীস শাস্ত্র গবেষণার মাধ্যমে জানা যায়, নবীজি কাঁধ, কাঁধের মাঝে, গ্রীবা বা ঘাড়, মাথা, পিঠ, রান, চিবুক ইত্যাদিতে শিংগা বা রক্তমোক্ষণ চিকিৎসা নিতেন। প্রাচীন প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ ডাক্তারগণ ঐক্যমত পোষণ করেন যে, চিবুকের নীচে শিংগা লাগালে চেহারা, গলা ও দাঁতের ব্যথা উপশম হয় এবং মাথা ও হাত-তালুতে আরাম বোধ হয়।
‘‘পায়ের গোড়ালিতে শিংগা লাগানোর দ্বারা রান, পায়ের গোছায় ব্যথা নিরাময় হয় এবং খোশ, পাঁচড়া জাতীয় চর্মরোগ ভাল হয়। সীনার নীচে শিংগা লাগালে ফোঁড়া, পাঁচর, খুজলী, দুম্বল, চর্মরোগ, নুকরস, অশ্বরোগ ও স্থূলবুদ্ধি দূর হয়।’’
২. লাদূদ (لدود)
মুখ দিয়ে ঔষধ ব্যবহার করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উম্মে কায়স রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহাকে কয়েকটি নিরাময় ব্যবস্থা দিয়েছিলেন তন্মধ্যে জাতুল জানব (ذات الجنب) বা পাঁজরের ব্যথা নিরাময়ের জন্য ‘কোস্তেহিন্দী’ পিষে মুখে খাওয়ানোর জন্য বলেছেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
عليكم بهذا العود (القسط) الهندى فان فيه سبعة اشفيه-
‘‘তোমরা কোস্তে হিন্দী (ভারতীয় আগর কাঠ) দিয়ে চিকিৎসা কর, কেননা তাতে সাত ধরনের রোগের নিরাময় রয়েছে।’’
৩. সাঊত (سعوط)
নাক দিয়ে ঔষধ ব্যবহার করা। আলাজিহ্বা ফুলে উঠা রোগের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উপরে বর্ণিত কোস্তেহিন্দী ঘষে পানিসহ ফোঁটা করে নাকে ভেতর দিতে বলেছেন।
৪. মধু পান (شرب العسل)
পেট পরিষ্কার ও ডায়রিয়া বন্ধ করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মধু পানের পরামর্শ দিয়েছেন। এতে খুব দ্রুত পেট পরিষ্কার হয় এবং ডায়রিয়া রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
عليكم بالشفاء بين العسل والقرأن-
‘‘মধু ও ক্বোরআনের মাধ্যমে তোমার তোমাদের চিকিৎসা নেয়াউচিত।’’
৫. কাওয়া (الكوى) রাসূলে করীমের নিকট অপছন্দনীয়
লোহা গরম করে ছ্যাঁক দেয়া। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- ‘‘তোমাদের ঔষধ সমূহের মধ্যে যদি কোন নিরাময় থাকে তা রয়েছে মধু গ্রহণে, রক্তমোক্ষণে এবং গরম লোহার দ্বারা ছ্যাঁক দেয়ার মধ্যে। তবে তা (ছ্যাঁক দেয়া) আমি পছন্দ করিনা।’’ নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ভাষ্য হচ্ছে-
ان كان فى شئ من اوديتكم خير ففى شربة عسل وشرطة محجم او لذعة نار وما احب ان اكتوى-
রাসূল (দ.) যে সমস্ত রোগের চিকিৎসা করতেন
১. মাছি বাহিত রোগ ও এর চিকিৎসা, ২. গলগন্ড রোগের চিকিৎসা, ৩. জ্বরের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপত্র, ৪. নিউমোনিয়া রোগের চিকিৎসা ও চিকিৎসাপত্র, ৫. মাথা ব্যাথার চিকিৎসা, ৬. অন্যান্য ব্যাথা-বেদনার চিকিৎসা, ৭. ডায়রিয়া ও পেটের পীড়ার চিকিৎসা, ৮. চক্ষুরোগের ব্যবস্থাপত্র, ৯. চর্মরোগের চিকিৎসা, ১০. বিষক্রিয়ার প্রতিষেধক ও চিকিৎসা, ১১. জীবাণু ধ্বংস চিকিৎসা, ১২. জখমের চিকিৎসা, ১৩. সর্প ও সরীসৃপ দংশন চিকিৎসা, ১৪. উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসা, ১৫. সাইটিকা বেদনার চিকিৎসা, ১৬. পক্ষাঘাতের চিকিৎসা, ১৭. যাবতীয় মানসিক রোগ, ১৮. অশ্বরোগ, ১৯. বিভিন্ন প্রকার গ্রন্থিসন্ধি।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে নবীজির ব্যবহৃত ঔষধ সমূহ
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিটি কাজ-কর্ম, কথা-বার্তা, প্রভৃতি ছিল বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ। নবীজির সমুদয় কাজ-কর্মকে আখ্যায়িত করা হয় সুন্নাত হিসেবে। আর নবীজির অনুসারী তথা উম্মত মাত্রই তা অনুসরণে বদ্ধপরিকর। নবীজির সুন্নাত ছিল, তিনি স্বীয় পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীদের বিভিন্ন জটিল ও কঠিন রোগে প্রাজ্ঞপূর্ণ চিকিৎসা সেবা দানে আত্মনিয়োগ করতেন। চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শ ও দিতেন আবার কখনো রোগ অনুসারে ঔষধপত্র সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিতেন। রোগ-ব্যাধিতে তাঁর ব্যবহৃত ঔষধপত্র প্রায় সবগুলোই অমিশ্র বা একক উপকরণ বিশিষ্ট ছিল। অবশ্য তিনি কখনো যৌগিক ঔষধ ব্যবহার করতেন এবং প্রয়োগ করতেন। তাঁর ব্যবহৃত কয়েকটি ঔষধের উপাদান হল-
১. মধু
আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত, মানবদেহের জন্য যত প্রকার ভিটামিন আবশ্যক, তার বার আনা মধুর মধ্যে বিদ্যমান্ গবেষণায় আরো দেখা গিয়েছে যে, মধু অপেক্ষা শক্তিশালী ভিটামিন যুক্ত আর কোন পদার্থ নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘দুটো আরোগ্যদানকারী বস্তুকে তোমরা অপরিহার্য করে নাও একটা মধু অন্যটা আল্ ক্বোরআন।’’
আল্লাহ্ পাক বলেন-
يخرج من بطونها شراب مختلف الوانه فيه سفاء للناس-
‘‘আল্লাহ্ পাক মধুমক্ষিকার উদর থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় এবং মধু বের করে থাকেন, যার মধ্যে মানুষের জন্য অসংখ্য রোগের প্রতিকার রয়েছে।’’
মধুর গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নবীজি বলেন-
من لعق العسل ثلاث غدوات فى كل شهر لم يصبه عظيم البلاء-
‘‘যে ব্যক্তি প্রতিমাসে তিনবার সকাল বেলায় মধু চেটে সেবন করে, তার কোন কঠিন ও জটিল রোগ হবে না।’’
মধু, ফোঁড়া, পাঁচড়া, আমাশয়, ডায়রিয়া এবং অন্যান্য পেটের রোগ তথা কোষ্ঠ কাঠিন্য, বাতের ব্যথা, মুখের পক্ষাঘাত, শরীরের পক্ষাঘাত, মানসিক রোগ চক্ষুরোগ ও দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধির মহৌষধ।
২.কালোজিরা
কালোজিরাকে ফার্সীতে বলা হয় ‘শোনিজ’ ইংরেজীতে (নষধপশ পঁসরহ) আর আরবীতে বলা হয় ‘হাব্বাতুস্ সাউদা’। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে কালোজিরা পেট, ব্যথা, শুলবেদনা, মস্তিস্ক দুর্বলতা, শিরা, অকর্মন্যতা, অর্ধাংগকাঁপুনি রোগ বিশেষত: ঠান্ডাজনিত রোগ-ব্যাধি যেমন সর্দি, কাশি, কফ ইত্যাদি উপশমে অত্যন্ত উপকারী। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
عليكم بهذه الحبة السوداء فان فيها شفاء من كل داءٍ الا السام والسام الموت-
‘‘কালোজিরা ব্যবহার করা তোমাদের জন্য অপরিহার্য। কেননা এতে মৃত্যু ছাড়া সকল রোগের আরোগ্যতা বিদ্যমান।’’
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও এর অনেক ব্যবহার রয়েছে। যৌনব্যাধি, বুক ব্যথা, পাকস্থলিতে বায়ু বৃদ্ধি, প্রসূতি রোগ, ভ্রুণ শক্তিশালী করণ, মূত্রথলির পাথর, অধিক ঋতু¯্রাব ও মাত্রাতিরিক্ত পেশাব তথা ডায়াবেটিস এবং ক্রিমিনাশক ইত্যাদি ক্ষেত্রে খুবই উপকারী।
৩. কুসত (قسط)
কুসতকে ফার্সীতে ‘কুস্তাই’ হিন্দীতে গোঠ আর ইংরেজীতে (ঈঁংঃঁং ৎড়ড়ঃ) বলা হয় যার বাংলা নাম হল গিরিমল্লিকা ফুলগাছের কাঠ বা আগরকাঠ। তা দু’ধরনের যেমন কুসতে বাহরি (قسط بحرى) বা কালো রঙের আগর কাঠ। সাদা কুসত এবং অন্যটি কুসতে হিন্দী ( قسط هندى) বা কালো রঙের আগর কাঠ। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাধারণত গলনালীর আবদ্ধতা, গলগন্ড, হাঁপানী, এজমা, নিউমোনিয়া, শ্লেষ্মা, হৃদযন্ত্র, মস্তিস্ক, যকৃৎ, অন্ডকোষের রোগের জন্য তা ব্যবহার করতেন। যেমন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لاتعذبوا صبيانكم بالغمز من العزرة وعليكم بالقسط-
‘‘তোমাদের বাচ্চাদের গলগ্রহ হলে গন্ডদেশ মালিশ ও দাবিয়ে কষ্ট দিওনা। বরং তোমরা কুসত ব্যবহার কর।’’
৪. মেহেদী (حنا)
রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আঘাত জনিত ক্ষত, ঘা ও চর্মরোগে মেহেদী ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন। যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর খাদেমা সালমা বিনতে উম্মে রাফি থেকে বর্ণিত-
كان يكون برسول الله صلى الله عليه وسلم قرحة او نكبة الا امرنى روسول الله صلى الله عليه وسلم ان اضع عليها الحناء-
‘‘যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ফোঁড়া-পাঁচড়া বের হত অথবা কাঁটা বা এ প্রকারের কিছু শরীরে ঢুকে যেত তখনি তিনি আমাকে বলতেন এর উপর মেহেদী লাগিয়ে দাও।’’
অপর এক হাদীসে ইবনে মাযাহর বরাত দিয়ে আল্লামা ইবন কায়্যিম নকল করেছেন-
ان النبى صلى الله عليه وسلم اذا صدع غلف رأسه بالحنا ويقول انه نافع باذن الله من الصدع-
‘‘যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাথা ব্যথা দেখা দিত তখন তিনি মাথায় মেহেদী লাগাতেন আর বলতেন এটা আল্লাহর হুকুমে মাথা ব্যথার আরোগ্য দানকারী।
৫. খেজুর (النخل)
সুস্বাদু ফল হিসেবে খেজুরের কোন জুড়ি নেই। এর মধ্যে রয়েছে পেটের গ্যাস, শ্লেষ্মা, কফ, শুষ্ক কাশি, এজমা এবং হৃদরোগের জন্য মহৌষধ। উল্লেখ্য যে, ‘‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে দেখতে গিয়ে তিনি তাকে মদীনার আযওয়া খেজুর খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। আবু সাঈদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ছিলেন হৃদরোগে আক্রান্ত।’’ অন্যত্র আছে ‘‘খেজুর বীচিও পাতলা পায়খানা বন্ধ করে, পোড়া খেজুর বিচি চূর্ণ রক্ত প্রবাহ বন্ধ করে ও ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে এবং চূর্ণ দিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত পরিষ্কার হয়।’’ রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন- ‘‘সকাল বেলা যে ব্যক্তি মদীনার সাতটি আযওয়া খেজুর খাবে, কোন বিষ বা যাদু তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।’’ হাদীস শরীফটি হল-
من تصبح سبع تمرات عجوة لم يضره ذالك اليوم سم ولا سحر-
নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন-
العجوة من الجنة وهى شفاء من السم-
‘‘আযওয়া জান্নাতের ফল। এর মধ্যে বিশেষ নিরাময় আছে।’’
৬.যায়তুন (زيتون)
যায়তুন তেলের উপকারীতা অপরিসীম। শরীরের ছোট ছোট গ্রন্থি, বিশেষ আংগুল, হাঁটু, গোড়ালি ও হাতের কবজির সন্ধিতে তীব্র ব্যথায় যায়তুন তেল মালিশ করলে অনেক উপকার পাওয়া যায়। ইউনানী পরিভাষায় এ রোগকে বলা হয় ‘নিকরেস’ বা গেঁঢেবাত। ‘‘নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন- তোমরা যায়তুন তেল খাও এবং তা মালিশ কর, কেননা এটা একটি বরকতময় বৃক্ষ থেকে উৎপন্ন।’’
كان النبى صلى الله عليه وسلم ينعت الزيت والورس من ذات الجنب-
‘‘নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ফ্লুরিসি বা পাঁজরের ব্যাথায় যায়তুন ও ওয়ারস ব্যবহার করতেন।’’
৭. ত্বীন
ত্বীন অর্থ বিলাতি ডুমুর, ফার্সীতে বলা হয় হয় ‘আনযীর’ ফল। অশ্বরোগ ও গেটে বাত-ব্যথার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিলাতি ডুমুর ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে-
‘‘একাদা হাদীয়া হিসেবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আনযীর আসলে তিনি সাহাবাদের বললেন, খাও। আমি যদি বলতাম যে জান্নাত থেকে ফল এসেছে, তবে আমি নিশ্চয় বলতাম এ জান্নাতী ফল হল আনযীর। এটা অশ্বরোগ দূর করে এবং গেটে বাতের ব্যথার জন্য উপকারী।’’
আল্লাহ্ পাক উপরোক্ত দুটো ফলের ব্যাপারে পবিত্র ক্বোরআনের শপথ করেছেন এভাবে- والتين والزيتون ‘‘শপথ ত্বীন (ডুমুর) এবং যায়তুনের।’’
ক্বোরআনের পাশাপাশি এর বর্ণনা পাওয়া যায় ইঞ্জীলের ইরমিয়া, অধ্যায় ২৪, ও মথি অধ্যায়: ২১ ইত্যাদি।
৮. মাশরুম (الكماة)
এটা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে উদগত এক প্রকার ছত্রাক। এটি একটি সুস্বাদু খাদ্য এবং চোখের নানা রোগে প্রতিষেধক হিসেবে অতীব পরিচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘‘ব্যাঙের ছাতা (মাশরুম) মান্নার মত অনায়াসে লব্দ মহান আল্লাহর নি’মাত বিশেষ। এর রস চোখের জন্য ঔষধ বিশেষ।’’ যেমন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الكماة من المن وماءها شفاء العين-
তবে উল্লেখ্য যে, ‘‘তিন ধরনের মাশরুম রয়েছে যথা সাদা, লাল ও কাল। তন্মধ্যে সাদা ও লাল ঔষধি মাশরুম হিসেবে প্রসিদ্ধ কিন্তু কালোটা অতীব বিষাক্ত।’’
৯. ওয়ারস (الورس)
‘হলদে এক প্রকার ঘাস বিশেষ। প্লারিসি (পাঁজর) ব্যথায় তা খুবই উপকারী। নবীজি এ ধরনের ব্যথায় ‘ওয়ারস’ ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন।’’
১০. লবণ (ملح)
লবণ খাদ্যের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। তা হজম শক্তি ‘পরিপাক বর্ধক, ক্ষুধানিবারণকারী ও মন প্রফুল্লকারী। চুকা ঢেকুর, পেটের বায়ু পরিশোধন, রক্ত দুষণ, যকৃত ও প্লীহা রোগে খুবই উপকারী। এ ছাড়া বিষাক্ত বিচ্ছু ও কীট-পতঙ্গের বিষক্রিয়ার প্রতিষেধক হিসেবে রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম লবণ ব্যবহার করতেন। দংশিত ক্ষতস্থানে পানি সহকারে লবণের ব্যবহার করলে অনেক উপকারীতা অর্জিত হয়। হাদীসে বর্ণিত আছে, একদা নবীজিকে নামাযরত অবস্থায় একটি বিচ্ছু কামড় দেয়। নবীজি নামাযান্তে বিচ্ছু দংশনের চিকিৎসা করলেন এভাবে-
ثم دعا بملح وماء فجعله فى اناء ثم جعل يصبه على اسبعيه حيث لدغتة ويمسحها ويعوذها بمعوذتين-
‘‘অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম লবণ ও পানি চাইলেন এবং তা একটা পাত্রে ঢাললেন। তারপর ঐ দ্রবণে আগুন ডুবিয়ে ক্ষতস্থানে মালিশ করলেন। অবশেষে পবিত্র ক্বোরআনের শেষোক্ত দু’টি সূরা তিলাওয়াত করলেন।’’
১১. ইছমিদ (الاثمد)
এন্টামনি বা এক প্রকার সুরমা বিশেষ। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সুরমা লাগানোর ব্যাপারে নির্দেশ দিতে গিয়ে বলেন এভাবে যে, ‘‘তোমরা সুরমা ব্যবহার কর। কেননা তা দ্বারা ভ্রƒ উদগত হয় এবং চোখের দৃষ্টি শক্তি প্রখর হয়। যেমন হাদীস শরীফে আছে-
عليكم بالاثمد عند النوم فانه يجلو البصر وينبت الشعر-
১২. তালবীনা (التلبينة)
দুধ, বার্লি ও মধুর সমন্বয়ে তৈরি এক ধরনের খাবার (হালুয়া) বিশেষ। তা পেটের পীড়া, ক্ষুধামন্দা শরীরিক দূর্বলতা নিরাময়ে অত্যন্ত কার্যকরী একটি মহৌষধ।
নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
‘‘কোন ব্যক্তির পেটের পীড়া হলে তাকে তালবীনা খাইয়ে দাও। অতঃপর তিনি বলেন- আল্লাহর শপথ, এটা তোমাদের পেটকে এমনভাবে পরিষ্কার করে, যেমনিভাবে কোন ব্যক্তি স্বীয় চেহারা ময়লা হতে পরিষ্কার করে থাকে।’’ নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেন, ‘‘তালবীনা রোগীর প্রাণে শক্তি বৃদ্ধি করে এবং মানব মন থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে।’’
১৩. শিবরাম (الشبرم)
এক ধরনের বীজ দানা। এটা সিদ্ধ করে পান করা হলে পেটের কোষ্ঠকাঠিন্য দূরীভূত হয়। তবে এটা অত্যন্ত গরম বিধায় তার পরিবর্তে নবীজি কালোজিরা এবং ‘সানা ও সোনামুখী গাছের ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
১৪. সিনা বা সানা (السناء)
সিনা বা সানা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে এক মহৌষধ। সিনা অনেক প্রকারের হয়ে থাকে যেমন সিনায়ে মাক্কী বা হিজাজী, সিনায়ে রোমী, সিনায়ে মিসরী, সিনায়ে আসকারী এবং সিনায়ে হিন্দী। সিনা ব্যবহারে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর, মস্তিস্ক পরিষ্কার হয়, কোমর ব্যথা, পার্শ্ববেদনা, নিউমোনিয়া, উরুর উপর অংশ ব্যথা, গিটবাত এবং পালাজ্বরসহ সর্বপ্রকার মাথা ব্যাথানাশক ও মৃগী রোগীর জন্য খুবই উপকারী। তাই নবীজি বলেন-
عليكم بالسنا فانها شفاء من كل داء الا السام-
‘‘তোমরা অবশ্যই সিনা ব্যবহার করবে, কেননা এটা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের আরোগ্য দানকারী।’’
১৫. সফরজাল (السفرجل)
সফরজালের বাংলা পরিভাষা হল ‘বিহিদানা’ এবং ইংরেজী ভাষা হল ‘কাউস’। তা একপ্রকার টক মিষ্টি জাতীয় ফল। বিহিদানা শরবত ও মোরাব্বা তৈরি করে খেলে পেট, যকৃত, হৃদকম্পন ও মানসিক দূর্বলতা দূর করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
فانها تشد القلب وتطيب النفس وتذهب بطخاء الصدر-
‘‘নিশ্চয় একটা (বিহিদানা) অন্তরের শক্তি সঞ্চার করে, মন প্রশান্ত করে এবং দম বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্বাসকষ্ট দূর করে।’’
১৬. মাদুরের ছাই
ক্ষত স্থানের প্রবহমান রক্ত প্রতিরোধে মাদুর বা চাইয়ের ছাই অতীব উপকারী যা পরীক্ষিত একটা চিকিৎসা। নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তা ব্যবহার করতেন। ‘‘উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আহত হরে অবিরত ধারায় রক্ত প্রবাহিত হচ্ছিল আর হযরত ফাতিমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা ক্ষতস্থান পানি দিয়ে পরিষ্কার পূর্বক চাটাই পুড়ে ছাইগুলো ক্ষতস্থানে লাগালে রক্ত বন্ধ হয়ে যায়।’’
১৭.দুম্বার নিতম্বের মাংস
সিয়াটিক পেইন (ঝপরধঃরপ চধরহ) এক প্রকার কঠিন ব্যথা যা মেরুদণ্ডের হাড় হতে রগের মধ্য দিয়ে পায়ের গিট পর্যন্ত নিন্মভাগে অসহনীয় পর্যায়ে সঞ্চারিত হয়। সাধারণ দুর্বলতা ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গের শুষ্কতা এ রোগের কারণ। আরবী ও ইউনানী চিকিৎসায় এ রোগকে বলা হয় عرق النساء। এ রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন- (আল্লাহ্র নামে যবেহকৃত) ‘‘দুম্বার নিতম্ব মাংসের মধ্যে বেদনা রোগের মহৌষধ রয়েছে। এটাকে দ্রবণ করে (পিশে বা গলিয়ে) তিনভাগ করবে এবং তিনদিন সেবন করবে।’’
১৮. ঠান্ডা পানি (ماء البرد)
জ্বর একটা প্রসিদ্ধ রোগ। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই আবাল-বৃদ্ধ বণিতা মাত্রই জ্বরের সাথে সুপরিচিত। গ্রীষ্ম প্রধান দেশে জ্বরের প্রকোপ এতই বেশী অনুভূত হয়, এ সব দেশে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের পদ্ধতি স্বরূপ বরফের সেল দ্বারা তা ঠান্ডা করা হয়। অথচ নবীয়ে রহমত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পনের শত বছর পূর্বে এ রোগের চিকিৎসা ঠান্ডা পানির মাধ্যমে করেছিলেন। জ্বর সম্পর্কে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
الحمى من كير جهنم فامحوها منكم بالماء البارد-
‘‘জ্বর জান্নামের একটা উত্তপ্ত পাত্র বিশেষ, তোমরা ঠান্ডা পানি দিয়ে তা দূর কর।’’
অন্যত্র আছে-
الحمى من فيح جهنم فابردواها بالماء-
‘‘জ্বর জাহান্নামের উত্তাপের অংশ বিশেষ, সুতরাং ঠান্ডা পানি দিয়ে তা দূর কর।’’
১৯. রেশমী কাপড় পরিধান
ইসলাম যদিও নারীদের ব্যাপারে স্বর্ণ, রৌপ্য এবং রেশমী কাপড়ের অনুমতি দিয়েছে পুরুষের বেলায় তার ব্যতিক্রম। কিন্তু যখন পুরুষ ত্বকাচ্ছদন প্রদাহ বা চুলকানি রোগে আক্রান্ত হয় তখন তার জন্য এ নির্দেশের ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। যেমন হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, ‘‘হযরত রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম চুলকানি রোগের কারণে হযরত যুবায়র রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু এবং হযরত আবদুর রহমান ইবনে আউফ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে রেশমী কাপড় পরিধান করার অনুমতি দিয়েছেন।’’
কেননা রেশমী পোষাক ঠান্ডা ও কোমল হওয়ায় চুলকানী রোগীদের জন্য খুবই আরামদায়ক হয়।
২০. মুসাব্বর
মুসাব্বর একটি বিস্বাদ ও অত্যন্ত তিক্ত কাল রঙ্গের গুড়ো বিশেষ। তবে এর প্রভাব গরম ও শুষ্ক। চিকিৎসকগণ এটাকে বিরোচক, পাকস্থলী ও হার্টের শক্তি বর্ধক বলে থাকেন। অধিক বায়ু নির্গম ও মস্তিস্ক বিকৃতির জন্যও তা ফলদায়ক। যেমন নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অন্যত্র বলেন-
انه يشب وجهه فلا تجعله الا الليل ونهى عنه بالنهار-
‘‘তা (মুসাব্বর) চেহারাকে অতীব সতেজ তেজোদীপ্ত ও উজ্জ্বল করে তা রাত্রে ব্যতীত দিনে ব্যবহার করো না।’’
২১. মাছি বাহিত রোগের প্রতিষেধক
মাছি একটা উড্ডয়নশীল তুচ্ছ ও ঘৃনিত প্রাণী বিশেষ। মাছি বাহিত রোগ প্রতিরোধে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন-
واذا وقع الذباب فى اناء احدكم فاملقوه فانّ فى احد جناحيه داء وفى الاخر شفَاءَ-
‘‘তোমাদের কারো পানির পাত্রে মাছি পতিত হলে তাকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দাও। কেননা মাছির এক পাখায় রোগ ও অপর পাখায় রোগের প্রতিষেধক রয়েছে।’’
২২. ডায়েরিয়া নিরাময়ে ওরাল স্যালাইন
আধুনিক কালে ডায়েরিয়া পাতলা পায়খানা নিরাময়ে ওরাল স্যালাইন একটি যুগান্তকারী চিকিৎসা। অনেকের ধারণা তা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান উদ্ভাবন করেছে। অথচ এ চিকিৎসার উদ্ভাবক ছিলেন স্বয়ং নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। তাঁর একান্ত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে নবীজি তাঁকে চিনির স্যালাইন পান করার পরামর্শ দিয়েছেন।
২৩. রাসূল (দ.)-এর যুগে প্লাষ্টিক সার্জারী
চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ভংগুর ও অকেজো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অপসারণ পূর্বক কৃত্রিম প্রত্যঙ্গ স্থাপন করার নাম প্লাষ্টিক সার্জারী। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সাহাবায়ে কেরাম তাঁর অনুমতি নিয়ে ভাঙ্গা ও অকেজো অঙ্গ অপসারণ পূর্বক কৃত্রিম অঙ্গ স্থাপন করেছেন। সাহাবী আবদুর রহমান ইবনে আউফের দাদা আরফাযা ইবনে আসআদ ছিলেন একজন বীর মুজাহিদ। এক যুদ্ধে তাঁর নাক কেটে গেলে তিনি একটি রৌপ্যের নাক সংযোজন করেন। পরবর্তীতে এতে দুর্গন্ধের উদ্রেক হলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশে তিনি একটি স্বর্ণের নাক সংযোজন করেন।
২৪. রাসূল (দ.) ও দন্ত চিকিৎসা
দাঁত আল্লাহ্ পাকের অন্যতম নি’মাত। এ দাঁত তথা শরীরের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গের যতœ করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। অযতেœ অবহেলায় সৃষ্টি হয় অসংখ্য মারাত্মক রোগ ব্যাধি। দন্ত রোগ তন্মধ্যে অন্যতম। দন্তরোগের অন্যতম কারণ হচ্ছে দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা খাদ্যাংশ, এর মাধ্যমে নানা রোগ জীবাণু সৃষ্টি হয় যা দাঁত ও দাঁতের মাড়ির চরম ক্ষতিসাধন করে। তাই দাঁত, দাঁতের মাড়ি, মুখ, কন্ঠনালী ও পাকস্থলীর সুরক্ষার জন্য রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রত্যহ পাঁচবার নামায পূর্বে অযূতে এবং ঘুম থেকে উঠে, রাত্রে শয়নকালে, আহারের পূর্বে ও পরে মিসওয়াক ও কুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর প্রতি জোর তাকীদ প্রদান করেছেন।
২৫. ডেন্টাল সার্জারী
সাহাবায়ে কেরাম নবীজির অনুমতি নিয়ে ডেন্টাল সার্জারীসহ দাঁতের অসংখ্য চিকিৎসা করাতেন। জিহাদের ময়দানে অনেক সাহাবীর দাঁত ভেঙ্গে গেলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে স্বর্ণের কৃত্রিম দাঁত, দাঁতের ক্যাপ ইত্যাদি চিকিৎসার অনুমতি প্রদান করেন। যারা দাঁতের চিকিৎসা নিয়েছিলেন তন্মধ্যে মুগীরা ইবনে আবদুল্লাহ্, হযরত উমায়ের রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা, রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর একান্ত খাদেম হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ও হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু প্রমুখ।
২৬. এইডস প্রতিরোধে নবীজির বাস্তব পদক্ষেপ
বর্তমান কালে অপরাধ ও বিকৃত যৌনাচারের ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে আমাদের দয়াল নবী পনের শ’ বছর পূর্বে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এভাবে যে, ‘‘যখন তোমরা ব্যাপকভাবে ব্যভিচারে লিপ্ত হবে তখন তোমাদের মধ্যে এমন সকল ভয়ংকর রোগ ব্যাধি দেখা দিবে, যা তোমাদের পূর্বপুরুষগণ কখনো দেখেনি।
মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এ ভবিষ্যদ্বাণী আজ বিশ্ব পরিস্থিতিতে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিফলিত। মানুষ আজ ব্যাপকভাবে এইডস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ তার নিরাময়ে বরাবরই ব্যর্থ, চরমভাবে হতাশ হয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর এ অমোঘ বাণীকে একমাত্র প্রতিষেধক মেনে নিচ্ছে।
২৭.সুষ্ঠ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা
চিকিৎসা হচ্ছে মূলত: ‘খিদমাতে খালক্ব’ বা আল্লাহর সৃষ্টজীবের সেবা যা একটা ইবাদত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রসার-প্রচারে নবীজির অবদান অত্যন্ত অনবদ্য। যেকালে সভ্যতা ও আধুনিকতা ছিল অকল্পনীয়, তদানীন্তন কালে নবীজি চিকিৎসা বিজ্ঞানের চরম অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। নবীজি স্বয়ং স্বাস্থ্যরক্ষা ও চিকিৎসা সেবায় গুরুত্ব অনুধাবন করে মদীনায় মসজিদে নববীর পার্শ্বে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে এটাই প্রথম পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল।
হাসপাতালে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশে যুদ্ধাহত সহ অন্যান্য অসুস্থরোগীদের চিকিৎসা দিতেন প্রখ্যাত চিকিৎসক সায়্যিদা নুসায়বা বিনতে কা’ব আল আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু। এ ছাড়া নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি জিহাদের ময়দানের পার্শ্বে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যোপযোগী স্থানে চিকিৎসা দেয়ার নিমিত্তে ভ্রাম্যমান চিকিৎসাকেন্দ্র (গড়নরষব গবফরপধষ ঈবহঃবৎ) প্রতিষ্ঠা করতেন।
২৮. চিকিৎসকদের উৎসাহ দান
চিকিৎসা সেবাকে গণমানুষের দোর-গোড়ায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে এবং আপামর জনসাধারণের জন্য এ সেবাকে সহজতর করার লক্ষ্যে নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মুসলিম-অমুসলিম প্রত্যেককে সমগুরুত্ব দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক উৎসাহিত হয়ে যারা এ পেশায় আসেন তারা হলেন যথাক্রমে-
১.হারিসবিন কালাদা- প্রখ্যাত অমুসলিম চিকিৎসক, ২. আবু হাফসা ইয়াযীদ- ইয়াহুদী চিকিৎসক। পরবতীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, ৩. ইবনে উবাই আততামীমি- প্রখ্যাত ক্ষত ও অস্ত্রোপাচার বিশেষজ্ঞ, ৪. যায়নাব- মহিলা চিকিৎসক যিনি ছিলেন চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ৫. রুফায়দা বা নুসায়কা- যিনি ছিলেন আনসারী সাহাবী তিনি মদীনার মসজিদে নববীর আঙ্গিনায় স্থাপিত চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।
পরিসমাপ্তি
পরিশেষে আমরা বলতে পারি, আখেরী নবী হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিশ্ব মানবতার উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রেরিত হয়েছেন। রূহানী চিকিৎসার পাশাপাশি রাহমাতুল্লিল আলামীন হিসেবে তিনি উম্মাতের দৈনিক চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যেসব তথ্য দিয়ে গেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উন্নতির অধুনা এ যুগেও তার পরিবেশিত অন্যান্য সকল তথ্যের ন্যায় চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কিত তথ্যাবলীও এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত যে, সংশ্লিষ্ট গবেষকগণ আজও তা থেকে কেবল উপকৃতই হচ্ছে না; বরং এসব তথ্যাবলীকে তারা চিকিৎসা বিজ্ঞানের মাপকাঠি রূপে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সময় যতই অতিবাহিত হচ্ছে, এর বাস্তবতা ততই দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

শেয়ার
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4
    Shares