রাসূলুল্লাহ্ ’র কয়েকটি মু’জিযা- অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

0

রাসূলুল্লাহ্ ’র কয়েকটি মু’জিযা-
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি>

عَنْ انس بن مالكٍ رضى الله عنه ان اهل مكة سألوا رسول الله صلى الله عليه وسلم ان يريهم اية فاراهم انشقاق القمر مرتين [متفق عليه] অনুবাদ: হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, মক্বাবাসীরা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে কোন মু’জিযা দেখানোর জন্য বলে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে দু’ বার চাঁদকে দু’ টুকরো করে দেখিয়েছেন। [বুখারী-হাদীস নং ৩৪, মুসলিম-হাদীস নং ২৮০০]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
المعجزة শব্দটি اعجاز শব্দ থেকে গৃহীত। আভিধানিক দৃষ্টিকোণে শব্দটি কয়েকটি অর্থে ব্যবহৃত হয়। ১. অক্ষম করে দেয়া, ২. পরাভূত করা। সুতরাং মু’জিযা হলো মোকাবিলায় অক্ষমতা সৃষ্টিকারী, অসাধারণ ঘটনা, অলৌকিক ঘটনা, প্রখ্যাত হাদীস ব্যাখ্যাকার আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী মু’জিযার সংজ্ঞায় বলেছেন- والايات اى خوارق العادات المسمّاة بالمعجزات ثابتة للانبياء عليهم الصلاة والسلام সেসব অস্বাভাবিক নির্দেশনাদিকে মু’জিযা নামকরণ করা হয় যা সম্মানিত নবীগণ আলায়হিমুস্ সালাম কর্তৃক প্রমাণিত ও প্রকাশিত।
المعجم الوسيط গ্রন্থ প্রণেতার মতে মু’জিযা হলো- هو امرخارق للعادة يظهره الله على يد النبى عليه السلام تائيدا للنبوّة আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁরই নির্দেশে নবীজির নবুওয়তের সত্যতা প্রমাণে নবী রাসূল কর্তৃক প্রকাশিত নিদর্শন তথা ঘটনার নাম মু’জিযা।
প্রত্যেক সম্মানিত নবী রাসূলগণকে আল্লাহ্ তা‘আলা নবুওয়ত ও রিসালতের সত্যতা প্রমাণে সুনির্দিষ্ট মু’জিযা দান করেছেন; কিন্তু নবীকুলের সরদার সৈয়দুল মুরসালীন ইমামুল আম্বিয়া রাহমাতুল্লীল আলামীনকে আল্লাহ্ তা‘আলা অসংখ্য অগণিত মু’জিযা সহকারে পাঠিয়েছেন, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক মু’জিযার আঁধার। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর অবতীর্ণ মহাগ্রন্থ আল কুরআন হলো, সর্বশ্রেষ্ঠ মু’জিযা।

যে অদ্বিতীয় আসমানী গ্রন্থের মোকাবেলায় আরবের খ্যাতিমান বড় বড় কবি সাহিত্যিক দার্শনিকগণ চূড়ান্তরূপে অক্ষম ও ব্যর্থ হয়েছিল। তারা আল্লাহর চ্যালেঞ্জ গ্রহণে অপারগ ও ব্যর্থ হয়ে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল ليس هذا كلام البشر এটি কোন মানব রচিত গ্রন্থ নয়। এভাবে নবীজির উল্লেখযোগ্য মু’জিযাসমূহের মধ্যে রয়েছে, জাগ্রত অবস্থায় স্বশরীরে উম্মে হানির ঘর থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস গমন তথা হতে উর্দ্ধজগত পরিভ্রমণ মিরাজুন্নবী আল্লাহর দিদারে গমন ছিল রসূলুল্লাহ্র অন্যতম শ্রেষ্ঠ মু’জিযা। শাহাদাত আঙ্গুলির ইশারায় চন্দ্র দ্বিখন্ডিতকরণ, অস্তমিত সূর্য উদিত হওয়া, খাবারে অকল্পনীয় বরকত হওয়া, বৃক্ষরাজি ও পর্বতমালা নবীজিকে সালাম দেওয়া, নবীজির সাথে উটের কথা বলা, নবীজির হাতে কঙ্কর তাসবীহ্ পাঠ করা, আঙ্গুলী মোবারক হতে পানির ঝর্ণা ধারা প্রবাহিত হওয়া ইত্যাদি ছিলো নবীজির মু’জিযা।

রাসূলুল্লাহর অন্যতম মু’জিযা অস্তমিত সূর্য উদিত হওয়া
মহান স্রষ্টা সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুতে তাঁর প্রিয় রাসূলের কর্তৃত্ব ও হুকুমত প্রতিষ্ঠা করেছেন। মওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নবীজির খিদমতে নিজকে উৎসর্গ করার কারণে নবীজিকে নিদ্রা থেকে ডেকে দেওয়াকে শানে রিসালতের পরিপন্থি মনে করে আসরের নামায ত্যাগ করেছেন; কিন্তু দয়াল নবী নবীজির প্রেমের অবগাহনে বিভোর প্রিয় সাহাবীকে মু’মিনের মিরাজ নামায থেকে বঞ্চিত করেননি, ডুবন্ত সূর্যকে পুনরায় ফিরিয়ে এনে নভোমন্ডলের সৃষ্টি রাজি তথা মহাকাশ জগতের সৃষ্টি তত্বের প্রতিটি স্তরে তাঁর সুমহান মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার প্রমানস্বরূপ উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, তাঁর প্রভু তাঁকে কতবেশী ভালবাসেন, স্বীয় মাহবুবের আহ্বানে অস্তমিত সূর্য উদিত করে বিশ্ববাসীর সামনে তাঁর প্রিয় রাসূলের মর্যাদাকে পুনঃপ্রকাশ করলেন।
হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে-
عن اسماء بنت عميسٍ رضى الله عنهما قالت كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوحى اليه وراسه فى حجر علىٍ رضى الله عنه فلم يصل العصر حتى غربت الشمس فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم اللهم ان عليا فى طاعتك وطاعة رسولك فاردد عليه الشمس قالت اسماء رضى الله عنهما فرايتها غربت ورايتها طلعت بعد ماغربت [رواه الطحاوى والطبرانى] অর্থাৎ হযরত আসমা বিনতে ওমাইস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ওহী অবতরণ হচ্ছিল, এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মাথা মোবারক হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর কোলে ছিল, সূর্য অস্তমিত হওয়ায় হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আসরের নামায পড়তে পারেননি, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আলী তোমার এবং তোমার রাসূলের আনুগত্যে নিয়োজিত ছিল। অতএব, তার জন্য অস্তমিত সূর্য উদয় করে দাও!
হযরত আসমা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা বললেন, আমি দেখলাম সূর্য ডুবে গেল, আবার দেখলাম অস্তমিত সূর্য উদিত হল। [তাবরানী শরীফ: হাদীস নং ৩৯০]

আ’লা হযরত ফাজেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি কতই চমৎকার বলেছেন-
سورج الٹے پاؤں پٹےা چاند اشارے سے هوچاك
اندهے نجدى ديكھ لے قدرت رسول الله كى
প্রিয় হাবীবের ইশারায় অস্তমিত সূর্য উদিত হলো, চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হলো, অন্ধ নজদীরা আল্লাহ্র প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মহান শক্তি প্রত্যক্ষ কর।
নবীজির আঙ্গুল মুবারক থেকে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত হওয়া ও পানিতে বরকত হওয়া
রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র আঙ্গুল মোবারক হতে পানির ঝর্ণা প্রবাহিত হওয়া ও এতে বরকত হওয়া সংক্রান্ত হাদীসগুলো ব্যাপক সংখ্যক সাহাবা-ই কেরামের বর্ণনা সূত্রে প্রমাণিত।
হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে-
عن انس رضى الله عنه قال اتى النبى صلى الله عليه وسلم باناء وهو بالزوراء فوضع يده فى الاناء ـ فجعل الماء ينبع من بين اصابعه فتوضا القوم قلت لائس كم كنتم؟ قال ثلاث مائة او زهاى ثلاث مائة وفى رواية لو كنا مائة الف لكفنا كنا خمس عشرة مائة [متفق عليه] অর্থাৎ হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট পানির একটি পেয়ালা আনা হল। তখন রসূলুল্লাহ্ ‘যওরাহ্’ নামক স্থানে ছিলেন, তিনি তাঁর হাত পেয়ালায় রাখলেন, তখন তাঁর আঙ্গুল মোবারক হতে ঝর্ণা ধারার ন্যায় পানি প্রবাহিত হচ্ছিল, সমবেত লোকেরা সে পানি দিয়ে অজু করলো। হযরত কাতাদাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, আমি হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আল আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম, পানি পানে আপনারা কতজন ছিলেন, তিনি বললেন, তিনশত অথবা তিনশতের কাছাকাছি ছিলাম, অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, আমরা যদি তখন এক লাখও হতাম আমাদের জন্য তা যথেষ্ট হতো; কিন্তু আমরা ছিলাম পনের শত।
[বুখারী-হাদীস নং ৩৩৮০, মুসলিম- হাদিস নং ২২৭৯]

নবীজির অঙ্গ প্রত্যঙ্গসহ আঙ্গুল মোবারক ছিল আল্লাহর কুদরতের বিকাশস্থল। নবীজির আঙ্গুল মোবারক হতে যে ¯্রােতস্বীণি ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হলো সে এক বিস্ময়কর অসাধারণ মু’জিযা। যা নবুয়তের এক সুমহান দলীল।
হযরত আবূ হুরায়রাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে স্মৃতি শক্তি দান করা, নবীজির এক অনন্য মু’জিযা
দরবারে রিসালতের সুরভিত গোলাফ
প্রিয় সাহাবী হযরত আবু হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু নিজের স্মৃতি শক্তির দূর্বলতার অভিযোগ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! প্রতি নিয়ত সর্বদা আপনার নূরানী জবান মুবারকের অসংখ্য অমূল্য বাণী শুনতে পাই। তবে সবকিছু স্মরণে থাকেনা, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ আমার স্মৃতি শক্তির জন্য দু‘আ করুন এরশাদ হয়েছে-
عن ابى هريرة رضى الله عنه قال قلت يا رسول الله صلى الله عليه وسلم انى اسمع منك حديثا كثيرا انسأه قال ابسط ردائك ـ فبسطته، قال فغرف بيده ثم قال ضمه فضممته ـ فما نسيت شيئا بعده [ متفق عليه] অর্থাৎ হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আপনার নিকট অনেক হাদীস শ্রবণ করি; কিন্তু তা ভুলে যাই। নবীজি বললেন, তুমি তোমার চাদর প্রসারিত করো, আমি প্রসারিত করলাম, তিনি বলেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ্ মুষ্ঠি করে কিছু দিলেন, এরশাদ করলেন, এটি তোমার সীনার সাথে মিলাও। আমি সীনার সাথে চাঁদর জড়িয়ে নিলাম। এরপর থেকে আমি কিছুই ভুলিনি।
[বুখারী হাদীস নং ১১নং মুসলিম শরীফ, হাদীস নং ২৪৯১]

সুবহানাল্লাহ! নবীজি হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে জ্ঞান রাজ্যের অতলান্ত বিস্তৃত মহাসমুদ্র বানিয়ে দিলেন, তিনি অধিক সংখ্যক হাদীস বর্ণনাকারীদের মর্যাদায় অভিষিক্ত হলেন, আ’লা হযরত ফাযেলে বেরলভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন-
كچهہ ركهتے نهيں مالك كونين ميں گوپاس
دو جهاں كى نعمتيں هيں ان كى خالى هاتھ ميں
তিনি প্রিয়নবী উভয় জগতের মালিক, যদিও সাথে কিছুই রাখেননি, তবে তাঁর শূন্য হস্ত মোবারকেই উভয় জাহানের নিয়ামত রাজির অফুরন্ত ভান্ডার। আমীন

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •