উম্মতে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শ্রেষ্ঠত্ব -অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

0

উম্মতে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র শ্রেষ্ঠত্ব >
অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

عَنْ على بن ابى طالب رضى الله عنه يقول : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم اعطِيتُ مالم يعط اَحَدٌ مِن الانبياء فقلنا يارسول الله ماهو قال نصرت بالرعب واعطيت مفاتيح الارض وسميت احمد وجعل التراب لى طهورًا وجعلت امتى خيرالامم [رواه ابن ابى شيبه واحمد باسناد جيد]

অনুবাদ: হযরত আলী ইবনে আবি তালিব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমাকে এমন সব দান করা হয়েছে যা, পূর্ববর্তী নবীগণ (আলায়হিস্ সালাম)-এর কাউকে দান করা হয়নি। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! তা-কী? নবীজি বললেন, ১. শত্রুপক্ষের অন্তরে ভীতির সৃষ্টি করে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে। ২. আমাকে ভূমন্ডলের (সকল প্রকার সম্পদ রাজির) চাবি দেয়া হয়েছে। ৩. আমার নাম আহমদ রাখা হয়েছে, ৪. মাটিকে আমার জন্য পবিত্র করা হয়েছে, ৫. আমার উম্মতকে (সকল নবীগণের উম্মতের উপর) শ্রেষ্ঠ উম্মত করা হয়েছে। [ইবনে আবি শায়বা, আহমদ, হাদীস নং ৩১৬৪৭, আহমদ, আল মুসনাদ, হাদীস নং-১৩৬১]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
মহান রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রিয় হাবীব রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় সমুন্নত করেছেন, হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম থেকে হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম পর্যন্ত সমগ্র নবী ও রসুল আলায়হিমুস্ সালামকে যতসব গুণাবলী দান করেছেন তা এককভাবে পূর্ণমাত্রায় প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র সত্ত্বায় দান করেছেন। নবীজির সত্বায় কোন প্রকার অপূর্ণতা, অক্ষমতা, দুর্বলতা ত্রুটি বিচ্যুতি কল্পনা করা, ধারণা করা চিন্তা-চেতনা ও আক্বিদা বিশ্বাসে লালন করা কুফরীর নামান্তর। বর্ণিত হাদীসে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্বের অসংখ্য দিকগুলোর পাঁচটি গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে। পঞ্চম নম্বরে উল্লেখিত বিষয়টি শিরোনামে বর্ণিত বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক। উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য এ বিষয়টি গৌরবের ও আনন্দের যে, অন্য কোন সম্মানিত নবীর উম্মতদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মতের অভিধায় ভূষিত করা হয়নি, অনন্ত অফুরন্ত শোকরিয়া কৃতজ্ঞতা পরম করুণাময় মহান আল্লাহর দরবারে যিনি তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের ওসীলায় নবীজির উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলেছেন। মহান আল্লাহ্ কর্তৃক নবীজির উম্মতের প্রতি শ্রেষ্ঠত্বের এ স্বীকৃতি পবিত্র কুরআনে বিঘোষিত হয়েছে। এরশাদ হয়েছে كنتم خير امة ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত’ ইবনে মাজাহ্ শরীফে হযরত আবু হানীফা (রহ.) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে এরশাদ হয়েছেان هذه الامة مرحومة অর্থাৎ নিশ্চয়ই এ উম্মতের উপর আল্লাহর বিশেষ রহমত অবতীর্ণ হয়েছে।

উম্মত কর্তৃক নবীজির দিদার লাভের প্রত্যাশা
ঈমানের সাথে যারা নবীজির সাক্ষাৎ করেছেন ঈমানের উপর ইন্তেকাল করেছেন, তাঁরা সৌভাগ্যবান সম্মানিত সাহাবা। যারা পূতঃপবিত্র চরিত্রের অধিকারী, যাঁরা সত্যের মাপকাঠি। যাঁদের আদর্শ অনুসরণ ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির পাথেয়। যাঁদের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন ঈমানের পরিচায়ক। যাঁদের ব্যাপারে কটূক্তি সমালোচনা, অশ্রদ্ধা ও অসম্মান মুনাফিক্বীর পরিচায়ক। তাঁরা আল্লাহর দ্বীন ও নবীজির আদর্শকে বুকে ধারণ করে ইসলামের বিজয়ের জন্য কুফরী শক্তিকে পদানত করার জন্য নিজেদের জানমাল পরিবার, পরিজন, সবকিছু বিসর্জন দিয়েছেন। দ্বীনের জন্য সকল প্রকার প্রতিকুলতা অতিক্রম করে সর্বোচ্চ কুরবানী পেশ করেছেন, দুনিয়াতে যাঁরা বেহেশতের সুসংবাদ প্রাপ্ত হয়ে পরবর্তী উম্মতদের জন্য অনুসরণীয় মডেল হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়েছেন যাঁদের মর্যাদা ও সন্তুষ্টির বর্ণনা পবিত্র কুরআনে বিঘোষিত হয়েছে।

رضى الله عنهم ورضوا عنه
অর্থ: আল্লাহ্ তাদের উপর সন্তুষ্ট তারাও আল্লাহর উপর সন্তুষ্ট। তাঁদের আদর্শের অনুসারী পরবর্তীতে তাবেঈন, তবে তাবেঈন, মুজতাহিদ ইমামগণ, তরীক্বতের মহান মাশায়েখ এজাম, আউলিয়ায়ে কেরাম, বুজুর্গানে দ্বীন, হক্কানী রব্বানী ওলামায়ে কেরাম, সত্যান্বেষী ঈমানদার মুসলমানগণ সর্বকালে সর্বযুগে দ্বীনের প্রচার প্রসার, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদা দর্শনকে বিস্তার, মুসলিম উম্মাহর ঈমান আক্বিদার সংরক্ষণ বাতিল মতাদর্শীদের স্বরূপ উম্মোচন কুরআন সুন্নাহর অপব্যাখ্যা ও বিভ্রান্তি নিরসনে নবীজির উম্মতের সত্যপন্থী সুন্নী মুসলমানরা নিজেদের জান মালের কুরবানী দিয়েছেন, ইসলামকে অপব্যাখ্যা ও বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করেছেন। ইসলামের সঠিক রূপরেখা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদা দর্শনকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের ত্যাগ ও কুরবানীর একমাত্র লক্ষ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের দিদার ও সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাদের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে নবীজি ভবিষ্যৎ বাণী করেছেন এরশাদ হয়েছে।
عن ابى هريرة رضى الله عنه قال رسول الله صلى الله عليه وسلم ان اناسًا من امّتى يأتون بعدى يودّ احدكم لواشترى رؤيتى باهله وماله [رواه الحاكم] হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আমার পরে আমার উম্মতের মধ্যে এমন লোকেরা আসবে যাদের প্রত্যেকে আকাক্সক্ষা করবে যে, তারা তাদের পরিবার পরিজন ও ধন সম্পদ (উৎসর্গ) দিয়ে আমার দিদার ক্রয় করে নেবে। (অর্থাৎ তারা তাদের সর্বোচ্চ ত্যাগ ও কুরবানীর মাধ্যমে আমার দিদার প্রত্যাশা করবে) [হাকিম আল মুসতাদরাক, হাদীস নং-৬৯৯১]

আমার উম্মতের বড় দলকে অনুসরণ করো
যুগে যুগে এক শ্রেণির পথভ্রষ্ট উম্মত হেদায়ত থেকে বিচ্যুৎ হয়ে গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়েছে, নিজেরাও পথভ্রষ্ট হয়েছে অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করেছে। আবহমান কাল ধরে উম্মতের একটি জামায়াত সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের উপর অবিচল থাকবে, সত্যের পথে ন্যায়ের পথে সিরাতুল মুস্তাক্বীমের পথে তারা মানুষকে আহ্বান করবে। কুরআন-সুন্নাহ ইজমা কিয়াসের সমষ্টি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদা বিশ্বাস চর্চা ও অনুসরণে তারা সচেষ্ট হবেন, অন্যদেরকেও এ আক্বিদার প্রতি আকৃষ্ট ও অনুপ্রাণিত করবেন, সাহাবায়ে কেরাম, আহলে বায়তে রসূল ও আউলিয়ায়ে কেরামদের মতাদর্শের প্রতি তাঁদের দাওয়াতী কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। তারা সঠিক পথ থেকে বিচ্রুত হবেনা, মিথ্যাচার শঠতা কপটতা ও শরীয়তবিরোধী কর্মকান্ডে তাঁরা সম্পৃক্ত হবেনা, সত্য পথে চলা, সত্য কথা বলা, সত্যের দিকে আহ্বান করা হবে তাদের নীতি-আদর্শ। হুব্বে রসূল তথা নবী প্রেমই হবে তাদের নাজাতের একমাত্র অবলম্বন।
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-
عن ابن عمر رضى الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم لايجمع الله هذه الامة على الضلالة ابدًا وقال : يد الله على الجماعة فاتبعوا السواد الاعظم فانه من شذ شذ فى النار [رواه الحاكم وابن ابى عاصم] অর্থ: হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন আল্লাহ্ তা‘আলা কখনো এ উম্মতকে গোমরাহীর উপর একত্রিত করবেন না। তিনি আরো এরশাদ করেন, সংঘবদ্ধ জামায়াতের উপর আল্লাহর রহমত রয়েছে। তোমরা বৃহত্তম জামায়াতের অনুসরণ করো, নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হলো, তাকে পৃথক করে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে।
[হাকিম, ইবনে আবি আসিম, হাকিম-আল মুসতাদরক হাদীস নং৩৯৭]

বর্ণিত হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, এ উম্মতের সকলে গোমরাহীর উপর ঐক্যমত হবেনা, যারা বৃহত্তম দল এর অনুসরণ করবে, তারা নাজাতপ্রাপ্ত হবে। যারা বৃহত্তম জামায়াত থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে, বৃহত্তম জামায়াত তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসরণ বর্জন করবে তারা জাহান্নামী হবে। হাদীস বিশারদগণ মুক্তিপ্রাপ্ত দলের নামকরণ করেছেন, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআত। এ জামায়াতের উপর রয়েছেন সকল সাহাবায়ে কেরাম, খোলাফায়ে রাশেদীন, হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.), হযরত ওমর ফারুক (রা.), হযরত ওসমান জিন্নুরাইন (রা.), হযরত মাওলা আলী (রা.) প্রমুখ সম্মানিত সাহাবাগণ, আহলে বায়তে রসূল, তাবেঈন, তবে তাবেঈন, মুজতাহিদ ইমামগণ যথাক্রমে হযরত ইমাম আবু হানিফা (রা.), হযরত ইমাম শাফেয়ী (রা.), ইমাম মালেক (রা.), হযরত ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রা.), তরীক্বতের মাশায়েখগণ, গাউসুল আযম দস্তগীর আবদুল কাদের জিলানী (রহ.), খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.), হযরত মুজাদ্দিদ আলফে সানী (রহ.), হযরত বাহাউদ্দিন নকশবন্দ (রহ.), হযরত ইমাম বোখারী (রহ.), হযরত ইমাম মুসলিম, হযরত ইমাম তিরমিযী, ইমাম নাসাঈ, ইমাম আবু দাউদ, ইমাম ইবনে মাযাহ্। শতাব্দীর বিস্ময় কালজয়ী বরেণ্য মুহাদ্দিসিনে কেরাম, কুরআনের তাফসীর বিশারদগণ। এরই ধারাবাহিকতায় মুজাদ্দিদে ইসলাম আ’লা হযরত শাহ্ মাওলানা আহমদ রেযা বেরলভী (রহ.), সদরুল আফাযিল হাকিম সায়্যিদ নঈমুদ্দিন মুরাদাবাদী (রহ.), খাজায়ে খাজেগান খলীফায়ে শাহে জিলান খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (রহ.), কুতবুল আউলিয়া আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি (রহ.), গাউসে জামান আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রহ.) ও গাজীয়ে দ্বীনো মিল্লাত আল্লামা শেরে বাংলা (রহ.)সহ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আরব বিশ্বসহ গোটা মুসলিম দুনিয়ার আউলিয়ায়ে কেরাম, হক্কানী আলেম ওলামা তরীকত ও তাসাওফপন্থী সুফীবাদী সুন্নী মুসলমানরা উম্মতের বৃহত্তর অংশ মুক্তিপ্রাপ্ত দল। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বিদা বিশ্বাসে আমলে, তাকওয়া, পরহেজগারী, সততা, নিষ্ঠা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন পালন ও অনুসরণে, যাঁদের আমল আখলাক শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বহন করে, তাঁরা উম্মতে মোহাম্মদীর মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। সৎ কাজের আদেশ অসৎ কাজের নিষেধ এ গুরু দায়িত্ব সম্পাদনে যারা জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ও ক্ষেত্রে অনুসরণীয়। কর্মগুণে যাঁরা অনুকরণীয়, তাঁরা শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদায় অভিষিক্ত। আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে শ্রেষ্ঠ উম্মতের মর্যাদা অর্জন করার তাওফীক দান করুন। আমিন।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •