দ্বীন বাঁচাবার হোসাইনী বাতিঘর সিরিকোট দরবার-এড. মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার

0

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

দ্বীন বাঁচাবার হোসাইনী বাতিঘর সিরিকোট দরবার (পূর্ব -১)

এড. মোছাহেব উদ্দিন বখতিয়ার >

দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরিফ, বা দরবারে সিরিকোট, দ্বীন রক্ষার সংগ্রামে এক সমুজ্জ্বল বাতিঘরের নাম। পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ খাইবার পাখতুন খোয়ার কোহে গঙ্গর, বা গঙ্গর উপত্যকার এক ঐতিহাসিক অঞ্চল সিরিকোট। একে দুধর্ষ শিখদের কবল থেকে মুক্ত করে মুসলমানদের অধিকারে আনেন ইমাম হোসাইন (রা)’র ২২ তম অধস্তন বংশধর হযরত সৈয়্যদ গফুর শাহ্, ওরফে কাপুর শাহ্ (রা), তাই তাঁকে বলা হয় –ফাতেহ্ সিরিকোট, বা সিরিকোট বিজয়ী তিনি এখানে এসেছিলেন আফগানিস্তানের ‘কোহে সোলায়মানি ‘থেকে, শিখদের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষা করতে, এবং পথ দেখাতে। বিজয়ের পর তিনি আর স্বদেশে ফিরে যাননি, বরং এখানেই থেকে যান –যাতে আবাদি এলাকার ইসলাম ও মুসলমানদের পথ প্রদর্শন করতে পারেন। তিনি থাকতেন এ পার্বত্য এলাকার একদম পাহাড়ের মাথায়। ‘সের’ মানে মাথা, আর ‘কোহ্’ মানে পাহাড়। ‘সেরকোহ্’ মানে পাহাড়ের মাথা। সিরিকোট বিজয়ীর পবিত্র বাসস্থান বুঝাতে ব্যবহৃত শব্দ ‘সেরকোহ্’, শব্দ পরিবর্তনের স্বাভাবিক ভাষাতাত্ত্বিক ধারায়, কালক্রমে মানুষের মুখের জড়তায় পরিবর্তন হতে হতে, ‘সেরকোট’ হয় এবং বর্তমানে এসে ‘সিরিকোট’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সিরিকোট বিজয়ী এই বীর সৈয়্যদ গফুর শাহ্ (রা)’র পূর্বপুরুষরাও ছিলেন এক একজন এক একটা অঞ্চলের বিজয়ী পুরুষ, ইসলামের বাতিঘর। তাঁর ১২ তম উর্ধ্বতন পুুরুষ হলেন মীর সৈয়্যদ মুহম্মদ গীসুদারাজ (ওফাত ৪২১), তিনি গীসুদারাজ আউয়াল হিসেবেও পরিচিত। (যেহেতু, তাঁর চারশত, পাঁচশত বছর পরে, চিশতিয়া ত্বরিকার কিছু বুজুর্গ একই উপাধিতে পরিচিতি পান। উল্লেখ্য, গীসু মানে চুল, দারাজ মানে দীর্ঘ। লম্বা চুল ওয়ালা বুজুর্গগন কখনো কখনো গীসুদারাজ নামেও অভিহিত হয়েছেন)। মীর সৈয়্যদ মুহম্মদ (গীসুদারাজ আউয়াল) হলেন হযরত ইমাম হোসাইন (রা)’র ১০ তম, এবং হুজুর পূর নূর সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ১২তম অধস্তন বংশধর। এই গীসুদারাজ আফগানিস্তান হতে মুলতান পর্যন্ত বিশাল এলাকার ইসলাম প্রচারক এবং বীরপুরুষ ছিলেন। তিনি সতের বার ভারত অভিযানকারী সুলতান মাহমুদ গজনবীর (৯৯৩ -১০৩০ খ্রি ) বিজয়ের নেপথ্যের আধ্যাত্মিক পুুরুষ হিসেবেও পরিচিত। আফগানের ‘কোহে সোলায়মানি’ তাঁকে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার নিদর্শন স্বরুপ সুলতান মাহমুদ গজনবীই দান করেছিলেন। গীসুদারাজ আউয়াল এখানে ইসলাম প্রচারক হিসেবেই ইরাকের আউস থেকে এসেছিলেন। এর আগে তাঁর পূর্বপুরুষ সৈয়্যদ জালাল আর রিজাল (রা) সর্বপ্রথম মদীনা পাকের মূল আবাস ছেড়ে আউসে এসেছিলেন। জানা যায়, মদীনা শরিফ ছেড়ে আসা এই দলে ইমাম আযম আবু হানিফা (রা)’র প্রধান শিষ্য ইমাম আবু ইউসুফ (রা)ও ছিলেন। সৈয়্যদ জালাল (রা)’র আগমনে ইরাকের ‘আউস’ ইসলামি শিক্ষা -দীক্ষা ও ঈমান রক্ষার বাতিঘরে রুপ নিয়েছিল। উল্লেখ্য, সৈয়্যদ জালাল (রা)’র দাদা হলেন হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রা)। আর, ইমাম জাফর সাদেক (রা)’র দাদা হলেন ইমাম জয়নুল আবেদীন (রা), যিনি হলেন কারবালায় ৬১ হিজরির ১০ মুহরমে বেঁচে যাওয়া, হযরত ইমাম হোসাইন (রা)’র একমাত্র শাহ্জাদা। অর্থাৎ, সিরিকোট বিজয়ী গফুর শাহ্ (রা) এমন এক অদ্বিতীয় বংশধারায় এসেছেন, যাঁদের এই উম্মতের আশ্রয়স্থল ‘‘নূহ (আ)’র জাহাজ সদৃশ’’ (হাদিস) বলা হয়েছে। আর, তাঁদের পবিত্রতা ঘোষনা করেন স্বয়ং আল্লাহ্ পাক, কালামে মজিদের মাধ্যমে জানান দিয়েছেন, ‘‘হে আহলে বাইতগণ! নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ্ চাই, তোমাদের মধ্য থেকে সকল অপবিত্রতা দূর করে, তোমাদের পরিপূর্ণ পাক সাফ করে দিতে’’। [আল আয়াত]

সুতরাং আল্লাহ্ পাকের ইচ্ছাতেই তাঁরা পবিত্র। আর,ইসলামের ইতিহাস প্রমান করে যে, এ পবিত্র ধারার নেতৃত্বেই আজো সমগ্র বিশ্ব আলোকিত। সর্বশেষ প্রতিশ্রুত যে মহান ইমামের হাতে আবারো বিশ্বে ইসলামের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, সেই মহাকাঙ্খিত ‘হোসাইনি বাতিঘর’ ইমাম মাহদী (আ) ও হবেন এ বংশধারা থেকেই। গরীবনওয়াজ খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র) বলেছিলেন -‘‘দ্বীন আস্ত হোসাইন, দ্বীন পানাহ্ আস্ত হোসাইন’’ অর্থাৎ, দ্বীনের অপর নামই হল ইমাম হোসাইন, আর দ্বীনের রক্ষকও ইমাম হোসাইন’’। উল্লেখ্য, সেই হোসাইনি বংশধারার বিজয়ী পুুরুষ সৈয়্যদ গফুর শাহ্ (রা)’রই ১৩ তম অধস্তন পুুরুষ হলেন হযরত সৈয়্যদ সদর শাহ্ (র)। আর, সৈয়্যদ সদর শাহর সুযোগ্য শাহজাদা হলেন দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট (শেতালু শরিফ)’র প্রতিষ্ঠাতা প্রাণপুরুষ, শাহানশাহে সিরিকোট, আল্লামা সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি পেশোয়ারী রহমতুল্লাহ্ আলাইহি (১৮৫৬-১৯৬১খ্রি)। তিনি পারিবারিক ঐতিহ্যবাহী বুনিয়াদী তা’লিম-তারবিয়তের পর কোরানে করিমের হিফজ শেষ করেন, এবং এরপর তৎকালিন ভারতের বিভিন্ন দ্বীনি মারকাজ হতে কোরান-হাদিস -ফেকাহ্ সহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞানার্জন করেন। ১২৯৭ হিজরির শা’বান মাসে (১৮৮০ খ্রি) তিনি মাদরাসা শিক্ষার সর্বশেষ সনদ লাভ করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক লেখা-পড়ার সমাপ্তির পর, তিনি তাঁর অর্জিত জ্ঞানও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলামের দাওয়াত পৌঁছাতে মনোনিবেশ করেন। কমপক্ষে ১৬ বছর ক্যাপটাউন, মোম্বাসা, জাঞ্জিবারের বিভিন্ন এলাকায় কলেমার দাওয়াত দিয়ে হাজার হাজার স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গ অমুসলমানকে তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেন। ড: ইব্রাহিম এম মাহদী লিখিত অ ংযড়ৎঃ যরংঃড়ৎু ড়ভ ওংষধস রহ ঝড়ঁঃয অভৎরপধ গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, দক্ষিণ আফ্রিকার ইসলাম প্রচারকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সফলকাম হয়েছিলেন সৈয়্যদ আহমদ পেশোয়ারী নামক ভারতীয় এক ব্যবসায়ী। উল্লেখ্য, সিরিকোটি হুজুর আফ্রিকার একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী এবং ইসলাম প্রচারক ছিলেন বলে পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ স্কলার ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন গবেষকগণের রচনায়ও দেখা যায়, এদের মধ্যে মুফতি আবদুল কাইউম হাজারভী (র), আল্লামা আবদুল হাকিম শরফ কাদেরী (র), আওলাদে রাসুল, আল্লামা সৈয়্যদ আমির শাহ্ গিলানি (র), খ্যাতনামা আ’লা হযরত গবেষকদের মধ্যে প্রফেসর ড: মাসউদ আহমদ (র), ড: মমতাজ আহমদ ছদীদি আল আজহারী সহ অনেকেই রয়েছেন।

শুধু তাই নয়, ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে, দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বপ্রথম জামে মসজিদটিও নির্মিত হয় হযরত পেশোয়ারি (র)’র হাতে, যা ড ইব্রাহিম এম মাহদী’র উক্ত গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, উক্ত মসজিদটি দেখভালের দায়িত্বে এখনো রয়েছেন সিরিকোটি (র)’র ভাইয়ের বংশধর, যিনি হুজুর কেবলা আল্লামা তাহের শাহ্ (মাজিআ)’র আপন নানা ছিলেন। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে সিরিকোটি হুজুরের ভাই সৈয়্যদ ইউসুফ শাহ ্(র) সপরিবারে ক্যাপটাউনে হিজরত করেন এই উদ্দেশ্যে। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকায় নয়, তাঁর হাতে বার্মার হাজার হাজার বিধর্মী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং লক্ষ লক্ষ মুসলমান তওবা করে ঈমানি জিন্দেগীতে ফিরে আসেন, যা সবার জানা আছে। তিনি তাঁর পীর, খলিফায়ে শাহে জীলাঁ, গাউসে দাওরাঁ, খাজা আবদুর রহমান চৌহরভী (র)’র নির্দেশে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে রেঙ্গুনে হিজরত করেন এবং ডিসেম্বর ১৯৪১ পর্যন্ত, রেঙ্গুনের বিখ্যাত বাঙালি সুন্নি জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তাঁর পীর খাজা চৌহরভী (র)’র প্রধান খলিফা ও সাজ্জাদানশীন ছিলেন এবং পীর সাহেবের ইন্তেকাল (১ জিলহজ্ব ১৩৪২ হিজরি,) হতে, ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে পীরের হাতে প্রতিষ্ঠিত হরিপুর দারুল উলুম ইসলামিয়া রহমানিয়ার পরিপূর্ণ পৃষ্টপোষকতা প্রদান করেন। যে মাদরাসাটি তাঁর হাতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নতি করেনি বরং পাকিস্তানের একটি প্রসিদ্ধ দ্বীনি মারকাজ হিসেবে জাতিয় স্বীকৃতি লাভ করে। আমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি সুসংবাদ বয়ে আনে তাঁর রেঙ্গুন জীবন। এই সময় তাঁর হাতে বায়াত গ্রহণের সুযোগ পান চট্টগ্রামেরই কয়েকশ সৌভাগ্যবান ব্যক্তি। এদের মধ্যে চট্টগ্রাম রাউজানের কৃতী পুরুষদের মধ্যে, চট্টগ্রাম সংবাদপত্র শিল্পের পথিকৃৎ, দৈনিক আজাদী প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার, মাস্টার আবদুল জলিল, আলহাজ সূফি আবদুল গফুর, মোয়াজ্জেম হোসেন পোস্টমাস্টার সহ বহু খ্যাতনামা ব্যক্তি ছিলেন।তাঁদের আবেদন-নিবেদন, এবং আল্লাহর ইচ্ছাতে তিনি ১৯৩৫-৩৬ খ্রিষ্টাব্দ হতে করাচি, কলিকাতা, রেঙ্গুনের পথে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে কয়েকদিন যাত্রা বিরতি করতেন এবং পরবর্তিতে, রেঙ্গুন ত্যাগের পর, ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ হতে পুরো রেঙ্গুন মিশন নিয়েই তিনি চট্টগ্রামে চলে আসেন। তাঁকে চট্টগ্রামে তশরিফ আনতে যাঁরা আবেদন জানান তাঁদের মধ্যে ইমাম শেরে বাংলা (র) অন্যতম। তিনি রেঙ্গুনে সফরে গিয়ে সুন্নি মুসলমানদের কাছে সিরিকোটি হুজুরের কামালিয়াত সম্পর্কে শুনতে পান এবং তাঁর সাথে সাক্ষাত করতে বাঙালি সুন্নি জামে মসজিদে যান। তাঁর সাথে মোলাকাত করার সুবাধে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক উচ্চস্তর সম্পর্কে অবগত হন এবং তাঁকে চট্টগ্রামে আগমন করার অনুরোধ জানান। ইমাম শেরে বাংলা (র), সেদিনের মোলাকাতে সিরিকোটি হুজুরকে কতটুকু চিনেছিলেন তা, তাঁর রচনা ‘‘দিওয়ান এ আজিজ’’র মন্তব্য দেখে অনুধাবন করা যায়। ইমাম শেরে বাং লা (র) বলেন-
‘‘মুক্তাদায়ে আলেমা আউর পেশওয়ায়ে সালেক্বা
দর জমানশ মান নাভী নম মিসলেও পীরে মগাঁ’’
অর্থাৎ হযরত সিরিকোটির মত এমন পীরে মগাঁ আমি পৃথিবীর কোথাও দেখিনি, তিনি আলেমদের শিরমনি, সালেক্ব বুজুর্গগনের পেশওয়া ছিলেন’’।

যাক, চট্টগ্রামে সিরিকোটি হুজুরের আগমনের ফলে, মূলত ব্রহ্মদেশে তাঁর হাতে শুরু হওয়া দ্বীনি মিশনের কেন্দ্র চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছিল স্থায়ীভাবে। ১৫ ফেব্রুুয়ারি ১৯২৫ তারিখে, তিনি রেঙ্গুনের সুলে পেগোডা সড়কের বাঙালি সুন্নি জামে মসজিদে বসে তাঁর বিশাল দ্বীনি মিশনে নিজের মুরিদদের কর্মি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন ‘‘আনজুমানে শূরায়ে রহমানিয়া’’। এ আনজুমান ২৯ আগস্ট ১৯৩৭ হতে প্রথমে রেঙ্গুনের চট্টগ্রাম শাখা হিসেবে এবং পরে ১৯৪২ হতে কেন্দ্রিয় সংগঠনের ভূমিকা পালন করে চট্টগ্রামে। সিরিকোটি হুজুর চট্টগ্রামে ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক সাহেবের বাসভবন ‘‘কোহিনুর মঞ্জিলে’’। ডিসেম্বর ১৯৪৯, বাশখালিতে তাঁর এক মাহফিলে, ওহাবীদের দরুদ-সালাম বিরোধি আচরণ এ হোসাইনি বীর মুজাহিদকে এমন ক্ষুদ্ধ করেছিল যে, এরই প্রতিক্রিয়ায় তিনি চট্টগ্রামের জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসা (১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই জামেয়া আজ সুন্নি মুসলমানদের প্রধান বাতিঘর হিসেবে স্বীকৃত। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে যে, জামেয়া না হলে সুন্নি-সূফী ধারার ইসলামের বাতি বহু আগেই নিভে যেত। বাংলাদেশের এমন কোন জায়গা পাওয়া যায়না, যেখানে সুন্নিয়তের বাতি জ্বলছে অথচ জামেয়ার কোন সম্পৃক্ততা নাই। বাংলাদেশের এমন কোন দরবার নাই,এমন কোন সুন্নি প্রতিষ্ঠান নাই, যারা এই জামেয়া দ্বারা কোন না কোনভাবে উপকৃত নয়। বলতে দ্বিধা নাই, সবাই ঋণী এই জামেয়ার কাছে যা ‘‘সুন্নিয়া মাদরাসা’’ নামে আজ সব মহলে খ্যাতিমান। শহীদ মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকি (র.)’র ভাষায় ‘এটা সুন্নিদের প্রধান ক্যান্টনমেন্ট’। আজ জামেয়া শুধু বাংলাদেশকে নয়, বিশ্বব্যাপি সুন্নিয়তের আলো বিতরন করে যাচ্ছে, যা সচেতন মহল সহজে আঁচ করতে পারছেন। আজ তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘‘আন্জুমান’’ বাংলাদেশের সুন্নিদের প্রধান আশ্রয়কেন্দ্র। সবাই তাদের অভাব, অভিযোগ এবং মিল্লাত- মাজহাবের সুরক্ষার প্রয়োজনে সহযোগিতা চায় আনজুমানের কাছে। যা প্রথমে শূরায়ে রহমানিয়া (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৫ রেঙ্গুন, ২৯ আগস্ট ১৯৩৭ চট্টগ্রামে) নামে কাজ করে ৩০ বছর। পরে, ২২ জানুয়ারি ১৯৫৪ ‘‘আনজুমানে আহমদিয়া সুন্নিয়া’’ প্রতিষ্ঠা করা হয় নতুন মাদরাসা বাস্তবায়নের জন্য। এরপর এ দুই আনজুমান যুক্ত হয়ে বর্তমান রূপ ‘‘আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া’’ (১৮ মার্চ ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) নামে খ্যাতি পেয়েছে। এবং দেশে অপ্রতিদন্দ্বী একটি অরাজনৈতিক-আধ্যাত্মিক সংস্থা হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে সুন্নিয়ত-শরিয়ত-ত্বরিকতের। আজ এ আনজুমান পরিচালনা করছে শতাধিক সুন্নি মাদরাসা, এর আওতায় আছে হাজারো খানক্বাহ্ এ কাদেরিয়া। মোটকথা, শাহানশাহে সিরিকোট (র)’র অবদান ব্যাপক এবং বিশ্বময়, যা এই ছোট প্রবন্ধে ধারন করা সম্ভব নয়। সিরিকোটি হুজুরের কামালিয়াত বর্ণনাতীত। ইমাম শেরে বাংলা (র) তাঁর সম্পর্কে যা বলেছেন, তা যথাযথ, ‘তাঁর (সিরিকোটি সাহেব) মত কামেল পীর আমি গোটা জাহানের মধ্যেও খুঁজে পাইনি’। রেঙ্গুনের বিখ্যাত কামেল দরবেশ সুলতান আউলিয়া সৈয়্যদ আবদুল হামিদ (র) এতবড় বুজুর্গ হবার পরও বায়াত হয়েছিলেন সিরিকোটি হুজুরের হাতে। ১৯৪৫ সনের হজ্জ্বের সময়ে, মদীনা পাকের রওজা মোবারকের প্রধান খাদেম সৈয়্যদ মনজুর আহমদ (র)ও বায়াত হয়েছিলেন এই সিরিকোটি হুজুরের হাতে। তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় মোহিত হয়ে ১৯৫৮ সনের হজ্জ্বের সময়ে চট্টগ্রাম শহরের একজন খ্যাতনামা পীর সাহেব (ফাসাদ এড়াতে নাম উল্লেখিত হলনা) সিরিকোটি হুজুরের হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়। যদিও, তিনি নিজে বুজুর্গির চেয়ে দ্বীনের সেবাকে অনেক বেশি পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, ‘ফকিরি-টকিরি মত কর, সাধাসিদা মুসলমান বন যাও, দ্বীনকো খেদমত কর’। তাই, এখানে সবাই দ্বীনের খেদমতকেই প্রাধান্য দেয়, ফকিরিকে নয়। অথচ, তিনি ছিলেন পীর-আউলিয়ার প্রধান আসন – ‘‘গাউসে জামান’’ মর্যাদায় আসীন, যা ইমাম শেরে বাংলা’র উক্ত উক্তির সাথে এবং উক্ত ঘটনাগুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর মহান পীর, খলিফায়ে শাহে জীলান, গাউসে দাওরান, খাজা চৌহরভী (র)ও তাঁকে উক্ত আসন সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছিলেন। বলেছিলেন-‘গাউসে জামান’ পদ কাদেরিয়া ত্বরিকার জন্য, এ ত্বরিকায় যদি আওলাদে রাসুল (দরুদ) পাওয়া যায়, তবে তো কথা নাই। তাঁর পীরের এ উক্তিতে শুধু তাঁর জন্য নয়, বরং তাঁর পরবর্তিতে দরবারের সাজ্জাদানশীন কয়েকজন আওলাদে পাকের জন্যও সুসংবাদ ছিল, যা আজ সচেতন মহলের কাছে স্পষ্ট। সিরিকোটি হুজুর বাংলাদেশ সফর সমাপ্ত করেছিলেন ১৯৫৮ সনে। এই বছরই চট্টগ্রামে আসেন তাঁর পরপর দু’জন ভবিষ্যত সাজ্জাদানশীন। প্রথমজন তাঁর শাহজাদা মাতৃগর্ভের অলী, গাউসে জামান, আল্লামা হাফেজ সৈয়্যদ মুহম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহমতুল্লাহ্ আলাইহি। যিনি এদেশে জসনে জুলুসের মত এ শতাব্দির শ্রেষ্ঠ সংস্কারের রূপকার। তাঁকে চট্টগ্রামেই খেলাফত দান করা হয় রেয়াজুদ্দিন বাজারের শেখ সৈয়দ ক্লথ স্টোরে খতমে গাউসিয়া শরিফ চলাকালে।

দরবারে আলিয়া কাদেরিয়া সিরিকোট শরিফের এ মহান সাজ্জাদানশীন আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (র)’র আধ্যাত্মিক মর্যাদা যে কত উপরে তা অনুধাবনের জন্য এই ঘটনাই যথেষ্ট, এক ভাগ্যবান জুতার দোকানি সব সময় জুতা বানিয়ে দিতেন তাঁর পীর সিরিকোটি হুজুরের জন্য। এবার তাঁর ইচ্ছা হল শাহজাদা তৈয়্যব শাহ্’র জন্যও এক জোড়া জুতা উপহার দেবেন। সিরিকোটি হুজুর, রেয়াজুদ্দিন বাজারের ঐ দোকানির ইচ্ছার কথা শুনে খুশী মনে ইজাজত দিলেন জুতা বানাতে। জুতার মাপ কত জানতে চাওয়ায় হুজুর বললেন-আমার জুতার মত একই সাইজে বানালে হবে। কয়েকদিন পর, জুতা নিয়ে আসলেন সওদাগর। দেখে খুব খুশি হয়ে দোয়াও করলেন-হুজুর সিরিকোটি (র) কিন্তু জুতা বরাবর মাপ মত হল কি হলনা সেটা পরীক্ষা না করে সওদাগরের মনের খটকা যাচ্ছিল না। তাই, তিনি একটু আবদার করে বললেন, হুজুর জুতা আপনার মাপেই বানিয়েছি, তবু একটু আপনি যদি পায়ে দিয়ে দেখতেন-বেশকম হলে ঠিক করে দিতে পারতাম। এতক্ষণ তাঁর চোখ মুখে ছিল আনন্দের ঝলক, আর এ আবদার শুনা মাত্রই তা নিমিষে হারিয়ে গেল, তাঁর চেহেরা লাল হয়ে গেল, বললেন-‘‘খামোশ! মুজেহ্ হিম্মত নেহী হ্যায় তৈয়্যব কা জুতো পর পাও রাখেহ্, উনকা মকান বহুত উঁচা হ্যায়, তৈয়্যব মাদারজাত অলী হ্যায়’’ ইত্যাদি আরো বহু আধ্যাত্মিক মন্তব্য। হযরত শাহানশাহ্ সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (র) বলেছিলেন -‘‘হযরত তৈয়্যব শাহ্ ইসলামি জাহানের মস্তবড় হাস্তি, তিনি ইসলামকে জিন্দা করতে এসেছেন’’ । কুমিল্লা- শাহপুর দরবারের পীর ড. আহমদ পেয়ারা বাগদাদী (র) হুজুর কেবলা তৈয়্যব শাহ্কে সবসময় প্রকাশ্যেই ‘‘গাউসে জামান’’ বলতেন। এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি স্বয়ং গাউসে পাকের মাজার পাক বাগদাদ শরিফে আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ (র)’র একটি জিয়ারাত সফরের (সম্ভবত তাঁর ১৯৭৮ সনের বাগদাদ সফর) ঘটনা উল্লেখ করে বলেন-সেবার গাউসে পাক, বড়পীর, আবদুল কাদের জিলানী (রা)’র মাজারের বিশেষ জায়গায় জেয়ারাতের অনুমতি পান হুজুর তৈয়্যব শাহ্। তাঁর অব্যবহিত পরের অনুমোদিত জেয়ারাতকারী ছিলেন আফ্রিকার একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান। সবার সময় সুনির্দিষ্ট। কিন্তু হুজুর কেবলা তৈয়্যব শাহ’র সময় শেষ হবার পরও তিনি ভিতর হতে ফিরছেন না, আর ঐ দিকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সিডিউল ভঙ্গ হবার উপক্রম, বারবার তাগিদ আসছে দায়িত্বশীল খাদেম হিসেবে ড. আহমদ পেয়ারা বাগদাদী সাহেবের প্রতি। তাই, তিনি নিরুপায় হয়ে, ভিতরে প্রবেশে বাধ্য হলেন, আর দেখলেন, হুজুর তৈয়্যব শাহ্ সে সময় বড়পীর গাউসুল আযম (রা)’র সাথে সমগ্র জাহানের হিসাব-কিতাব নিয়ে ব্যস্ত, কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছেন, আর নতুন কিছু বুঝে নিচ্ছেন বড়পীর সাহেবের কাছ থেকে এবং ঈঙ্গিত পেলেন আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ এই ‘‘জামানার গাউস’’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন-যার নিয়ন্ত্রন মূলত বাগদাদ শরিফেই রয়েছে। তাঁর ‘‘গাউসে জামান’’ হবার প্রসঙ্গটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এমন বহু আধ্যাত্মিক ঘটনা রয়েছে যা এখানে আলোচনা প্রাসঙ্গিক হলেও প্রবন্ধ হয়ে ওঠবে অনেক দীর্ঘ। তাই, উপরে আলোচিত কয়েকটিতেই সীমিত রাখা হল। আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ ছিলেন ইসলামের মহান সংস্কারক-মুজাদ্দিদের আসনের উপযুক্ত একজন ‘‘গাউসে জামান’’। তাঁর এক অদ্বিতীয় বাণী হল -‘‘কাম কর, দ্বীনকো বাচাও, ইসলামকো বাচাও, সাচ্চা আলেম তৈয়ার কর’’ যা আজ শুধু বাণীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং কাজে পরিণত হয়ে সুন্নিয়তের বাতিকে উজ্জ্বলতর করে দিয়েছে। এখন বাংলাদেশে তৈয়্যবিয়া, তাহেরিয়া, সাবেরিয়া, আহমদিয়া, কাদেরিয়া নামে শত শত মাদরাসা কায়েম হয়ে সাচ্চা আলেম তৈরীর আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েছে। হযরত জিয়াউল হক মাইজভান্ডারী (র)র কালামও হক্ব – সত্যিই ‘হযরত তৈয়্যব শাহ্ ইসলামকে জিন্দা করতেই এসেছেন’। তিনিও ছিলেন দ্বীন বাঁচাবার হোসাইনি এক উজ্জ্বল বাতিঘর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জসনে জুলুস সকল সুন্নি দরবার ও মহলের কাছে পর্যায়ক্রমে সমাদৃত ও পালিত হতে হতে এখন শুধু বাংলাদেশেই বের হয় হাজার হাজারটি জসনে জুলুস। আর দরবারে সিরিকোটের বর্তমান সাজ্জাদানশীন হযরত আল্লামা তাহের শাহ্ হুজুরের নেতৃত্বে, আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট’র চট্টগ্রামের জুলুসে যোগ দেন ত্রিশ চল্লিশ লাখের মত সুন্নি জনতা, যা সুন্নিয়তকে যেমন নবজীবন দান করে, তেমনি বাতিল শিবিরে সৃষ্টি করে মহাতংক। বাতিলদের হাজারো প্রকাশনার জবাব দিতে সুন্নিদের নিয়মিত কোন প্রকাশনার অস্তিত্ব সংকট যখন প্রকট, তখন ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭৬ তিনি মাসিক পত্রিকা ‘‘তরজুমান এ আহলে সুন্নাত’’ প্রকাশের নির্দেশ দিলেন। মাসিক তরজুমান এখনও সুন্নিয়তের পক্ষে প্রধান এবং নিয়মিত প্রাচীন মুখপত্র। তাঁরই নির্দেশনা অনুসরনে আনজুমান হতে কমপক্ষে অর্ধশত পুস্তক প্রকাশিত হয়েছে এর মধ্যে। খতমে গাউসিয়া, গেয়ারভী শরিফ, সবসে আউলা-মুস্তফা জানে রহমত আজ ঘরে ঘরে চালু আছে তাঁরই কারণে। আজ যে মসজিদে আজানের আগে সালাত-সালাম হয়, সেখানে সচেতন সুন্নিরা জামাতে নামাজ আদায়ে দ্বিধাগ্রস্থ হয়না। আর এটা তৈয়্যব শাহ্ হুজুরের সংস্কার। মসলকে আ’লা হযরতের যে বুনিয়াদ তাঁর আব্বা হুজুর সিরিকোটি (র) জামেয়া প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্থাপন করেছিলেন তা তৈয়্যব শাহ্ হুজুরের হাতে সমগ্র বাংলাদেশ, এমনকি বহির্বিশ্ব পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তাঁর পরিচর্যায় সিলসিলায়ে আলিয়া কাদেরিয়া ফিরে পায় নতুন জীবন। সময়ের সেরা ওলামারা ছিলেন তাঁর মুরীদ,তাঁর হাতে মুরীদ হওয়া আলেম-হাফেজদের সংখ্যাও ছিল হাজার হাজার। এসব সাচ্চা আলেমদের পরিচর্যায় তাঁর সংস্কার কর্মসূচি সহজে পৌঁছে যায় দেশ- দেশান্তরে। আজ রাজধানি ঢাকার বুকে সুন্নিদের একটি মাত্র কামিল মাদরাসা হল-মুহম্মদপুর কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া আলিয়া (অনার্স-মাস্টার্স), যা ১৯৬৮ সনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর হাতে বাংলাদেশ-পাকিস্তান -রেঙ্গুনসহ বিভিন্ন দেশে বহু মাদরাসা কায়েম হয়। বিশেষত তাঁর বাংলাদেশে শেষ সফর হয় ১৯৮৬ সনে। এ বছরই তিনি তাঁর এ দ্বীন বাঁচাবার হোসাইনি মিশনকে বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন গাউসিয়া কমিটি, যা ১৯৮৭ হতে ‘‘গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ’’ নামে এগিয়ে চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশে অন্তত ৫০ টি জেলায় এবং পৃথিবীর অন্তত ৩০ টি দেশ-প্রদেশে এ সংগঠন বিস্তার লাভ করে দ্বীনের সেবায় অবদান রেখে যাচ্ছে। ১৯৮৭ সাল থেকে দরবারে সিরিকোটের পরবর্তি সাজ্জাদানশীন হিসেবে বাংলাদেশ সফর করে আজ ৩২ বছর ধরে শরিয়ত-ত্বরিকত পাহাড়া দিয়ে যাচ্ছেন রাহনুমায়ে শরিয়ত ও ত্বরিকত, আল্লামা সৈয়্যদ মুহম্মদ তাহের শাহ্ (মা.জি.আ)। তিনি ১৪০৭ হিজরি থেকে ১৪৩৯ পর্যন্ত ৩৩ টি জসনে জুলুসে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে জসনে জুলুসে বর্তমানে ৩০-৪০ লাখ মানুষের সমাগম হচ্ছে চট্টগ্রামে। তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর ১৯৫৮ সনে। তখন তাঁর বয়স ১৬ বছর। সেবার এই তরুন বড় নাতিকে নিয়ে সিরিকোটি হুজুর হজ্জ্বে যান চট্টগ্রাম থেকেই, সফিনায়ে আরব নামক পানির জাহাজে। এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক নির্দেশনার কথা তিনি তাঁর বিশিষ্ট মুরীদদের বলে আসছিলেন ১৯৪৫ সনের হজ্জ্বের পর হতে। ১৯৪৫ সনের হজ্জ্বে, মদিনা শরিফ থেকে বিদায়েরকালে স্বয়ং রাসুলেপাক সল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম সিরিকোটি হুজুরকে নির্দেশ করেন, যেন আগামিবার হজ্জ্বে আসবার সময় বড় নাতি তাহের শাহ্ কে সাথে নিয়ে আসেন। কিন্তু এ কাজটি এ নির্দেশের অব্যবহিতপর করা সহজ ছিলনা, কারণ তখন তাঁর বড় নাতি সৈয়্যদ মুহম্মদ তাহের শাহ্ (জন্ম ১ ডিসেম্বর ১৯৪২)’র বয়স দুই বছরের কিছু বেশি মাত্র। সেকালে, পানির জাহাজে হজ্জ্ব যাতায়াত ছিল কয়েকমাসের কঠিন সফর। তাই, তিনি খুব চিন্তিত থাকতেন কখন যে এ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবেন। আর এ মহান নির্দেশ পালন করলেন ১৯৫৮ সনে, চট্টগ্রাম থেকে হজ্জ্বে যাবার সময় বড় নাতি তাহের শাহ্ (মাজিআ) কে সাথে নিয়ে গেলেন, সফিনায়ে আরব জাহাজে, সাথে ছিলেন মুরীদ-ভক্তদের বড় কাফেলা। তখন হুজুর কেবলা তাহের শাহ্’র বয়স হয়েছিল ১৬ বছর। সবচেয়ে কনিষ্ঠ এ হাজী সাহেবকে, দাদা হুজুর সিরিকোটি সাহেব কেবলা আরাফাতের ময়দানে বায়াত করান এবং মদিনা পাকে নিয়ে গিয়ে মদিনাওয়ালার কাছে হাওলা করেন, সুবহানআল্লাহ। সিরিকোট এলাকার বাসিন্দারা এ ঘটনার বিষয়ে শুরু থেকেই জানতেন, তাই, তাঁরা হুজুর কেবলা তাহের শাহ্ কে সম্বোধন করেন-হাজী সাহেব। আর পীর সাহেব ডাকা হয় -পীর সাবির শাহ্’কে, যিনি পীরে বাঙ্গাল হিসেবে এ দেশে বহুল পরিচিত। আর, সমগ্র পাকিস্তান, এমনকি আন্তর্জাতিকভাবেও পরিচিত-পীর সাবির শাহ্ নামে। কারণ, তাঁর জন্মের পর পরই, তাঁর দাদাজান কেবলা সিরিকোটি হুজুর বলেছিলেন, ‘সাবির শাহ্ পাকিস্তান কা লিডার হোগা, আউর বাঙ্গাল কা পীর হোগা’। পীর সাবির শাহ্’র মর্যাদা সম্পর্কে দাদা হুজুর সিরিকোটি এবং আব্বা হুজুর তৈয়্যব শাহ্ কেবলা’র রয়েছে বহু তাৎপর্যপূর্ণ বাণী। সুবহানআল্লাহ, এখন তিনি ময়দানের বীর, পাকিস্তানের জনপ্রিয় লিডার, সিনেটর। ইনশাল্লাহ্, সহসা হবেন খানকাহ্’র পীর- পীরে বাঙ্গাল। তাঁর সময়ে তিনি হবেন অপ্রতিদন্দ্বী কামেল পীর, আর দ্বীন বাঁচাবার আন্দোলনে মহান এক কর্মবীর। অলির জবান-খোদার জবান, বরহক্ব, বরহক্ব। উল্লেখ্য, পীর সাবির শাহ্ এবং আল্লাহ্ তাহের শাহ্ (মা.জি.আ) উভয়েই তদীয় আব্বা হুজুর গাউসে জামান তৈয়্যব শাহ্ (র)’র সাজ্জাদানশীন খলিফা। ১৯৮৭ থেকে বায়াতের দায়িত্বটা পালন করছেন হুজুর কেবলা তাহের শাহ্ (মা.জি.আ)। অথচ, আপন বড় ভাই কে সম্মান দেখিয়ে পীর সাবির শাহ্ দরবারের এ পীর-মুরীদির দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং ক্ষমতাবান হওয়া সত্ত্বেও আজ ৩১ বছর ধরে এ পীর-মুরীদির কাজ থেকে নিজেকে সযত্নে দুরে রেখেছেন -যা অন্য দরবারে বিরল।

ত্বরিকতের শিক্ষা হল নিজেকে কুপ্রবৃত্তি বা লোভ-লালসা, হিংসা-অহংকার-আমিত্বের কবল থেকে মুক্ত রাখা, তারপর অন্যকেও সে সবক অনুশীলনে উৎসাহী করা। পীর সাবির শাহ্ প্রমাণ করলেন-তিনি নিজে নফসানিয়ত হতে মুক্ত। যে নিজে লোভী সে অন্যকে কীভাবে সুপথ দেখাবে, কীভাবে ত্বরিকতের সবক দেবেন? আজ ত্বরিকতের নামে যে অসহনশীল মহড়া দেখা যায়- এ থেকে দরবারে সিরিকোট সম্পূর্ণ মুক্ত, আলহামদুলিল্লাহ্। এতবড় সিরিকোট দরবারের কোথাও কোন দানবাক্স নাই –নাই কোন আমদানিখানা। তাঁরা কারো হাদিয়া বা দানের ধার ধারেননা। এমনকি, কারো খেদমতের আশাও করেননা বরং নিজেরা, আওলাদে পাকেরাই দরবারের মেহমানদের খাদেম, আর মুরীদ -ভক্তরা হলেন মেহমান। দরবারে কোথাও নাই পীরের কোন বিশেষ আসন বা গদী। পীর-মুরীদ-ভক্ত-মেহমান সবার আসন মর্যাদা সমান। তাই তো একবার পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ, দরবারে সিরিকোট গিয়ে পীরের কোন আসন খুঁজে না পেয়ে, অবশেষে পীর সাবির শাহ্ কে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘‘আপনার আব্বা হুজুরের আসন কোথায়? পীর সাবির শাহ্, জানালেন, হুজুরের কোন আলাদা আসন নাই-উনি গদীতে বসেন না, বসেন চাটাইতে’’ সুবহানআল্লাহ। জিনকি হার হার আদা সুন্নতে মুস্তফা -এয়সে পীরে ত্বরিকত পে লাখো সালাম’। দরবারে সিরিকোট সুন্নতে নববীর এক উজ্জ্বল নমূনা, অন্য সব দরবারের প্রেরণার ঠিকানা। এ দরবার আদর্শে যেমন অতুলনীয়, সেবার দিক থেকেও বেমেসাল, আর, সুসংবাদ রয়েছে, এখানে থাকবেন গাউসিয়াতের এক একজন নিশান বরদার। এ দরবারের প্রধান নির্দেশ হল, -‘‘কাম কর, দ্বীনকো বাচাও, ইসলাম কো বাচাও, সাচ্চা আলেম তৈয়ার কর’’। বড়পীর গাউসে পাক (রা) দ্বীন বাঁচিয়েছেন, বলে তাঁকে ‘‘মূহীউদ্দিন’’ বলা হয়। আর, এ দরবারের নির্দেশও হল, ‘‘দ্বীন বাঁচাও’’। সত্যিই আজ বড়পীরের নিশান উড়ছে-দরবারে সিরিকোটে। গাউসে পাক (রা) তাঁর ‘‘কাসিদায়ে গাউসিয়ায়’’ বলে গেছেন, ‘‘আনাল জী’লী মূহীউদ্দিন ইসমি, ওয়া আ’লামি আ’লা রা’সিল জেবালি’’ অর্থাৎ আমি জীলান নগরের, আমার পরিচয় হল দ্বীনের জীবনদাতা (মূহীউদ্দিন), আর, আমার পতাকা দেখ ঐ পাহাড়ের মাথায়। জানিনা, কোন রহস্য আছে কিনা-পাহাড়ের মাথা যেন, আজও-গাউসে পাকের ঠিকানা। আগেই বলা হয়েছে, ‘সের’ মানে মাথা, আর ‘কোহ’ মানে পাহাড়। ‘সেরকোহ্’ মানে পাহাড়ের মাথা। আর, সেরকোহ, শব্দটিই কালক্রমে হয় ‘‘সিরিকোট’’। সিরিকোটের শাব্দিক অর্থ এবং ব্যুৎপত্তিগত অর্থ শুধু পাহাড় শীর্ষ নয়-বাস্তবেও, প্রাকৃতিকভাবেও এই দরবার আছে হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড়ের মাথায়। বাতিঘর, মিনার সদৃশ উঁচু ঘরকে বুঝায়, রাতের আঁধারে চলমান জাহাজ কে পথ দেখাতে, কুল চেনাতে এ বাতির ব্যবহার চলছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই। প্রকৃত অলি-আউলিয়া এবং আহলে বাইতগন উম্মতের জন্য সেরূপ বাতিঘর, এমনকি এর চেয়েও অনেক বেশি। দরবারে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীন হযরতগন বংশেও হোসাইনি, চেতনায়ও হোসাইনি, আর ত্বরিকায় হলেন ‘‘কাদেরী’’। গাউসে পাক (রা)’র সবচেয়ে প্রিয় শাহজাদা সৈয়্যদ আবদুর রাজ্জাক (রা) এবং নাতি খাজা আবু সালেহ্ নজর (রা)’র মাধ্যমে যে মূল সিলসিলাহ্ অব্যাহত আছে এরই প্রতিনিধিত্বের সৌভাগ্য হয়েছে সিরিকোটের সাজ্জাদানশীনদের। ‘‘কেবলায়ে ওশ্শাকে হযরত সৈয়্যদে আবদুর রাজ্জাক-খাজা বু সালেহ্ নজর গাউসুল ওয়ারা কে ওয়াস্তে’’। সিরিকোটের বাতিঘর, দ্বীনের জন্য নিবেদিত ইমাম হোসাইন (রা), আর দ্বীনের জীবনদাতা গাউসে পাক (রা)’র সাথে অবিচ্ছেদ্য। তাই, এ দরবার পথ দেখায় দিশেহারাদের জন্য হোসাইনি বাতিঘর হয়ে, আর আশ্রয় দিয়ে যাবে নূহ (আ)’র জাহাজ হয়ে আখেরি জামানার উম্মতদের। গাউসে জামান তৈয়্যব শাহ্ (রহ.) বলেন, ‘মেরে বাচ্চা মাহদি (আ.) কা ফৌজ বনেগা, আউর দাজ্জালকা সাথ জেহাদ করেগা’ সুবহানাল্লাহ্।

সুতরাং সর্বশেষ প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদী (আ.)’র কাফেলায়ও থাকবে এ দরবারের সৌভাগ্যবান ফৌজগণ। সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে সিরিকোট দরবার এবং এর দ্বীনী মিশন। সে আলামত সুস্পষ্ট। পীর সাবির শাহ্ (মা.জি.আ.)’র পরও কামিল বুযুর্গ এ দরবারে রয়েছেন। শাহযাদা আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়্যদ মুহাম্মদ আহমদ শাহ্ (মা.জি.আ.)’র বুযুর্গী এতোমধ্যেই প্রচারিত হয়েছে। যা আগাম না বলাই ত্বরিকতের শিক্ষা, তাই আর অগ্রসর না হওয়াই উচিত হবে। আল্লাহ্ পাক আমাদেরকে এ মহান দরবারের দিক নির্দেশনা অনুসারে দ্বীনি খেদমতে জীবন উৎসর্গ করার তৌফিক দিন। আমিন। বেহুরমতে সৈয়্যদিল মুরসালিন সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম।

২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ খ্রিস্টাব্দ, গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ রাউজান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ শাখা আয়োজিত ‘দ্বীন বাচাঁবার হোসাইনী বাতিঘর সিরিকোট দরবার’ শীর্ষক সেমিনারে পঠিত মূল প্রবন্ধ। স্থান: রাউজান উপজেলা মিলনায়তন।
===============

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •