বুখারী শরীফ তিলাওয়াত করলে সাওয়াব হবে কিনা?

0

মুহাম্মদ আবুল মোকার্‌রম আমিরী, আমিরভান্ডার, পটিয়া, চট্টগ্রাম।

প্রশ্নঃ হাদীস শরীফ ওহী গায়্‌রে মাতলূ, কোরআন শরীফ ওহী-ই মাতলূ; যা তিলাওয়াত করলে প্রতি অক্ষরে দশটি নেকী পাওয়ার কথা হাদীস শরীফে বর্ণনা বিদ্যমান। আর পবিত্র হাদীসের কিতাব ছহি বুখারী শরীফ তিলাওয়াত করলে সাওয়াব হবে কিনা এবং এ ধরনের খতম আদায়ের উপর কোরআন, হাদীস ও ফিকহ্ এর বিস্তারিত দলিল প্রদান করলে উপকৃত হব।

উত্তরঃ দ্বীনের মৌলিকত্বের নিরিখে পবিত্র কোরআনের পরেই পবিত্র হাদীসে নববীর স্থান। যে পবিত্র যবান থেকে হিদায়তের মূল উৎস কোরআনুল করীম উচ্চারিত হয়েছে, সেই পবিত্র যবান থেকেই নিঃসক্সত হয়েছে ‘আল্‌-হাদীস’। পার্থক্য এখানে যে, কোরআন মজীদ প্রকাশ্য ওহী আর হাদীসে নববী অপ্রকাশ্য ওহী, যা প্রকাশ্য ওহীর ব্যাখ্যা স্বরূপ. পবিত্র কোরআনে এ দুঞ্চটি দিকের কথা তুলে ধরে এরশাদ হয়েছে, وَأَنْزَلَ اللّٰہَ عَلَیْکَ الْکِتَابَ وَالْحِکْمَۃَ ‘‘আল্লাহ্‌ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন’’ [সূরা নিসা, আ. ১১৩]

এখানে ‘হিকমত’ বলে অনেক তাফসীর বিশারদগণের মতে হাদীসকে নির্দেশ করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লামা কিরমানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন যে, فَانّ علم الحدیث بعد القراٰن ھو افضل العلوم واعلامہا واجلّ المعارف واسناھا من حیث انّہ بہٖ یُعلم مراد اللہ تعَالٰی من کلامہٖ ومنہ تظھر المقاصد من احکامہٖ

অর্থাৎ,‘‘পবিত্র কোরআনের পর সকল প্রকার জ্ঞানের মধ্যে সর্বাধিক উন্নত, উত্তম এবং তথ্য ও তত্ত্বসমৃদ্ধ শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে ‘ইল্‌মে হাদীস’। এ কারণে যে, এটা দ্বারা আল্লাহর কালামের লক্ষ্য ও তাৎপর্য জানা যায় এবং আল্লাহর যাবতীয় হুকুম-আহকামের উদ্দেশ্যও তা হতে বুঝে যায়।’’ [মুক্বাদ্দিমা-ই কিরমানী শরহে সহীহ বুখারী, পৃষ্ঠা- ১]

হাদীস শরীফ অধ্যয়নের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী প্রমুখ মনীষী লিখেছেন যে,

وامّا فائدتہ فھی الفوز بسعادۃ الدارین অর্থাৎ, ‘‘উভয়কালের চরম কল্যাণ লাভই হচ্ছে হাদীস অধ্যয়নের সার্থকতা।;; [উমদাতুল ক্বারী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১১]

পবিত্র হাদীস শরীফ শ্রবণ করা, মুখস্ত করা এবং হাদীস শরীফের পর্যালোচনা করা সম্পর্কে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন যে,

نَضر اللہ امرأ سمع مقالتی فحفظہا ووَعَاھَا و ادَّاھَا فربُّ حاملٍ فقہٍ الی مَنْ ہوَافقہُ منہ (ترمیذی) অর্থাৎ আল্লাহ্‌ তা’আলা ওই ব্যক্তির জীবন উজ্জ্বল করুক, যে আমার কথা শুনেছে, অতঃপর তা স্মরণ রেখেছে এবং পরিপূর্ণভাবে সংরক্ষণ করছে আর অপরের নিকট তা পৌঁছে দিয়েছে। অনেক জ্ঞান বহনকারী লোক এমন ব্যক্তির নিকট তা পৌঁছে দেয় যে, তার অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ও বিজ্ঞ। [তিরমিযী শরীফ]

এমনকি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জাহেরী জীবদ্দশায়ও সাহাবা-ই কেরাম হাদীস শরীফ অধ্যয়নে ব্যস্ত থাকতেন। যেমন, হযরত আবূ হুরায়রা রদ্বিয়াল্লাহু আন্‌হু বলেন-انِّیْ لاجزئ اللیل ثلثۃ اجزءٍ فثلثُ انام وثلث اقوم وثلث اتذکراحادیث الرسول ﷺ

অর্থাৎ, ‘‘আমি রাতকে তিন ভাগে ভাগ করে নিই। এক ভাগে আমি ঘুমাই, এক ভাগ ইবাদতের মধ্যে অতিবাহিত করি আর এক ভাগ আমি রসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস শরীফ স্মরণ ও মুখস্ত করে থাকি। [মুসনাদে দারেমী]

সুতরাং, বুঝা গেল, পবিত্র কোরআনের পর পবিত্র হাদীসের স্থান। আর পবিত্র হাদীসের অধ্যয়ন, গবেষণা ও সে মতে আমলের মধ্যে উভয় জগতে অশেষ কল্যাণ লাভে ধন্য হওয়া যায়। পবিত্র হাদীস শরীফ অধ্যয়নকারী ও শ্রবণকারীর ব্যাপারে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামা দু’আ করেছেন। পবিত্র হাদীস শরীফ অধ্যয়ন করা সাহাবা-ই কেরামের পবিত্র আমল দ্বারা প্রমাণিত। আর বর্তমান বিশ্বে সঙ্কলিত হাদীস গ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাধিক বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ হচ্ছে ‘সহীহ বুখারী শরীফ’।

এ মহান গ্রন্থের শ্রেষ্ঠত্ব ও বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে গিয়ে প্রত্যেক যুগের আলিম ও মুহাদ্দিসগণ অনেক উক্তি করেছেন। এ পর্যায়ে নিম্নোক্ত উক্তিটি সর্বজনপ্রিয় ও সকলের মুখে ধ্বনিত, اصح الکتبُ بعد کتاب اللہ تحت السمآء صحیح البخاری অর্থাৎ ‘‘আল্লাহর কিতাবের পর আসমানের নিচে সর্বাধিক সহীহ (বিশুদ্ধ) গ্রন্থ হচ্ছে জ্ঞসহীহ বুখারী শরীফ’। [মুক্বাদ্দিমা-ই ফাতহুল বারী ও উমদাতুল ক্বারী]

হুজূর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি যেমন মকবূল হয়েছেন, তেমনি তাঁর এ সহীহ গ্রন্থটিও অত্যন্ত মকবূল হয়েছে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে নিজের কিতাব বলে সম্বোধন করেছেন। বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস মোল্লা আলী ক্বারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ‘মিরকাতুল মাফাতীহ’ গ্রন্থে লিখেছেন যে, যে কোন বিপদের সময় সহীহ বুখারী শরীফের খতম পড়া হলে ওই বিপদ দূরীভূত হয়ে যায়। যে নৌযানে সহীহ বুখারী শরীফ থাকবে ওই নৌযান নদীবক্ষে কখনো ডুববে না। হাফিয ইবনে কাসীর রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, অনাবৃষ্টিকালে সহীহ বুখারী শরীফ পাঠের ব্যবস্থা করা হলে বৃষ্টি বর্ষিত হয়। [মিরকাতুল মাফাতীহ, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৪]

এ নানা উপকারিতার কারণে পবিত্র কোরআন শরীফের খতমের পাশাপাশি পবিত্র বুখারী শরীফের খতম অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা যুগ যুগ ধরে হয়ে আসছে। এতে অশেষ সাওয়াব রয়েছে এবং ইমাম, মুহাদ্দিস, ফক্বীহ্‌, অলী, গাউস, ক্বুত্ব্‌ব ও আবদালগণের আমল রয়েছে। সুতরাং ভক্তি-শ্রদ্ধাসহ সহীহ বুখারী শরীফের তিলাওয়াত ও খতম অত্যন্ত সাওয়াবজনক, মঙ্গলময়, বরকতমণ্ডিত এবং উভয় জাহানে কামিয়াবীর এক বিরাট ওসীলা ও সোপান।

[‘মিরকাতুল মাফাতীহ্‌’, কৃত. মোল্লা আলী ক্বারী আল্‌ হানাফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ও ‘আশিয়াতুল লুম’আত’, কৃত: শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহ্‌লভী রহমাতুল্লাহি আলাইহি ইত্যাদি।]

[সূত্র. যুগ-জিজ্ঞাসা, পৃ.৩৮-৪০]

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •