দ্বীনী শিক্ষার প্রসারে আওলাদে রসূল, গাউসে জমান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রহ.)

0

দ্বীনী শিক্ষার প্রসারে আওলাদে রসূল, গাউসে জমান আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান

====

হুযূর ক্বেবলা হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র মধ্যে একজন মহান ওলীর যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। তাঁর ছিলো অগণিত কারামত। মুসলিম সমাজকে ইশ্ক্বে রসূল (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) এবং শরীয়ত ও তরিক্বতের শিক্ষা ও দীক্ষার সমন্বয়ে সমৃদ্ধ করার জন্য তিনি অনেক যুগান্তকারী অবদান রেখে যান। তন্মধ্যে দ্বীনী শিক্ষার প্রসারে তাঁর ঐতিহাসিক অবদানগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি নিজেও দ্বীনী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন, মুসলিম সমাজের মধ্যেও তিনি ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার বিস্তারের উপর অত্যন্ত জোর দিতেন। কারণ শরীয়ত ও দ্বীনী শিক্ষা বিবর্জিত তরীক্বত ও তরীক্বতপন্থী ইসলামের বাস্তব বা প্রকৃত আদর্শের পূর্ণতায় পৌঁছতে পারে না।

ইমাম গায্যালী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁর ‘ইসলাহ্-ই নাফ্স’ (আত্মশুদ্ধি) নামক প্রামাণ্য পুস্তকে লিখেছেন- আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র ক্বোরআনে ঘোষণা করেছেন-‘‘আমি জিন্ ও মানব জাতিকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’’ আর সঠিক ও আল্লাহর দরবারে গ্রহণীয় পদ্ধতিতে ইবাদত-বন্দেগী করার পূর্বশর্ত হচ্ছে জ্ঞানার্জন। তিনি একথাও নিদ্বির্ধায় বলেছেন যে, ইল্ম ও ইবাদতের মধ্যে ইল্মের মর্যাদা অনেক বেশী। এ মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন- ‘ইবাদতকারীর উপর আলিমের মর্যাদা ততখানি, যতখানি মর্যাদা একজন সাধারণ উম্মতের আমাকে আমাকে দান করা হয়েছে।’’ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম একদা সাহাবা-ই কেরামের মজলিসে বেহেশতের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সম্প্রদায়ের পরিচয় দিয়ে এরশাদ করেছেন- ‘‘ওই সম্মানিত সম্প্রদায় হলো আমার উম্মতের আলিমগণ।’’ ইল্ম হাসিল করা ও ইবাদত করা উভয়টিই মানব জাতির জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। আবার ইল্ম হচ্ছে ইবাদতের মূল ও ভিত্তি। কারণ সুষ্ঠুভাবে ইবাদত করার জন্য ইল্ম হাসিল করতে হয়। তাই হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- ‘‘আমলের জন্য ইল্ম পথ-প্রদর্শক, আর আমল হচ্ছে ইলমের অনুসারী।’’ ইমাম গায্যালী আলায়হির রাহমাহ্ আরো বলেন, পৃথিবীতে নানা প্রকার বিদ্যার ছড়াছড়ি হলেও যে বিদ্যা শিক্ষাকে ফরয করা হয়েছে তা হচ্ছে- ফরয ও শরিয়ত-সম্বন্ধীয় জ্ঞানার্জন। অবশ্য এগুলোর পাশাপাশি অঙ্ক, ভূগোল, রাজনীতি, অর্থনীতি ও আইন ইত্যাদি বিষয়ে জ্ঞানার্জন করলে মানুষের ব্যক্তিগত, সমাজগত ও ধর্মীয় জীবনে অধিকতর পূর্ণতা, সর্বোপরি উক্ত ফরয বিষয়ে জ্ঞানার্জনে সহায়ক হবে। তিনি আরো বলেন- আমল বিহীন ইল্ম যেমন কোন কাজে আসে না, তেমনি ইলম ব্যতীত আমলও কোন উপকারে আসে না। এ প্রসঙ্গে হুযূর-ই আক্রামের নিম্নলিখিত হাদীস শরীফও তিনি উদ্ধৃত করেছেন- অর্থাৎ ‘‘ফিক্বহ্ বিহীন তথা না বুঝে ইবাদতকারী কলুর বলদের ন্যায়।’’ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম উপকারশূন্য ইল্ম থেকেও আল্লাহর নিকট এ বলে পানাহ্ চাইতেনঃ
(হে আল্লাহ! যে শিক্ষা কোন উপকারে আসে না, আমি তা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। [ইসলাহ্-ই নাফ্স, সংক্ষেপিত]

শাহানশাহে সিরিকোট এবং তাঁর উত্তরসূরিরাও দ্বীনী শিক্ষায় সমৃদ্ধ ছিলেন বলেই তাঁদের প্রচারিত তরীক্বত আজ শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার, তাঁদের প্রত্যেকের শানে একথা বলতে কোন দ্বিধা থাকে না বরং প্রাণভরা ভক্তি ও একান্ত আনন্দচিত্তে বলতে ইচ্ছা হয়-
জিন্কী হার হার আদা- সুন্নাতে মোস্তফা
আয়সে পীরে তরীক্বত পেহ্ লাখোঁ সালাম।

অর্থাৎ যাঁর প্রতিটি কর্মই হচ্ছে হুযূর মোস্তফার সুন্নাত। এমন পীর-ই ত্বরীক্বতের প্রতি লাঁেখা সালাম।
বায়‘আত গ্রহণের সব বৈশিষ্ট্য ও পূর্বশর্তই বিদ্যমান ছিলো হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির মধ্যে যেমন- বায়‘আত (নিজেকে পরিপূর্ণভাবে বিক্রি) ওই ব্যক্তির হাতে করা চাই যাঁর মধ্যে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যাদি রয়েছে-
১. সুন্নী, বিশুদ্ধ আক্বীদা সম্পন্ন হওয়া, ২. দ্বীনী শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া, (কমপক্ষে এতটুকু ইল্ম থাকা যে, কারো সাহায্য ছাড়াই নিজের জরুরি মাসাইল কিতাব থেকে নিজেই বের করতে পারেন) ৩. তাঁর সিল্সিলাহ্ (ত্বরিক্বতের শায়খদের শাজরাহ্ বা ধারা) হুযূর-ই আক্বদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছে, মাঝখানে যেন কোন কারণে কর্তিত না হয় এবং ৪. ‘ফাসিক্ব-ই মু’লান’ (প্রকাশ্য পাপাচারী) না হওয়া। যেমন- (দাড়ি মুণ্ডানো, নামায বর্জন ইত্যাদি)। [আল- কাওলুল জমীল ও ইরশাদাত-ই আ’লা হযরত ইত্যাদি] উল্লেখ্য, শাহানশাহ-ই সিরিকোট ও তাঁর এ মহান উত্তরসূরি একাধারে সুন্নী আক্বীদার প্রবাদ পুরুষ, দ্বীনী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষাসমৃদ্ধ ও উপমহাদেশের শীর্ষ পর্যায়ের বহু দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক ও প্রতিষ্ঠাতা, হুযূর শাহানশাহ্ েবাগদাদ গাউসুল আ’যম জীলানী হয়ে হুযূর-ই আক্রাম পর্যন্ত অতি উৎকৃষ্ট সিলসিলা বা শাজরাধারী এবং তাক্বওয়া-পরহেযগারীর আদর্শ মুর্শিদ। তাঁর কোন কাজই যেমন সুন্নাতই রসূলের পরিপন্থী ছিলো না, তেমনি তাঁর কোন কথা ও প্রবর্তিত কোন কর্ম-পদ্ধতিও ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী ছিলো না। ফলে পরিদৃষ্ট হয় যে, তাঁর নিরেট সুন্নী আক্বিদা ও অকৃত্রিম ইশক্বে রসূলের আলোকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচারিত প্রায় প্রতি সাওয়াবদায়ক কর্মের বিরুদ্ধে বাতিলপন্থীরা নানাভাবে অপপ্রচার করেও শেষ পর্যন্ত একথা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে যে, এ সিলসিলার প্রতিটি কর্মই ইসলামী শরীয়ত ও নিষ্কলুষ তাসাওফের অকাট্য প্রমাণসমৃদ্ধ। তাই তিনি ও তাঁর তরিক্বত বরেণ্য ও নির্দ্বিধায় অনুসরণীয়।

হুযূর ক্বেবলা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির বেলায়ত এবং খেলাফতপ্রাপ্তিও বাস্তব অথচ অনন্য। কিতাবাদির পর্যালোচনা ও বাস্তবতার নিরিখে দেখা যায় যে, তিনভাবে আত্মার প্রকৃত পরিশুদ্ধি তথা বেলায়ত অর্জিত হতে পারে- ১. আল্লাহর বিশেষ দান, ২. রিয়াযত-ইবাদত এবং ৩. কোন কামিল-মুকাম্মিল ওলীর কৃপাদৃষ্টি। আল্লাহরই জন্য সকল প্রশংসা। আমাদের হুযূর ক্বেবলার মধ্যে এ তিনটি নি’মাতই অর্জিত ছিলো। হুযূর ক্বেবলা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির জীবনী আলোচনা করলে এর বাস্তবতা মধ্যাহ্ন সূর্যের মতো স্পষ্ট হয়। তাঁর রিয়াযত ও ইবাদত-বন্দেগী এবং তাঁর মুর্শিদ হযরত খাজা আব্দুর রহমান চৌহরভী ও শাহে সিরিকোট হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটির ভবিষ্যদ্বাণী ও কৃপাদৃষ্টির বিভিন্ন ঘটনা একথা প্রমাণ করে যে, আল্লাহ ও তাঁর হাবীবের কত মহান দয়া ‘বেলায়তের উঁচুতর মর্যাদা’ রূপে তিনি প্রদত্ত হয়েছেন। নিম্নে এ প্রসঙ্গে কয়েকটা ঘটনা উল্লেখ করার প্রয়াস পাচ্ছি-

এক. হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ৪০তম বংশধর। তাঁর বংশীয় ধারা সাইয়্যেদুশ্ শোহাদা হযরত হোসাঈন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু পর্যন্ত পৌঁছে হুযূর আক্রামের সাথে মিলিত হয়। হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ গীসূ দরায ও হযরত সৈয়্যদ গফুর শাহ্ ওরফে কাফূর শাহ্, (সিরিকোট বিজয়ী)’র মতো বুযুর্গগণ তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ।
[খড়পধষ মড়া.ঃ অপঃ ৩৩ জবভ-১৫, ঐধলধৎধ ১৮১৭ ও হালাত-ই মাশ্ওয়ানী] দুই. হযরত তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির জন্মের পূর্বেই হযরত খাজা চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁর শুভ জন্মের সুসংবাদ দিয়েছেন। বর্ণিত হয়েছে যে, হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্’র জন্মের কিছুদিন পূর্বে হযরত চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ তাঁর প্রধান খলীফা হযরত সৈয়দ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলায়হি’র শাহাদত আঙ্গুল ধরে নিজের পিঠ মুবারকে মেরুদণ্ডের মাঝামাঝি স্থানে ঘষ্তে ঘষ্তে বললেন, ‘‘ইয়ে পাক চীয তোম্ লে-লো।’’ (এ পবিত্র জিনিষ তুমি নিয়ে নাও।) পাক উর্দু ও ফার্সি শব্দ। আরবীতে এর প্রতিশব্দ হয় ‘তৈয়্যেব’ যেমন পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে-
(পবিত্র শহরের উদ্ভিদ সেটার রবের অনুমতিক্রমে বের হয়।) [সূরা আ’রাফ, আয়াত ৫৮] এটা ছিলো হযরত শাহানশাহে সিরিকোটের ঔরশে হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহর শুভ জন্মের পূর্বাভাস। বাস্তবেও তাই হয়েছে। কিছুদিন পর হুযূর ক্বেবলার শুভ জন্ম হলো। আর শাহানশাহে সিরিকোট উক্ত শুভ সংবাদের আলোকে তাঁর নাম রাখেন ‘সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্।’ সুতরাং তিনি যে ‘মাদারজাদ ওলী’ (মাতৃগর্ভ থেকে ওলী হিসেবে ভূমিষ্ট হয়েছেন) তা একেবারে স্পষ্ট হলো।
তিন. শৈশবে তাঁর ওলীসূলভ কারামাতও প্রকাশ পেয়েছিলো। তাঁর জন্মের ৬/৭ মাস পর বরকতের জন্য তাঁকে শিরনী খাওয়ানের জন্য হযরত খাজা চৌহরভী সিরিকোট শরীফে তাশরিফ আনলেন। গরম শিরনি হাযির করা হলো। খাজা চৌহরভী শিশু তৈয়্যব শাহকে সম্বোধন করে বললেন, ‘‘তৈয়্যব তোম নেহীঁ খাতে তো হামভী নেহীঁ খায়েঙ্গে।’’ (তৈয়্যব তুমি না খেলে আমরাও খাবো না।) এটা শুনতেই হুযূর ক্বেবলা ওই শিরনির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। তারপর তিনি শিশুসুলভ ভঙ্গিতে শিরনি আহার করলেন; কিন্তু শিরনির তাপ তাঁর হাতে-মুখে লাগেনি। এটা দেখে হযরত খাজা চৌহরভী হেসে ফেললেন, আর হযরত শাহানশাহে সিরিকোটি আশ্চার্যান্বিত ও খুশী হলেন।
চার. হুযূর ক্বেবলা হযরত তৈয়্যব শাহর বয়স শরীফ যখন দু’বছর তাঁর আম্মাজান তাঁকে নিয়ে খাজা চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির দরবারে গেলেন। হুযূর ক্বেবলা শিশু সুলভ আচরণে মহীয়সী আম্মাজানের দুধ পান করতে চাইলেন। এটা দেখে হযরত খাজা চৌহরভী বললেন, ‘‘তোম বড়ে হে গায়ে, দুধ মত পিও!’’ (তুমি এখন বড় হয়ে গেছো, আর মায়ের দুধ পান করো না!) এটা শুনা মাত্রই তিনি শান্ত হয়ে গেলেন। এরপর থেকে তিনি আর কখনো মায়ের দুধ পান করেন নি। তাঁর আম্মাজান দুধ পান করাতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাজীনে মানা’ কিয়া, দুধ নেহীঁ পিয়োঙ্গা’’ (দাদাজী নিষেধ করেছেন, দুধ আর পান করবো না।)
পাঁচ. হুযূর ক্বেবলার বয়স যখন ৫/৬ বছর, তখন পিতার সাথে আফ্রিকার জোহানেসবার্গে (মোম্বাসা) এবং ক্যাপটাউনে ছিলেন। তিনি সেখানে একদিন পিতা হযরত শাহানশাহে সিরিকোটকে বললেন, ‘‘নামায মে আপ আল্লাহ কো দেখতে হ্যাঁয়, মুঝে ভী দেখনা হ্যাঁয়।’’ (নামাযে আপনারা আল্লাহকে দেখেন, আমিও আল্লাহর দর্শন চাই।) ছোট্ট শিশুর মুখে মা’রিফাতের এমন উঁচু পর্যায়ের কথা শুনে শাহানশাহে সিরিকোটি আল্লাহর দরবারে তাঁর এ বাসনা পূরণ হবার জন্য দো‘আ করলেন।
ছয়. হুযূর ক্বেবলার বয়স যখন ৭/৮ বছর; তখন শাহানশাহে সিরিকোট তাঁকে নিয়ে খাজা গরীব নওয়ায (রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি)’র দরগাহ্ শরীফে গিয়েছিলেন। হুযূর ক্বেবলা মাযার শরীফের চত্বরে মনের খেয়ালে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তিনি দেখলেন, হঠাৎ এক নূরানী চেহারার বুযুর্গ এসে হুযূর ক্বেবলাকে খুব আদর স্নেহ সহকারে পাশে বসালেন এবং তাঁর জন্য বিশেষ দো‘আ করলেন। ওই সময় শাহানশাহে সিরিকোট মু‘আল্লিমের ঘরে অবস্থান করছিলেন। পরে ঘটনা আব্বা হুযূরকে বললে তিনি বললেন, ‘‘বেটা ওয়হ্ তো খাজা থে।’’ (বেটা, তিনি তো হযরত খাজা গরীব-নওয়ায ছিলেন।) [সূত্র: জীবনীগ্রন্থ]

সাত. শাহানশাহে সিরিকোট হযরত আল্লামা তৈয়্যব শাহকে মাদারযাদ ওলী বলে সুসংবাদ দিয়েছেন। [প্রাগুক্ত] আট. হুযূর ক্বেবলার শিক্ষার্জনও ছিলো পূর্ণাঙ্গ এবং তাঁর বংশীয় ঐতিহ্য এবং হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ ১৩৩৬হিজরি/১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে পাাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জিলার সিরিকোটি, শেতালু শরীফে প্রসিদ্ধ ওলী হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি আলায়হির রাহমার পবিত্র ঔরশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি রসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ৪০তম বংশধর। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হযরত হোসাঈন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বংশ পরম্পরায় তিনি ৪০তম সৈয়্যদযাদা। ইমাম হোসাঈন রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বংশধরগণ ইসলাম প্রচারের নিমিত্ত পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েন। হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ গীসূ দরায রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। হযরত গীসূ দরায ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাগদাদের আউস নগরী থেকে সুদূর আফগানিস্তান সফর করেন। তিনি ৪২১ হিজরিতে আফগানিস্তানের কোহে সুলায়মানীতে ইন্তিকাল করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর সুযোগ্য পুত্র ওলী-ই কামিল হযরত সৈয়্যদ মাস‘ঊদ মাশ্ওয়ানী আলায়হির রাহমাহর একজন বংশধর হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ গফূর শাহ্ ওরফে কাফূর শাহ্ পরবর্তী সময়ে আফগানিস্তান থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পাকিস্তানে আসেন এবং সিরিকোট শরীফে বসবাস করতে থাকেন। তাঁকে ইতিহাসে ‘ফাতেহ্ েসিরিকোট’ (সিরিকোট বিজয়ী) বলে আখ্যা দেয়া হয়। তাঁরই এক বুযুর্গ বংশধর সৈয়দ খানি যমান শাহ্, তাঁর সুযোগ্য সাহিবযাদা সৈয়দ সদর শাহ্ (রাহমাতুল্লাহি আলায়হিমা)। সৈয়দ সদর শাহ্ আলায়হির রাহমাহর সুযোগ্য সাহেবযাদা হলেন হযরত শাহানশাহে সিরিকোট সৈয়দ আহমদ শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্।

শাহানশাহে সিরিকোট নিজেও একজন বিজ্ঞ আলিম ও প্রসিদ্ধ ওলী ছিলেন। তাঁর যুবুর্গ মুর্শিদ হলেন ওলূম-ই লাদুন্নিয়াহ্র ধারক হযরত আবদুর রহমান চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্, যিনি যাহেরী কোন ওস্তাদের নিকট লেখাপড়া না করলেও তাঁর ছিলো খোদা প্রদত্ত- ইলমে লাদুন্নী। তিনি ত্রিশপারা সম্বলিত মজমুআহ্-ই সালাওয়াত-ই রসূলসহ কতিপয় প্রমাণ্য ও হতবাককারী গ্রন্থ-পুস্তক রচনা করে যান।
সুতরাং তাঁদেরই স্নেহ ও প্রিয়ভাজন হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি দ্বীনী শিক্ষায় যুগশ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন আপন আব্বাজান হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটির নিকট থেকে। হযরত শাহানশাহে সিরিকোট যখন দ্বীন ও মাযহাবের প্রচারের খাতিরে দেশের বাইরে সফরে ব্যস্ত হয়ে যান তখন হযরত খাজা চৌহরভী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত- হরিপুরের রহমানিয়া ইসলামিয়া মাদরাসা থেকে হাদীস-ফিক্বহ ও তাফসীরসহ বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর সনদ লাভ করেন। প্রখর মেধার অধিকারী হুযূর ক্বেবলা পরবর্তীতে পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ওস্তাদ আল্লামা সরদার আহমদ লায়েলপুরী আলায়হির সান্নিধ্যে গিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ২৭ বছর বয়সে ১৯৪৩ খৃষ্টাব্দে তিনি দ্বীনী শিক্ষার শেষবর্ষ সনদ লাভ করেন এবং যাহেরী শিক্ষা গ্রহণ পর্ব সমাপ্ত করেন।

এ মুহাদ্দিস-ই লায়েলপুরী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির সাথে হুযূর ক্বেবলার রূহানী সম্পর্কও ছিলো। এ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও বুযুর্গ তাঁর মাদরাসার হাদীসের ছাত্রদের দস্তারবন্দি হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রাহমাতুল্লাহি আলায়হির মাধ্যমে করাতেন।

নয়. ওদিকে হুযূর ক্বেবলা অসাধারণ ইবাদত-বন্দেগী ও কঠোর রিয়াযতের মাধ্যমে বেলায়তের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত হতে থাকেন। ১৯৫৮ ইংরেজিতে ৪২ বছর বয়সে তাঁর পিতা শাহানশাহে সিরিকোট বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) অবস্থানকালে ‘খিলাফত’ দান করেন। এরই মাধ্যমে হুযূর ক্বেবলা আপন পিতা মহোদয় আলায়হির রাহমার সুযোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে যাবতীয় দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৯৩ ইংরেজি, ১৫ জিলহজ্ব ১৪১৩ হিজরি সোমবার, পাকিস্তানের সময় অনুসারে সকাল সাড়ে ৯টায় সিরিকোটে আপন বরকতময় বাসভবনে ইন্তিকাল করেন। তখন তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৭ বছর। বলাবাহুল্য, অসাধারণ বেলায়তী শক্তি, প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা দ্বারা হুযূর ক্বেবলা দ্বীন মাযহাবের জন্য বহু অনন্য অবদান রেখে চির স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েছেন।
তাঁর অবদানগুলো বহুমুখী, সুদূরপ্রসারী ও দ্বীন ও মাযহাবের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসূ। তিনি আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়ার কেন্দ্র ও শাখাগুলোকে সমৃদ্ধতর করে তুলেন। শাহানশাহে সিরিকোটের প্রতিষ্ঠিত ‘কিশ্তী-ই নূহ’ বলে আখ্যায়িত জামেয়াকে বলিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতায় ধন্য করেন। তিনি নিজেই এ জামেয়াকে ‘জান্নাত নিশান’ (বেহেশত্ সদৃশ) প্রতিষ্ঠান বলে আখ্যায়িত করেন। ঐতিহাসিক জশ্নে জুলূসে ঈদে মিলাদুন্নবী প্রবর্তন করেন, গাউসিয়া কমিটি প্রতিষ্ঠা করেন। এদেশের সুন্নী মুসলমানদেরকে সংগঠিত হবার জন্য বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করেন ও দিক-নির্দেশনা দিয়ে যান। মাজমু‘আহ-ই সালাওয়াতে রসূলের নতুন সংস্করণ প্রকাশ করান। পাকিস্তানের দক্ষ আলিমদের দ্বারা সেটাকে উর্দু ভাষায় অনুবাদের সূচনা করে যান। সেটাকে বাংলা ভাষায়ও অনুবাদ করানোর জন্য দিক-নির্দেশনা দিয়ে যান। ‘আওরাদ-ই ক্বাদেরিয়া’ নামক আরেকটি অতি বরকতময় ওযীফাও প্রকাশ করিয়ে সেটা নিয়মিত পাঠ করার জন্য নির্দেশ দেন। মাসিক ‘তরজুমান’ প্রকাশ করান এবং সেটাকে ‘বাতিল ফির্কার মৃত্যু’ বলে আখ্যায়িত করে সেটার প্রকৃতি নির্ণয় করে যান। শরীয়ত ও ত্বরীক্বতের কাজ একসাথে সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের নিমিত্ত তিনি বিভিন্ন জায়গায় মসজিদ, খানকাহ্ এবং মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করান। সিরিকোট শরীফে শাহানশাহে সিরিকোট রাহমাতুল্লাহি আলায়হির মাযার শরীফের পাশে মার্বেল ও লাল পাথর দিয়ে একটি মনোরম বিশাল আকারের জামে মসজিদ নির্মাণ করান, বার্মার রেঙ্গুনের তেঙ্গানজে এলাকায় সেগুন কাঠের দ্বি-তল বিশিষ্ট ‘খানক্বাহ্-ই ক্বাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়্যবিয়া’ প্রতিষ্ঠা করান। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে বলুয়ারদিঘী পাড়স্থ খানক্বাহ্ ক্বাদেরিয়া সৈয়্যদিয়া তৈয়বিয়া’র তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা এবং জামেয়া সংলগ্ন সুবিশাল ‘আলমগীর খানকাহ্ শরীফ নির্মাণের নির্দেশ ও পৃষ্ঠপোষকতা তরীক্বতের শিক্ষা-দীক্ষার ইতিহাসে এক অনন্য অবদান। তাছাড়া, দেশ-বিদেশে তাঁদের নামে প্রতিষ্ঠিত হয় বহু খানকাহ, মসজিদ ও মাদরাসা। আপন বরকতময় জীবদ্দশার শেষ অবধি তিনি ব্রিটেন, আফ্রিকা, বার্মা, ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, সৌদী আরব ও মক্কা সফর করে শরীয়ত ও তরিক্বতের অসাধারণ খিদমত আঞ্জাম দেন। বাংলাদেশে তাঁর নিয়মিত সফরগুলোর ফলে এ দেশের অগণিত মানুষ তাঁর হাতে বায়‘আত গ্রহণ ও সান্নিধ্য লাভ করে ধন্য হয়েছে। মোটকথা, দ্বীন ও মাযহাবের স্বার্থে তিনি প্রতিটি ক্ষেত্রে সুদূর প্রসারী ও ফলপ্রসূ অবদান রাখেন এবং অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার করেন।

অগাধ দ্বীনী-ইল্ম সমৃদ্ধ মুর্শিদে বরহক্ব হুযূর ক্বেবলা তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্ দ্বীনী শিক্ষার প্রসার এবং সত্যিকার অর্থে দ্বীনের দক্ষ ‘সাচ্চা ওলামা’ তৈরীর উপর বিশেষভাবে জোর দিতেন। দ্বীনী ইলমের চর্চা ও প্রসারের প্রচেষ্টা তো হুযূর ক্বেবলার বংশ ও মাশাইখ পরম্পরার এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। যেমন- হযরত খাজা চৌহরভী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ছিলেন ইলমে লাদুন্নীর ধারক। দ্বীনী ক্ষেত্রে ওই অসাধারণ ও নির্ভুল ইলম যাতে মানুষের ঈমান ও আমলকে আলোকিত করে তজ্জন্য তিনি নিজ এলাকায় ‘মাদরাসা-ই রহমানিয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন, ত্রিশপারা সম্বলিত বিস্ময়কর দুরূদ শরীফ গ্রন্থ ‘মজমু’আহ্-ই সালাওয়াত-ই রাসূল’ প্রণয়ন করেন এবং তাঁর প্রধান খলিফা শাহানশাহে সিরিকোটের মাধ্যমে তা প্রকাশ করান। পরবর্তীতে গবেষণায় দেখা যায় যে, তিনি আরো কতিপয় অতি মূল্যবান গ্রন্থ-পুস্তকও রচনা করে গেছেন। তাঁর খলিফা ও হুযূর ক্বেবলা আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহর আব্বাজান ও মুর্শিদ হযরত সৈয়্যদ আহমদ শাহ্ সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্ দ্বীনী শিক্ষার প্রসার ও সাচ্চা আলেম-ই দ্বীন তৈরী করার জন্য ‘জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া’ প্রতিষ্ঠা করে এক্ষেত্রে একটি দীর্ঘস্থায়ী ও কল্পনাতীত ফলপ্রসূ ব্যবস্থা করে যান। প্রসিদ্ধি আছে যে, তিনি যখন প্রত্যক্ষ করলেন যে, এদেশে দেওবন্দী-জামাতী প্রমুখ এদেশে তাদের ভ্রান্ত আক্বীদা ও কর্ম পদ্ধতি চালু করার জন্য তৎপর রয়েছে, তখন তাদের মোকাবেলায় ইসলামের সঠিক মতাদর্শ (সুন্নী মতাদর্শ) প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের স্থায়ী ব্যবস্থা হচ্ছে তরীক্বতের পাশাপাশি শরীয়তের দক্ষ ওলামা তৈরীর ব্যবস্থা করা। তাই তিনি ১৯৫৪ ইংরেজীতে ‘জামেয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। আর ‘মসলক-ই আ’লা হযরতের উপর এ মাদরাসা প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে শিক্ষা পদ্ধতিতেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ দিক-নির্দেশনা দিয়ে যান। তদুপরি, এ মাদরাসাকে মানুষের জীবনের বিপদাপদ দূরীকরণ ও মনোবাঞ্ছা পূরণের মাধ্যম করে যান, আর এটাকে হযরত নূহ আলায়হিস্ সালামের কিস্তির মতো নাজাতের ওসীলা করেন যান। তাঁরই অনুসরণে তাঁরই খলীফা হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্ এ জামেয়ার যথার্থ পৃষ্ঠাপোষকতা করেন। তাঁর হাতে তরীক্বাহ্-ই ক্বাদেরিয়া যেভাবে দ্রুত প্রসার লাভ করছিলো, সেভাবে জামেয়ার উন্নতির জন্যও তিনি অত্যন্ত সচেষ্ট ছিলেন। চট্টগ্রামের মতো দেশের রাজধানী ঢাকায় একইভাবে দ্বীনী শিক্ষার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ‘জামেয়া ক্বাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া আলিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষা নির্দেশে সারা দেশে আরো অর্দ্ধ শতাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বর্তমান হুযূর ক্বেবলা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ মুদ্দাজিল্লুহুল আলীর পৃষ্ঠপোষকতা ও নির্দেশে এ সংখ্যা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে। ওইসব মাদরাসার মধ্যে ‘মাদরাসা-ই তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া, হালিশহর, চট্টগ্রাম, মাদরাসা-ই তৈয়্যবিয়া অদুদিয়া সুন্নিয়া, চন্দ্রঘোনা, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া তাহেরিয়া সুন্নিয়া, কক্সবাজার, জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা মাদরাসা, চট্টগ্রাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া, পাকিস্তানের করাচিতে এবং মায়ানমারেও আহলে সুন্নাতের মাদরাসা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে আর সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

বলাবাহুল্য, হুযূর ক্বেবলা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্ জামেয়ার লেখা পড়ার সব সময় খোঁজ খবর নিতেন। বাংলাদেশে সফরকালে মাদরাসা চলাকালে প্রত্যেক ক্লাশে গিয়ে নিজেই পরিদর্শন করতেন এবং ছাত্র-শিক্ষকদের সরাসরি প্রশ্ন করে লেখাপড়ার মান যাচাই করতেন ও প্রয়োজনীয় আদেশ-উপদেশ দিতেন। পাকিস্তানে যাবার পর চিঠি মারফতও জামেয়ার প্রসঙ্গে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিতেন। তিনি এরশাদ করতেন- জামেয়া থেকে এমনসব আলিম বের হওয়া চাই, যারা বহির্বিশ্বেও দ্বীন ও মাযহাবের খিদমত আঞ্জাম দিতে পারে। তিনি জামেয়ার শিক্ষকদের খুব ভালবাসতেন, ছাত্রদেরকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। তাদেরকে লেখাপড়ার প্রতি খুব উৎসাহিত করতেন এবং সব সময় দো‘আ করতেন। তাদেরকে জামেয়া-বাগানের ফুল বলে আখ্যায়িত করতেন। তিনি এরশাদ করেছেন- জামেয়া থেকে এমন এমন আলিম তৈরী হওয়া চাই, যারা দ্বীন ও শরীয়তের দক্ষ আলিম হবে, মুনাযিরও হবে, লিখকও হবে, ওয়াইযও হবে ইত্যাদি। আর যথাযথ জ্ঞানার্জন করে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। এমন একটা সময় আসবে যখন সর্বত্র জামেয়ার ছাত্রদেরই চাহিদা হবে। [সূত্র: হুযূর ক্বেবলার বরকতময় নসীহত ও পত্রাদি]

সুতরাং হুযূর ক্বেবলা তদনুযায়ী লেখাপড়া হচ্ছে কিনা তা স্বচক্ষে দেখতে চাইতেন। কখনো বিন্দুমাত্র দুর্বলতা দেখলেও তিনি অত্যন্ত দু:খ প্রকাশ করতেন ও তা প্রতিকারের উপর খুব জোর দিতেন। গত শতাব্দির আশির দশকের প্রথম দিকের ঘটনা। হুযূর ক্বেবলা চট্টগ্রাম অবস্থানকালে জামেয়ার ছাত্রদের একটি আক্বীদাভিত্তিক ‘মুনাযারা’ (তর্কযুদ্ধ) স্বচক্ষে দেখার কর্মসূচী দিলেন। যথাসময়ে জামেয়ার ওই তর্কযুদ্ধ অনুষ্ঠিত হলো। হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ইলমে গায়ব ইত্যাদি বিষয়ের উপর পক্ষে ও বিপক্ষে দু’ গ্র“পের মধ্যে মুনাযারাহ্ হলো- হুযূর ক্বেবলার সদয় উপস্থিতিতেই। ওই বিতর্কে বিষয়বস্তুর পক্ষের গ্র“পের প্রমাণাদি উপস্থাপনের ধরন দেখে হুযূর ক্বেবলা তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে আরো বেশি দক্ষতা অর্জনের জন্য তাকীদ দিয়েছিলেন। বিভিন্ন ভাষা শিক্ষা, দলীল প্রমাণ শিক্ষা ও উপস্থাপনা ইত্যাদির ক্ষেত্রে হুযূর ক্বেবলা অব্যর্থ দিক-নির্দেশনা দিতেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, হুযূর ক্বেবলার উত্তরসূরী হিসেবে বর্তমান হুযূর ক্বেবলা হযরতুল আল্লামা তাহের শাহ্ সাহেব ও পীরে বাঙ্গাল হযরতুল আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবের শাহ্ সাহেব ক্বেবলাও এসব ব্যাপারে খুবই যতœবান। তাঁরাও নিয়মিতভাবে এসব বিষয়ের খোঁজখবর নেন ও প্রয়োজনীয় নির্দেশ ও পরামর্শ প্রদান করেন। সুতরাং দ্বীনী শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রে হুযূর ক্বেবলাগণের এসব নির্দেশনার যথার্থ বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলে প্রতিটি যুগে দ্বীন ও মাযহাবের ময়দানকে নিষ্কলুষ রাখা সম্ভবপর হবে। দেশ ও জাতি উপযুক্ত ও শান্তিপ্রিয় নাগরিক লাভ করতে থাকবে। বর্তমান যুগে ও ভবিষ্যতে সকলে হুযূর ক্বেবলার আনজুমান ও জামেয়া এবং প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এটাই আশা করে থাকেন। দ্বীন ও মাযহাবের স্বার্থে এটা অপরিহার্যও বৈকি।

বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষার ধরন দ্রুত বদলাচ্ছে। মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে দ্বীনী বিষয়াদির পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষার বিষয়াদি এত বেশী হারে চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, অদূর ভবিষ্যতে দক্ষ ওলামা তৈরী হবে না তা সুস্পষ্ট। উল্লেখ্য, কওমী, খারেজীরা ভারতের দেওবন্দ মাদরাসার পাঠসূচী অনুসরণ করে তাদের পরিকল্পিত ওহাবী-খারেজী মোল্লা-মৌলভী তৈরি করেই যাচ্ছে। তাদের হাজার হাজার মাদরাসা থেকে দক্ষ মৌলভী যে হারেই বের হোক না কেন, কিন্তু ওহাবী-খারেজী মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে বের হচ্ছে শতকরা নিরান্নব্বই ভাগ। তারা এক দিকে মাদরাসা বোর্ডের অনুমোদন ও সরকারী সাহায্য প্রাপ্ত মাদরাসাগুলো থেকে ক্লাস না করেই নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে মাদরাসা বোর্ডের সনদ অর্জন করে যাচ্ছে। প্রত্যেক সরকারের আমলে দেশের শিক্ষা-পদ্ধতির কোন নিয়ম না মানলেও তাদের নিজস্ব সনদগুলোকে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক প্রদত্ত শিক্ষা সনদের মান অর্জনের জন্য অন্যায় আবদার করেই যাচ্ছে। অন্যদিকে আলিয়া শিক্ষা পদ্ধতির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন যাবৎ চলে এসেছে সূক্ষ্ম প্রহসন। ব্রিটিশ আমলে মাদরাসা শিক্ষাকে সংকোচিত করে পরিণত করা হলো নিউ স্কীমের মাদরাসা তথা মাদরাসা নামের স্কুল-কলেজে। এর মোকাবেলায় মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড সুচিন্তিতভাবে মাদরাসা শিক্ষাকে রক্ষার জন্য নতুন পাঠ্যসূচি প্রণয়ণ করলো। সেগুলোর অনুসরণে বেশ কিছুদিন শিক্ষা দেয়া হলে মাদরাসা শিক্ষার মান কিছুটা হলেও রক্ষা হয়। বর্তমানে এবং দেশের রচিত শিক্ষানীতিতে মাদরাসাগুলোর জন্য যে পাঠ্যসূচি প্রণীত হচ্ছে তা মাদরাসাগুলো থেকে দক্ষ আলিম বের হওয়া সম্ভব হবে না বলে ধারণা করা অযৌক্তিক হবে না। তাই এক্ষেত্রে এখন চিন্তা-ভাবনা করার সময় এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে আলিয়া শিক্ষা ব্যবস্থার মাদরাসাগুলো পরিচালনার জন্য ভিন্ন মতাদর্শের শিক্ষকদের শরণাপন্ন হবার বিকল্প পথ থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে আমাদের হুযূর ক্বেবলা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির দিক-নির্দেশনা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। আমার জানা মতে, জামেয়ায় বিজ্ঞান-বিভাগ খোলার জন্য সরকারী সাহায্য প্রাপ্তির যুক্তি প্রদর্শন করে হুযূর ক্বেবলা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির অনুমতি চাওয়া হলো, হুযূর ক্বেবলা অনুমতি দেন নি, বরং বলেছিলেন ‘জামেয়া’ সুদক্ষ দ্বীনী-আলিম তৈরি করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং যারা বিজ্ঞান-বিভাগে লেখা পড়া করতে চায়, তাদের জন্য দেশ-বিদেশে বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠান অনেক রয়েছে। সুতরাং তখন থেকে হুযূর ক্বেবলার ওই দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করে যথাযথ সুফল পাওয়া যাচ্ছে। বর্তমানে যদি দেশের বর্তমান শিক্ষানীতি দ্বীনী আলিম তৈরির ক্ষেত্রে বাধা হয়, তবে ‘দরসে নিজামী’র অনুসরণে পৃথক শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করাও অপরিহার্য বৈ-কি, বিশেষ করে আহলে সুন্নাতের প্রতিপক্ষরা যেসব বিষয়ে পাঠদান করছে।

সর্বোপরি, যেসব বিষয়ে পাঠদান করা দ্বীনী আলিম তৈরি করার জন্য পূর্বশর্ত ওইসব বিষয় নির্ণয় করা এবং একেকজন দক্ষ আলিম তৈরি হবার জন্য ওইসব পাঠ কতটুকু দেওয়া অপরিহার্য তা নির্দ্ধারণ করা আর সেগুলোর যথাযথ পাঠদানের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবী, দ্বীন ও মাযহাবের দাবী। একথাও অস্বীকার করার জো নেই যে, মাদরাসা শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হচ্ছে- উর্দু ও ফার্সি ভাষা শিক্ষা। কারণ ইসলামী জ্ঞানের বহু অমূল্য ও অপরিহার্য বই পুস্তক এখনো ফার্সি ও উর্দু ভাষায় রয়ে গেছে। এ দু’ভাষায় পণ্ডিত ও বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ যথেষ্ট পরিমাণে গ্রন্থ-পুস্তক রচনা করে গেছেন ও করে যাচ্ছেন। সেগুলোর সংখ্যানুপাতে বাংলা ভাষায় দ্বীনী প্রয়োজনীয় বইপুস্তক এখনো রচিত হয়নি। ফলে দ্বীনী বিষয়াদির অমূল্য জ্ঞানাহরণ থেকে বাংলাভাষী ছাত্র-ছাত্রীরা বঞ্চিত থেকেই যাচ্ছে। বর্তমানে উর্দু-ফার্সি ভাষায় চর্চা দেশ থেকে লোপ পাওয়ায় এ দু’ ভাষায় শিক্ষক সংখ্যাও দ্রুত কমে যাচ্ছে। অথচ আমাদের দেশে, বিশেষত চট্টগ্রামে ফার্সি ভাষায় চর্চা হতো প্রচুর। সাম্প্রতিককালের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানেও ফার্সি পাণ্ডুলিপির যে মজুদ রয়েছে তা অন্য কোথাও নেই। এখানে চারশ’ ফার্সি পাণ্ডুলিপি ও এক হাজার পুরানো ফার্সি গ্রন্থ মজুদ রয়েছে। বলাবাহুল্য, ওইগুলো চর্চার অভাবে অবিলম্বে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যাবে বলে আশংকা করা হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে একথা প্রমাণিত যে, চট্টগ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারের ঘরে ফার্সির চর্চা হতো, বিভিন্ন ফার্সি, গ্রন্থ-পুস্তকের পাঠ-পর্যালোচনা চলতো, যার মাধ্যমে চট্টগ্রামের সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং শিক্ষা রক্ষা পেয়েছিলো, একটি উন্নত জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠিত হয়েছিলো। ১৮৩৭ ইংরেজী সালে সরকারী ভাষা ইংরেজী হলে মুসলিম শিক্ষিত সমাজের সাহিত্য সংস্কৃতির ভাষা ফার্সির উপর নানা ধরনের আক্রমন আসতে থাকে, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে, উর্দু-ফার্সি চর্চা না থাকায় মাদরাসা শিক্ষাও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। এটা আমাদের জন্য আনন্দের বিষয়। প্রিয় মাতৃভাষায় যে কোন বিষয় অতি সহজে অনুধাবন করা যায়। এর পাশাপাশি বিশ্বে প্রচলিত অন্য ভাষা, যেমন ইংরেজী, জানা থাকলে যেমন তা প্রত্যেকের জন্য বিশেষ উপকারী, তেমনি দ্বীনী শিক্ষার সমৃদ্ধির জন্য উর্দু এবং ফার্সি ভাষাও বিশেষ সহায়ক বলে প্রমাণিত। কাজেই, এ ব্যাপারেও সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনযোগ দেয়ার উপযুক্ত সময় এসেছে। বহির্বিশ্বেও এ দু’টি ভাষার প্রচূর মানুষ বিভিন্ন পেশায় জড়িত। তাদের সাথে যোগাযোগ ও আচার-ব্যবহারে ইংরেজীর পাশাপাশি উর্দু-ফার্সির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। জামেয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আ’লা হযরতের মসলকের উপর। আ’লা হযরতের সহস্রাধিক প্রমাণ্য পুস্তক বুঝতে হলে উর্দু ভাষা শিক্ষা অপরিহার্য। মাদরাসার অধিকাংশ পাঠ্য পুস্তকের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যাচ্ছে। আরবী কিংবা ফার্সি বা উর্দু ভাষায়। আমাদের আলিম-ওলামাদের যদি বাংলার পাশাপাশি এসব ভাষায় দক্ষতা না থাকে, তবে অন্যান্য ভাষাভাষীদের সাথে ভাবের আদান-প্রদান কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

মোটকথা, দ্বীন ও ঈমানের সংরক্ষণ, দ্বীন শিক্ষার প্রসার ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে হুযূর ক্বেবলা হযরতুল আল্লামা তৈয়্যব শাহ্ আলায়হির রাহমাহ্ ছিলেন একজন আদর্শ পুরুষ, সঠিক পথের দিশারী। সর্বোপরি, তিনি ছিলেন একজন কামিল-মুকাম্মিল ওলী। আসুন, আমরা তাঁর অনুসরণে আত্মশুদ্ধি এবং দ্বীন ও মাযহাবের খিদমতে আত্মনিয়োগ করি। আল্লাহ পাক আমাদের তৌফিক দিন! আমিন।