নগর জুড়ে বর্ণিল আলোকসজ্জা জুলুস ঘিরে উৎসবের আমেজ-

0

নগর জুড়ে বর্ণিল আলোকসজ্জা জুলুস ঘিরে উৎসবের আমেজ- 

কাশেম শাহ্, =

দৈনিক আজদী, শেষ পৃষ্ঠা, বৃহস্পতিবার , ৩০ নভেম্বর, ২০১৭
====
আর মাত্র একদিন পরেই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.)। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (দ.) এর দুনিয়ায় শুভাগমনের এ দিনটি বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায় ঈদের দিন হিসেবে উদযাপন করে থাকে। এ দিনকে ঘিরে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানমালা। ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) ১২ রবিউল আউয়াল হলেও এ মাসের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত মিলাদ মাহফিল, ওরশ, র‌্যালিসহ নানা আয়োজনে উদযাপিত হয় পবিত্র এ মাসটি। দেশের অন্যান্য স্থানের মতো চট্টগ্রামেও ঈদে মিলাদুন্নবী (দ.) উপলক্ষে আয়োজিত হয় দেশের সবচেয়ে বড়, বর্ণাঢ্য র‌্যালি, যা জশনে জুলুস নামে পরিচিত। অরাজনৈতিক ধর্মীয় সংস্থা আনজুমানে রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট বাংলাদেশ গত ৪২ বছর ধরে এ জশনে জুলুসের আয়োজন করে আসছে। ১৯৮৭ সাল থেকে জশনে জুলুসে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন পীরে কামেল, আওলাদে রাসুল হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মাজিআ)। এবছরও তিনি জুলুসে নেতৃত্ব দেবেন। জশনে জুলুস সফল করতে ইতিমধ্যেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। কয়েক লক্ষ মানুষের শোভাযাত্রার নিরাপত্তায় প্রস্তুত রাখা হয়েছে তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবক। চট্টগ্রামের স্থানীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠা এ জুলুসকে বরণে নগরবাসীর মধ্যেও উৎসাহ–উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বর্ণিল আলোয় রঙিন নগরী : শনিবারের জুলুসকে ঘিরে পক্ষকাল ধরে চলছে নগরীকে সাজিয়ে তোলার প্রস্তুতি। ফ্রি পোর্ট থেকে দেওয়ান হাট, লালখান বাজার হয়ে কাজির দেউড়ি, জামালখান–চেরাগি পাহাড় হয়ে আন্দরকিল্লা, লালদীঘি–নিউমার্কেট হয়ে কদমতলী, কাপ্তাই রাস্তার মাথা হয়ে বহাদ্দারহাট–মুরাদপুর, ষোলশহর, ওয়াসা, অক্সিজেন হয়ে বিবিরহাট প্রায় সর্বত্রই বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। রাত হলেই লাল–নীল বাতি রঙিন আলো ছড়াচ্ছে নগর জুড়ে। লাগানো হয়েছে ব্যানার, ফেস্টুন, পতাকা। তৈরি করা হয়েছে তোরণ। এ প্রসঙ্গে আনজুমান ট্রাস্টের সাজসজ্জা কমিটির আহবায়ক আযহারুল হক আযাদ বলেন, ১৫ দিন ধরে নগরীকে সাজানোর কাজ চলছে। যেসব পথ দিয়ে জুলুস রওয়ানা হবে শুধু সেসব পথই নয়, পুরো নগরীতে যেন ঈদে মিলাদুন্নবীর আমেজ ছড়িয়ে দেওয়া যায় সে চেষ্টা করা হয়েছে। নগরীর সব গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে লাইটিংয়ের পাশাপাশি দশ হাজার পতাকা লাগানো হয়েছে। আনজুমান ট্রাস্টের পাশাপাশি স্থানীয় গাউসিয়া কমিটি এ কাজে সহযোগিতা করেছে। এছাড়া তোরণ নির্মাণ, মাইকিং, কর্ণফুলী ব্রিজ, কালুরঘাট সেতু,মদুনাঘাট সেতু, ফ্লাইভারেও লাইটিং করা হয়েছে। জুলুসের সমাবেশ স্থল জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে তৈরি করা হয়েছে বিশাল প্যান্ডেল।

জুলুসের পথে নিষ্ফিদ্র নিরাপত্তা

গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সাদেক হোসেন পাপ্পু জানান, গত এক মাস ধরে চলছে জুলুসের প্রস্তুতি চলছে। জুলুস সফল করতে গঠন করা হয়েছে ২০টি উপকমিটি। জুলুসের দিন সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা ও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুত রাখা হয়েছে প্রায় তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবক। এরা সবাই গাউসিয়া কমিটির নিবেদিত কর্মী। এদেরকে দুটি সভার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে নিরাপত্তার ব্যাপারে। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে আগে থেকে অবস্থান করবে নিরাপত্তা কর্মীরা। জুলুসে হুজুরের গাড়ির নিরাপত্তায় থাকবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আনজুমানের নিজস্ব সিকিউরিটি ফোর্স এএসএফ। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব, আধা সামরিক বাহিনীও নিরাপত্তার কাজে নিয়োজিত থাকবে।

জরুরি স্বাস্থ্য সেবা

জুলুসে আগতদের স্বাস্থ্যসেবায় ৩টি মেডিকেল টিম অ্যাম্বুলেন্সে চলমান থাকবে। এছাড়া ৩টি অস্থায়ী ক্যাম্প করা হচ্ছে। এখানেও চিকিৎসকরা থাকবেন, তারা কারো প্রয়োজন হলে জরুরি চিকিৎসা সেবা দেবেন। সবাইকে সুশৃঙ্খলতার সাথে জুলুসে অংশ নেয়ার আহবান জানিয়ে সাদেক হোসেন পাপ্পু বলেন, আনজুমান ট্রাস্ট যেসব বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে সেসব বিষয়ে সবই যেন সতর্ক থাকে। বিশেষ করে গাড়ি থেকে খাবার ছুঁড়ে মারা কিংবা এক গাড়ি অন্য গাড়িকে ওভারটেক করা, হুজুরের গাড়ির আগে পরে হুড়োহুড়ি করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।

জবাই হবে দেড়শ গরু–মহিষ

গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ এর মহানগর সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মাহবুবুল আলম বলেন, জুলুসে প্রায় ৪০ লাখ লোকের সমাগম হবে, কিন্তু এত মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করতে গেলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। তাই আনজুমান ট্রাস্ট কিংবা গাউসিয়া কমিটি জশনে জুলুসে তবারকের ব্যবস্থা করেনা। তবে মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকা নাজিরপাড়া, খতিবের হাট, মোহাম্মদপুর, বহাদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকার মহল্লা কমিটির উদ্যোগে জুলুসে আগতদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এটি তাদের নিজস্ব আয়োজন। এ জন্য শুক্রবার রাতে জবাই করা হবে অন্তত দেড়শ গরু–মহিষ। এছাড়া মাদ্রাসা সংলগ্ন এলাকায় প্রায় সব ঘরেই মুসল্লীদের জন্য নামাজের ব্যবস্থাও করা হয়। মাদ্রাসার আশপাশে মুসল্লিদের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে শতাধিক অস্থায়ী শৌচাগার।

যে পথে জশনে জুলুস

আনজুমান ট্রাস্ট সূত্র জানায়, প্রতিবছরের মতো এবারও চট্টগ্রামের জুলুস নগরীর পশ্চিম ষোলশহর আলমগীর খানকাহ–এ কাদেরীয়া সৈয়দিয়া তৈয়বিয়া হতে সকাল ৮টায় শুরু হবে। এর পর বিবিরহাট, মুরাদপুর, পাঁচলাইশ, চকবাজার, সিরাজদ্দৌলা রোড হয়ে আন্দরকিল্লা, চেরাগি পাহাড় মোড়, জামালখান, প্রেস ক্লাব, গণিবেকারি, চট্টগ্রাম কলেজ হয়ে পুনরায় চকবাজার, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর বিবিরহাট হয়ে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসায় মাহফিলে মিলিত হবে। সেখানে আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ (মাজিআ)র ইমামতিতে জোহরের নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। মাহফিলে উপস্থিত থাকবেন তাঁর দুই সাহেবজাদা আল্লামা সৈয়দ কাসেম শাহ (মাজিআ) ও আল্লামা সৈয়দ হামেদ শাহ (মাজিআ)।

আয়োজকরা জানান, জুলুসে উত্তরবঙ্গসহ প্রায় ৪০টি জেলা থেকে নবীপ্রেমিকরা যোগ দেবেন। এছাড়া চট্টগ্রামের ১৪ উপজেলা,রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজার থেকেও ভক্তরা বাস–ট্রাক ও মাইক্রোযোগে মাহফিলে যোগ দেবেন।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •