হযরত নবী করীম’র পবিত্র মি’রাজ- শেখ মুহাম্মদ ইব্রাহীম

0

হযরত নবী করীম’র পবিত্র মি’রাজ-
শেখ মুহাম্মদ ইব্রাহীম

===

উম্মাহাতুল মোমেনিন হযরত খাদীজা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা শে’বে আবু তালিবের বন্দী জীবনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গী ছিলেন। শে’বে আবু তালিব থেকে বেরিয়ে আসার পর তিনি ইন্তেকাল করেন। তখন পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়নি। প্রিয় বিবির ইন্তেকাল ও তায়েফের ঘটনাবলী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে ভীষণ পীড়া দিচ্ছিল। এ অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য আল্লাহ্ জাল্লাশানুহু নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত এবং মসজিদে আকসা থেকে সপ্তাকাশ অতিক্রম করে আল্লাহর দীদার নসীব করেছিলেন। দেহ-আত্মায় জাগ্রত অবস্থায়- এই অলৌকিক সফরই ‘ইসরা’ ও ‘মি’রাজ’ নামে অভিহিত। এটা ছাড়াও মি’রাজ শরীফের আরো বহু হিকমত তথা কারণ আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর একান্ন বছর নয়মাস বয়সে, নবুয়তের দশম বর্ষে, ২৭ রজব, ৬২১ খ্রিস্টাব্দে পবিত্র মি’রাজ সম্পন্ন হয়।

মহান আল্লাহ্ তা‘আলা পবিত্র ক্বোরআনে ইরশাদ করেন, ‘‘পবিত্র ওই মহান সত্তা, যিনি স্বীয় বিশিষ্ট বান্দা (অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফাকে রাত্রির সামান্যতম সময়ে মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করান, যার সমুদয় পরিবেশকে আমি (আল্লাহ্) বরকতময় করেছি। আমার নিদর্শনসমূহ দেখানোর জন্য। (তাকে আসমানে ভ্রমণ করানো এবং সেখানকার বিশেষ নিদর্শনাবলী প্রত্যক্ষ করানোর জন্য।) যার আরো কিছু বর্ণনা আল্লাহ্ ‘সূরা নাজ্ম’-এ উল্লেখ করেছেন। তা শেষ নবীর জন্য ছিল এক অনন্য সম্মান ও মর্যাদা।

প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও আলিমগণের ভাষ্য মতে, মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে ‘ইসরা’ এবং মসজিদে আকসা থেকে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত ভ্রমণকে ‘মি’রাজ’ বলে। মি’রাজ মানে আরোহনের সিড়ি। এটা উর্ধ্বগমন ছিলো তাই এটাকে মি’রাজ বলা হয়। মি’রাজে হুযূর-ই আকরামের প্রধান বাহন ছিলো বেহেশতী বোরাক। মি’রাজের সারসংক্ষেপ হলো এই;

একরাতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম চাচা আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা-এর ঘরে শু’য়ে আরাম করছিলেন। তাঁর অবস্থা ছিল আধো নিদ্রা, আধো জাগরণের মতো। হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম আরো ফিরিশতাসহ এসে তাঁকে অতি আদর সহকারে জাগালেন এবং মসজিদে হারামের দিকে নিয়ে গেলেন। সেখানে যমময কূপের ধারে নিয়ে গেলেন। আর সেখানে তাঁর পবিত্র বক্ষ-বিদীর্ণ করে তাঁর ক্বলব মুবারককে যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করলেন।

আর একটি স্বর্ণের বাটি আনা হলো- যা ঈমান ও হিকমতে পরিপূর্ণ ছিল। তা তাঁর পবিত্র বক্ষে ঢেলে দিয়ে বক্ষ বন্ধ করে দেন। এরপর বোরাক্ব আনা হলো। বোরাক্ব একটি বেহেশতি পশু- যা খচ্চর থেকে কিছুটা ছোট, গাধা থেকে কিছুটা বড়, শ্বেতবর্ণের বিদ্যুৎগতিতে চলৎশক্তিসম্পন্ন ছিল- যার এক একটি পদক্ষেপ দৃষ্টি সীমার অনেক বাইরে পড়ত। নবী করীম বোরাক্বে আরোহন করলেন। হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম, হযরত মীকাঈল আলায়হিস্ সালাম ও হযরত ইস্রাফীল আলায়হিস্ সালাম তাঁর সফর সঙ্গী ছিলেন। বোরাক্বের সাথে ফেরেশতাদের একটি জুলূস ছিলো।

প্রথমে তিনি অতিক্রম করলেন এমন ভূমি যেখানে প্রচুর খেজুর গাছ ছিল। হযরত জিবরাঈল আমীন অবতরনের জন্য বললেন এবং দু’রাকাত নামায পড়লেন তিনি। হযরত জিবরাঈল ফেরেশতা তাঁকে বললেন, ‘আপনি ইয়াসরিব অর্থাৎ পবিত্র মদীনায় নামায আদায় করলেন যেখানে আপনি হিজরত করবেন।’’

এরপর রওয়ানা হয়ে অপর একটি স্থানে পৌঁছে আগের মতো নামায আদায় করলেন। এটা হলো সিনাই এলাকা যেখানে হযরত মুসা আলায়হিস্ সালাম আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সাথে কথা বলছিলেন- এটাও জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম পরিচিতি দিলেন। অতঃপর আরেকটি ভূমি অতিক্রম কালে জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, এখানে নেমে নামায আদায় করুন। হযরত জিবরাঈল আমীন বললেন, এটা হলো মাদাইন যেখানে হযরত শোয়াইব আলায়হিস্ সালাম-এর আবাসস্থল ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু-এর বর্ণনায় আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন, শবে মি’রাজের যাত্রায় আমি মুসা আলায়হিস্ সালামকে তাঁর কবরে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে দেখেছি।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছলেন এবং সেখানে বোরাক্ব থেকে আবতরণ করলেন। সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বোরাক্বকে সেই স্তম্ভের সাথে বাঁধলেন যাতে পূর্ববর্তী নবীগণ নিজেদের বাহন বাঁধতেন। কালের বিবর্তনে ওই ছিদ্র বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম আঙ্গুল দিয়ে তা খুলে দেন।

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি এবং জিবরাঈল আমীন উভয়েই মসজিদে প্রবেশ করি এবং উভয়েই দু’রাকাত নামায আদায় করি। [বায়হাকী]

তা এভাবে যে, সেখানে আম্বিয়া আলায়হিমুস্ সালাম একত্রিত হয়েছিলেন জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম আমাকে এগিয়ে দেন। আর আমি তাঁদের ইমামতি করি।

পৃথবীর বুকে এসব কাজ সমাপ্তির পর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম ও অপরাপর ফিরিশতাগণের সাথে আসমানের দিকে- অসীমের পানে যাত্রা শুরু করলেন।

আলমে মালাকুত সফর ও আসমান সমূহে নবীগণের সাথে তাঁর সাক্ষাত শুরু হলো। এভাবে তিনি প্রথম আসমানে উপনীত হন। জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম দরজা খোলান। পৃথিবীর নিকটতম প্রথম আসমানের প্রহরী ফিরিশতা জিজ্ঞেস করেন আপনার সাথে কে? জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম। ফিরিশতা জিজ্ঞেস করেন তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে? জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে ফিরিশতা তা শুনে স্বাগত সম্ভাষণ জানান ও দরজা খুলে দেন। তিনি প্রথম আসমানে প্রবেশ করে একজন বুযুর্গ ব্যক্তির দেখা পান। জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন, তিনি আপনার আদি পিতা আদম আলায়হিস্ সালাম, তাঁকে সালাম করুন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আদম আলায়হিস্ সালামকে সালাম জানালে প্রত্যুত্তরে তিনি বলেন, ‘মারহাবা বিল ইবনিস সালেহ ওয়ান্ নবীইস্ সালেহ’ অর্থাৎ স্বাগতম, সৎ সন্তান ও উপযুক্ত নবীর জন্য। এবং তাঁর কল্যাণের জন্য প্রার্থনা করেন। এ সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম দেখেন হযরত আদম আলায়হিস্ সালাম-এর ডানে-বামে কিছু আকৃতি বিরাজমান। যখন তিনি ডানদিকে তাকান তখন আনন্দিত হয়ে হাসেন আর বামদিকে যখন তাকান তখন কান্না করেন। জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম বলেন, তাঁর ডানদিকে সৎবংশধরদের জান্নাতি আকৃতি এবং বামদিকে অসৎ সন্তানদের দোযখের আকৃতি। ডানদিকে তাকালে জান্নাতের সুগন্ধি পান আর বামদিকে তাকালে দোযখের দুর্গন্ধ আসে।

হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে আসলেন। দরজা খুলতে বললে রক্ষী ফিরিশতা বললেন, আপনার সাথে কে? তাঁকে আহ্বান করা হয়েছে? জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম বললেন হ্যাঁ। ফিরিশতা বললেন, স্বাগতম, কত উত্তম আগমন। এখানে তিনি যাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন, তাঁরা হলেন, হযরত ইয়াহহিয়া ও হযরত ঈসা আলায়হিমাস্ সালাম। তাঁদেরকে সালাম দেয়ার পর প্রত্যুত্তরে তাঁরা বললেন, ‘‘মারহাবা বিল আখিস্ সালেহ ওয়া বিল নবীইস্ সালেহ। অর্থাৎ ‘সুশীল ভ্রাতা ও যোগ্য নবীর জন্য স্বাগতম।’ হযরত ইয়াহহিয়া আলায়হিস্ সালাম ও হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম- সম্পর্কে খালাতো ভাই।

এরপর তাঁরা তৃতীয় আসমানে আগমন করেন এবং জিবরাঈল আমীন একইভাবে দরজা খোলান। সেখানে হযরত ইউসুফ আলায়হিস্ সালাম-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তাঁর সাথেও একইভাবে কুশলাদি বিনিময় হলো। এরপর একইভাবে চতুর্থ আসমানে আগমন করেন। সেখানে হযরত ইদ্রীস আলায়হিস্ সালাম-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়। তাঁর সাথেও একইভাবে কুশলাদি বিনিময় হলো।

এবার তাঁরা পঞ্চম আসমানে আগমন করেন, একইভাবে সওয়াল জবাবের পর হযরত হারুন আলায়হিস্ সালাম-এর সাক্ষাৎ পেলেন। তাঁকে সালাম দেয়ার পর প্রত্যুত্তরে হযরত হারুন আলায়হিস্ সালাম বললেন, সু-স্বাগতম সৎকর্মশীল ভাইকে ও সৎকর্মশীল নবীকে। ষষ্ঠ আসমানে গিয়ে একইভাবে সওয়াল জবাবের পর হযরত মুসা আলায়হিস্ সালাম-এর সাক্ষাৎ পেলেন। তাঁকে সালাম দেয়ার পর মুসা আলায়হিস্ সালাম বললেন, ‘সু-স্বাগতম সৎকর্মশীল ভাইকে ও সৎকর্মশীল নবীকে।

এবার তাঁরা সপ্তম আসমানে আগমন করেন। সেখানে তাঁরা হযরত ইবরাহীম আলায়হিস্ সালাম-এর সাক্ষাৎ পান। তাঁকে দেখা গেলো বায়তুল মামুরে পিঠে হেলান দিয়ে বসে আছেন। তাঁকে সালাম দিলে প্রত্যুত্তরে বললেন, ‘সু-স্বাগতম সৎকর্মশীল সন্তান ও সৎকর্মশীল নবীকে।’ বায়তুল মামুর ফিরিশতাদের কিবলা-প্রতিদিন সত্তর হাজার ফিরিশতা এই কিবলা তাওয়াফ করেন। প্রতিদিনের তাওয়াফকারী দল দ্বিতীয়বার তাওয়াফের সুযোগ পান না। নিত্য নতুন দল তাওয়াফ করেন- যা কিয়ামত পর্যন্ত এভাবে জারী থাকবে। উর্ধ্বাকাশে বায়তুল মা’মুরের অবস্থান মক্কার কা’বা গৃহের হুবহু বরাবর। মক্কার কা’বাগৃহ বায়তুল মামুরের আদলে তৈরী।

বিভিন্ন আসমানে অবস্থানরত নবীদের অতিক্রম করার পর তিনি এমন এক সমতল স্থানে পৌঁছেন যেখান থেকে কলমের লেখন শব্দ শুনতে পাচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ো যাওয়া হলো, যা সপ্তম আসমানের উপরে একটি সীমান্তবর্তী কুলবৃক্ষ বিশিষ্ট স্থান। এ বৃক্ষের পাতাগুলো হাতির মত এবং ফলগুলো হিজর অঞ্চলের কলমীর মত। একাধিক উজ্জ্বল রংয়ের বিশেষ বস্তু সমূহ ওই কুল বৃক্ষকে আচ্ছাদিত করে রাখে। বৃক্ষে ছড়ানো পাখির মতো ফিরিশতাগণ ওই বৃক্ষে আরোহন করেন। সোনালী পতঙ্গগুলো বৃক্ষের চতুর্দিকে উড়তে থাকে। আল্লাহ্ তা‘আলার নূরের জ্যোতিতে বৃক্ষটি অপূর্ব শোভিত হয়ে অপরূপ রূপ ধারণ করে আছে। পৃথিবী থেকে যা কিছু উপরে উত্থিত হয়, তা সিদরাতুল মুনতাহায় এসে সমাপ্ত হয়। এরপর আরো উপরে উঠানো হয়। আর ফিরিশতাকুল থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয়, তাও সিদরাতুল মুনতাহায় এসে স্থির হয়। এরপর নীচে অবতীর্ণ হয়। এজন্য এর নাম সিদরাতুল মুনতাহা।

এ স্থানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম জিবরাঈল আলায়হিস্ সালামকে তাঁর আসল অবয়বে দেখতে পান। তাঁর ছয়শ পাখা। এক পাখা থেকে অপর পাখার দূরত্ব- যমীন থেকে আসমানের দূরত্বের সমান। এ প্রসংঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই তিনি তাঁকে আরেকবার দেখেছিলেন সিদরাতুল মুনতাহার নিকট। যার নিকট অবস্থিত বাসোদ্যান। তাঁর দৃষ্টি বিভ্রম হয়নি, দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুত হয়নি। [সূরা নাজম: আয়াত- ৫]

আল্লাহ্ তা‘আলা হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্ সালামকে যে আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, সে আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবার সহ তাঁকে দু’বার দেখলেন। বেহেশত যেহেতু সিদরাতুল মুনতাহার নিকটে, যেমনটি পবিত্র ক্বোরআনে বর্ণিত হয়েছে। এখানে থেকে তিনি প্রথমে জান্নাত পরিভ্রমণ করেন, পরে তাঁকে জাহান্নাম দেখানো হয়।

এরপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আরো উপরে নিয়ে যাওয়া হলো, ওখানে তিনি ‘সরীফুল আকলামের’ আওয়াজ শুনতে পান। লেখার সময় কলম থেকে মৃদু শব্দ সৃষ্টি হয় তাকে ‘সরীফুল আকলাম’ বলে। আল্লাহর অভিপ্রায় ও নির্দেশ-লিখন এবং আল্লাহর বিধানসমূহ লাওহে মাহফুয থেকে কপি করা হচ্ছিল। সরীফুল আকলামের স্থান সিদরাতুল মুনতাহার পরে। উপরে নির্দেশাবলী সিদরাতুল মুনতাহার সর্বশেষ ঘাটি হিসেবে অবতীর্ণ হয়। সমগ্র সৃষ্টির নির্দেশনার ঘাটি হলো সরীফুল আকলাম। স্রষ্টার নির্দেশাবলী এবং বিধানসমূহের উপমাহীন-তুলনাহীন প্রধান কার্যালয় এটিই। সরীফুল আকলামের স্থান থেকে পর্দাসমূহ অতিক্রম করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্ তা‘আলার পবিত্র দরবারে উপস্থিত হলেন। উল্লেখ্য তাঁর বাহন হিসেবে একটি রফ্রফ্ (অর্থাৎ একটি সুসজ্জিত সবুজ সিংহাসন) আগমন করে এবং তাতে সওয়ার হয়ে প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পরম সান্নিধ্যে ও একান্ত নৈকট্যে অর্থাৎ একটি ধনুকের দুই প্রান্ত ধনু পরিমাণ অথবা তদপেক্ষা আরো নিকটে উপস্থিত হন।

হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ফরমান, ‘‘আমি নূরে আযম অর্থাৎ আল্লাহকে দেখেছি। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা আমার প্রতি যা ইচ্ছা ওহীর বাণী শোনালেন। অর্থাৎ কোন মাধ্যম ছাড়াই তিনি আমার সাথে কথা বলেছেন।

মোটকথা, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দর্শন ও বিনা মাধ্যমে মহান রবের সাথে কথা বলে ধন্য হলেন। আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর সাথে কথা বলেন এবং তাঁর ও উম্মতের জন্য পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামায ধার্য করেন- যা পরবর্তীতে ফিরে আসার সময় হযরত মুসা আলায়হিস্ সালাম-এর সাথে সাক্ষাতে এবং তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আল্লাহর দরবারে একাধিকবার গিয়ে আবেদন জানিয়ে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নিয়ে আসেন। পাঁচ ওয়াক্তে নামাযের সাথে আরো দু’টি অনুগ্রহ দান করে আল্লাহ্ প্রিয় হাবীবের আগমনকে ধন্য করলেন। তাহলো সূরা বাকারার শেষ আয়াত- যা দু‘আর আকারে এই উম্মতকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা কর, আমি তোমাদের সমস্ত দু‘আ ও আবেদন মঞ্জুর করব। পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের সওয়াব পঞ্চাশ ওয়াক্তের সমপরিমাণ ধার্য করবেন। শেষ অনুদান হলো তাঁর উম্মতের মধ্যে যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করবেনা, আল্লাহ্ তা‘আলা তার কবীরাগুনাহ সমূহ ক্ষমা করে দেবেন অর্থাৎ তাদেরকে কাফিরদের ন্যায় সর্বকালের মতো জাহান্নামে রাখবেন না; বরং কাউকে নবী আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম-এর সুপারিশে মাফ করবেন; আর কাউকে মর্যাদাপ্রাপ্ত ফিরিশতাগণ ইত্যাদির সুপারিশে, আর কাউকে নিজ অনুগ্রহ ও দয়ায়। যার অন্তরে একবিন্দু পরিমাণও ঈমান থাকবে তাকেও শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেয়া হবে।

আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে একান্ত কাছে নিয়ে গিয়ে নানাবিধ সৌভাগ্য ও সাহায্য দানে ধন্য করেন এবং এবং সুসংবাদ দানে আনন্দিত করেন। আর বিশেষ বিধান ও নির্দেশ প্রদান করেন।

পবিত্র মিরাজের মাধ্যমে নবী করীম-এর অনন্য মর্যাদা ও ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এটি মূলত: মহান আল্লাহ্র অপরিসীম কুদরত ও শক্তির বহিঃপ্রকাশ। জ্ঞানী ও বিজ্ঞ লোকদের জন্য এর মধ্যে অন্তর্নিহিত শিক্ষণীয় গূঢ় রহস্য রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হিদায়াত, রহমত এবং ঈমানদারদের জন্য দৃঢ়তার ও আস্থার উপাদান। এটা নিশ্চয়ই মহান আল্লাহর ইচ্ছাকৃত সুমহান কর্ম। আল্লাহর প্রিয় হাবীব রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে যা দেখানোর ইচ্ছা ছিল তা দেখানোর জন্যে মহান আল্লাহ্ তাঁকে যেভাবে যেরূপে চেয়েছেন সেরূপে আদি-অন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন। ফলে, নবী করীম মহান আল্লাহর অনন্য কুদরত ও হিকমতের নিদর্শন স্বচক্ষে স্বশরীরে প্রত্যক্ষ করলেন। যে কুদরত ও হিকমত দ্বারা মহান আল্লাহ্ যখন যা চান, তখন তা করতে পারেন- তিনি মহান পরাক্রমশালী।

হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম আসমান থেকে প্রত্যাবর্তন করে বায়তুল মুকাদ্দাসে এসে অবতরণ করেন। ওখান থেকে বোরাক্ব যোগে প্রভাত হওয়ার পূর্বেই মক্কা মোকাররামায় পৌঁছে যান। মক্কায় ফিরে তিনি ছিলেন পরিপূর্ণ শান্ত ও স্থির তবে আশংকা ছিলো এ সংবাদ দেওয়ার মক্কার কাফিররা অস্বীকার করতে পারে।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক হযরত উম্মে হানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু’র সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে রাতে ভ্রমণ করানো হয়েছে আমার ঘর থেকে। সেই রাতে এশার নামায আদায়ের পর তিনি আমার ঘরে কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন। ফজরের পূর্বে তিনি আমাদেরকে ঘুম থেকে জাগালেন। আমরা তখন ফজরের নামায আদায় করলাম। তখন তিনি বললেন, হে উম্মে হানী! গতরাতে এই জায়গায় আমি তোমাদের সাথে এশার নামায আদায় করেছি। তারপর আমি বায়তুল মুক্কাদ্দাসে যাই এবং সেখানে নামায আদায় করে উর্ধ্বাকাশে আরোহন করি। সাত আসমান পাড়ি দিয়ে আলমে লা-মাকানে গিয়ে আল্লাহ্ তা‘আলার সাথে সাক্ষাৎ করে এখন আবার ফিরে এসে তোমাদের সাথে ফজরের নামায আদায় করলাম। এতে উম্মে হানী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বললেন, হে আল্লাহর নবী! একথা আপনি কারো নিকট বলবেন না, তারা আপনাকে অস্বীকার করবে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রত্যুত্তরে বললেন, আল্লাহর ক্বসম, আমি তা অবশ্যই অকপটে ব্যক্ত করব এবং তিনি এই অলৌকিক ঘটনা জনসমক্ষে বলে গেলেন। এতে ঠিকই কাফিরগণ তাঁর কথা প্রত্যাখ্যান করলো। তারা প্রমাণ চাইলে তিনি বললেন, আমি অমুক স্থানে অমুক গোত্রের কাফেলাকে অক্রিম করেছি। আমার সওয়ার চলার শব্দে ওরা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ওঠেছিল এবং কাফেলার একটি উট কাফেলা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল যা পরে পাওয়া যায়। তিনদিন পর অর্থাৎ আগামী বুধবার কাফেলা মক্কায় পৌঁছবে এবং একটি মেটো বর্ণের উট ওই কাফেলার অগ্রগামী হবে- যার পিঠে দু’টি বড় বড় বোঝা থাকবে। বুধবার এসে গেলো, পুরোদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর সূর্য অস্তমিত হওয়ার উপক্রম হলো, কিন্তু তবুও কাফেলার দেখা নেই। নবী করীম আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন। আল্লাহ্ সূর্যকে স্থির রেখে দিলেন। এর মধ্যে রাসূলুল্লাহর বর্ণনা মুতাবেক ওই কাফেলাটি সূর্য অস্তমিত হওয়ার পূর্বেই এসে পড়লো। প্রসঙ্গত: সেদিন রাসূলুল্লাহ্ এর জন্য এবং অন্য আরেকদিন হযরত ইউশা ইবনে নূন আলায়হিস্ সালাম-এর জন্য সূর্য স্থির রেখেছিলেন মহান আল্লাহ। এ ছাড়া আরেকদিন হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর জন্য ডুবন্ত সূর্যকে উদিত করে আসরের নামায যথা সময়ে পড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামকে মুশরিকরা বায়তুল মুকাদ্দাসের বিভিন্ন বিবরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন শুরু করলো। আল্লাহ্ তা‘আলা বায়তুল মুকাদ্দাসকে তাঁর সম্মুখে এনে দিলেন, তা দেখে দেখে তিনি মুশরিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে যাচ্ছিলেন। হযরত আবূ বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বললেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম রাতের ভ্রমণ নিয়ে যা বলেছেন তা একেবারে নির্ভেজাল সত্য এবং তাঁর সত্যতা আমি অকপটে স্বীকার করলাম এবং মনেপ্রাণে গ্রহণ করলাম। এই ঘটনার পর ওইদিন থেকে তিনি ‘সিদ্দীক্ব’ হিসেবে অভিহিত হলেন।

এভাবে আল্লাহ্ তা‘আলা উপস্থিত মক্কাবাসীদের নিকট দলীল প্রমাণ সুদৃঢ় করলেন এবং বিষয়টি তাদের নিকট স্পষ্ট হয়ে পড়ল। ফলে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে যাঁরা ঈমান আনয়নকারী তাঁরা ঈমান আনলেন আর প্রত্যাখ্যানকারীরা দলীল প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও কুফরী করলো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, আমি যে দৃশ্য আপনাকে দেখিয়েছি তা এবং ক্বোরআনে উল্লিখিত অভিশপ্ত বৃক্ষটিও (যক্কুম বৃক্ষ) কেবল মানুষের পরীক্ষার জন্য। অর্থাৎ যাচাই করা ও পরখ করে নেয়ার জন্য।

কোন অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনার সময় তাসবীহ বা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করা হয়। এতে বুঝা যায়, মি’রাজ সংঘটিত হয়েছিল সশরীরে। দেহ ও রূহ এর সমন্বিত অবস্থার ক্ষেত্রেই আব্দ শব্দ প্রযোজ্য। বরং ওই মি’রাজ যদি নিদ্রিত বা স্বপ্নাবস্থায় হতো তখন কাফিরগণ তা অস্বীকার করত না রবং এটা তাদের ধারনায় অসম্ভব মনে হতো না। কারণ স্বপ্নের মধ্যে এরূপ কিছু দেখা আশ্চর্যের বিষয় নয়। অন্যান্য নবীর উপর আমাদের নবী করীমের দুটি ফযীলত সবিশেষ লক্ষ্যণীয়। তাহলো পৃথিবীতে মি’রাজ ও আখিরাতে শাফায়াত। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে বিনীত হওয়ায় মি’রাজের মর্যাদা লাভ করেছেন এবং সৃষ্টির প্রতি বিনম্র হওয়ায় শাফায়াতের অধিকারী হয়েছেন। এটাও উম্মতের জন্য শিক্ষার বিষয়; তারাও যদি এ দু’টি চরিত্রকে গ্রহণ করে, তবে তারাও আল্লাহর দরবারে প্রিয় ও সৃষ্টির নিকট সম্মানিত হবে।

শবে মি’রাজের পরের দিন জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট মধ্যাহ্নের পরপরই এসেছিলেন। তিনি নামাযের নিয়ম-কানুন ও সময় সবিস্তারে রাসূলুল্লাহকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্কে নিয়ে পরের দিন সকাল পর্যন্ত নির্ধারিত পাঁচওয়াক্তের নামাযসমূহ আদায় করলেন। শবে মি’রাজের আগে দু’রাকাত করে নামায পড়া হতো। তারপর যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয হলো, তখন মুকীমদের জন্যে এখন যে বিধান কার্যকর অর্থাৎ পূর্ণ নামায আদায় করা সে হিসেবে ফরয হলো। শুক্রবারের জুমার নামাযের নিয়ম-রীতি ও সময় নির্ধারিত হলো। আর সফল অবস্থায় দু’রাকাত করে কসর আদায়ের অনুমতি দেয়া হলো। কালক্রমে তারাবীর নামায ও অন্যান্য সুন্নাত ও নফল নামায পড়ার রীতি-নীতি সময়-কাল নির্ধারিত হলো।

আল্লাহ্ তা‘আলা মি’রাজের ঘটনা ‘সুবহানাল্লাযী’ দ্বারা এজন্য শুরু করেছেন, যাতে কোন অন্ধ ধারনার অনুসারীর নিকট অবাস্তব ও অসম্ভব মনে না হয়। তিনি সর্বপ্রকার দুর্বলতা থেকে পাক পবিত্র। হযরত আল্লামা সুয়ূতী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ‘আর রিসালা’ গ্রন্থে পবিত্র মি’রাজের ঘটনাবলীর সাথে নবী করীমের বাস্তব জীবনের কিছু ঘটনার মিল খুঁজে বের করেছেন, তাহলো এই: নবীগণের সাত আসমানের সাতটি স্তর অতিক্রম করে তিনি অষ্টম স্তর সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছেন- এতে অষ্টম হিজরির মক্কা বিজয়ের ইঙ্গিত ছিল। নবম স্তর সরীফুল কলমের স্থলে পৌঁছানো যা নবম হিজরিতে তাবুকের যুদ্ধের ইঙ্গিত বহন করে। আর সর্বশেষ দশম স্তর রফ্রফে আরোহন করে আল্লাহ্ তা‘আলার একান্ত নৈকট্য লাভ। পবিত্র দর্শন ও মহান বাণী শ্রবণের সৌভাগ্য। দশম স্তরের ইঙ্গিত হলো, হিজরি দশম বর্ষে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর সান্নিধ্যে পুনর্গমন অর্থাৎ তিনি পার্থিব ইহলৌকিক আবাস ত্যাগ করে পরম বন্ধুর একান্ত সান্নিধ্যে চলে যাওয়া।

নবী করীমের আসমানী সফরে আল্লাহর ফিরিশতাগণকে বিভিন্ন অবস্থায় দেখতে পান। আল্লাহর ইবাদতে মশগুল ফিরিশতাদের একদল কিয়ামের অবস্থায় হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছেন, একদল রুকু অবস্থায় কখনো মাথা উত্তোলন করেন না; একদল সর্বদা সাজদারত অবস্থা আছেন এবং আরেক দল সবসময় বসা অবস্থায় রয়েছেন। আল্লাহ্ ত‘আলা এ সমুদয় শর্ত নামাযের একই রাকাতে একত্র করে দেন। যাতে করে উম্মতের ইবাদত সমস্ত ফিরিশতার ইবাদতের সমষ্টি ও সার-সংক্ষেপে পরিণত হয়।

অনেকে মনে করেন মহাশূন্যে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করা স্থুল দেহের মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। নূরের তৈরী ফিরিশতারা যেহেতু অনায়াসে বিচরণ করতে পারেন তদ্রুপ ‘নূরে মুহাম্মদী’র পক্ষেও আল্লাহর ইচ্ছায় তা অসম্ভব কিছু নয়। সৃষ্টিকর্তা যা ইচ্ছা তা করতে পারেন। কোন বস্তু দৃষ্টি গোচর না হওয়াটা এর অস্তিত্বহীনতার প্রমাণ নয়। অন্যথায় আসমান-যমীনের অজস্র বস্তু অস্বীকার করা আবশ্যকীয় হয়ে পড়তো। মানুষের আধুনিক আবিস্কারের ফলে মহাশূন্যে রকেটসহ অন্যান্য মহাশূন্য যান উড্ডীন করে তাদের প্রযুক্তিগত প্রমাণ দিচ্ছেন, অথচ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর পক্ষে মুহূর্তে এসব করা সম্ভব। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নিকট হযরত ইদ্রিস আলায়হিস্ সালাম এবং হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম-এর নশ্বর দেহ জীবিত আসমানে উঠানো এবং নামানো (শেষ জমানায়) যদি সত্যি হয় তাহলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মুবারক নূরী-দেহ নিয়ে আসমানে আরোহন ও অবতরণ সত্যি হবে না কেন? অবশ্যই সম্ভব। যা কোরআন-হাদীস, সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিঈগণের ইজমা দ্বারা প্রমাণি। মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ্ সমস্ত আসমানকে মহাশূন্য ধরে রেখেছেন তাঁর পক্ষে কি মানবরূপী নূরী নবীকে মহাশূন্যে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখেন না? অবশ্যই রাখেন।

মি’রাজে রূহের হুকুম দেহের উপর প্রকাশ পেয়েছে এবং আত্মিক ব্যাপারসমূহ দেহের স্বরূপেই প্রতিভাত হয়েছে। বর্তমান যুগের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের দৃষ্টি কোণ্ থেকেও সশরীর ‘ইসরা’ ও মি’রাজ-এর যথার্থতা প্রমাণিত হয়। আধুনিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে প্রমাণিত হয়েছে যে, সুষ্ঠু শক্তি যত কার্যকর হবে সত্য ও অজানা তথ্য ততোধিক প্রকাশিত হবে। বিজ্ঞানী মার্কনীর আবিস্কার এক্ষেত্রে উল্লেখ্য। বিশ্বের অনাবিস্কৃত শক্তিই তাঁকে তাঁর আবিস্কারের প্রতি অনুপ্রাণিত করে নতুন পথ প্রদর্শন করেছে। তিনি যখন আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে একটি সমুদ্রগামী জাহাজে বসে সুদূর অস্ট্রেলিয়ার সিডনীতে অর্থাৎ অপর প্রান্তে একটি বেতার সংযোগ স্থাপন করলেন ইথারের তরঙ্গমালার শক্তির মাধ্যমে-সিডনীতে স্থাপিত বৈদুতিক তারে বিদ্যুত প্রবাহিত হয়ে বেতার সংযোগের স্থলে তাঁর উচ্চারিত সাগর বক্ষের জাহাজের একই কন্ঠস্বর অপর প্রান্তে সুদূর সিডনীতে শোনা গিয়েছিল- এতে করে বিজ্ঞানী মার্কনীর নিকট তাঁর দু’জায়গায় অবস্থান বলে প্রতীয়মান হয়। এটা তো বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রমাণ। বর্তামনের আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রকৌশলগত আবিস্কার নানাধরনের যন্ত্রপাতি-স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা তার প্রকৃত প্রমাণ।

পবিত্র মি’রাজ হলো নবী করীমের মহান জীবনে একটি অলৌকিক (মু’জিযা), বিস্ময়কর এবং একটি মহত্বপূর্ণ সমুজ্জ্বল ঘটনা। নবী করীম-এর অস্তিত্ব একজন সাধারণ মানুষের অস্তিত্বের মত নয়। বিশ্বচরাচরের অস্তিত্বের সঙ্গে তাঁর অস্তিত্ব ওঁতপ্রোতভাবে ছিল যে কারণে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রথমেই আল্লাহ তা‘আলা যে নূর সৃষ্টি করেছিলেন সে নূর হচ্ছে আমার নূর। পরে তিনি আমার নূর থেকে সারা বিশ্ব সৃষ্টি করলেন। একথার প্রতীকী ব্যষ্ণনা হচ্ছে তিনি বিশ্ব থেকে বিচ্ছন্ন কোন সত্তা নন, বরং বিশ্ববলয়ের সঙ্গে একীভূত সত্তা। অর্থাৎ তাঁর কোন স্থানে অবস্থিতি অথবা কোন উচ্চারণ অথবা তাঁর অবলোকন একই স্থানে যে প্রকাশিত এবং রূপায়িত থাকবে তা নয়, বিভিন্ন স্থানেও একই সময়ে রূপায়িত হতে পারে। তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল বিশ্ব চরাচরের সকল অণু-পরমাণুর সঙ্গে। তাঁর মধ্যে একক মানব শক্তির প্রকাশ ছিল না, তাঁর মধ্যে অন্যান্য শক্তির প্রকাশ ছিলো। যেমন- সূরাতে মালাকী ও হক্কীর সূরাতে প্রকাশ। অর্থাৎ দেহধারী মানুষের স্বরূপ দৃশ্যত তাঁর ছিল, কিন্তু প্রজ্ঞার বিবৃতি এবং অনুভূতির গভীরতম রহস্যকে নিজের মধ্যে জাগরিত করে তিনি ছিলেন মহান রব আল্লাহর নিকটতম বন্ধু। মি’রাজের ঘটনার সাহায্যে আমরা ইসলামের আচরণ বিধির একটা পরিপূর্ণতা খুঁজে পাই এবং সৃষ্টির গূঢ় রহস্য উদঘাটিত হয়। মি’রাজের পর মদীনা গমনকে কেন্দ্র করে রাসূলে করীমের সে সঙ্গে ইসলামের জীবন এবং ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল।

লেখক: পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক- প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •