নবী ও রসূলকুল সরদার ’র রাজনৈতিক সংস্কার- মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান

0

নবী ও রসূলকুল সরদার ’র রাজনৈতিক সংস্কার-

মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান
===

আরববাসীরা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আসার কারণে আরব রাজ্যের রাজনীতিতে এক অপূর্ব পরিবর্তন এসেছিলো। হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মাত্র দশ বছরের রাষ্ট্রীয় শাসনামলে একদিকে আরবীয়দের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অন্যদিকে তাদের চরিত্র, অভ্যাস ও সামাজিক নিয়ম বা প্রথাগুলোর মধ্যে দ্রুত আমূল পরিবর্তন এসে গিয়েছিলো। এ পরিবর্তন দেখে সারা বিশ্ব হতভম্ব হয়ে গেলো। ওই আরব, যারা শতধা গোত্র ও খান্দানে বিভক্ত ছিলো, মাত্র কয়েকটা বছরে এমন এক মজবুত ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গিয়েছে, যাতে বংশীয় ও গোত্রগত কোন মত-পার্থক্যের দখল ছিলোনা। ইসলামী সাম্য পুরানা শত্রুতা ও হাজারো বছরের পুরাতন বৈরিতাগুলোকে খতম করে একদম ভ্রাতৃত্বের এমন পরম্পরা কায়েম করলো যে, সমস্ত গোত্র দুধ ও চিনির মিশ্রণের মতো হয়ে গেলো। এ ঐক্য ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রভাব এ হলো যে, তদানীন্তন আরবরাষ্ট্র দুনিয়ার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত হতে লাগলো।

পার্থিব বাদশাহীর বিপরীতে বিশ্বনবীর ইসলাম ন্যায়পরায়ণ ও জনকল্যাণকর শাসকের এক নতুন রূপ উপস্থাপন করলো। বিশ্বকুল সরদার প্রেরিত হবার যুগে দুনিয়ার সমস্ত রাজনৈতিক বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা বাদশাহী কিংবা ব্যক্তিগত শাসনের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। কিন্তু তিনি যেই শাসন-ব্যবস্থা কায়েম করেছেন, সেটার ভিত্তি হলো- আল্লাহর প্রদত্ত শাসন-কর্তৃত্ব আর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের খিলাফত বা প্রতিনিধিত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। খোদাপ্রদত্ত কানূনই সেটার কানূন ছিলো। এ জন্য এ শাসন-ব্যবস্থায় না ব্যক্তিপূজা ও খান্দানপূজার কোন অবকাশ ছিলো, না স্বৈরাচার ও শাহানশাহ কেন্দ্রীকতার স্থান ছিলো। ধনী হোক কিংবা দরিদ্র হোক, আপন হোক কিংবা পর সবাই ওই খোদাপ্রদত্ত কানূনের বাধ্যগত ছিলো। অনুরূপ, রাজনীতির পরিভাষায় এটা এমন এক পূর্ণাঙ্গ গঠনতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা ছিলো, যাতে আল্লাহর সুষ্ঠু ও সুবিন্যস্থ কানূনের অনুসরণ ছিলো; বিচার-ব্যবস্থা ছিলো অন্য কারো চাপ বা প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। এ ব্যবস্থা নির্ভয়ে ও নির্দ্বিধায় জনগণকে সুবিচার দিতে সক্ষম ছিলো। ইসলামী রাষ্ট্রের এ সুবিন্যস্থ কাঠামো এ কথার জামিনদার ছিলো যে, সেটার সীমারেখায় জনগণের সব অধিকার সংরক্ষিত থাকবে। তাছাড়া, এ শাসন ব্যবস্থা কোন জরুরী অবস্থার জন্য রচিত ও প্রবর্তিত হয়নি বরং ভবিষ্যতে আসবে এমন সব উত্তরসূরীদের জন্য, প্রতিটি রাজ্য ও জনগোষ্ঠীর হিদায়ত বা পথ-নির্দেশনার উৎসস্থল ছিলো। এ কারণে, বিশ্বকুল সরদার সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম শুধু আরবের জন্য প্রেরিত হননি বরং ক্বোরআন-ই করীমের এরশাদ অনুযায়ী তিনি ক্বিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্যই প্রেরিত হয়েছেন।

যদিও তদানীন্তনকালের প্রথানুসারে বাদশাহ্ আইন-কানূনের ঊর্ধ্বে ও খোদ্ মুখতার হয়ে থাকতেন, তাঁকে সব ধরনের বাধ্যবাধকতা ও জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে মনে করা হতো; কিন্তু মুসলমান শাসক তাঁর ইখতিয়ার বা কার্যাদিতে স্বেচ্ছাচারিতা করতে পারতেন না। প্রতিটি কাজে তাঁকে ক্বোরআনের বিধানাবলী ও ধর্মীয় মূলনীতিগুলো পালন করতে হতো। যদি তাঁর কোন কাজ শরীয়তের আইন অনুরূপ না হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে অপসারিত করে শাস্তির আওতায় আনা হতো। হুযূর-ই আরকাম তাঁর মাত্র দশ বছরের শাসনামলে যে কোন পদক্ষেপই গ্রহণ করেছেন, ক্বোরআনী দিক-নির্দেশনা অনুসারেই গ্রহণ করেছেন। যদি পার্থিব লেনদেনের ক্ষেত্রে ক্বোরআনী আয়াতের কোন সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা না মিলতো, তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোন ফয়সালা বা রায় প্রদানের পূর্বে সাহাবাই কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন। এটাও পবিত্র ক্বোরআনের বিধান وَشَاوِرْهُمْ فِى الْاَمْرِ (এমন বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করুন) অনুসারেই ছিলো। সুতরাং এভাবে চয়নকৃত সাহাবা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুকে নিয়ে একটি নিয়ম মোতাবেক ‘মজলিশে শুরা’ও গঠন করা হয়েছিলো, যাঁদের সাথে হুযূর-ই আক্রাম সাধারণত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে পরামর্শ করতেন। শুধু তা নয়; বরং বদর ও উহুদের যুদ্ধের সময়, যখন গোটা জাতির জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন সামনে এসেছিলো, হুযূর-ই আক্রাম সমস্ত মুসলমানকে একেকটা আম জলসায় অংশগ্রহণ করে পরামর্শ দেওয়ার জন্য আহ্বান করেছিলেন।

নি¤েœ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক শাসন-ব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত রূপরেখা পেশ করা হচ্ছে-

কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মদীনা মুনাওয়ারাহ্ ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানীর মর্যাদা রাখতো। সেখানকার ব্যবস্থাপনা হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সরাসরি পরিচালনা ও দেখাশুনা করতেন। ধর্মীয় পেশোয়া হওয়া ছাড়াও তিনি একযোগে সর্বোচ্চ শাসনকর্তা (রাষ্ট্রনায়ক), প্রধান বিচারপতি ও প্রধান সেনাধ্যক্ষও ছিলেন। এসব শাসনকার্য পরিচালনার জন্য তখনকার সময়ে পৃথক কোন নিয়মতান্ত্রিক দপ্তর কিংবা দিওয়ান কায়েম করা হয়নি। এসব কাজ হুযূর-ই আকরাম সাধারণত মসজিদে নবভী শরীফে বসেই সমাধা করতেন। মসজিদে নবভী শরীফ যেন রসূলে খোদা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সেক্রেটারিয়েটেরও মর্যাদাপ্রাপ্ত ছিলো। হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু প্রমুখ হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, হযরত যায়দ ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ওহী লিখক ছিলেন। হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও কিছুদিন এ খিদমত আনজাম দিয়েছিলেন। হযরত যুবায়র ইব্নুল আওয়াম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু সাদক্বাহ্ ও যাকাতের হিসাব-নিকাশ সংরক্ষণ করতেন। হযরত মুগীরাহ্ ইবনে শো’বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু জনসাধারণের পারস্পরিক চুক্তিনামাগুলো লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। হযরত যায়দ ইবনে সাবিত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু ওহী লিখন ছাড়াও ভিনদেশী বাদশাহ্ ও নেতৃবৃন্দের সাথে চিঠিপত্র লিখন তথা যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করতেন। হযরত হানযালাহ্ ইবনে রাবী’ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বিশেষ লেখক ও কর্মপরিচালক (সেক্রেটারী)’র মর্যাদা পেয়েছিলেন। তাছাড়া, নবী করীমের মোহর (রাষ্ট্রীয় শীল-মোহর)ও তাঁর নিকট সংরক্ষিত ছিলো। হিসাব-নিকাশ ও যাবতীয় রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ডের দেখাশুনা হুযূর-ই আকরাম নিজেই করতেন।

প্রাদেশিক শাসনব্যবস্থা
রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে ইসলামী রাষ্ট্র মদীনা মুনাওয়ারাহ্, তিহামাহ্, জানাদ, মক্কা মুকাররামাহ্, হাদ্বারা মওত, আম্মান বাহারাইন-এ প্রদেশগুলোতে বিভক্ত (বিন্যস্থ) ছিলো। প্রত্যেক প্রদেশের শাসনভার একেকজন প্রাদেশিক গভর্ণরের হাতে ন্যস্ত ছিলো, যাঁকে ‘ওয়ালী’ বলা হতো। নিরাপত্তা বিধান ছাড়াও প্রাদেশিক সেনাবাহিনীর সেনাধ্যক্ষের দায়িত্বও প্রাদেশিক গভর্ণরের হাতে ন্যস্ত ছিলো, গভর্ণরের সাহায্যের জন্য ‘আমিল’ (কর্মকর্তা) এবং ক্বাযী (বিচারক)ও নিয়োগ দেয়া হতো, ‘আমিল’ (কর্মকর্তা)’র দায়িত্বে সাদক্বাহ্ যাকাত আরোপ ও সংগ্রহ এবং সেগুলোর হিসাব-কিতাব ন্যস্ত ছিলো। ক্বাযী লোকজনের মুকাদ্দামাগুলো শুনতেন ও শরীয়তের বিধানাবলীর আলোকে তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিতেন। ক্বাযী (বিচারক)-এর পদটি শুধু ধনবান-উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিদেরকেই দেওয়া হতো।

রাষ্ট্রীয় আয়ের উৎস ও খাতগুলো
ওই যুগ শরীফে আমদানীর পাঁচটি বড় বড় উৎস বা মাধ্যম ছিলোঃ ১. মালে গণীমত, ২. যাকাত ও সদক্বাহ্, ৩. জিযিয়া (ঞধী), ৪. খারাজ (জমির জাগিয়াৎ) ও ৫. জায়গীর অথবা ফাই।

‘মালে গণীমত’ বলতে বুঝায় ওই মাল, সম্পদ ও যুদ্ধ সামগ্রী, যেগুলো মুসলমানগণ কাফিরদের মোকাবেলা করতে গিয়ে করায়ত্ব করতেন। ওই মালের ৪৫ অংশ যোদ্ধাদের মধ্যে বন্টন করা হতো। আরোহী সৈন্য পদাতিকের তুলনায় দ্বিগুণ পেতেন। অবশিষ্টটুকু হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, তাঁর সংশ্লিষ্টগণ এবং অন্যান্য প্রাপকগণের জন্য ওয়াক্বফ ছিলো।

যাকাত প্রদান করা শুধু ওই মুসলমানদের উপর ফরয ছিলো, যাঁরা যাকাতের নিসাবের অধিকারী ছিলেন। সাদক্বাহ্গুলোর মধ্যে ওইসব অর্থ-সম্পদ সামিল ছিলো, যেগুলো সম্পদশালী ও ইখতিয়ারপ্রাপ্ত লোকেরা জনহিতকর কাজে ব্যয় করার জন্য সরকারকে দিতেন।

জিযিয়া এমন এক ট্যাক্স ছিলো, যা শুধু অমুসলিমদের নিকট থেকে উসূল করা হতো। আর এর বিনিময়ে সরকার তাদের জানমাল ও ধর্মের হিফাযত (সংরক্ষণ) করতো। এ বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ওই ট্যাক্স (জিযিয়া) শুধু ওই সুস্থ ও সামর্থ্যবান অমুসলিম পুরুষদের উপরই আরোপ করা হতো, যারা সৈন্যসুলভ সেবা বা কাজ করার উপযোগী ছিলো; কিন্তু সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাইতোনা। নারীগণ, শিশুরা, বৃদ্ধ লোকেরা, অসুস্থ ও পরমুখাপেক্ষী এবং ভিক্ষুকগণ, এমনকি পাদ্রী ও রাহিবগণ প্রমুখও এর বর্হিভুত ছিলো। এ ট্যাক্সের পরিমাণও অতি অল্প ছিলো। অর্থাৎ বার্ষিক মাথাপিছু মাত্র এক দিনার উসূল করা হতো। যে অমুসলিম জিযিয়া দিয়ে মুসলমানদের আশ্রয় গ্রহণ করতো তাকে ‘যিম্মী’ বলা হতো। যদি কোন কারণে মুসলমানগণ ওই যিম্মীদের হিফাযত করতে অক্ষম হতেন, তবে জিযিয়ার সমস্ত অর্থ তাদেরকে ফেরৎ দেওয়া হতো। এটা এমন এক বৈশিষ্ট্য, যা ইসলামী রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ব্যতীত অন্য কোথাও পাওয়া যাওয়া অতি বিরল ও দুষ্কর।

কোন কোন অমুসলিম ঐতিহাসিক জিযিয়ার ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট সমালোচনা করেছেন এবং সেটাকে ইসলামী ন্যায়বিচার ও সাম্যের মূলনীতি বিরোধী সাব্যস্ত করেছেন; কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে দেখা হলে একথা সুস্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ সমালোচনা ও অভিযোগের বাস্তবতার সাথে দূরবর্তী সম্পর্কও নেই। কেননা, জিযিয়ার এক অতি নগণ্য অংকের অর্থ পরিশোধ করে যিম্মী না শুধু তার জান ও মালের হিফাযত বা নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হয়ে যায় না; বরং ওই যাকাতের অংক পরিশোধ করা থেকেও অব্যাহতি পেয়ে যায়, যেগুলো মুসলমানদের উপর ফরয। অথচ মুসলমানদের উপর, যাকাৎ পরিশোধ করা সত্ত্বেও সৈন্যসুলভ সেবা করাও অপরিহার্য ছিলো। ‘জিযিয়া’ হিসেবে উসূলকৃত অর্থ সৈন্যদের বেতন এবং অন্যান্য সামরিক খাতগুলোতে ব্যয় করা হতো। এখানে উল্লেখ্য যে, ‘জিযিয়া’ (কর) প্রথা মুসলমানগণ আরম্ভ করেননি, বরং এ কর (ট্যাক্স) রোম ও পারস্য সা¤্রাজ্যে আরো আগে থেকে ভিন্ন ভিন্ন নামে প্রচলিত ছিলো।

‘খারাজ’ মানে জমির লাগিয়াৎ কিংবা ট্যাক্স-এর সূচনা রসূলে আকরামের সময় খায়বার বিজয়ের পর থেকে হয়েছে, যখন হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইহুদীদের জমিগুলোর বেশীর ভাগ তাদেরই চাষাবাদের অধীনে রেখে দিয়েছিলেন। আর তাদের থেকে প্রতি বছর অর্দ্ধেক উৎপন্ন দ্রব্য ‘খারাজ’ হিসেবে নিতে সম্মত হয়েছিলেন। এর বাহ্যিক কারণ এ ছিলো যে, মুসলমানদের নিকট না কৃষি কাজের জন্য সময় ছিলো, না তত সংখ্যক গোলাম ছিলো, যারা এ কাজ সম্পন্ন করতে পারতো।

খারাজের পরিমাণ নির্ণয় ও তা উসূল করা এক পদস্থ ব্যক্তির দায়িত্বে ছিলো, যাকে হুযূর-ই আক্রাম নিজেই নিয়োগদান করতেন। এ পদের দায়িত্ব হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে রাওয়াহা অনেক দিন যাবৎ পালন করেছিলেন।
‘জায়গীর কিংবা ফাই’ মানে ওই জায়গা-জমি ছিলো, যার উপর সরকারের সরাসরি আয়ত্ব ছিলো। এগুলো থেকে উসূলকৃত আয় (আমদানী) হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজের পবিত্র ইচ্ছানুসারে ব্যয় করতেন। এর উদাহরণ ‘ফিদ্ক’-এর এলাকা, যা খায়বারের নিকটে অবস্থিত ছিলো। (এর বর্তমান নাম হুভেত)। ওখানকার বাসিন্দারা মুসলমানদের খায়বার বিজয়ের সময় অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্থ হয়ে পড়েছিলো এবং আনুগত্য স্বীকার করে হুযূর-ই আক্রামের সাথে সন্ধি করার দরখাস্ত পেশ করেছিলো। এর ভিত্তিতে তাদের সাথে একটি প্রাথমিক এবং পরবর্তীতে দ্বিতীয় পাকাপোক্ত সন্ধিচুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিলো। এ সন্ধির শর্তানুসারে ফিদ্কের অর্দ্ধেক জমি এবং খেজুর বাগানগুলোর অর্দ্ধেক উৎপন্ন দ্রব্য শুধু হুযূর-ই আকরামকেই দেওয়া হতো। হুযূর-ই আক্রাম এ আমদানী আপন খান্দানের লোকজন, অভাবী মুসাফিরগণ ও বনী হাশেম (গোত্র)-এর উপযুক্ত লোকদের এবং অন্যান্য অভাবগ্রস্তদের জন্য ব্যয় করতেন।

সামরিক ব্যবস্থাপনা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে পৃথক কোন বেতনভুক্ত সেনাবাহিনী ছিলোনা; বরং প্রত্যেক মুসলমান যুদ্ধের সময় স্বেচ্ছা প্রণোদিত হয়ে স্বত:র্স্ফূতভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতেন। বেতনের স্থলে যোদ্ধাদের ‘মালে গণীমত’-এর ৪৫ অংশ দেওয়া হতো। যুদ্ধে ওই সময় তরবারি, বর্শা, তীর, ধনুক, ঢাল, বর্ম ও শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি ব্যবহৃত হতো। যে যুদ্ধে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজে সদয় শরীক হতেন, সেটাকে ‘গায্ওয়া’ বলা হতো। আর ওই যুদ্ধের সিপাহ্সালার (প্রধান সেনাপতি)ও হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম নিজেই থাকতেন। আর যেসব যুদ্ধে নিজে অংশগ্রহণ করতেন না, সেটার সিপাহ্সালার হিসেবে কোন সম্মানিত ও অভিজ্ঞ সাহাবীকে নিয়োগদান করতেন। এমন যুদ্ধকে ‘সারিয়াহ’ বলা হতো।

যুদ্ধে আম হামলা হবার পূর্বে উভয়পক্ষের বাহাদুর ও বাছাইকৃত সৈন্যগণ পৃথকভাবে দ্বন্দ্বে উপনীত হতো; যাকে ‘সম্মুখযুদ্ধ’ বলা হতো। একথা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, নতুন নতুন যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন করতে হুযূর-ই আক্রাম পছন্দ করতেন। এ কারণে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধের বিন্যাস ও সারি বিন্যাস ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে হতে থাকে। বেশীরভাগ সময় মহিলাগণও যুদ্ধে শরীক হতেন। তাঁদের কাজ ছিলো যোদ্ধাদের পানি পান করানো, খাবার তৈরী করা, তীর এগিয়ে দেওয়া, আহতদের ব্যান্ডিজ করা ইত্যাদি। কোন কোন যুদ্ধে তো মুসলিম মহিলারা এমন এমন কর্মতৎপরতা ও রণনিপুণতা দেখিয়েছেন, যেগুলো দেখে শত্রুরাও হতভম্ব হয়ে গেছে।

পরিশেষে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। রাজনীতি ইসলামের পূর্ণাঙ্গতার এক বিশেষ দিক। আমাদের নবী-ই আক্রাম বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মের প্রবর্তক হবার সাথে সাথে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক, সেনাধ্যক্ষ, অর্থনীতিবিদ ও সমাজ সংস্কারকও। একথা শুধু মুসলিম মনীষী নন; অমুসলিম মনীষী এবং ঐতিহাসিকগণও নির্দ্ধিধায় স্বীকার করেছেন। তিনি বিশ্বের সর্বাধিক কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেখিয়েছেন এবং ক্বিয়ামত পর্যন্তের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর রাজনীতির রূপরেখা দিয়েছেন। তাই, একজন সত্যিকার মুসলমান ইসলামের রাজনীতিকে অস্বীকার করার যেমন অবকাশ নেই, তেমনি একথাও স্বীকার করতে বাধ্য যে, আমাদের দেশ এবং জাতিরও সার্বিক কল্যাণ, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা সুন্নী মতাদর্শ ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমের বিকল্প নেই।

লেখক: মহাপরিচালক, আনজুমান রিসার্চ সেন্টার, চট্টগ্রাম।

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •