তিনি একজন পীরজাদা, কিন্তু অন্যদের মত নন – আবুল কাশেম মোহাম্মদ ফজলুল হক

0

তিনি একজন পীরজাদা, কিন্তু অন্যদের মত নন

আবুল কাশেম মোহাম্মদ ফজলুল হক

===

পীরজাদা হওয়া প্রচলিত প্রেক্ষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘সোনার চামচ’ মুখে নিয়ে জন্ম গ্রহণ করার মতই। সালাম-কালাম, সম্মান-কদমবুুচী কোনটারই অভাব হয়না। পীরের আওলাদ হিসেবে মারেফতের সংসারে মুরীদদের উপর এগুলো নৈতিক বাধ্যবাধকতার সীমানায় পড়েও। কিন্তু সে মারেফতের সংসারে ‘আসল মারেফত’ তো থাকতে হবে সবার আগে। ইদানিং কালে পীর-মাশায়েখদের মারেফতী দরবারে দু-চারটি ব্যতিক্রম ছাড়া ‘সোনার চামচ’ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া অধিকাংশ পীরজাদাদের জীবনে বাহ্যিক প্রেক্ষায় মহামূল্যবান মারেফতই অবলুপ্ত! ভয়ংকর এ দৃশ্য এখন হর হামেশাই চোখে পড়ে। এ সকল পীরজাদাদের অন্য কোন একাডেমিক সার্টিফিকেট না থাকলেও লকব-বিদ্যায় উত্তীর্ণ তারা। মারেফতের নামে নতুন নতুন কনসেপ্ট আবিষ্কার করে ‘মুজাদ্দিদ’ (!) বনে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় আছে সবাইÑ কেউ আগে যায় তো কেউ পেছনে দৌঁড়ায়।

সম্পদের আশা কোথাও কোথাও বাঁধ ভাঙ্গা নেশায় পরিণত হতেও দেখা যায়। আইয়াশী জীবনের আহলাদ অন্য দশ জনের মতই নির্ভেজাল দুনিয়াদার বানিয়ে ছেড়েছে তাদেরকে। পীরজাদা বলে কথা! কারো কিছু বলার নেই। নেক কাজ করলে ভক্তরা কারামত বলে পাবলিসিটি করে। বে-শরীয়তী কাজ করলে ‘ওটা মারেফত’ বলে আদবে নিরব থাকে। দরবারের ভক্তরা পীরজাদাদের বিপরীতে যাওয়ার কোন চিকন রাস্তাও খোলা নাই মারেফতে বর্তমান রাজ্যে। বর্তমান যুগে হঠাৎ পীর বনে যাওয়া অনেকের অবস্থা আরো করুণ। কন্ঠ সুন্দর হওয়া এ যুগে পীর হওয়ার একটা বড় যোগ্যতা। কিছুদিন ওয়াজ করার পর মনোরাজ্যে পীর বনে যাওয়ার তুফান শুরু হয়। আবার কিছু কিছু দরবার এমন আছে যারা খেলাফত দেয়ার জন্য জনপ্রিয় বক্তাদের হন্যে হয়ে খোঁজে। আহ! মারেফতের পবিত্র হেরেমে আজ চরম নৈরাজ্য। পীরজাদাদের আহলাদী জীবনের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে পৃথিবী ইলমে তাসাউফকে অচেনা কোন দ্বীপে পাঠিয়ে দিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ এখন ‘মেকি তাসাউফে’র কাগুজে নৌকার টিকেট কেটে তৃপ্তির ‘যাত্রী ছাউনি’তে অপেক্ষা করছে।

তবে এত কিছুর মাঝেও আলো একেবারে নিভে যায় নি। রাজ্যের প্রগাঢ়তম অন্ধকারে দু‘এক জায়গায় এখনো আলোর সন্ধান পাওয়া যায়। পীরজাদাদের ‘মেকি তাসাউফের কাগুজে নৌকা’র মাঝিদের দুর্দন্ড প্রতাপের মাঝেও দু‘ একজন মাঝি ‘নূহে’র (আলাইহিস সালাম) নৌকার টিকেট নিয়ে মানুষকে ‘জুদি’ পাহাড়ের আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন। তাঁদেরই একজন ছিলেন আওলাদে রাসূল আল্লামা তৈয়্যব শাহ রহমাতুল্লাহি আলায়হি। তিনি পীরজাদা ছিলেন। তবে দুনিয়াদার ছিলেন না। অন্য অনেকের মত মেকি নৌকার মাঝিও ছিলেন না। দুনিয়ার কাছে আহলাদ চেয়ে হাত বাড়িয়ে দেননি কখনো। কঠোর সাধনায় স্বর্গের সুখ খুঁজে বেড়াতেন সারা জীবন। ভক্তদের ধনের পেছনে নয়, দৌড়াতেন তাদের সত্যের দিশা দানের বন্ধুর পথে। চাইলে আইয়াশী চালে জীবনকে সাজাতে পারতেন। কিন্তু তা তাকে স্পর্শ করার সাহসই পায়নি। একজন হক্কানী পীরের সন্তান ছিলেন। কিন্তু সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেয়া তথা কথিত পীরজাদা ছিলেন না। জীবন ধারণে সারল্য তাঁর অসাধারণ বেলায়তের স্বত্ত্বাকে মানুষের দৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ আড়াল করে রেখেছিল শেষ বিকেল পর্যন্ত। দুর্মোখোদের তীর্যক সমালোচনাও লুকোনো সেই স্বত্ত¦াকে প্রকাশ করতে তাঁকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি।

আবার ভক্তদের মাঝেও চিরদিন থাকলেন একজন অভিভাবকের মতই। তারাবী পড়াতেন একজন হাফেজ হয়ে। আবার তাফসীরের গভীর তথ্য বলতেন দক্ষ মুফাসসির হয়ে। মানুষের সাথে কথা বলতেন বাবা সন্তানের মতই। আবার আন্জুমানের মিটিং-এ বসতেন দক্ষ একজন দূরদর্শী প্রশাসকের মত। এই সকল কাজের দৃশ্যমান চিত্র দিয়ে মারেফতের সাধণা-সত্ত্বাকে আড়ালে রাখতেন। নিজেকে লুকিয়ে রাখার যোগ্যতাও একটা উচুমানের দক্ষতা। নিজের যোগ্যতার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে তা লুকিয়ে রাখার কোয়ালিটি দুনিয়ার ক‘জনের আছে বলেন? আমরা তো বরং শুন্যকে ষোল আনা করে প্রকাশ করি। আল্লামা তৈয়্যব শাহ রহমাতুল্লাহি আলায়হি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। কত সোনার চামচ চারদিকে ঘুর-ঘুর করত, অথচ তিনি তা মুখে নেন নি। কত পীরজাদারা টাকার জোয়ারে ভেসে যায়। কিন্তু অর্থ-প্রেম তাঁর মনোরাজ্যের বারান্দার কাছেও যেতে পারেনি। দুনিয়ার নেশায় পীরজাদারা আকীদা বিকিয়ে দিয়ে বাতিলদের এজেন্ডার কাজ করতে হর হামেশাই দেখা যায়Ñকেউ প্রকাশ্যে কেউ বা গোপনে। অথচ আল্লামা তৈয়্যব শাহ রহমাতুল্লাহি আলায়হি বাতিল বিনাশী একটা দূর্গ তৈরী করে গেছেন, যার নাম “কাদেরিয়া তৈয়্যেবিয়া কামিল মাদরাসা”।

লেখক : উপাধ্যক্ষ, কাদেরিয়া তৈয়্যবিয়া কামিল মাদরাসা, মুহাম্মদপুর, ঢাকা।