জশনে জুলুস : ভালোবাসায় সিক্ত প্রাণের আবেশ- কাশেম শাহ

0

জশনে জুলুস : ভালোবাসায় সিক্ত প্রাণের আবেশ

কাশেম শাহ

====

সুন্দর, শ্বাশত, বর্ণাঢ্য, বর্ণিল, ভালোবাসায় সিক্ত, আবেগে পরিপূর্ণ যেভাবেই ব্যাখ্যা দিই না কেন তা নিতান্তই কম হয়ে যায় প্রাণের জশনে জুলুসের জন্য। ১২ রবিউল আউয়াল, কি পূণ্যময় সে দিন, কি প্রাণের আবেশ ছড়িয়ে যাওয়া সুবহে সাদেক, যেদিন এ ধরায় এসেছিলেন দু জাহানের কাৃারী, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। দেড় হাজার বছর পরও আজো সে ১২ রবিউল আউয়ালের সুবহে সাদিক একই রকম পবিত্র ভালোলাগার আবেশ নিয়ে হাজির হয়। মনোমুগ্ধকর রজনী শেষে উষা প্রভাতে ফজরের আযানের ‘আচ্ছালাতু খাইরুম মিনান্নাউম’ কানে আসতেই হৃদয়ে ভাসে এক স্বর্গীয় ছোঁয়ার পরশ। মন ছুঁয়ে যায় অনাবিল এক ভালো লাগায়। আকাশ ফর্সা হতেই পাখিদের কলকাকলি, বাতাসে বসন্তের মোহনীয় শব্দ মনকে উথাল পাথাল করে দেয়।

সেদিন ১২ রবিউল আউয়ালের দিন, যেদিন সমস্ত পৃথিবী, আকাশ-বাতাস, পাখ-পাখালি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে সালাম জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের এক হাজার বছর পরও আজো সে পাখি, সে সৃষ্টি প্রিয় নবীকে সালাম জানানোর জন্য অপেক্ষমান। আকাশে আলো সরলেই সবাই একসাথে গেয়ে ওঠবে ‘এয়া নবী সালাম আলাইকা/এয়া রাসুল সালাম আলাইকা’। সমস্ত সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের দিন আজ, তাঁর আবির্ভাবের দিন আজ, আজই তো প্রাণ আনন্দে নেচে ওঠবে, মনের অজান্তেই মন গেয়ে ওঠবে। কাজী নজরুল ইসলাম লিখছেন, ‘উরজ্ য়্যামেন্ নজ্দ হেজাজ্ তাহামা ইরাক শাম/মেসের ওমান্ তিহারান-স্মরি’/কাহার বিরাট নাম/পড়ে- ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম।’ সারা পৃথিবী আজ, পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রতিটি প্রান্তে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওপর দরুদ পড়ছে, মিছিলে মিছিলে (জুলুস) প্রকম্পিত করছে রাজপথ, অলি-গলি। সব মিছিলেরই এক ঠিকানা, এক লক্ষ্য, এক সুর, এক আওয়াজ ‘সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম’।

আমরাও চরম সৌভাগ্যের অধিকারী, আজ পথে পথে, হেঁটে হেঁটে গলা উঁচিয়ে গাইব ‘ ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়/আয়রে সাগর আকাশ বাতাস দেখবি যদি আয়।’। হাতে থাকবে কালেমা তাইয়েবা খচিত পতাকা, মনে থাকবে ঈমানী বল, স্লোগানে স্লোগানে, হামদ-নাতে, জিকির জিকিরে প্রকম্পিত হবে সারা বাংলার আকাশ-বাতাস। ছোট-বড়, অশীতিপর বৃদ্ধ সবাই আজ মন খুলে গাইবে ‘সাল্লু আলাইহি ওয়া আলিহি’। কারণ আজ ১২ রবিউল আউয়াল, আজ ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। প্রিয় নবীজীর আওলাদে পাকের নেতৃত্বে রাজপথে সরকারে দো আলমের শানে নাত গাইতে গাইতে মানুষের সারি আজ বিশ^বাসীকে বার্তা দেবে, হে বিশ^বাসী দেখ, আমার আঁকা, আমার নবী ধরাধমে এসেছিলেন বলেই তুমি আজ এত সুন্দর পৃথিবীর বাসিন্দা। সমগ্র মানবজাতির, সমগ্র কালের, সমগ্র সৃষ্টির সেরা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের দিনে আজ আমরা আনন্দে আত্মহারা। খুশিতে আজ মন উচাটন। নবীজী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে পাইনি, পেয়েছি তাঁর আওলাদে পাককে, পেয়েছি তাঁর আদর্শকে।

আজ থেকে ৪৪ বছর আগে, বার আউলিয়ার পূণ্যভূমি, বদর শাহ-আমানত শাহ’র পদধূলি ধন্য এ চট্টগ্রাম থেকেই আওলাদে রাসুল, হযরত সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির নির্দেশে ও পরবর্তী সমেয় তাঁরই সুদক্ষ, সুযোগ্য নেতৃত্বে যে জশনে জুলুসের প্রবর্তন হয়েছিল কালের পরিক্রমায় তা আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যেক অঞ্চল, প্রত্যেক ঘর, প্রতিটা মানুষ আজ জানে, ১২ রবিউল আউয়াল মানেই জশনে জুলুস। ঈদে মিলাদুন্নবী মানেই রাজপথে কালেমা খচিত পতাকা নিয়ে দলে দলে নেমে আসবে লাখে লাখে মানুষ। সবার লক্ষ্য একটাই, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের দিনকে কোমল হৃদয়ে, শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা। প্রিয় নবীর ওপর দরুদ পড়ে নিজের মনকে প্রশান্ত করা।

সেদিনের কথা ভাবলেই অবাক হয়ে দিশেহারা হয়ে যেতে হয়, কি করে এত দূরদর্শী চিন্তা করেছিলেন হুজুর আল্লামা তৈয়ব শাহ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি। ১৯৭৪ সালের সে দিনটা, যখন যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটা দেশ ঘুরে দাঁড়াবার জন্য প্রাণপণে লড়ছে, অভাব আর দুর্ভিক্ষ যখন মানুষকে অসহায় দিশেহারা করে তুলছে, বাতিলপন্থীরা যখন ভুল ব্যাখ্যার মাধ্যমে ইসলামকে কলংকিত করে তুলছে, সহজ সরল মুসলমানদের ধোঁকায় ফেলে তাদের ঈমানহারা করছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ থেকে বাংলার মুসলমানদের দূরে সরানোর চেষ্টা চলছে, সে সময়ে অসম সাহসিকতার সাথে, বুদ্ধিমত্তার সাথে তাঁর অনুসারীদের নির্দেশ দিলেন জশনে জুলুস আয়োজনের। আর সাথে সাথে সে আদেশ পালনে ব্রতী হলেন আওলাদে রাসুলের অনুসারীরা। ১২ রবিউল আউয়ালের প্রভাতে বলুয়ার দীঘি খানকাহ শরীফ থেকে হামদ-নাত, জিকির নিয়ে মিছিল সহকারে বেরিয়ে এলেন শ’য়ে শ’য়ে মানুষ। রাস্তায় নেমে তাঁরা দেখলেন সে সংখ্যা কি করে যেন হাজারে হাজারে রূপ নিল। তবে কি ফেরেশতারা এসে যোগ দিল জশনে জুলুসে। ঠিক যেমন ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল মা আমেনার কুঁড়ে ঘরে জুলুস নিয়ে এসেছিলেন ফেরেশতারা। গেয়ে উঠেছিলেন, ‘তোরা দেখে যা, আমিনা মায়ের কোলে। মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে/যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে’। ভেবে কূল পায় না কেউই, কি করে, কোথা থেকে এসে হাজির হল এত মানুষ, কারা এত উচ্চ স্বরে গাইল প্রিয় নবীর গুণগান। পরের বছর থেকে যখন স্বয়ং আওলাদে রাসুল নিজেই ছদারত করছেন জুলুসে তখন থেকেই সে সংখ্যা কখনো হাজার ছাড়িয়ে লাখে পৌঁছে, আবার কখনো লাখ ছাড়িয়ে হয়ে যায় অগুণিত। আশেকে রাসুলদের সাথে এখনো ফেরেশতারা আসে কি-না জানি না, তবে মিছিল এসে মিশে মিছিলে, নগরীর যে সব মোড় দিয়ে জুলুস রওয়ানা হয় তা মুহূর্তেই হয়ে উঠে লোকে লোকারণ্য। শুধু নগরীর কথা বলি কেন, আজ তো জুলুস সর্বমহলে স্বীকৃত। সব দরবার, সব খানকাহ, সব প্রতিষ্ঠান, যাঁরাই বিশ^াস করে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের বিশুদ্ধ আক্বিদা সবাই গ্রামে গঞ্জে, মাদরাসায়-খানকায় শরীক হোন জুলুসে।

কি রোদ, কি বৃষ্টি কোথাও কারো নজর থাকে না, সবার নজর ঘুরে ফিরে খুঁজে শুধু আওলাদে রাসুলের নুরানি চেহারা। সকাল থেকে অপেক্ষমান আশেকে রাসুলেরা প্রাণপ্রিয় হুজুর কেবলার আগমনের অপেক্ষায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সে অপেক্ষা যে কত মধুর, কত মিষ্টি, কত আবেগময় তা শুধু তাঁরাই বোঝেন, যারা একনজর নিজের মুর্শিদকে দেখার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন। ১২ রবিউল আওয়াল তাই আমাদের কাছে সকল ঈদের সেরা ঈদ, এ ঈদের আনন্দ অন্যান্য সব ঈদের চাইতেও অধিক মধুর। ঈদুল ফিতরের চাঁদ রাত যেমন বাঙময়, আনন্দময় তেমনি ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আগের রাতও তার চাইতে অনেক বেশি খুশির ফোয়ারা নিয়ে আসে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলীয়া এলাকায় গেলে সে আনন্দ অনেকাংশেই লাভ করা যায়। একদিকে তখন আলমগীর খানকাহ শরীফে অবস্থান করেন হুজুর কেবলা (মাজিআ), অন্যদিকে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে জুলুসে যোগ দিতে দলে দলে এসে হাজির হন আশেকে রাসুলেরা। রঙিন আলোয় বর্ণিল জামেয়া ভবন, আশেপাশের মসজিদ, বাসা-বাড়িসহ পুরো এলাকাকে ভাসিয়ে তুলে অন্যরকম এক আবহে। গভীর রাতেও যখন সারাদেশ ঘুমিয়ে থাকে তখনও জাগ্রত থাকে জামেয়া এলাকা। ক্ষণে ক্ষণে, দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসে মিলাদ-কিয়ামের হৃদয় পাগল করা সুর। কোথাও আবার পরদিনের জন্য মেজবানির আয়োজনের ব্যস্ততা, গাড়ি সাজাতে কিংবা মঞ্চ সাজাতে ব্যস্ত আনজুমান, গাউসিয়া কমিটি ও জামেয়ার ভাইয়েরা। কারো বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই, নেই বিরক্তি, বরং কাজ করতে পারার গৌরবে তাদের মন-চেহারা হয়ে ওঠে প্রফুল্ল। এক ভালোলাগার স্বর্গীয় আবেশ ছড়িয়ে যায় তাদের হৃদয়ে। সকাল হলেই যে আবার জুলুসে যেতে হবে, সে ভাবনাও তাদের ক্লান্তি আনতে পারে না। সকাল হলেই অন্য পরিবেশ, শত শত সাইকেল, মোটর সাইকেল, কার-মাইক্রো, বাস-ট্রাক নিয়ে সারা শহর তখন জুলুস রওয়ানা হওয়ার অপেক্ষায়। মাইকে প্রিয় নবীর শানে নাত-গজলে তখন শহরবাসীর ঘুম ভেঙেছে। ঘরের বারান্দায়, ছাদে, দোকানের কার্নিশে সবাই অপেক্ষমান-কখন আসবেন হুজুর কেবলা, আর একনজর দেখে চোখ জুড়াব, মন জুড়াব। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মা বোনেরা, বয়স্করা অপেক্ষায় থাকেন হুজুর কেবলার আগমনের, আওলাদে রাসুলের আগমনের। এরই মধ্যে হাজার হাজার আশেকে রাসুলের আসা যাওয়া, সাইকেল-মোটর সাইকেলের সারি দেখে তারা বিমোহিত হন, দলে দলে আসমান থেকে ফেরেশতা নেমে না এলে এতগুলো মানুষ একসাথে, একই নিয়মে, একই সারিতে, একই স্লোগানে Ñনা, সম্ভব নয়। আজ রাসুলের আগমেনর দিনে ফেরেশতারাও আর বসে থাকেন নি, আশেকে রাসুলদের সাথে তারাও নেমে এসেছেন জুলুসে অংশ নিতে। মানুষের সাথে সাথে ফেরেশতারাও আজ গাইছেন ‘সাহারাতে ফুটল রে ফুল রঙিন গুলে লালা/সেই ফুলেরি খোশবুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা’।

সত্যিই আজ পুরো দুনিয়া মাতোয়ারা প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের দিনে, এ দিনে তাঁকে সালাত-সালাম জানাতে পারাই আশেকে রাসুলদের একমাত্র লক্ষ্য। জশনে জুলুস আমাদের প্রাণে যে আবেগের, যে প্রেমের জোয়ার সৃষ্টি করে তা অন্যকিছুর বিনিময়ে সম্ভব নয়। জশনে জুলুস আরো বেশি রৌশন ছড়াক, ছড়িয়ে যাক বিশে^র সব প্রান্তে Ñএ দিনে রাব্বুল আলামীনের কাছে তাই প্রত্যাশা।

লেখক : সহ-সম্পাদক, দৈনিক আজাদী।