নুবূওয়াত-রিসালত

0

নুবূয়ত ও রিসালতের প্রয়োজনীয়তা এবং  নবী-রাসূল প্রেরণের কারণ
আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, দুনিয়াতে তাদেরকে তাঁর ‘খলীফা’ বা প্রতিনিধি করেছেন এবং সৃষ্টিজগতের নেতৃত্ব তাদের হাতেই ন্যস্ত করেছেন। তাদের সুবিধার্থে আসমান ও যমীনের সবকিছুকে তাদের অধীনস্থ করেছেন, তাদের খেদমতে নিয়োজিত করেছেন এবং তাদেরকে ‘আক্বল’ বা বুদ্ধির মত অনন্য নি’মাত দ্বারা ধন্য করেছেন, যাতে তারা বুদ্ধি বা বিবেক দ্বারা মন্দ থেকে ভালকে পৃথক করতে পারে। অন্যদিকে তাদের মধ্যে কু-প্রবৃত্তি এবং এর সহায়ক শক্তিও দিয়েছেন, যা তাদেরকে নাফ্‌সের চাহিদানুযায়ী কাজকর্ম করতে অগ্রগামী করে, যা তাদেরকে অপরাধী-অত্যাচারী বানায়, অন্যের হক্ব নষ্ট করার মত জঘন্য অপরাধে লিপ্ত করে।
কোন মানব সন্তানের পক্ষে একাকী সমাজ-বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করা সম্ভব নয়। সে তার নিজের চাহিদা নিজেই মেটাবে তা হতে পারে না, বরঞ্চ সে স্বজাতির সাথে সহাবস্থান করবে, তাদের সাথে লেনদেন করবে, একে অপরকে সহযোগিতা করবে এবং পরস্পরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ইত্যাদি। আর এ জন্য প্রয়োজন একটি জীবন বিধান বা সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-কানুন। কারণ সবল দুর্বলের উপর চড়াও হয়, শক্তিশালী শক্তিহীনদের প্রতি যুল্‌ম করে; অথচ সাধারণ মানুষের বিবেকের পক্ষে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় দূরূহ ব্যাপার। কারণ মানুষের বিবেক-বুদ্ধির পরিধি সীমিত। এর মাধ্যমে তারা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারে না। যেমন- সুনির্দিষ্ট কোন জিনিসকে কোন একটি দল বা সম্প্রদায় ভাল বললে অন্য একটি দল তা মন্দ বলে। এমনকি ব্যক্তি বিশেষের বেলায়ও তা দেখা যায়। কোন একজন বিশেষ সময়ে একটি জিনিসকে ভাল মনে করে পছন্দ করে। আবার ওই নির্দিষ্ট জিনিসটিকে অন্য সময় মন্দ মনে করে অপছন্দ করে। সুতরাং এটাই প্রতীয়মান হল যে, নিছক জ্ঞআক্বলঞ্চ বা বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা সাধারণ মানুষ কোন কিছুর ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে না। কারণ, তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, মানুষের বিবেক-বুদ্ধি সীমিত।
মানুষকে শুধু এ সংক্ষিপ্ত ও অনিশ্চিত জীবনের জন্য সৃষ্টি করা হয়নি; বরং তার জন্য অপেক্ষমান রয়েছে অনন্ত জীবন। সেখানে মু’মিনদের জন্য আল্লাহ তা’আলা প্রস্তুত করে রেখেছেন অফুরন্ত নি’মাতে ভরপুর জান্নাতসমূহ এবং কাফিরদের জন্য জাহান্নামের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তিসমূহ। আর এসব কারণে মানুষ এমন সত্তার মুখাপেক্ষী, যে তাকে মহান রবের ইবাদতসমূহ এবং তাঁর নৈকট্য ও সন্তুষ্টির পন্থাসমূহ বাতলিয়ে দেবে এবং সাথে সাথে ওই বিষয়াবলীও চিহ্নিত করে দেবে, যেগুলো বান্দাকে মহান রবের সন্তুষ্টি থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। কারণ তাঁর ক্রোধে নিপতিত হলে শাস্তি অবধারিত। এখানেও প্রজ্ঞাময় রবের মহত্ব ও মহা বদান্যতা যে, তিনি স্বীয় বান্দাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে যুগে যুগে বহু নবী ও রাসূল আলায়হিমুস্‌ সালাম প্রেরণ করেছেন, যাতে তাঁরা সৃষ্টিকুলকে ওই সমস্ত বিষয় বলে দেন, যা গ্রহণ করলে তাদের দুনিয়াবী যিন্দেগী ও আখিরাত সুন্দর ও সাফল্যমণ্ডিত হয়। এমতাবস্থায় আল্লাহ্‌র প্রেরিতদের হিদায়ত গ্রহণ না করলে তারা কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হবে এবং তাদের কোন ওযর তখন গ্রহণ করা হবে না। এটাই যুক্তিযুক্ত। আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন-وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّى نَبْعَثَ رَسُولاً” তরজমা ঃ আমি শাস্তিদাতা নই, যতক্ষণ না রসূল প্রেরণ করি। [সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত-১৫, তরজমা কান্‌যুল ঈমান]
وَلَوْ أَنَّا أَهْلَكْنَاهُم بِعَذَابٍ مِّن قَبْلِهِ لَقَالُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ آيَاتِكَ مِن قَبْلِ أَن نَّذِلَّ وَنَخْزَىٰ
তরজমাঃ এবং যদি আমি তাদেরকে কোন শাস্তি দ্বারা ধ্বংস করে দিতাম রসূল আসার পূর্বে, তবে তারা অবশ্যই বলতো, ‘হে আমাদের রব! তুমি আমাদের প্রতি কোন রাসূল কেন প্রেরণ করোনি যাতে আমরা তোমার নিদর্শনসমূহের উপর চলতাম লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবার পূর্বে।  [সূরা ত্বোয়াহা, আয়াত-১৩৪, তরজমা- কান্‌যুল ঈমান]

সমস্ত নবী ও রসূলের মূল বাণী ছিল এক ও অভিন্ন এবং তাদের শরীয়ত বা জীবন-বিধান ছিলো ভিন্ন ভিন্ন

রাসূলগণ আলায়হিমুস্‌ সালাম দাওয়াত, আক্বীদা ও চারিত্রিক গুণাবলীর ক্ষেত্রে ছিলেন এক ও অভিন্ন; কিন্তু তাঁদের শরীয়ত বা জীবন বিধানে ভিন্নতা ছিলো। আর এ ভিন্নতা ছিলো নবী ও রাসূলগণ আলায়হিমুস্‌ সালাম-এর উম্মতদের ভৌগলিক অবস্থান ও যুগের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে। অর্থাৎ তাঁরা (আলায়হিমুস্‌ সালাম)-এর দ্বীন প্রচারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ধর্মের মৌলিক বিষয়ে অভিন্নতা। সবাই এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহবান করেছেন। ‘ফুরু’আত’ বা ধর্মের অনুশাসনের বিষয়গুলো ভিন্ন ছিলো, মূলতঃ তা ছিলো স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে।

নবী ও রাসূলগণের অভিন্ন দাওয়াত বা আহবানের প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ এরশাদ করেন আমি কোন না কোন রাসূল প্রেরণ করেছি এ নির্দেশ প্রচারের জন্য যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগূত (শয়তান) থেকে দূরে থাকো। অতঃপর তোমাদের কতেককে আল্লাহ হিদায়ত দান করেন এবং কতকের উপর গোমরাহী অবধারিত হয়ে গেল। সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছে। আল্লাহ তা’আলা ক্বোরআন মজীদে এরশাদ করেন, ‘‘আর আমি আপনার পূর্বে এমন কোন রাসূল প্রেরণ করিনি, যার প্রতি আমি এ মর্মে ওহী নাযিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া কোন উপাস্য নেই।’ অতএব, আমারই ইবাদত করো।’’             [সূরা আম্বিয়া, আয়াত-২৫]

তাঁদের শরীয়তের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেন, ‘‘আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছি নির্দিষ্ট শরীয়ত ও নির্দিষ্ট পন্থা।’’ [সূরা মা-ইদাহ, আয়াত-৪৮]

হযরত ঈসা আলায়হিস্‌ সালাম বলেছেন, (পবিত্র ক্বোরআনের ভাষায়) ‘‘আর আমি এসেছি আমার সামনে তাওরাতে যা আছে তার সত্যায়নকারীরূপে এবং তোমাদের জন্য কতিপয় বস্তু হালাল করার জন্য, যা তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে এবং আমি তোমাদের কাছে এসেছি নিদর্শন নিয়ে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে। সুতরাং তোমরা ভয় করো আল্লাহকে এবং আমাকে অনুসরণ করো। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত-৫০]

রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘আমার জন্য গনীমতের মাল-সামগ্রী হালাল করা হয়েছে।’’                      [মুসলিম শরীফ]

উপরিউক্ত আলোচনা ও দলিল-প্রমাণ থেকে বুঝা যায় যে, সমস্ত নবী ও রসূলের মূল বাণী এক ও অভিন্ন ছিলো। আর তা হচ্ছে আল্লাহ তা’আলার একত্ববাদ ও তদ্‌সম্পর্কিত আনুষাঙ্গিক বিষয়সমূহ, যেগুলোকে ‘আক্বাইদে ইসলামী’ বলা হয়, আর সবার শরীয়ত ছিলো স্থান, কাল ও পাত্র ভেদে ভিন্ন ভিন্ন।

রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ঈমানের দ্বিতীয় ভিত্তি

হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা’আলার নির্বাচিত প্রিয় বান্দা এবং তাঁর মনোনীত নবী ও রাসূল। তিনি ‘খাতামুল আম্বিয়া’ বা শেষ নবী এবং আল্লাহ তা’আলার মুত্তাক্বী বান্দাদের ইমাম। সমস্ত নবী ও রাসূলের সরদার এবং তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের প্রিয়তম বন্ধু। তিনি সমস্ত জ্বিন-ইনসানের প্রতি তথা সমগ্র সৃষ্টির প্রতি সত্য, হিদায়ত ও নূর সহকারে নবী হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন।            [ইমাম তাহাভী]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালতের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা ঈমানের দ্বিতীয় মূল ভিত্তি। আর যে তাঁর প্রতি ঈমান আনবে না তার জন্য জাহান্নাম অনিবার্য। যেমন আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, ‘‘আর যে ঈমান আনে না আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসূলের প্রতি, তবে আমি তো প্রস্তুত করে রেখেছি কাফিরদের জন্য দোযখ।’’                              [সূরা ফাত্‌হ, আয়াত-১৩]

আর হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর রিসালতের প্রতি ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে- তাঁর প্রতি এ মর্মে বিশ্বাস স্থাপন করা যে, তিনি আরবের শ্রেষ্ঠতম প্রখ্যাত ক্বোরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রে তাশরীফ আনয়ন করেছেন। তিনি আল্লাহর প্রিয় বান্দা এবং সমগ্র সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল। পুরো আরবের নেতৃত্ব তাঁর গোত্রের নিকট ন্যস্ত ছিলো। তাঁর সৌভাগ্যবান পিতা হচ্ছেন হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং মাতা হলেন হযরত আমেনা বিনতে ওহাব। তাঁরা উভয়েই অভিজাত বংশ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের। তাঁর বংশধারা হযরত ইসমাঈল ইবনে ইব্রাহীম আলায়হিমুস্‌ সালাম পর্যন্ত গিয়ে মিলিত হয়। হযরত আদম ও হাওয়া আলায়হিমাস্‌ সালাম হতে তাঁর পিতা-মাতা পর্যন্ত যাঁরা তাঁর নূরের আমানতদার ছিলেন, তাঁরা সবাই পূণ্যবান ও পূণ্যবতী এবং আল্লাহ্‌র একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এমনকি জাহেলী যুগের পাপ-পঙ্কিলতা তাঁর বংশধারাকে স্পর্শ করতে পারে নি। তিনি মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন। নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বে অত্যন্ত পবিত্র ও পরিচ্ছন্নতার সাথে বড় হয়েছেন। অর্থাৎ শৈশব, কৈশোর ও যৌবনে তিনি তাঁর সমসাময়িক অন্য দশজনের মত ছিলেন না। জাহেলী যুগের কোন মন্দ স্বভাব তাঁর মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে নি। চল্লিশ বছরের প্রকাশ্য জীবদ্দশায় তাঁর নুবূয়ত প্রকাশ পেয়েছে। পরবর্তীতে তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় হিজরত করেছেন। নুবূয়তের মহান দায়িত্ব পালন শেষে তিনি তথায় ওফাত বরণ করেন এবং মদীনা মুনাওয়ারাতেই লোক-চক্ষুর অন্তরালে, রওযা-ই পাকে তাশরীফ নিয়ে যান। তাঁর উপর মহাগ্রন্থ ক্বোরআন করীম নাযিল হয়েছে, যা আল্লাহরই কালাম, যাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তিনি জীবনে যা কিছু বলেছেন, অদৃশ্য জগতের যে সমস্ত বিষয়ের সংবাদ দিয়েছেন এবং হালাল ও হারাম সম্পর্কে যা বলেছেন সবকিছু সত্য, বাস্তবসম্মত এবং তা আল্লাহ তা’আলার ‘ওহী’ বা প্রত্যাদেশের নিরিখেই বলেছেন। সৃষ্টির মধ্যে তিনি সবার চেয়ে বেশী মর্যাদাবান ও সম্মানিত। তাঁর পরে অন্যান্য নবীগণ। তাঁকে সম্মান করা, সবকিছু থেকে তাঁর ভালবাসাকে প্রাধান্য দেয়া, এমনকি নিজের প্রাণের চেয়েও বেশী ভালবাসা পরিপূর্ণ ঈমানের প্রমাণ।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসমূহ

পূর্বে আমরা নবী ও রাসূলগণের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছি তা আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহ তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। তবে তাঁর এমন কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যেগুলো শুধু তাঁর সাথেই সম্পৃক্ত, অন্য কোন নবীর মধ্যে সেগুলো পাওয়া যায় না।

হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমাকে এমন পাঁচটি বিশেষত্ব দেয়া হয়েছে, যেগুলো আমার পূর্ববর্তী নবীগণের কাউকে দেয়া হয় নিঃ

এক. আমাকে গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব প্রদান করে সাহায্য করা হয়েছে, এক মাস পথের দূরত্বে অবস্থানরত শত্রুও আমার আগমণের সংবাদে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়।

দুই. আমার জন্য সমগ্র ভূ-খণ্ডকে মসজিদ (নামাযের যোগ্য স্থান) এবং পবিত্র করা হয়েছে। অতএব, আমার উম্মতের যে কোন ব্যক্তির যখন নামাযের সময় হয়, সে যেন তথায় নামায পড়ে নেয়।

তিন. আমার জন্য গনীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ) হালাল করা হয়েছে। আমার পূর্ববর্তী কারো জন্য তা বৈধ ছিল না।

চার. আমাকে ‘শাফাঞ্চআত’ (ক্বিয়ামত-দিবসের মহাসঙ্কটে এবং বৃহত্তম গুনাহ্‌গার উম্মতদের জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা) দেয়া হয়েছে।

পাঁচ. অন্যান্য নবীগণ প্রেরিত হয়েছেন বিশেষ কোন সম্প্রদায় বা জাতির প্রতি আর আমি প্রেরিত হয়েছি সমগ্র মানবজাতির প্রতি।    [মুসলিম শরীফ]

এমনকি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হয়েছেন সমগ্র সৃষ্টির প্রতি, মানব ও জিন্‌ জাতি উভয়ের প্রতি। তিনি সবার নবী। তাঁর নুবূয়ত ও রিসালতের পরিধি ভৌগলিক সীমারেখা ও সুনির্দিষ্ট কালের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। তা হচ্ছে পুর্ববর্তী নবীগণের বিপরীত। কারণ, তাঁরা প্রেরিত হয়েছিলেন নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট জাতির প্রতি। আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহ তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নুবূয়তের পরিধির ব্যাপকতার পক্ষে পবিত্র ক্বোরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। কয়েকটি আয়াত নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

এক. স্মরণ করুন, আমি আপনার প্রতি একদল জিন্‌কে আকৃষ্ট করেছিলাম। তারা ক্বোরআন পাঠ শুনছিলো। যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হলো তখন পরস্পর বললো, নীরবে শ্রবণ করো। অতঃপর যখন ক্বোরআন পাঠ সমাপ্ত হলো, তখন তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে সতর্ককারীরূপে ফিরে গেলো। তারা বললো, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এক কিতাব পাঠ শুনেছি, যা মূসার পরে নাযিল করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কিতাবের সমর্থক এবং সত্য ও সরল-সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করে।’         [সূরা আহক্বাফ, আয়াত-২৯-৩০]

দুই. আপনি বলুন, ‘আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করা হয়েছে, যে জিন্‌দের একটি দল মনযোগ সহকারে ক্বোরআন শ্রবণ, করেছে অতঃপর তারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বললো, ‘আমরা তো শুনে এসেছি এক বিস্ময়কর ক্বোরআন।’                     [সূরা জিন্‌, আয়াত ১]

তিন. বলুন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল, যিনি সমগ্র আসমান ও যমীনের মালিক, যিনি ছাড়া অন্য কোন মা’বুদ নেই, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সুতরাং তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর (পার্থিব ওস্তাদের নিকট) পড়াবিহীন, অদৃশ্যের সংবাদদাতা রসূলের উপর, যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের উপর ঈমান আনেন এবং তাঁরই গোলামী করো, তবে তোমরা পথ পাবে।              [সূরা আ’রাফ, আয়াত-১৫৮]

চার. এবং আমার কাছে এ ক্বোরআন প্রেরিত হয়েছে যে, আমি এর মাধ্যমে তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে এটা পৌঁছে সবাইকে সতর্ক করি। [সূরা আ ‘আম, আয়াত-১৯]

পাঁচ. আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তাদের এবং নিরক্ষরদের বলুন, ‘তোমরা কি আত্মসমর্পণ করেছো? যদি তারা আত্মসমর্পণ করে তবে অবশ্যই তারাও সরল-সঠিক পথ পাবে; কিন্তু যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে আপনার দায়িত্ব তো শুধু পৌছিয়ে দেয়া। আর আল্লাহ বান্দাদের সম্যক দ্রষ্টা। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত ২০]
হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ‘খাতামুন নাবিয়্যীন’
আল্লাহ সুবহা-নাহু ওয়া তা’আলা মানব জাতির হিদায়তের জন্য অসংখ্য নবী ও রাসুল এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। আর এ প্রেরণের ধারাবাহিকতায় সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী হচ্ছেন আমাদের প্রিয় নবী আল্লাহ্‌র প্রিয় হাবীব রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ মোস্তাফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তা’আলা নুবূয়ত ও রিসালতের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। তাঁর উপর অবতীর্ণ করেছেন সর্বশেষ আসমানী কিতাব মহাগ্রন্থ ক্বোরআন মজীদ। ক্বিয়ামত পর্যন্ত এটি আল্লাহর বান্দাদের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন-বিধান। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ওফাত শরীফের পর থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্‌ সালাম আর কোনদিন মহান রব আল্লাহ তা’আলার ওহী নিয়ে যমীনে অবতরণ করবেন না। এরপর কেউ যদি নিজেকে আল্লাহর রাসূল বা নবী বলে দাবি করে আর যারা তা বিশ্বাস ও সমর্থন করবে অথবা কেউ যদি ভিন্ন কাউকে নবী বা রাসূল বলে আখ্যায়িত করে আর তা যদি কেউ সত্য বলে বিশ্বাস করে, তবে ইসলামী শরীয়তের আলোকে তারা সবাই নিঃসন্দেহে কাফির বলে গণ্য হবে।
হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী
ক্বোরআন ও হাদীসের আলোকে আল্লাহর বাণী (ক্বোরআন শরীফ)
হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ। [সূরা আহযাব; আয়াত ৪০]

‘নবী’ শব্দটি ‘রাসূল’ শব্দ থেকে ব্যাপক। বস্তুতঃ তিনি শেষ নবী এবং শেষ রাসূলও। ক্বিয়ামতের পূর্বে হযরত ঈসা আলায়হিস্‌ সালাম পুনরায় অবতীর্ণ হওয়া  নবী করীমের শেষ নবী হওয়ার পরিপন্থী নয়। কারণ তখন তিনি নবী বা রসূল হিসেবে আসবেন না; বরং আমাদের নবী করীমের উম্মত তথা উম্মতের ‘ইমাম’ হিসেবে আসবেন এবং হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তাজ্ঞআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এরই শরীয়ত মোতাবেক হুকুম-আহকাম পরিচালনা করবেন।

হাদীস শরীফ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি লোকের ন্যায়, যিনি একটি ঘর বানিয়েছেন খুব সুন্দর করে; কিন্তু তার এক পাশে একটি ইট পরিমাণ জায়গা অসম্পূর্ণ রেখেছেন। অতঃপর লোকেরা ঘুরে ঘুরে এই ঘর দেখছে এবং এর সৌন্দর্য  দেখে বিস্ময় প্রকাশ করছে আর বলছে, ‘আহা! এ ইটটি কেন বসানো হলো না?’  হুযূর-ই আকরাম বলেন, ‘আমি ওই (ঘরকে পরিপূর্ণকারী) ইট এবং আমি ‘খাতামুন্‌ নাবিয়্যীন (শেষ নবী)।’’ [মুসলিম শরীফ]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমার বেশ কিছু নাম রয়েছে। আমি মুহাম্মদ, আমি ‘আহমদ’, আমি ‘মাহী’ -আমার দ্বারা আল্লাহ তা’আলা কুফরকে নিশ্চিহ্ন করবেন, আমি ‘হাশের’-আমার কদমের সামনে সমস্ত লোককে একত্রিত করা হবে, আমি ‘আক্বিব’ এবং সমাপ্তকারী, যার পরে কোন নবী নেই।       [বোখারী ও মুসলিম শরীফ]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ছয়টি জিনিস দ্বারা অন্যান্য নবীগণের উপর আমাকে মর্যাদাবান করা হয়েছে। (আর সেগুলো হচ্ছে) আমাকে ‘জাওয়ামি’উল কালিম’ বা ব্যাপকার্থক বাক্য দেয়া হয়েছে। আমাকে ভীতসন্ত্রস্তকারী গাম্ভীর্য দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। আমার জন্য গণীমত বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ হালাল করা হয়েছে। আমার জন্য সমগ্র ভূ-খণ্ডকে মসজিদ বা ইবাদতের উপযোগী ও পবিত্র করা হয়েছে। আমি প্রেরিত হয়েছি সমগ্র সৃষ্টির প্রতি এবং আমার দ্বারা নবী প্রেরণের ধারাবাহিকতার ইতি টানা হয়েছে।    [মুসলিম শরীফ]

হুযূর সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নুবূয়তের প্রমাণাদি
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যে আল্লাহ্‌র নবী, তার অসংখ্য প্রমাণ বা দলীল রয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটা নিম্নে উপস্থাপন করা হচ্ছে-
পবিত্র ক্বোরআন শরীফ
ঐশী কিতাব মহাগ্রন্থ ক্বোরআন মজীদ আল্লাহ্‌র কালাম বা বাণী। আল্লাহ্‌ তা’আলার পক্ষ থেকে এমন কিতাব নবী করীমের উপর অবতীর্ণ হওয়াই তাঁর নুবূওয়তের অন্যতম প্রমাণ। এ ক্বোরআন শরীফ তাঁর সবচেয়ে বড় মু’জিযা। এটা দ্বারা তিনি জিন্‌ ও ইনসানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। চরম সাহিত্য-উৎকর্ষের যুগেও এ ক্বোরআন পাকের একটি ছোট সূরার মতো কেউ রচনা করতে পারেনি। এ ব্যাপারে আরবের ভাষাবিদগণ সম্পূর্ণ অক্ষম ছিলো। যেমন আল্লাহ্‌ তা’আলা এরশাদ করেন, ‘‘আমার খাস বান্দার উপর আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে যদি তোমাদের সন্দেহ হয়, তবে সেটার মত একটি সূরা নিয়ে এসো এবং আল্লাহ্‌ ব্যতীত তোমাদের সকল সহায়তাকারীদের আহ্‌বান করো, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’’ [সূরা বাক্বারা, আয়াত-২৩]
গায়বের সংবাদ দেয়া
মূলতঃ ‘নবী’ শব্দের অর্থ আল্লাহ্‌র অদৃশ্য জগতের সংবাদদাতা। আর গায়েবের সংবাদ দেয়া তাঁর অন্যতম কাজ। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র জীবন চরিত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি অসংখ্য গায়বের সংবাদ দিয়েছেন। আর এ গায়বের সংবাদ দেয়াই তাঁর নুবূয়তের অন্যতম প্রমাণ। প্রসঙ্গতঃ কিছু সংখ্যক ইল্‌মে গায়বের প্রমাণাদি পেশ করা হচ্ছে- ক্বোরআন পাকে অসংখ্য গায়বের সংবাদ।

হাদীস শরীফে অসংখ্য গায়বের সংবাদ রয়েছে। যেমন- হযরত রাসূল-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘‘তোমরা আমার পরে আবূ বকর ও ওমরের আনুগত্য করবে ‘’ [মুসনাদে ইমাম আহমদ]

খিলাফত সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্ববাণী করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ত ‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘খিলাফত ৩০ বছর থাকবে। এরপর আল্লাহ তা’আলা যাকে চান তাঁকে অধিপতি করবেন।’’    [আবূ দাউদ শরীফ]

হযরত আম্মার রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র শাহাদাতের ভবিষ্যদ্ববাণী করে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘আমার ওফাতের পর তোমাকে একটি বিদ্রোহী দল হত্যা করবে।’’ [মুসলিম শরীফ ও মুসনাদে ইমাম আহমদ] সত্যি তিনি সিফ্‌ফীনের যুদ্ধে বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন।

আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশীর ইন্তিকালের দিনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর মৃত্যুর সংবাদ দেন এবং সাহাবা-ই কেরামকে নিয়ে তাঁর জানাযার নামায পড়েন।                       [বোখারী শরীফ]

’মূতার যুদ্ধে তিনজন মুসলিম সেনাপতি শহীদ হওয়ার সাথে সাথে লোক মারফত খবর আসার পূর্বেই নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মদীনা মুনাওয়ারায় বসে তা প্রচার করেছেন। তিনি সাহাবা-ই কেরামকে শত শত মাইল দূরের ঘটনাটি এমনভাবে বর্ণনা করলেন যেন তিনি চাক্ষুষভাবে দেখছেন। তখন তিনি বলেছেন, ‘‘এখন মুসলমানদের ঝাণ্ডা যায়দ ইবনে হারেসার হাতে। অতঃপর সে শহীদ হলে তা জাফর ইবনে আবূ তালিব গ্রহণ করেছে। সে শহীদ হলে তা আবদুল্লাহ্‌ ইবনে রাওয়াহা গ্রহণ করেছে এখন সেও শাহাদাতের উচ্চস্তরে পৌঁছে গেছে।’’ এই বর্ণনা দেয়ার সময় হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতময় চক্ষুযুগল থেকে অঝোরে অশ্রু-ধারা প্রবাহিত হচ্ছিলো। অতঃপর তিনি সংবাদ দিলেন, ‘‘এখন সাইফুল্লাহ্‌ (খালেদ ইবনে ওলীদ) ঝাণ্ডা নিয়েছে এবং আল্লাহ তাজ্ঞআলা মুসলমানদেরকে বিজয় দান করেছেন।’’ [বোখারী শরীফ]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম যখন উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করলেন, তখন হযরত আবূ বকর, হযরত ওমর এবং হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুম তাঁর সাথে ছিলেন। তখন পাহাড়ে কম্পন শুরু হলে তিনি বললেন, ‘‘হে উহুদ! শান্ত হও। তোমার উপর অবস্থান করছেন একজন নবী, একজন সিদ্দীক্ব এবং দু’জন শহীদ।’’        [বোখারী শরীফ]

উক্ত হাদীসে হযরত ওমর ও হযরত ওসমান রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুমার শাহাদাতের ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, যা হুযূরের অদৃশ্য জ্ঞানের জ্বলন্ত প্রমাণ।

কিস্‌রা ও ক্বায়সারের সাম্রাজ্য ও আধিপত্য ধ্বংস হবে, তা একদিন মুসলমানদের করায়ত্বে আসবে এবং তাদের সম্পদসমূহ আল্লাহর রাস্তায় বিলি-বন্টন করা হবে মর্মেও হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অনেক পূর্বেই সংবাদ দিয়েছেন।          [বোখারী শরীফ]

হুযূরের নুবূয়তের প্রমাণাদির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে-পূর্ববর্তী অবতীর্ণ আসমানী কিতাবসমূহ তাঁর শুভাগমনের বার্তা প্রচার করেছে এবং তাঁর বৈশিষ্ট্য ও চিহ্নসমূহ বর্ণনা করেছে। আমাদের ইমাম এবং মনীষীগণও ওই সমস্ত আসমানী কিতাবের উদ্ধৃতি দিয়ে স্ব স্ব গ্রন্থাবলীতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তাঞ্চআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বৈশিষ্ট্যাবলী বর্ণনা করেছেন। যেমন- আল্লামা সা’দ উদ্দীন তাফতাযানী প্রমুখ।

এ প্রসঙ্গে ইমাম বোখারী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদীস শরীফে হযরত ‘আত্বা ইবনে ইয়াসার বলেন, ‘‘একদা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল ‘আসের সাথে দেখা হলে আমি তাঁর সমীপে আরয করলাম, ‘‘তাওরীতে বর্ণিত হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বৈশিষ্ট্যসমূহ অনুগ্রহপূর্বক আমাকে বলুন।’’ তিনি বললেন, ‘‘হ্যাঁ, আল্লাহ্‌রই শপথ, তাওরীতে তাঁর এমন কিছু গুণাবলী পাওয়া যায়, যা ক্বোরআনেও বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ তা’আলা তাঁকে ক্বোরআন পাকের মধ্যে বিশেষণ দ্বারা সম্বোধন করেছেন-‘হে নবী’, ‘আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষী (হাযির-নাযির) হিসেবে’, ‘বেহেশতের সু-সংবাদ দাতা’, ‘দোযখের ভীতি প্রদর্শনকারী’ এবং ‘উম্মীদেরকে সতর্ককারীরূপে. ‘আপনি আমার খাস বান্দা’ এবং ‘আমার রাসূল’, আমি আপনার নাম দিয়েছি, ‘আল্লাহ্‌র উপর ভরসাকারী’, আপনি কর্কশভাষীও নন, কঠোরও নন, ‘আপনি হাট-বাজারে হৈ হুল্লোড়কারীও নন’,‘জ্ঞমন্দের প্রতিশোধ মন্দ দিয়ে নেন এমনও নন’, কিন্তু ‘ক্ষমা আর ক্ষমাই আপনার আদর্শ’, ‘ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত গোমরাহ্‌ সম্প্রদায়কে হিদায়ত না করা পর্যন্ত, সবাই একত্ববাদের স্বীকারোক্তি (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু বলে) না দেয়া পর্যন্ত, গোমরাহ্‌দের চক্ষু, বধিরের কর্ণ ও কপটদের অন্তর গোমরাহীর আচ্ছাদন থেকে উন্মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ আপনাকে মৃত্যু দেবেন না।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বর্ণনা যে পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহে রয়েছে ক্বোরআন পাকে সেটার উল্লেখ রয়েছে। যেমন- আল্লাহ তা’আলার বাণীঃ ‘‘নিশ্চয় তাঁর (নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) উল্লেখ আছে পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে’’।   [সূরা শু’আরা, আয়াত ১৯৬]

ওইসব লোক, যারা দাসত্ব করবে এ (পার্থিব কোন ওস্তাদের নিকট) পড়াবিহীন অদৃশ্যের সংবাদদাতা রসূলের, যাঁকে লিপিবদ্ধ পাবে নিজেদের নিকট তাওরীত ও ইন্‌জীলের মধ্যে; তিনি তাদেরকে সৎকর্মের নির্দেশ দেবেন এবং অসৎকাজে বাধা দেবেন আর পবিত্র বস্তুগুলো তাদের জন্য হালাল করবেন এবং অপবিত্র বস্তুসমূহ তাদের উপর হারাম করবেন; আর তাদের উপর থেকে ওই কঠিন বোঝা ও গলার শৃঙ্খল, যা তাদের উপর ছিলো, নামিয়ে অপসারিত করবেন। সুতরাং ওইসব লোক, যারা তাঁর উপর ঈমান আনে, তাঁকে সম্মান করে, তাঁকে সাহায্য করে এবং ওই নূরের অনুসরণ করে, যা তাঁর সাথে অবতীর্ণ হয়েছে, তারাই সফলকাম হয়েছে। [সূরা আ’রাফ, আয়াত-১৫৭, কান্‌যুল ঈমান]

তাঁর অসংখ্য মু’জিযা বা অলৌকিক ঘটনা 
চন্দ্রকে দ্বি-খণ্ডিত করা, আঙ্গুল মুবারক দিয়ে পানির ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হওয়া, অল্প খাদ্য দিয়ে অসংখ্য লোককে পরিতৃপ্ত করা, মৃত খেজুর বৃক্ষ তাঁর বিচ্ছেদে অবোধ শিশুর ন্যায় ক্রন্দন করা ইত্যাদি অসংখ্য মু’জিযা তাঁর নুবূয়তের প্রমাণ বহন করে।
আহ্‌লে কিতাবের নিকট তাঁর পরিচিতি
পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবের অনুসারীগণ তাদের কিতাবসমূহে আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বৈশিষ্ট্যাদির বর্ণনা পাওয়া এবং তা নবী করীমের যাহেরী জীবদ্দশায় বাস্তবে পাওয়া ঋনড় এরই মাধ্যমে তারা নবী করীমকে শেষনবী হিসেবে স্থির করাও তাঁর নুবূওয়তের অন্যতম প্রমাণ। যেমন- আল্লাহ তা’আলার বাণী-
‘‘যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছে তারা তাঁকে তেমনিভাবে চিনে, যেমন তারা তাদের সন্তানদেরকে চিনে। আর তাদের একটি দল জেনেশুনে সত্যকে গোপন করে’’।     [সূরা বাক্বারা, আয়াত-১৪৬]
এটা কি তাদের জন্য দলীল নয় যে, বনী ইসরাঈলের আলিমগণ তাঁর (নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) সম্বন্ধে জানে? [সূরা শু’আরা, আয়াত-১৯৭]
হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (মদীনা পাকে ইহুদীদের তৎকালীন বড় আলিম)-এর নিকট যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মদীনা পাকে আগমনের বার্তা পৌঁছলো, তখন তিনি হুযূর পাকের নিকট এসে বললেন, ‘‘আমি আপনাকে এমন তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন করবো, যেগুলোর উত্তর শুধু কোন নবীই দিতে পারেন। (নবী ছাড়া আর কেউ এ বিষয়গুলোর জ্ঞান রাখে না। প্রশ্নগুলো হচ্ছে)
১. ক্বিয়ামতের প্রথম আলামত কি?
২. জান্নাতবাসীদের প্রথম খাদ্য কি?
৩. কোন্‌ জিনিস সন্তানকে পিতার দিকে ঝোঁকাবে আর কোন্‌ জিনিস সন্তানকে তার মাতার দিকে ঝোঁকাবে?’’

প্রশ্নগুলোর উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বললেন, ১. ‘‘ক্বিয়ামতের প্রথম চিহ্ন হচ্ছে- তখন এমন একটি আগুন আসবে, যা পূর্ব  প্রান্তের মানুষকে তাড়িয়ে পশ্চিম দিকে নিয়ে যাবে।

২. আর জান্নাতবাসীর প্রথম খাদ্য হবে মাছের কলিজার অতিরিক্ত অংশ এবং ৩. সন্তানের সাদৃশ্যের ব্যাপারটা হল, পুরুষ যখন স্ত্রী-সহবাস করে আর পুরুষের বীর্য (শুক্র) মাতৃগর্ভে আগে পৌঁছে তখন সন্তান পিতার সদৃশ হয়। আর যদি মায়ের বীর্য (ডিম্ব) পূর্বে গর্ভে পৌঁছে তখন সন্তান তার মায়ের মত হয়।’’

এটা শুনে আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম নবী করীমের রিসালতের সত্যতা স্বীকার করে বললেন, ‘‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল।’’ [বোখারী শরীফ, কিতাবুল আম্বিয়া]

অন্য বর্ণনায় আছে, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম তাঁর জাতি-ভাইদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘‘হে ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় করো। ওই আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই। নিশ্চয় তোমরা জানো তিনি (হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল এবং তিনি সত্যের বাণী নিয়ে এসেছেন।’’    ’   [বোখারী শরীফ]

রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস ক্বোরাঈশ নেতা আবূ সুফিয়ানের সাথে দীর্ঘ কথোপকথনের পর বললেন, ‘‘আপনি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সম্বন্ধে যা বলেছেন তা যদি সত্য হয়, তাহলে তিনি সত্য নবী। আর আমার এই রাজ্যও অচিরেই তাঁর পদানত হবে।’’

হযরত জাফর ইবনে আবূ তালিবের উদ্দেশে আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজাশী ক্বোরআন পাক শোনার পর বলেছেন, ‘‘নিশ্চয় এটি (ক্বোরআন শরীফ) এবং হযরত ঈসা আলায়হিস সালাম যা নিয়ে এসেছেন, উভয়টি এক ও অভিন্ন উৎস থেকে আগত।’’

উল্লেখ্য যে, অসংখ্য খ্রিষ্টান তাদের ধর্মগ্রন্থ অনুযায়ী নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর মধ্যে শেষ যমানায় প্রতিক্ষিত নবীর বৈশিষ্ট্য পেয়ে তাঁর উপর ঈমান এনেছে। এ প্রসঙ্গে ক্বোরআন পাকে এরশাদ হয়েছে, ‘আপনি সব মানুষের চাইতে মুসলমানদের অধিক শত্রু ইহুদী ও মুশরিকদেরকে পাবেন এবং আপনি সবার চাইতে মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্বে অধিক নিকটবর্তী তাদেরকে পাবেন, যারা নিজেদেরকে খ্রিস্টান বলে। এর কারণ এ যে, খ্রিষ্টানদের মধ্যে আলিম রয়েছে, দরবেশ রয়েছে এবং তারা অহঙ্কার করে না। আর তারা রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা যখন শুনে, তখন আপনি তাদের চোখ অশ্রু-সজল দেখতে পাবেন, এ কারণে যে, তারা সত্যকে চিনে নিয়েছে। তারা বলে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা মুসলমান হয়ে গেলাম। অতএব, আমাদেরকেও মান্যকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন। আমাদের কি ওযর থাকতে পারে যে, আমরা আল্লাহর প্রতি এবং যে সত্য আমাদের কাছে এসেছে, তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবো না এবং এ আশা করবো না যে, আমাদের প্রতিপালক আমাদেরকে সৎ লোকদের মধ্যে প্রবিষ্ট করবেন?ঞ্চ অতঃপর তাদেরকে আল্লাহ এ উক্তির প্রতিদান স্বরূপ এমন উদ্যান দেবেন, যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত তারা তাতে চিরকাল অবস্থান করবে। এটাই সৎকর্মশীলদের [সূরা; মা-ইদাহ্‌‌, আয়াত-৮২-৮৫]

তাঁর জীবনাদর্শ নুবূয়তের অন্যতম প্রমাণ
কেউ যদি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যক্তি-জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করে, তাহলে তার সম্মুখে এটা সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। কারণ, কোন সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের চারিত্রিক গুণাবলীর পরিপূর্ণভাবে সমাবেশ ঘটা অসম্ভব। যুগে যুগে মনীষীগণ, এমনকি অমুসলিম মনীষীগণও তাঁর জীবনী গবেষণা করে এটাই বলতে বাধ্য হয়েছেন যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পূতঃপবিত্র ব্যক্তিত্ব।
‘নবী’ ও ‘রাসূল’-এর সংজ্ঞা এবং উভয়ের মধ্যে পার্থক্য
নবীঃ নবী মানবজাতির এমন স্বাধীন পুরুষকে বলে, যাঁর প্রতি আল্লাহ তা’আলা ওহী (আসমানী প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করেছেন।
রসূলঃ রাসূল মানবজাতির এমন স্বাধীন পুরুষকে বলে, যাঁর প্রতি আল্লাহ তা’আলা স্বীয় ঐশঃ নৎ প্রত্যাদেশ সম্বলিত শরীয়ত দিয়েছেন এবং তা প্রচারের নির্দেশও দিয়েছেন।
অতএব, বুঝা গেলো যে, নবী ও রাসূল মানবজাতি থেকেই হয়েছেন; ফিরিশ্‌তা ও জিনকে আল্লাহ তা’আলা নবী-রাসূল করেন নি। কেউ কেউ ধারণা করতো যে, নবী ও রাসূল ফিরিশ্‌তাদের মধ্য হতে হওয়া আবশ্যক। যেমন মক্কার কাফিররা বলেছিলো, ‘আমাদেরকে কি একজন মানুষ হিদায়ত করবে?’ তাদের এই ধারণা যে অমূলক ও অবাস্তব সে সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ক্বোরআন মজীদে এরশাদ করেন, ‘যদি নবীকে ফিরিশতা করতাম তবুও তাঁকে পুরুষই (ওহী) করতাম এবং তাদের উপর ঐআ সন্দেহ রাখতাম, যার মধ্যে তারা এখন পতিত।’ [সূরা আ ‘আম, আয়াত ৯, তরজমা- কান্‌যুল ঈমান]

আর নবী-রাসূলগণ পুরুষ হওয়াও আবশ্যক। কারণ, নুবূয়ত ও রিসালত (তথা মানবজাতিকে আল্লাহ্‌র দ্বীনের প্রতি আহ্‌বান করা)-এর দায়িত্ব নারীদের জন্য প্রযোজ্য নয়। কেউ কেউ মনে করে যে, হযরত মরিয়ম আলায়হাস্‌ সালাম, হযরত আসিয়া আলায়হাস্‌ সালাম, হযরত মূসা আলায়হিস্‌ সালাম-এর মাতা এবং হযরত হাজেরা আলায়হাস্‌ সালাম নবী ছিলেন; কারণ তাঁদের প্রতি আল্লাহ তা’আলা ওহী প্রেরণ করেছেন। কিন্তু উপরিউক্ত আয়াত (সূরা আন’আম, আয়াত-৯) দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, নারীকে আল্লাহ পাক নবী করেন নি; বরং পুরুষকেই নবী করেছেন। আর উপরিউক্ত সম্মানিত মহিলাদের প্রতি যে ‘ওহী’ এসেছে, ওই ‘ওহী’ মানে ‘ইলহাম’ (স্বর্গীয় প্রেরণা) মাত্র।      [তাফসীর ও আক্বাইদ গ্রন্থাবলী]

নবী ও রাসূলের মধ্যে আরো কিছু পার্থক্য
নবীঃ নবী হলেন, যার উপর স্বতন্ত্র দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব আরোপ করা হয়নি আর রাসূল হচ্ছেন যাঁর উপর স্বতন্ত্র দ্বীন প্রচারের দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে।
নবী হচ্ছেন, যাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ হতে কিতাব অবতীর্ণ হয় নি। আর রাসূল হচ্ছেন যাঁর উপর আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে কিতাব অবতীর্ণ হয়েছে।
নবী, যিনি তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলের শরীয়তকে সমর্থন করেন, মানুষকে সেটার প্রতি আহ্‌বান করেন, তাঁর কোন নতুন স্বতন্ত্র শরীয়ত থাকে না। আর রাসূল যিনি স্বতন্ত্রভাবে নতুন শরীয়ত নিয়ে এসেছেন।
কারো কারো মতে, নবীগণের নিকট আল্লাহর ওহী নিয়ে সরাসরি ফিরিশতা আসেন না, পক্ষান্তরে রাসূলের নিকট আল্লাহ্‌র ওহী নিয়ে সরাসরি ফেরেশতা আসেন।
মোটকথা, তাঁরা উভয়ে আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত ও নির্বাচিত এবং তাঁরা আল্লাহর প্রত্যাদেশ (ওহী) দ্বারা ধন্য। এ দৃষ্টিকোণ্‌ থেকে নবী ও রাসূল এক ও অভিন্ন।
ওহীর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
নুবূয়ত ও রেসালতের ক্ষেত্রে ওহী হচ্ছে প্রধান বিষয়, যার মাধ্যমে নবী ও রসূলগণ আল্লাহ  তা’আলার পক্ষ থেকে আক্বীদা, ইবাদত, জীবনবিধান, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, উপদেশাবলী, হুকুম-আহকাম, তথা দ্বীন, দুনিয়া ও আখিরাত সম্পর্কিত সবকিছু পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁরা উল্লেখিত বিষয়গুলো পাওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে ওহী।
ওহীর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে গোপনে তাৎক্ষণিকভাবে কোন বিষয়ে অবগত করা। সাধারণত এটা আল্লাহর পক্ষ হতেই তাঁর নবী-রসূল, ফেরেশ্‌তা ও বিশেষ কোন বান্দার প্রতি প্রেরণ করা হয়। আর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে- আল্লাহ তাজ্ঞআলা কর্তৃক তাঁর নবী ও রসূলগণকে দ্বীন ও শরীয়ত সম্পর্কিত বিষয়াবলী এভাবে অবগত করা যে, তাঁরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বুঝতে পারেন যে, এগুলোর সবই মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে। মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত সম্পর্কিত বিষয়াবলী, বিশেষ করে আমাদের চোখের আড়ালের, আল্লাহর অদৃশ্য জগতের বিষয়াবলী নবী ও রাসূলগণ আল্লাহ্‌র পক্ষ হতে ওহী দ্বারা অবগত হয়ে মানব সমাজে প্রচার করেন।
সাধারণত ওহী তিন ধরনের। এর বর্ণনা আমরা ক্বোরআন পাকের মধ্যে পেয়ে থাকি। যেমন আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, জ্ঞকোন মানুষের অবস্থা এমন নয় যে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলবেন; কিন্তু ওহীর মাধ্যমে অথবা পর্দার অন্তরাল থেকে কিংবা তিনি কোন ফিরিশতা প্রেরণ করবেন, যে আল্লাহ যা চান তা তাঁর অনুমতিক্রমে পৌঁছিয়ে দেবে। নিশ্চয় তিনি অতি উচ্চ মর্যাদার অধিকারী, প্রজ্ঞাময়।’ [সূরা শূরা, আয়াত-৫১]
আল্লাহ তাজ্ঞআলার পক্ষ থেকে নবী ও রাসূলগণের প্রতি ওহী প্রেরণের পদ্ধতিসমূহের মধ্যে-
প্রথমটি হচ্ছে তাঁদের ঘুমন্ত অথবা জাগ্রত অবস্থায় অন্তরে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ভাব উদ্রেক হওয়া। তা থেকে তাঁরা বিষয়টি বুঝে নেন যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। সে ব্যাপারে তাঁরা সুদৃঢ় মনোভাব পোষণ করেন।
দ্বিতীয়টি  হচ্ছে নবী ও রসূলগণ কর্তৃক আল্লাহকে স্বচক্ষে দেখা ব্যতীত তাঁর কথা সরাসরি শোনা। যেমন হযরত মূসা আলায়হিস্‌ সালাম তূর পর্বতে গিয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলতেন; কিন্তু তিনি আল্লাহকে দেখতেন না।
তৃতীয় পদ্ধতি হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নিয়ে তাঁদের নিকট ফিরিশতা অবতীর্ণ হওয়া। বেশির ভাগ ওহী এ পদ্ধতিতে নাযিল হয়েছে। বিশেষ করে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ওহীর দায়িত্বে নিয়োজিত বুযুর্গ ফেরেশতা হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্‌ সালাম মহান রাব্বুল আলামীনের বাণী নিয়ে আসতেন। তিনি কখনো কখনো তাঁর মূল আকৃতিতে আর কখনো কখনো কোন সাহাবীর আকৃতিতে আসতেন। আর সাহাবীদের মধ্যে হযরত দাহ্‌‌ইয়া কালবী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু’র আকৃতিতে হযরত জিব্রাঈল নবী করীম সাল্লাল্লাহু তাজ্ঞআলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আসতেন।
নবী ও রসূলগণ আলায়হিমুস্‌ সালাম -এর বৈশিষ্ট্যাবলী  
সমস্ত নবী ও রসূল, বিশেষকরে আমাদের নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্‌ পাকের নূর থেকে সৃষ্ট। যদিও তাঁরা বাহ্যিকভাবে মানবীয় আকৃতিতে দুনিয়াতে এসেছেন। আল্লাহর ক্বুদরতে তাঁদের মধ্যে নূরানিয়াত ও মানবীয়তার সমন্বয় ঘটেছে। পিতার ঔরশে ও মায়ের গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। সুতরাং মানবীয়তা তাঁদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো। তাই তাঁরা শারীরিকভাবে ব্যাথা-বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, সুস্থতা-অসুস্থতা অনুভব করেন। তাঁরা পানাহার গ্রহণ করেন, বিবাহ-শাদী করেন, সন্তান-সন্তুতি জন্ম দেন এবং ইনতিকালের স্বাদও গ্রহণ করেন। তবে সাধারণ মানুষের মৃত্যু ও তাঁদের ইন্‌তিক্বালের মধ্যে বিরাট ব্যবধান রয়েছে। প্রত্যেক নবী ও রাসূলের ওফাত শরীফ তাঁদের ইখতিয়ার অনুসারে সংঘটিত হয়। তাঁদেরকে ইনতিকাল করা কিংবা না করার ইখ্‌তিয়ার দেওয়া হলেও তাঁরা ইন্‌তিকালকেই গ্রহণ করেছেন। তাঁদের রূহ মুবারকগুলো কব্‌জ করার প্রকৃতি এবং ধরনও স্বতন্ত্র। অতি যত্ন সহকারে এটা সম্পন্ন করা হয়।
তাঁদেরকে মূলত মহান আল্লাহ তা’আলা মানব জাতি থেকে নুবূয়ত ও রিসালতের মত গুরুদায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার জন্য নির্বাচিত করেছেন। স্বয়ং রাব্বুল আলামীন তাঁদেরকে খুব সুন্দরভাবে আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ থেকে বহু বেশী অনুগ্রহ দ্বারা তাঁদেরকে ধন্য করেছেন। মানবিক গুণে পূর্ণতার চরম শিখরে তাঁদেরকে সমাসীন করেছেন এবং সব প্রকার মানবীয় দুর্বলতা থেকে তাঁদেরকে মুক্ত রেখেছেন। মানবীয়তায়ও তাঁদের নূরানিয়াতের প্রভাব বিদ্যমান। তাঁদেরকে যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য দ্বারা ধন্য করা হয়েছে, তন্মধ্যে নিম্নে কিছু আলোকপাত করা হচ্ছে-
‘ইস্‌মত’ (সংরক্ষণ তথা নিষ্পাপ হওয়া।) আর তা হচ্ছে আল্লাহ তা’আলা নবী ও রাসূলগণের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন ব্যাপারসমূহকে বিশেষভাবে হেফাযত করেছেন। এরই ফলশ্রুতিতে তাঁরা আল্লাহর বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে যে কোন ধরনের ভুল-ভ্রান্তি কিংবা অবহেলা থেকে মুক্ত ছিলেন। তাঁরা নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বে এবং পরে কুফ্‌র থেকে এবং সব রকমের কবীরা গুণাহ, এমনকি সগীরা গুনাহ থেকেও পবিত্র। অর্থাৎ নবীগণ মাঞ্চসূম বা নিষ্পাপ। আর নিষ্পাপ হওয়ার গুণটা তাঁদের জন্য আল্লাহ তাজ্ঞআলা অনিবার্য করেছেন- এ কারণেই যে, তাঁদেরকে তিনি মানব জাতির জন্য উত্তম আদর্শ বানিয়েছেন, অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় করেছেন। তাঁদের কথা মান্য করতে এবং তাঁদের কর্মের অনুসরণ করতে আল্লাহ তা’আলা মানব জাতিকে কঠোরভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। নজ্ঞৈণ যাঁদের অনুসরণ করা হবে, যাঁদেরকে আদর্শ হিসেবে মানা হবে, তাঁরা যদি নিষ্পাপ না হন তাহলে তাঁদের মানা ও অনুসরণের মধ্যে উপকারিতাই বা কি?
অতএব, সম্মানিত নবীগণ হলেন মানবজাতি থেকে আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নির্বাচিত। মানবজাতিকে হিদায়ত এবং তাদের নিকট আল্লাহর বাণী ও শরীয়ত প্রচারের নিমিত্তে আল্লাহ তাজ্ঞআলা তাঁদেরকে মনোনীত করেছেন এবং তাঁদেরকে সুসজ্জিত করেছেন সুনিপুণ দৈহিক অবয়বেও। সাথে সাথে সব রকমের চারিত্রিক গুণাবলী ও পূর্ণতার সমাবেশ ঘটিয়েছেন তাঁদের সত্তায়। বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ যত ধরনের দোষ-ত্রুটি হতে পারে সবকিছু থেকে, তথা সবধরনের মানবীয় দুর্বলতা থেকে আল্লাহ তাজ্ঞআলা তাঁদেরকে মুক্ত রেখেছেন। আর এ হেফাযত শুধু নুবূয়ত প্রকাশের পরে নয়; বরং নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বেও। এই ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়া জামা‘আতের বিজ্ঞ আলিমগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
অসাধরণ বুদ্ধিমত্তা ও বোধশক্তি
নবী ও রাসূলগণের জ্ঞান, বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা, বোধশক্তি ও সচেতনতা সাধারণ মানুষ থেকে অনেক বেশি। কারণ তা তাঁদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তর্ক-বিতর্কে তাঁরা খোদাদ্রোহীদেরকে পরাস্ত করতে সক্ষম। আর এ সকল বৈশিষ্ট্য তাঁদেরকে দেয়া হয়েছে এ জন্য যে, তাঁদের দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহর দ্বীন প্রচার করা, মানুষকে সত্য ধর্মের প্রতি আহ্‌বান করা, ভ্রান্ত আক্বীদা দূরীভূত করা, মানুষের অন্তরে সঠিক আক্বীদা বা বিশ্বাসের বীজ বপন করা। আর এসব কিছুর জন্য তীক্ষ্ণবুদ্ধি, সচেতনতা ও প্রজ্ঞা অত্যন্ত আবশ্যক। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা ক্বোরআন পাকে সম্মানিত নবীগণের কিছু ঘটনা উল্লেখ করেছেন। যেমন-
আল্লাহ তা’আলার বাণী, (নূহের সম্প্রদায় বলেছে) ‘হে নূহ! তুমি আমাদের সাথে ঝগড়া করেছো, তুমি আমাদের সাথে অতি মাত্রায় ঝগড়া করেছো, সুতরাং তুমি সত্যবাদী হলে আমাদের যার ভয় দেখাচ্ছ তা আনয়ন করো।’           [সূরা হুদ-৩২]
এবং এটা আমার দলীল, তা আমি ইব্রাহীমকে তার সম্প্রদায়ের মোকাবেলায় দান করেছি। আমি যাকে চাই বহু মর্যাদায় উন্নীত করি। নিঃসন্দেহে আপনার রব জ্ঞান ও প্রজ্ঞার অধিকারী। [সূরা আন’আম, আয়াত-৮৩, তরজমা কান্‌যুল ঈমান]
হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্‌ সালাম-এর সাথে নমরূদের ঘটনাটি আল্লাহ তা’আলা ক্বোরআন মজীদে উল্লেখ করেছেন, যে বিতর্কের ঘটনায় হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্‌ সালাম নমরূদকে পরাস্ত করেছিলেন- ‘‘তুমি কি ওই ব্যক্তির (নমরূদ) কথা ভেবে দেখোনি, যে ইব্রাহীমের সাথে তার প্রতিপালক সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলো, যেহেতু আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন। যখন হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্‌ সালাম বললো, জ্ঞতিনি আমার প্রতিপালক, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান’। তখন সে বললো, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। হযরত ইব্রাহীম (আলায়হিস্‌ সালাম) বললো, ‘নিশ্চয় আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করো।’ তখন সে (নমরূদ) হতবুদ্ধি হয়ে গেলো এবং আল্লাহ অত্যাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।’’ [সূরা বাক্বারা: আয়াত ২৫৮]
এভাবে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, ‘হে হাবীব! আপনি আপনার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করুন প্রজ্ঞা ও সুন্দর উপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে উৎকৃষ্ট পন্থায় তর্ক করুন, যা তাদের জন্য প্রযোজ্য।’                [সূরা নাহ্‌ল, আয়াত-১২৫]
তাঁরা সম্ভ্রান্ত পরিবারের হন অর্থাৎ তাঁদের পূর্বপুরুষগণ সম্মানিত ও মর্যাদাবান। তাঁরা উত্তম বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁদের সামাজিক অবস্থান সম্মানজনক ছিলো। যেমন- বিশুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ তা’আলা শুধু সম্ভ্রান্ত ও সম্মানিত সম্প্রদায় থেকেই নবী প্রেরণ করেছেন ‘’[আল হাদীস]
আল্লাহ তা’আলা পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ করেছেন, তারা বললো, ‘হে শু’আয়ব! আপনি যা বলেন তার অনেক কথাই আমরা বুঝি না এবং আমরা তো আপনাকে আমাদের মধ্যে দুর্বল মনে করি। যদি আপনার স্বজনবর্গ না থাকতো, তবে আমরা অবশ্যই আপনাকে প্রস্তরাঘাত করে মেরে ফেলতাম। আর আপনি তো আমাদের উপর শক্তিশালী নন।’ [সূরা হুদ, আয়াত-৯১]
উক্ত আয়াতে হযরত শু’আয়ব আলায়হিস্‌ সালাম সম্ভ্রান্ত পরিবারের হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে প্রত্যেক নবী স্বীয় যুগের শ্রেষ্ঠ বংশের সন্তান ছিলেন। যেমন- আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম বিখ্যাত ক্বোরাইশ বংশের হাশেমী গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। রোমের বাদশাহ হেরাক্লিয়াস যখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে আবূ সুফিয়ানকে বললো, ‘‘তোমাদের মধ্যে তাঁর সামাজিক মর্যাদা কেমন?’’ উত্তরে আবূ সুফিয়ান বললেন, ‘‘তিনি আমাদের মধ্যে মর্যাদাশীল ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান।’’ তখন হেরাক্লিয়াস বললো, ‘‘এভাবে রাসুলগণকে সম্মানিত বংশধারায় প্রেরণ করা হয়।’’ আর এর পেছনে কারণ হচ্ছে- নবী-রাসূলগণ সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণেই একদিকে মানুষ যেমন তাঁদের কথার উপর আস্থাশীল হতে পারে, অন্যদিকে তেমনি তাঁরা কাফির-মুশরিকদের অত্যাচার প্রতিরোধ করতে পারেন।
তাঁরা উত্তম চরিত্র ও মহৎ প্রাণের অধিকারী। তাঁরা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের চরম শিখরে উপনীত। তাঁরা পূত-পবিত্র আত্মার অধিকারী। সামাজিক অনাচার-দূরাচার এবং কোন ধরনের মন্দ কার্যকলাপ তাঁদের ব্যক্তিত্বকে স্পর্শ করতে পারে নি। উদারতা, মহানুভবতা ও বদান্যতা তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অন্যতম। যেমন নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নুবূয়তের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে হযরত খাদীজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই চিহ্নিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি (হযরত খাদীজা রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহা) বলেছেন, ‘‘কখনো না। মহান আল্লাহ তা’আলারই শপথ, আল্লাহ কখনো আপনাকে লাঞ্ছিত করবেন না। কেননা আপনি আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করেন, সত্য কথা বলেন, নিঃস্বদের আশ্রয় দেন, অতিথিকে সমাদর করেন এবং বিপদগ্রস্থদের সাহায্য করেন’’।  [বোখারী শরীফ]
হেরাক্লিয়াস যখন আবূ সুফিয়ানকে প্রশ্ন করলো, ‘‘তিনি কি অবাধ্যাচারণ করেন?’’ উত্তরে আবূ সুফিয়ান বললেন, ‘‘না।’’ তখন হেরাক্লিয়াস বললো, ‘‘এটাই নবী-রসূলগণের চরিত্র।’’ আল্লাহ তাজ্ঞআলা নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তাঁর প্রতি ওহী প্রেরণ করার পূর্বে আইয়্যামে জাহেলিয়াতের মন্দ স্বভাব থেকে হেফাজত করেছেন। যেমন- বিশুদ্ধ হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ছোট বেলায়, কাঞ্চবা ঘর পুনঃনির্মাণের সময়, তাঁর চাচা হযরত আব্বাসের সাথে ইট বহন করেছিলেন। তখন  হযরত আব্বাস তাঁর পরিহিত লুঙ্গি খলে তাঁর কাঁধের উপর দিতে চাইলেন। তখন লজ্জায় তিনি বেঁহুশ হয়ে পড়ে যান। তখনই তাঁর কাপড় তাঁকে উত্তমরূপে পরিয়ে দেওয়া হলো। আরেকবার তাঁকে কোন এক খেলা-তামাশার অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা হলে তাঁকে প্রচণ্ড নিদ্রা পেয়ে যায় এবং ওই নিদ্রায় তাঁর সকাল হয়ে গেলো। ফলে ওই অনুষ্ঠানে যা কিছু হয়েছে তা তিনি দেখেনও নি এবং তাতে অংশ গ্রহণও করেন নি। আর তাঁর নুবূয়ত প্রকাশের পূর্বে আরবদের মধ্যে তিনি সত্যবাদী ও আমানতদার হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তারা তাদের সম্পদ তাঁর নিকট গচ্ছিত রাখতো। আর তারা কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে তাঁর শরণাপন্ন হতো। এমনকি কাবাগৃহে কালো পাথর স্থাপনের ব্যাপারে যে বিরোধ সৃষ্টি হয়েছিলো, তাতে তারা তাঁর সমাধানকে মাথা পেতে মেনে নিয়েছিলো।
মানুষের মধ্যে দুর্বল লোকেরাই প্রথমে তাঁদের অনুসারী হয়। যেমন- হযরত নূহ আলায়হিস্‌ সালামকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা বলেছিলো, (ক্বোরআনের ভাষায়) ‘‘আর আমাদের মধ্যে যারা নিতান্ত নিম্নস্তরের, তাও আবার স্থুল-বুদ্ধিসম্পন্ন, তাদের ছাড়া অন্য কাউকে আপনার অনুসরণ করতে দেখি না এবং আমাদের উপর আপনার কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখি না বরং আমরা আপনাকে মিথ্যাবাদী মনে করি।’’
অর্থাৎ নবীগণের প্রতি প্রথমে ঈমান আনেন সমাজের দুর্বল মানুষগণ। এরপর ক্রমশ তাঁদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা দ্বীন-ধর্মের প্রতি অত্যন্ত আন্তরিক। ঈমান যখন তাদের আত্মার গভীরে পৌঁছে যায় তখন তাদের কেউ আর ধর্মবিমুখ হয় না। তারা আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূলের সন্তুষ্টি কামনায় সর্বস্ব উৎসর্গ করতে সদা প্রস্তুত।
এ প্রসঙ্গেও হেরাক্লিয়াস আবূ সুফিয়ানকে বলেছিলো, ‘‘আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি- ‘সমাজের মোড়ল শ্রেণীর মানুষ কি তাঁকে অনুসরণ করে, না দুর্বল লোকেরা?’ তুমি উত্তরে বলেছো, ‘দুর্বল লোকেরাই তাঁর অনুসরণ করে।’ স্বভাবত দুর্বলরাই রসূলের অনুসারী হয়।’’ আর আমি তোমাকে প্রশ্ন করেছি, ইসলাম গ্রহণ করার পর ধর্মের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে কেউ কি ধর্মান্তরিতও হয়?’ তুমি বলেছো, ‘না।’ আর এভাবেই হয়ে থাকে। ঈমান যখন অন্তরের অন্তঃস্থলে পৌঁছে যায় তখন তার প্রভাব তার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সঞ্চালিত হয়। ফলে তাঁরা ধর্মানুরাগী হয়, ধর্মান্তরিত হয় না।’’। [সহীহ বোখারী শরীফ, ১ম খণ্ড]
তাঁদের থেকে মু’জিযা প্রকাশ পায়। তাঁদের নুবূয়ত ও রিসালতের স্বীকৃতি স্বরূপ আল্লাহ তা’আলা তাঁদের হাতে এমন অলৌকিক শক্তি দেন, বা অলৌকিক ঘটনাসমূহ সংঘটিত করান, যা করা কোন মানুষ ও জিনের পক্ষে সম্ভব নয়। যেমন, মি’রাজ শরীফ, চন্দ্রকে দ্বিখণ্ডিত করা, ডুবন্ত সূর্যকে ফেরৎ আনা ইত্যাদি।
সত্যবাদিতা তাঁদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমন আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন- ‘‘আর আমি তাদেরকে দান করলাম আমার রহমত এবং তাদেরকে দিলাম সুনাম, সুখ্যাতি।’’ [সূরা মরিয়াম, আয়াত- ৫০]
হে আমার রব! আমাকে হিকমত দান করুন এবং আমাকে পূণ্যবান লোকদের অন্তর্ভুক্ত করুন আর আমার সুখ্যাতি অব্যাহত রাখুন পরবর্তীদের মধ্যে। [সূরা শু’আরা, আয়াত-৮৩-৮৪]
অতএব, ‘সত্যবাদিতা’ গুণটি নবী ও রাসূলগণের ক্ষেত্রে ওয়াজিব বা অনিবার্য। মিথ্যা বলা কথা তাঁদের বেলায় কল্পনাও করা যায় না।
তাঁদের বৈশিষ্ট্যাবলীর মধ্যে অন্যতম হল তাঁরা মানুষকে দ্বীনের প্রতি আহ্‌বান করেন, আল্লাহর ইবাদত তথা নামায, যাকাত, আত্মীয়তার বন্ধন ইত্যাদির প্রতি আহ্‌বান করেন। সম্রাট হিরাক্লিায়াস আবূ সুফিয়ানকে বলেছিলো, ‘‘তিনি তোমাদেরকে কিসের নির্দেশ দেন?’’ আবূ সুফিয়ান বলেছিলেন, ‘‘তিনি আমাদেরকে নামায, যাকাত, আত্মীয়তার বন্ধন ও সততা অবলম্বনের নির্দেশ দেন।’’ অতঃপর, হিরাক্লিায়াস বলেছিলো, ‘‘তুমি যা বলেছো তা যদি সত্য হয় তাহলে তিনি সত্য নবী। তাছাড়া, আমার এই সাম্রাজ্য অচিরেই তাঁর আয়ত্বে চলে যাবে।’’ আর মুসলমানরা যখন আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তখন বাদশাহ্‌ নাজাশী মুসলমানদের দলপতি হযরত জা’ফর ইবনে আবূ তালেব রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘‘এটা কেমন ধর্ম, যা তোমাদের আপন সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছে?’’ উত্তরে তিনি বলেন, ‘‘হে মহান বাদশাহ! আমরা জাহেলী যুগের সম্প্রদায়। আমরা মূর্তি পূজা করতাম, মৃত ভক্ষণ করতাম, অশ্লীলতা ঐ বেহায়াপনায় লিপ্ত থাকতাম, আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করতাম, প্রতিবেশীদের প্রতি সদাচরণ করতাম না, আমাদের মধ্যে শক্তিমানরা দুর্বলদের উপর চড়াও হতো। এ অবস্থা আমাদের মধ্যে চলতে লাগলো। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা’আলা আমাদের মধ্য থেকে আমাদের প্রতি এমন রাসূল প্রেরণ করেন, যাঁকে আমরা চিনি, যাঁর বংশধারা সু-পরিচিত, যাঁর সততা, আমানতদারী, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা সম্পর্কে আমরা উত্তমরূপে জ্ঞাত। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর দিকে আহ্‌বান করলেন এবং সত্য কথা বলতে, আমানত রক্ষা করতে, আত্মীয়তার বন্ধন সংরক্ষণ করতে, প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হতে এবং হারাম ও রক্তপাত হতে বিরত থাকতে নির্দেশ দিলেন এবং অশ্লীলতা, মিথ্যা বলা, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, কোন সাধ্বী মহিলাকে অপবাদ দিতে নিষেধ করেছেন। আমাদেরকে এক আল্লাহ্‌র ইবাদত করার নির্দেশ দিয়েছেন-আমরা যেন তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করি। এভাবে নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতেরও নির্দেশ দিয়েছেন। অতঃপর আমরা তাঁকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি, তাঁর প্রতি ঈমান এনেছি। তাই আমাদের সম্প্রদায়ের লোকেরা আমাদের সাথে দুশমনী করছে, আমাদের নির্যাতন করছে। আমাদের উপর যখন তারা অত্যাচারের মাত্রা বাড়িয়ে দিলো, তখন আমরা বাধ্য হয়ে আপনার দেশে হিজরত করেছি।’’
সমস্ত নবী-রসূলের প্রতি ঈমান আনার হুকুম
প্রত্যেক মু’মিনের উপর নবী ও রসুলগণের প্রতি এই মর্মে ঈমান আনা ওয়াজিব যে, তাঁরা আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ। তাঁদেরকে আল্লাহ তা’আলা এ মহান দায়িত্ব (নুবূয়ত ও রিসালত) আঞ্জাম দেয়ার জন্য মানব জাতি থেকে নির্বাচিত করেছেন। তাঁরা সত্যবাদী ও নিষ্পাপ। নুবূয়ত ও রিসালত প্রকাশের পুর্বে এবং পরে তাঁদের থেকে কোন ধরনের ছোট কিংবা বড় গুণাহ সম্পাদিত হয় নি। তাঁরা সংখ্যায় অগণিত। হযরত আদম আলায়হিস সালাম-এর মাধ্যমে দুনিয়াতে নবী-রসূল প্রেরণের সূচনা হয় এবং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণের মাধ্যমে এ ধারার পরিসমাপ্তি ঘটে। তিনিই সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘‘রসূল ঈমান এনেছেন ওই সব বিষয়ের উপর, যেগুলো তাঁর প্রতি নাযিল করা হয়েছে, তাঁর পালনকর্তার পক্ষ থেকে এবং মু’মিনরাও ঈমান এনেছে। তারা সবাই ঈমান এনেছে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফিরিশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রসূলগণের প্রতি। তারা বলে, জ্ঞআমরা তাঁর রসূলদের মধ্যে পার্থক্য করি নাশ।’’ [সূরা বাক্বারা, আয়াত-২৮৫]
নবী ও রসূলগণের সংখ্যা সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। এরপরও ১,২৪,০০০ (এক লক্ষ চব্বিশ হাজার), ৩,৩৬,০০০ (তিনলক্ষ ছত্রিশ হাজার) মর্মে বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁদের সংখ্যা যতই হোক না কেন তাঁদের সবার উপর আমাদের ঈমান আনা ওয়াজিব। তাঁদের মধ্যে ২৫ জনের নাম পবিত্র ক্বোরআনের উল্লেখ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ৫ জনকে اولوا العزم (উলুল্‌ আযম) বা দৃঢ় প্রত্যয়ী বলা হয়। কারণ তাঁদেরকে তাঁদের সম্প্রদায়গুলো অসহনীয় কষ্ট ও যন্ত্রণা দিয়েছে, তাঁদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। তাঁদের সম্পর্কে আল্লাহ তাজ্ঞআলা আমাদের প্রিয় নবীকে সম্বোধন করে এরশাদ এরশাদ করেছেন, ‘‘অতঃপর আপনি ধৈর্যধারণ করুন, যেভাবে পূর্ববর্তী রসূলগণ ধৈর্যধারণ করেছেন।’’ [সূরা আহক্বাফ, আয়াত-৩৫]
আর اولوا العزم (উলুল আযম) রাসূলগণ হচ্ছেন- আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম, হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস সালাম, হযরত মুসা আলায়হিস সালাম, হযরত ঈসা আলায়হিস্‌ সালাম ও হযরত নূহ আলায়হিস সালাম। তাঁদের প্রত্যেকের নুবূয়ত বা রিসালতের কথা কায়মনোবাক্যে স্বীকার করতে হবে; কোন অবস্থাতেই তা অস্বীকার করা যাবে না। কেউ অস্বীকার করলে সে কাফির হয়ে যাবে।

 

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •