তাজিমী সাজদা (সম্মানার্থে কাউকে সাজদা করা)

0

তাজিমী সাজদা (সম্মানার্থে কাউকে সাজদা করা)

=============

বাংলাদেশসহ সারা ভারত উপমহাদেশেই অজ্ঞতার দরুণ একজন আরেকজনের মাথায় কপাল ঠেকায়, আবার অনেককে বিভিন্ন ওলী-আউলিয়ার কবরে সাজদা দিতেও দেখা যায়। এ কাজটা কত বড় জঘন্য গুনাহ্, আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি ‘আযযুবদাতুয যাকীয়্যাহ্ তাহরীমে সুজুদুত তাহীয়্যাহ’ লিখে গোমরাহীর তীরে দাঁড়ানো মানুষের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, সাজদা দুপ্রকার

১. তাআববুদীঃ আল্লাহ ছাড়া কোন ব্যক্তিকে ইলাহ বা ইলাহর অংশ বা বন্ধু ইত্যাদি মনে করে ইবাদতের নিয়তে যদি সাজদা করাকে সাজদায়ে তা‘আব্বুদী বলে।

২. তাহিয়্যাঃ কোন ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর বন্ধু ও নৈকট্যপ্রাপ্ত মনে করে তার সম্মানার্থেই (ইবাদতের উদ্দেশ্যে নয়) সাজদা করাকে সাজদায়ে তাহিয়্যা বা তা’জীমী বলা হয়।

‘সাজদায়ে তাআব্বুদী’ সর্বসম্মতভাবেই শিরক ও কুফর। এ ব্যাপারে সকল মায্হাবের ফক্বীহগণ একমত। তবে সাজদায়ে তা’জীমীর ব্যাপারে অধিকাংশ ফক্বীহগণের মত হলো, তা’জিমী সাজদা সম্পূর্ণভাবে হারাম। কতেকের মতো তা মাকরূহ। আবার কেউ কেউ বলেছেন মুবাহ্। শেষোক্ত দলের ফক্বীহগণ হাতে গোনা যায়। তবে ফতোয়া ও আমল হল প্রথমোক্ত ফক্বীহদের মতের উপর। আর আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি প্রথমোক্ত দলেই রয়েছেন। কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াস ছাড়াও যুক্তি বিজ্ঞান দিয়ে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও বিজ্ঞানময়ভাবে সাজদায়ে তাহিয়্যার উপর উক্ত গ্রন্থটি রচনা করেন। এতে তিনি বলেন, ‘‘হে মুসলমান! ওহে প্রিয় মুসলিম সমাজ! হে মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর শরীয়তের অনুসারী! (আল্লাহ ও রাসূলের) ফরমান জেনে রেখো! মনে প্রাণে একীন করো হযরত ইয্যত জাল্লা জালালুহু আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কারো জন্যে ইবাদতের নিয়্যতে সাজদা করা নিশ্চিত ও সর্বসম্মতভাবে কঠিনতম শিরক এবং প্রকাশ্য কুফরী। আর সাজদায়ে তাহিয়্যা (কারো সম্মানার্থে সাজ্দা করা) হারাম, নিশ্চিতভাবে গুনাহে কবীরা আর তা কুফরী হওয়ার মধ্যে ওলামা (ফক্বীহ) দের মধ্যে মতভেদ আছে। একদল ফক্বীহর মতে তাও কুফরী….।’’ [ইমাম আহমদ রেযাঃ ‘আল যুবদাতুয যাকীয়াহ’ (বেরেলী) পৃষ্ঠা-৫]

রুকুর ন্যায় নত হওয়া 

অনেকে দেখা যায়, কোন কবর ইত্যাদির সামনে এমনভাবে ঝুঁকে পড়ে যেমনটি রুকূতে করা হয়। এ সম্পর্কে ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, ‘‘মাযারসমূহকে সাজদা এবং এর সামনে জমীনকে চুমো দেয়া হারাম। আর রুকু পর্যন্ত ঝুঁকে পড়া মামনু (নিষিদ্ধ)।’’

তিনি বলেন, ‘‘যিয়ারতের সময় না দেওয়ালে হাত লাগাবে, না চুমো দেবে, না একে জড়িয়ে ধরবে, না এর তাওয়াফ করবে। আর না মাটি চুম্বন করবে। এসব বিদ’আতে কবীহা বা গর্হিত বিদআত।’’

তিনি আরো বলেন, ‘‘শরহে লুবারের মধ্যে আছে, মাযারকে সাজদা করা তো অকাট্যভাবে হারাম। তাই অজ্ঞমূর্খ যায়েরীনদের কাজ দেখে প্রতারিত হবেন না, বরং আমলসম্পন্ন আলেমদের অনুসরণ করবেন।’’

ফিক্বাহর উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘মাযারকে সাজদা করা থেকে দূরে থাক, কোন কবরের সামনে আল্লাহ তা‘আলাকে সাজদা করাও জায়েয নেই। যদিও তা ক্বিবলার দিকে হয়।’’ কবরস্থানে কোন জায়গা যদি নামাযের জন্য প্রস্তুত করা হয়, আর সেখানে যদি কোন কবর কিংবা নাজাসাতও না থাকে, আর ক্বিবলার দিকে যদি কবর হয়, তবে তখনও নামায মাকরুহ।

তাওয়াফ করা ও কবরে চুমো দেয়া

তাওয়াফ এবং কবরে চুমো দেয়া সম্পর্কে আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খাঁন রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন, ‘‘তাজীমের নিয়তে মাযারের তাওয়াফ নাজায়িয্। কেননা ঘরসমূহের মধ্যে তাওয়াফ করা একমাত্র খানায়ে কা’বার জন্যই নির্দিষ্ট। মাযারসমূহকে চুমো দেয়া থেকেও বেঁচে থাকা চাই। কেননা এতে সম্মানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত (বাড়াবাড়ি) করা হয়।’’ [ইমাম আহমদ রেযাঃ ‘ফতাওয়া-ই- রেযভীয়া, (৪র্থখণ্ড) জানাযা অধ্যায়, পৃষ্ঠা-৮]

আহকামে শরীয়তের মধ্যে আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি লেখেছেন, পবিত্র কা’বা মুআজ্জামা ব্যতীত অন্য কিছুকে সম্মানার্থে তাওয়াফ করা জায়েয নেই। আর খোদা ছাড়া অন্য কিছুকে সাজদা করা আমাদের শরীয়তে হারাম। কবরকে চুমো দেয়ার ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে। আর ঘেরাও করা নিষেধ। বিশেষত আমাদের (পূর্বসূরী) আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, (যিয়ারতের সময়) কমপক্ষে চার হাত দূরে দাঁড়াবে। এটাই হলো আদব। তারপরও চুমো দেয়া কিভাবে (চিন্তা) ধারণা করা যায়? এটা সেই হুকুম যা সাধারণ মানুষকে দেয়া হয়। (অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জন্য এ হুকুম প্রযোজ্য।) আর বিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের স্থান আলাদা।’’[ইমাম আহমদ রেযাঃ ‘আহকাম-ই শরীয়ত’ দ্রষ্টব্য]

শেয়ার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •