বায়আত, পীর-মুরশিদের প্রকারভেদ ও পীরের যোগ্যতা

0

বায়আত কি?
‘মুরশিদ-ই ‘আম’-এর আনুগত্যের পাশাপাশি তরিকতের প্রচলিত বায়আতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হওয়া সূফী তরিকার অন্যতম লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রকৃত সালিক (তরীকত পথের যাত্রী) -এর জন্য পীর-মুরশিদ নির্বাচন করা এক সুকঠিন ব্যাপার। কারণ, বর্তমানে পীর হওয়াকে অনেকে লাভজনক ব্যবসা মনে করে থাকে। ফলে যোগ্যতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ না হয়ে অনেকেই পূর্বপুরুষদের বুযুর্গীর সুবাদে নিজেকে শুধুমাত্র বংশীয় ধারায় ‘পীর-মুরশিদ’ ‘রাহবার’ ইত্যাদি সেজে তরিকত ও তাসাউফের পথকে কলুষিত করে তুলেছে। তাই ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বায়াআতের অর্থ, বায়আতের প্রকারভেদ ও কোন প্রকার বায়আতের জন্য কোন ধরনের পীর-মুরশিদ আবশ্যক এবং তাদের যোগ্যতার মানদণ্ড কি? -এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন-‘বায়আত মানে পরিপূর্ণভাবে বিক্রি করা। অনেকে বায়আতকে রসম বা প্রথানুসারে করে থাকে, বায়আতের অর্থ জানে না। বায়আত বলে, হযরত ইয়াহয়া মুনীরী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির এক মুরীদ নদীতে ডুবে যাচ্ছিলো। হযরত খাযির আলাইহিস্ সালাম আত্মপ্রকাশ করলেন। আর বললেন, তোমার হাত আমাকে দাও! আমি তোমাকে পানি থেকে বের করে আনবো। মুরিদ আরজ করলো, এ হাত আমি হযরত ইয়াহয়া মুনীরীকে দিয়ে রেখেছি। এখন অন্য কাউকে দেবো না। তখন হযরত খাযির অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আর হযরত ইয়াহয়া মুনীরী আত্মপ্রকাশ করলেন এবং তাকে ডুবে যাওয়া থেকে উদ্ধার করলেন।
[ইরশাদাত-ই আ’লা হযরত, পৃ.৫৯, ও মালফুযাত ২য় খণ্ড, পৃ. ৪১]

বায়আত, পীর-মুরশিদের প্রকারভেদ ও পীরের যোগ্যতা
উল্লেখ্য যে, বায়আত দু’প্রকার। ১. বায়আত-ই বরকত ২. বায়আত-ই ইরাদত। বায়আতের এ প্রকারদ্বয়ের উপর আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বলেন-

এক. ‘বায়আত-ই বরকত’ হচ্ছে- শুধু বরকত হাসিলের জন্য সিলসিলায় দাখিল হয়ে যাওয়া। আজকাল সাধারণভাবে এ বায়আতই হচ্ছে। তাও ভাল নিয়্যতে হতে হবে। অনেকে পার্থিব কোন ফাসিদ উদ্দেশ্যে বায়আত হয়ে থাকে তা আলোচনার বাইরে।… এ বায়আত গ্রহণ করাও অনর্থক নয় বরং ইহলোক ও পরলোকে এটাও অনেক উপকারে আসবে। আল্লাহর প্রিয়-বান্দাদের গোলামদের দপ্তরে নাম লিপিবদ্ধ হওয়া, তাঁদের সিলসিলার সাথে মিলিত হয়ে যাওয়া মূলত সৌভাগ্যই। (ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি এখানে এ বায়আতের ৩টি বিশেষ উপকারের কথা উল্লেখ করেছেন। বিস্তারিত জানতে ‘বায়আত ও খিলাফতের বিধান’ বঙ্গানুবাদ পুস্তকটি পাঠ করুন।)

এ প্রকার বায়আতের জন্য পীরকে ‘শায়খ-ই ইত্তিসাল’ হতে হবে। আর ‘শায়খ-ই ইত্তিসাল’ হচ্ছেন এমন পীর যার হাতে বায়আত করলে মুরীদের সম্পর্ক পরম্পরা হুযূর পুরনূর সায়্যিদুল মুরসালীন সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত গিয়ে মিলিত হয়। আর এ প্রকার পীরের মধ্যে নিম্নোক্ত চারটি বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় বায়আত করা না-জায়েয হবে। যেমন-

১. তরিকতের শায়খের সিলসিলা পরম্পরা সঠিক পন্থায় হুযূর আকদাস সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত পৌঁছা, মাঝখানে কেউ বাদ না পড়া।
২. তরিকতের শায়খ সুন্নী ও বিশুদ্ধ আক্বিদাধারী হওয়া।
৩. আলিম হওয়া। কমপক্ষে এতটুকু ইলম থাকা জারুরি যে, কারো সাহায্য ছাড়াই নিজের জরুরি সামাইল কিতাব থেকে নিজেই বের করতে পারেন।
৪. পীর ফাসিক-ই মু’লান (প্রকাশ্য ফাসিক) না হওয়া।
[বায়আত ও খিলাফতের বিধান, পৃ. ৫৮]

দুই.‘বায়আত-ই ইরাদত’ হচ্ছে নিজের ইচ্ছা ও ইখতিয়ার থেকে পুরোপুরিভাবে বের হয়ে শায়খ ও মুরশিদ, হাদী-ই বরাহক ও আল্লাহর প্রকৃত ওলীর হাতে একেবারে সোপর্দ করে দেওয়া। তাঁর কাছে জীবিত হয়েও মৃত্যের মতো থাকা। এটা হচ্ছে সালিক বান্দাদের বায়আত। এটাই মাশাইখ ও মুরশিদের উদ্দেশ্য ও কাম্য। এ ধরনের বায়আত সালিককে আল্লাহ তা‘আলা পর্যন্ত পৌঁছায়। [পূর্বোক্ত, পৃ.-৬৩]

এ প্রকার বায়আতের জন্য পীরকে ‘শায়খ-ই ইসাল’-এর মর্যাদায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আর ‘শায়খ-ই ইসাল’ হচ্ছেন এমন পীর, যিনি ‘শায়খ-ই ইত্তিসাল’-এর যাবতীয় বৈশিষ্ঠ্যের ধারক হওয়ার সাথে সাথে নফসের ক্ষতিকর বস্তু, শয়তানের প্রতারণা, কামনা-বাসনার ফাঁদ সম্পর্কে জ্ঞাত হবেন। মুরিদকে তরীকতের প্রশিক্ষণ দিতে জানেন এবং নিজ মুরিদদের প্রতি এমন স্নেহপরায়ণ যে তাকে তার দোষত্র“টি ধরিয়ে দেন এবং সংশোধনের পন্থা বাতলিয়ে দেন। আর তরিকতের পথ-পরিক্রমায় যতো অসুবিধার সৃষ্টি হয় তা’ মীমাংসা করে দেন। তিনি শুধু না ‘সালিক’, না শুধু ‘মাজযূব’।….শুধুমাত্র ‘সালিক’ বা শুধুমাত্র ‘মাজযূব’-এরা উভয় ‘শায়খ-ই ইসালা’ হতে পারেন না। কারণ প্রথমজন (সালিক) তো স্বয়ং এখন (তরিকতের) পথে রয়েছেন আর অন্যজন (মাজযূব) মুরীদকে প্রশিক্ষণ দিতে অক্ষম। বরং এ প্রকার পীরকে হয় ‘মাজযূব-ই সালিক’ হতে হবে, না হয়, ‘সালিক-ই মাজযূব’ হতে হবে। উভয়ের মধ্যে প্রথমজনই উত্তম। [প্রর্বোক্ত পৃ.৬০]

ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, ‘ফালাহ-ই ইহসান’-এর মর্যাদা অর্জন করাই তরিকতের চরম ও পরম লক্ষ। এ ফালাহ- (কল্যাণ) অর্জনের মাধ্যমেই ‘সালিক’ আল্লাহ ও তাঁর রসূলের একান্ত সান্নিধ্য লাভ করে থাকে। তাই ‘ফালাহ-ই ইহসান’ এর মর্যাদা লাভের জন্য শায়খ-ই ইসালের শিষ্যত্ব গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন। আর তাঁর হাতে বায়আত-ই ইরাদতই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বায়আত-ই বরকত যথেষ্ট নয়। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি লিখেছেন যে, ‘তরিকতের সূক্ষ্ম পথে (ইহসানের পথে) ‘মুরশিদ-ই খাস’ এর হাতে ‘বায়আত-ই ইরাদত’ গ্রহণ করা কদম রাখলে ওই সালিকের বিপদগামী হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। এ ক্ষেত্রে ‘শায়খ-ই ইত্তিসাল’ কোন কাজ দেবে না। বরং ‘শায়খ-ই ইসাল’-এর হাতে ‘বায়আত-ই এরাদত’ করতে হবে। হ্যাঁ আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ যদি তার প্রতি হয় তবে তরিকতের সব বিপদ হতে মুক্তি পাবে। তখন তার পীর স্বয়ং রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম। (তবে এটা এমন দূর্লভ বিষয় যার উপর সাবর্জনীন বিধান বর্তায় না।)[পূর্বোক্ত, পৃ.৮৭]

কাশ্ফ (অতিন্দ্রীয় অনুভূতি)
তরিকত দর্শনে ‘কাশ্ফ’ বা অতিন্দ্রীয় অনুভূতি হচ্ছে এক ধরনের অন্তর্দৃষ্টি, যার সাহায্যে সাধক ভূত-ভবিষ্যত জগতের দৃশ্য, অদৃশ, আত্মা, আল্লাহর জাত ও সিফাতকে জানতে প্রয়াস পান। অনেক তরিকতপন্থী সূফীর নিকট তরিকতপন্থী সূফীর নিকট কাশফ্লব্ধ জ্ঞানই প্রকৃত জ্ঞান। কিন্তু ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’ প্রসিদ্ধি তরীকতের ইমামদের উক্তি উদ্ধৃতিপূর্বক লিখেছেন-‘আল্লাহর ইলমের মধ্যে ওলীর কাশ্ফ ওই ইলমকে অতিক্রম করতে পারে না। যা আল্লাহর নবী কিতাব ও ওহী ধারা দান করেছে। এ স্থানে হযরত জুনাইদ বোগদাদী বলেন, আমাদের সূফীদের ইলম (হাল ও কাশ্ফ) আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাত দ্বারা আবদ্ধ।…. যে কাশফের স্বপক্ষে কিতাবুল্লাহ্ ও সুন্নাতে রসূল সাক্ষ্য না দেয়, তা কোন বস্তুই নয়।…. সুতরাং ওলীর ইলম কিতাবুল্লাহ্ ও সুন্নাতে রাসূলের বাইরে যাবে না। আর যদি সামান্যও বের হয়ে যায় তবে বুঝতে হবে যে, এটা ইলমও নয়, কাশ্ফও নয়। বরং চিন্তা-ভাবনা করলে দেখা যাবে যে, সেটি নিছক মূর্খতাই।[মাকালু- উরাফা, পৃ.২৫]

আল্লাহ্ তা‘আলা শয়তানকে এমন ক্ষমা দিয়েছেন, সে কাশফের অধিকারী ব্যক্তিকে গোলক ধাঁধায় পতিত করে। ফলে ঐ কাশফের দাবীদার সেটাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বলে ধারণা করে। এটার উপর আমল করে নিজে যেমন পথভ্রষ্ট হয় এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করে দেয়। এ জন্য তরিকতের ইমামগণ কাশ্ফ দ্বারা অর্জিত ইলমের উপর আমল করার পূর্বে তা কিতাবুল্লাহ্ ও সুন্নাতে রাসূলের মাপকাঠিতে যাচাই করে নেন। যদি তা কিতাবুল্লাহ্ ও সুন্নাতে রাসূলের অনুরূপ হয় তবে আমলযোগ্য, নতুবা ওটার উপর আমল করা হারাম।