ওরস শরীফ

0

ওরস শরীফ
‘ওরস’ (عرس)-এর আভিধানিক অর্থ বিবাহ। বর ও কনে উভয়কে আরবীতে ‘আরূস’ (عروس) বলা হয়। বাসর, প্রীতিভোজ, ওলীমাহ্ (وليمه – طعام – زفاف)কেও ওরস বলা হয়। এর বহুবচন হয় ‘আ’রাস’ ও ‘উরূসাত’ (اعراس وعروسات)। [আল-মুনজিদ]

পরিভাষায়, বুযুর্গগানে দ্বীন-এর ওফাত দিবসকে ‘ওরস’ বলা হয়। এর ভিত্তি হাদীসে পাকে বর্ণিত আছে, মুন্কার ও নাকীর যখন মৃত ব্যক্তির কবরে এসে প্রশ্ন করবে, তখন ওই প্রশ্নের সঠিক উত্তর প্রদান করতে সক্ষম হলে মৃত ব্যক্তিকে বলা হয়- نَمْ كَنَوْمَةِ الْعَرُوْسِ الَّذِىْ لاَيُؤْقِظُه اِلاَّ اَحَبُّ اَهْلِه اِلَيْهِ অর্থাৎ ওই দুলহানের মত ঘুমিয়ে পড়, যাকে পরিবারে তার প্রিয়তম ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কেউ জাগাবে না। ওই দিন মুন্কার ও নাকীর ফিরিশ্তাদ্বয় তাকে ‘আরূস’ (عَرُوْس) নামে আখ্যায়িত করে। এ জন্য ওই ওফাত দিবসকে ‘ওরস’ (عُرْس) বলা হয়।

অথবা মৃত ব্যক্তি নেক্কার হওয়ার কারণে বিশেষ করে বুযুর্গ হওয়াতে কবরের মধ্যে হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নূরানী সৌন্দর্য দেখার সৌভাগ্য হবে, যখন মুন্কার ও নাকীর জিজ্ঞাসা করবেন-مَا كُنْتَ تَقُوْلُ فِىْ حَقِّ هذَا الرَّجُلِ অর্থাৎ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে ইশারা করে বলেন, এ নূরানী সত্তা সম্পর্কে তুমি কি আক্বীদা পোষণ করতে? তখন ওই ব্যক্তি দীদারে মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম পেয়ে আত্মহারা হয়ে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর প্রশংসামূলক উত্তর দেবে। উভয় জাহানের সরদারের দীদার লাভ করে ধন্য হওয়াতে ওই সময় ওই ব্যক্তির জন্য অনেক আনন্দের মুহূর্ত হয়। তাই ওই দিনকে ‘ওরস’ (عُرْس)-এর দিন বলা হয়।

‘ওরস’ পালনের শর‘ঈ ভিত্তি বা দলীল
প্রতি বছর ওফাত দিবসে মৃত ব্যক্তি কবর বা আউলিয়া-ই কেরামের মাযার যিয়ারত করা, ক্বোরআন তিলাওয়াত, সাদ্ক্বা-খায়রাত, হালাল পশু যবেহ করে তাবাররুকের ব্যবস্থা করা হয়। এ সমস্ত কাজ ‘ওরস’ ‘(عرس) উপলক্ষে করা হয়। শরীয়ত মতে এসব কর্মসূচি শুধু বৈধ নয়, বরং অনেক সাওয়াবের কাজও।

২. ইবনে আবী শায়বাহ্ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বর্ণনা-
اِنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ ىَأْتِىْ شُهَدَآءَ أُحُدٍ عَلى رَأْسِ كُلِّ حَوْلٍ
অর্থাৎ নিশ্চয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বছরের মাথায় উহুদের শহীদগণের কবরগুলোর নিকট তাশরীফ নিয়ে যেতেন।

৩.
عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ أَنَّه كَانَ يَأْتِىْ قُبُوْرَ شُهَدَآءٍ اُحُدٍ عَلى رَأْسِ كُلِّ حَوْلٍ فَيَقُوْلُ سَلاَمٌ عَلَيْكُمْ بِمَا صَبَرْتُمْ فِنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِوَالْخُلَفَآءُ اَلْاَرْبَعَةُ هٰكَذَا كَانُوْا يَفْعَلُوْنَ
অর্থাৎ হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক বছর নির্দিষ্ট তারিখে উহুদের শোহাদা-ই কেরামের মাযারে হাযির হতেন এবং তাদেরকে সালাম পেশ করে দো‘আ করতেন। খোলাফা-ই রাশেদীনও এ আমল করতেন।

শায়খ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি বর্ণনা করেন,
دوم آنكه بهيئت اجتماعى مردمان كثير جمع شوند وختم كلام الله فاتحه برشيرينى وطعام نموده تقسيم درميان حاضران كنند ايں قسم معمول درزمانه پيغمبرخدا صلى الله عليه وسلم وخلفاۓ راشدين نه بود اگر كسےايں طور كند باك نيست بلكه فائده احياء اموات راحاصل مى شود
অর্থাৎ দ্বিতীয়ত অনেক লোক একত্রিত হয়ে খতমে ক্বোরআন করবে, খাবার ও শিরনী পাক করে ফাতেহার মাধ্যমে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে বন্টন করবে। যদিও এ কাজ হুযূর-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও খোলাফা-ই রাশেদীনের যুগে ছিলোনা; কিন্তু এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন অসুবিধা নেই; বরং এতে জীবিত ও মৃত সকলেরই উপকার সাধিত হয়।

মাওলানা আব্দুল হাই লক্ষ্মৌভী বর্ণনা করেন যে-
كه شيخ عبد الحق محدث دهلوى از شيخ خود نقل مى سازد كه فرمود كه ايں عرس در زمان سلف نبود از مستحسنات متأخرين است
অর্থাৎ শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি নিজ ওস্তাদের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, প্রচলিত ওরস শরীফ সালফ-ই সালেহীনের যুগে না থাকলেও পরবর্তী ওলামা-ই কেরামের মতে মুস্তাহাসান, ক্বোরআন-সুন্নাহর আলোকে সাব্যস্ত আমল।

হযরত গাযী-ই দ্বীন ও মিল্লাত আল্লামা আযীযুল হক্ব শেরে বাংলা রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি তাঁর ফাতাওয়া-ই আযীযিয়াতে উল্লেখ করেন-
وَفِىْ سِرَاجِ الْهِدَايَةِ َلِمَوْلاَنَا جَلاَلُ الدِّيْنِ الْبُخَارِىِّ عَلَيْهِ الرَّحْمَةُ فِىْ حَاشِيَةِ الْمَظْهَرِىِّ وَتُحْتَاطُ فِىْ السَّاعَةِ الَّتِىْ نُقِلَ رُوْحَه فِيْهَا فَاِذَا اَرْوَاحُ الْاَمْوَاتَ تَأْتُوْنَ فِىْ اَيَّامِ الْاَعْرَاسِ فِىْ كُلِّ عَامٍ فِىْ ذَالِكَ الْمَوْضِعِ فِىْ تِلْكَ السَّاعَةِ وَيَنْبَغِىْ يُطْعَمَ الطُّعَامُ وَالشَّرَابُ فِىْ تِلْكَ السَّاعَةِ فَاِنَّ ذَالِك يُفْرَحُ اَرْوَاحَهُمْ وَاِنَّ فِيْهِ تَأْثِيْرًا بَلِيْغًا (هدية الحرمين)
অর্থাৎ মাওলানা জালালুদ্দীন বোখারী হাশিয়া-ই মাযহারীতে ‘সিরাজুল হেদায়া’য় বর্ণনা করেন, ওই সময়কে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে, যখন বুযুর্গ বা মৃত ব্যক্তির রূহ কব্জ হয়েছে; কেননা। মৃতদের রূহ প্রত্যেক বছর ওরস চলাকালীন ওই সময়ে ওই স্থানে হাযির হয়। অতএব, সে সময় খাবার-তাবাররুকাত পরিবেশন করা দরকার। এতে তাদের রূহ আনন্দিত হয়।

হাজী এমদাদুল্লাহ্ মুহাজিরে মক্কী (দেওবন্দী আলিমদের পীর) ‘ফয়সালা-ই হাফতে মাসয়ালা’য় ওরস বৈধ বলে জোর দিয়ে বলেন-
ফক্বীর (নিজ)-এর এ বিষয়ে তরীক্বা এযে, আমি প্রত্যেক বছর আমার পীর-মুরশিদের এর জন্য ঈসালে সাওয়াবের ব্যবস্থা এভাবে করি যে, প্রথমে ক্বোরআন পাক তিলাওয়াত করা হয়। আর মাঝে মধ্যে সময়ানুপাতে মীলাদ শরীফও পাঠ করা হয়। এরপর উপস্থিত সবাইকে খাবার তাবাররুক হিসাবে বিতরণ করা হয়।

উপরোল্লিখিত দলীলাদির আলোকে সাব্যস্ত হল যে, ওরস শরীফ পালন করা ইসলামী অনুষ্ঠানাদির অন্তর্ভুক্ত। এটা শুধু জায়েয নয়; বরং সাওয়াবের কাজ ও ওই অনুষ্ঠানে প্রথমে যিয়ারত করা হয়। আর যিয়ারত করা ক্বোরআন-সুন্নাহ্ দ্বারা প্রমাণিত। হাদীস-ই পাকে রাসূল-ই করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُوْرِ فَزُرُوْهَا رَوَاهُ مُسْلِمٌ عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ وَقَالَ عَلَيْهِ الصَّلاَةُ وَالسَّلاَمُ كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُوْرِ فَزُرُوْا فِاِنَّهَا تُزْهِدُ فِى الدُّنْيَا وَتُذْكِرُ الْاخِرَةَ (ابن ماجة)
অর্থাৎ আমি তোমাদেরকে প্রথমে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা যিয়ারত কর। কেননা, এটা দুনিয়া বিমুখতাকে বাড়িয়ে দেয় এবং আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
দ্বিতীয়, সেখানে ক্বোরআন খতম ও অন্যান্য যিক্র-আযকার করা হয়। তা ক্বোরআন-সুন্নাহ মতে সম্পূর্ণ নেক আমল।

তৃতীয়ত, সেখানে বুযুর্গ ও মৃত ব্যক্তির স্মারক আলোচনা করা হয়, যার হাদীসে পাকে আমাদের উপর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে-
عَنْ اِبْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اُذْكُرُوْا مَحَاسِنَ مَوْتَاكُمْ وَكُفُّوْا عَنْ مَسَاوِيْهِمْ (ابوا داؤدـ ترمذى ـ حاكم ـ بيهقى ـ الجامع الصغير)
অর্থাৎ: হযরত ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল-ই পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের ঈমানদার মৃত ব্যক্তিদের ভাল দিকগুলো তুলে ধরো এবং তাদের মন্দ বিষয়সমূহের চর্চা থেকে বিরত থাক।

এছাড়া হাদীস-ই পাকে আরো উল্লেখ আছে-
ذِكْرُ الْاَنْبِيَآءِ مِنَ الْعِبَادَةِ وَذِكْرُ الصَّالِحِيْنَ كَفَّارَةٌ وَذِكْرُ الْمَوْتِ صَدَقَةٌ وَذِكْرُ الْقَبْرِ يُقَرِّبُكُمْ مِنَ الْجَنَّةِ
অর্থাৎ নবীগণের আলোচনা ইবাদত, নেককার বান্দাদের আলোচনা কাফ্ফারা, মৃত্যুকে স্মরণ করা, সদক্বাহ্ এবং কবরের আলোচনা তোমাদেরকে জান্নাতের নিকটস্থ করে দেয়।

চতুর্থ, সেখানে খাবার হিসাবে তাবাররুক বিতরণ করা হয়। অপরকে খাবার পরিবেশন সম্পর্কে হাদীসে পাকে বর্ণিত আছে-
اَىُّ الْاِسْلاَمِ خَيْرٌ قَالَ تُطْعِمُ الطَّعَامَ تَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَّمْ تَعْرِفْ ـ وَقَالَ اَيْضًا اَطْعِمُوْا الطَّعَامَ وَأَفْشُوْا السَّلاَمَ تُوَرِّثُوْا الْجِنَانَ
অর্থাৎ ইসলামের উত্তম কাজ খানা খাওয়ানো এবং পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে অধিক হারে সালাম দেয়া এটাও এরশাদ করেছেন- তোমরা খানা খাওয়াও, বেশি পরিমাণে সালাম দাও, তাহলে বেহেশতের মালিক হয়ে যাবে। (ঈমানদারদের জন্য)।

পঞ্চমত, ওরসে পাকে উপস্থিত ব্যক্তিরাই হলো মেহমান, আর মেহমানদের অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন করা ঈমানের পরিপূর্ণতা। যেমন হাদীসে পাকে উল্লেখ রয়েছে-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَبِالْيَوْمِ الْاخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَه
অর্থাৎ যে আল্লাহ্ ও আখিরাতের উপর ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানের সমাদর করে।

উপরোক্ত আমলসমূহের সমন্বয়ে ওরসে পাক উদ্যাপিত হয়, তাই ওরস পালন ইসলামের অনুষ্ঠানাদি পালনের মধ্যে অন্যতম এবং সাওয়াবের কাজ।

টিকা:
১. باب اثبات عذاب القبر ـ مشكواة ২. ফাতাওয়া-ই শামী ১ম খন্ড, বাবু যিয়ারতিল ক্বুবূর, ৩. তাফসীর-ই কবীর, তাফসীর-ই র্দুরে মনসূর, ইবনে মুনযের ইবনে মার দিওয়াইহ্ বর্ণনা সূত্রে হযরত আনাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু, ৪. ফাতাওয়া-ই আযীযিয়্যাহ্, কৃত. গাযী শেরে বাংলা (রহ.), পৃ. ৩৬ (পুরাতন ছাপা), ৭. মেশকাত শরীফ বাবু যিয়ারাতিল ক্বুবূর, ৮. আবূ দাঊদ, তিরমিযী, হাকিম, বায়হাক্বী, আল জামে‘ঊস সগীর, ইমাম সুয়ূত্বী, ৯. মুসনাদে ফেরদাউস আল জামেউস সগীর, ইমাম সুয়ূত্বী: ২য় খন্ড, পৃ. ১৯, ১০. সহীহ্ বুখারী শরীফ ১ম খন্ড, পৃ. ৬, ১১. ত্বাবরানী, আল-জামেউস্ সগীর, ইমাম সুয়ূত্বী, পৃ. ৪৪ এবং ১২. মুসনাদে আহমদ, নাসাঈ, বোখারী, মুসলিম ও আল-জামে‘ঊস সগীর, ইমাম সুয়ূত্বী।